কোভিড-১৯ একটি প্যানডেমিক

আপডেট: এপ্রিল ৭, ২০২১, ১২:১৪ পূর্বাহ্ণ

রাজিউদ্দীন আহ্মাদ:


(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
আশ্চর্য হলেও সত্য, বর্তমান বিজ্ঞানিরা কোভিড-১৯-এর টিকা বের করে ফেলেছে মাত্র ৯ মাসের মাথায় এবং তাদের অনেকগুলোই মানুষের উপর প্রয়োগ করার অনুমতিও পেয়ে গেছে ১০/১১ মাসের মধ্যে। জ্ঞান-বিজ্ঞানে যদিও পৃথিবী এখন বহু গুণ এগিয়ে তার পরেও মাত্র ৯ মাসের মধ্যে এমন একটা অজানা ভাইরাসের টিকা বের করা নিশ্চয় একটা বিস্ময়কর ঘটনা। তবে এই টিকা নিয়েও পলিটিক্স কম হয় নি! চিন-রাশিয়া অনেক আগে এর টিকা বের কললেও পশ্চিমা ধনবাদী সমাজ সেগুলোকে স্বীকৃতি দেয় নি। আজ মোট আক্রান্ত মানুষের সংখ্যার দিক থেকে বিচার কললে চিন ১ নম্বর থেকে চলে গেছে ৮৬ নম্বরে তারপরেও তাদের টিকা বিশ্বাসযোগ্য নয়! বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল এই দেশটিতে মোট আক্রান্তের সংখ্যা এখনও হাজারের ঘর ছাড়ে নি এবং মোট মৃতের সংখ্যা ৫ হাজারের নিচে।
পৃথিবীর অনেক রাষ্ট্রনায়কগণ এ রোগের কবলে পড়েছেন। প্যানডেমিকের একেবারে শুরুর দিকে কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাসিটিন ট্রুডোর স্ত্রী সফি প্রথম কোভিডে আক্রান্ত হয়েছিলেন। সম্ভবত তিনি সেটি ব্রিটেন থেকে নিয়ে এসেছিলেন। এরপরে মারাত্মকভাবে ভুগলেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন স্বয়ং। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ও ফার্স্ট লেডি উভয়েই কোভিডে ভুগেছেন। ফ্রান্স ও ব্রাজিলের প্রেসিডেন্টদেরও কোভিড হয়েছিল। এমন কি ব্রিটিশ রাজপরিবারও বাদ যায় নি Ñ প্রিন্স চার্লসও কোভিডে ভুগেছেন। এ ছাড়াও বিশ্বের নামি-দামি অনেকেই কোভিডের ছোবল খেয়েছেন। আর বিশ্বজুড়ে মারা গেছেন ৫ এপ্রিল পর্যন্ত ২৮ লাখ ৬৫ হাজার ছাব্বিশ সাধারণ মানুষ ছাড়াও এদের মধ্যে শত শত নামি-দামি মানুষও আছেন।
পৃথিবীর সব চেয়ে বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন এবং মারা গেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এত মানুষের মরার প্রয়োজন ছিল না। এ ঘটনা ঘটেছে মূলত সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ট ট্রাম্পের অবহেলার কারণে। মাস্ক পরা, সামাজিক ও পারস্পরিক দূরত্ব বজায় রাখা আর হাত ধোয়ার মতো সহজ কিন্তু অতি প্রয়োজনীয় বিষয়গুলোকে তিনি সবসময়ে বিদ্রুপ করে গেছেন Ñ বিজ্ঞান যখন জনস্বার্থে তখন তাকে অস্বীকার করে গেছেন। নিজে র‌্যালি করেছেন বিনা মাস্কে এবং প্রতিটা র‌্যালির পরে একটি করে ধাক্কা এসেছে Ñ আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা বেড়েছে। ২০২০-এ সে দেশে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ছিল। এ নিয়ে নানান অসভ্যপনা করেছেন এই সভ্য দেশের মানুষেরা কিন্তু অনেক কাজই করেছেন যা কোভিড ছড়াতে সরাসরি সাহায্য করেছে। ট্রাম্প দাবি করেন যে এতো তাড়াতাড়ি টিকা প্রস্তুত করতে তাঁর অবদান সব চেয়ে বেশি কিন্তু সেই টিকা যখন পাওয়া গেল তখন তা জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ব্যাপারে তিনি কিছুই করে যান নি। তবে বিস্ময়কর বিষয় এই যে, নিজ স্বার্থে টনটনে থেকে তিনি ও তাঁর স্ত্রী হোয়াইট হাউস ছাড়ার আগে চুরি করে টিকা নিয়ে গেছেনÑ কাউকে জানান নি। বরং উল্টো বলেছেন, তাঁদের যেহেতু কোভিড হয়েছিল এবং তখন পর্যন্ত তাঁরা ট্রিটমেন্টের মধ্যে ছিলেন তাই তাঁরা টিকা নিতে পারেন নি। অবশ্য মিথ্যে বলাটা তাঁর স্বভাব ১০টার মধ্যে ৯টা মিথ্যা এবং এতে তাঁর কোনো লজ্জা নেই। তাঁদের এই টিকা নেওয়ার কথা তো আর গোপন থাকে নি!
