কোভিড-১৯ – একটি প্যানডেমিক

আপডেট: এপ্রিল ৮, ২০২১, ১২:১৭ পূর্বাহ্ণ

রাজিউদ্দীন আহ্মাদ:


(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
তা যা বলছিলাম, আমরা গরিব বলে এমন সব জায়গাতে বসবাস করি, এমন সব কিছু খাই ও