যুক্তরাষ্ট্রে যাঁরা কোভিডে আক্রান্ত হয়েছেন ও মারা গেছেন তাঁদের অধিকাংশই কালো আর হিস্পানিক (মূলত লাতিন আমেরিকার দেশসমূহের স্প্যানিশ ভাষাভাষী মানুষ) যাঁদের বেশির ভাগই ডেমোক্র্যাটদের ভোটার। কেন এঁরা বেশি আক্রান্ত হয়েছেন ও মারা গেছেন তা অবশ্য সঠিক করে বলা শক্ত কিন্তু সেটাই বাস্তব। আমার কাছে মনে হয়েছে রিপাব্লিকান প্রশাসন সেটার সুযোগ নিয়েছে যদিও তাতে তাৎক্ষণিক কোনো ফল পাওয়া যায় নি Ñ ডোনাল্ড ট্রাম্প ভোটে হেরেছেন, কিন্তু এর সুদূরপ্রসারী লাভ হয়তো তারা আশা করেছে। এ যুগে তো আর সেই পঞ্চদশ শতাব্দী ও তার পরের দুই-তিন শতকের (১৪৯২-১৭৭৬) মতো গণহারে আদিবাসী বা কালো ও হিস্পানিকদের হত্যা করা সম্ভব না, সুতরাং যেটা কোভিড করে দিচ্ছে তাকে বাধা দেওয়া বা প্রতিরোধ না করাই উত্তম! ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্লিপ্ততা দেখে আমার কাছে তেমনই মনে হয়েছিল।
ব্রাজিল ও মেক্সিকোর অব¯থা দেখেও কিন্তু আমার কাছে তেমনই মনে হয়েছে। সেখানে অবশ্য কালো ও হিস্পানিক শব্দগুলো তেমনভাবে আসে না কিন্তু আদিবাসী শব্দটি প্রকটভাবে আসে। এ দুটো দেশে সম্ভবত আদিবাসীদের সংখ্যা আমেরিকার মহাদেশদুটির দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি। কিন্তু বর্তমান বিশ্বে তাঁদের এখন পূর্বের মতো কচুকাটা করা যাচ্ছে না। তাই মনে হয়েছে, তাদের জন্যও কোভিড একটা আশির্বাদ হিসেবে এসেছে। ভারতও এদের মতোই দলিত শ্রেণিকে ও গরিব মুসলমানদেরকে উচ্ছেদের কাজে কোভিডকে ব্যবহার করে চলেছে।
ইউরোপের মধ্যে রাশিয়াকে বাদ দিলে সবচেয়ে খারাপ অব¯থা হয়েছে গ্রেট ব্রিটেন, ফ্রান্স, ইতালি, স্পেইন ও জার্মানির। এদের মধ্যে মৃতের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি ব্রিটেনে ও দ্বিতীয় অব¯থানে ইতালি। আক্রান্তের দিক থেকে বিচার করলে রাশিয়া এদের সবার উপরে কিন্তু মৃতের সংখ্যা ব্রিটেন ও ইতালির চেয়ে কম। এ দেশগুলির মধ্যে সবচেয়ে কার্যকরিভাবে এ ভাইরাস ও রোগকে মোকাবেলা করেছে জার্মানি এবং সবচেয়ে বাজে অব¯থা ব্রিটেনের- যদিও শুরুতে সবচেয়ে খারাপ অব¯থা ছিল ইতালির। কে জানে, ব্রিটেনও এটাকে সুযোগ হিসেবে নিয়েছিল কি না! ব্রিটেনেও তো অভিবাসীদের সংখ্যা ইউরোপের দেশগুলির মধ্যে সবচেয়ে বেশি এবং এটা নিয়ে আদি ব্রিটোনরা খুব একটা সুখি নন। পৃথিবীর বহু দেশ তাদের উপনিবেশ ছিল এবং সেই সুবাদে সেই সমস্ত দেশের বহু মানুষ ব্রিটেনে গিয়ে অধিকার নিয়ে বসবাস শুরু করে বর্তমান অভিবাসীদের একটা বিরাট অংশ সেই গ্রুপের। এরাকে তো ব্রিটোনরা কখনই ভাল চোখে দেখেন না!
এশিয়া মহাদেশে সবচেয়ে খারাপ যাদের অব¯থা তাদের মধ্যে ভারতের পরেই তুরস্ক। তুরস্ক অবশ্য রাশিয়ার মতো ইউরোপ ও এশিয়া দুটো মহাদেশ মিলে বিস্তৃত তবে এর ইউরোপিয় অংশ নিতান্তই ছোট। তুরস্কে কোভিড-১৯-এ আক্রান্তের সংখ্যা জামার্নির চেয়ে বেশি। যা-ই হোক, তুরস্কের পরে আসে ইরান আর ইন্দোনেশিয়া। আর ভারত তো পৃথিবীর দ্বিতীয় দেশ কোভিডে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যার দিক থেকে। অবশ্য অতি সম্প্রতি সে ¯থান অধিকার করেছে ব্রাজিল। বর্তমানে ভারত তৃতীয় অব¯থানে।
আফ্রিকা মহাদেশে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মানুষ কোভিডে আক্রান্ত দেশ হচ্ছে সাউথ আফ্রিকা বিশ্বের মধ্যে যার অব¯থান ইরানের পরেই কিন্তু সারা মহাদেশে আক্রান্তের সংখ্যা ফ্রান্সের চেয়েও কম। অর্থাৎ, সাউথ আফ্রিকা বাদে বাকি গরিব দেশগুলোতে কোভিড তেমনভাবে ছড়াতে পারে নি। এরাও প্রতিকূল পরিবেশে জীবন যাপন করে প্রাকৃতিকভাবেই বেশি সহিষ্ণু সহজে কেউ কাহিল করতে পারে না।
যাকগে, এবারে নিজের দেশ নিয়ে কিছু বলি। আমরা ও আমাদের দেশ গরিব, এ কথা সবাই জানেন। মনে আছে, ছোটবেলায় রচনা আসতো, দারিদ্র অভিশাপ না আশির্বাদ। এ নিয়ে ডিবেটও হতো। তখন কোন পক্ষ সমর্থন করতাম মনে নাই, কিন্তু এখন নিশ্চই দারিদ্রকে আশির্বাদই বলতাম। পৃথিবীর আর সকল দরিদ্র দেশের মতো আমাদের দেশেও কোভিড তেমন সুবিধা করতে পারে নি। এ কথা স্বীকার করতে বাধা নাই যে, আমাদের দেশ গরিব হওয়ার কারণে যথেষ্ট পরিমাণ কোভিড পরীক্ষাগার নেই যার ফলে প্রকৃত অব¯থা আমরা জানতে পারি না। সে অব¯থা ধনী দেশগুলোর জন্যও প্রযোজ্য যদিও কারণ এক নয়। ধনী দেশগুলোর অনেকেই ইচ্ছা করে পরীক্ষা করান না, বা অন্য অনেক কারণেই তা রেকর্ড হয় না। সেটা আরও খারাপ। এর প্রমাণ পাওয়া যায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ডেটা দেখে। একেকটা প্রতিষ্ঠানের ডেটা একেক রকম যদিও বিরাট ধরনের গরমিল নেই। (বিশ্বে বড় বড় প্রতিষ্ঠান এ কাজ করে চলেছে তার মধ্যে নামকরা ইউনিভার্সিটিও আছে)।
(চলবে)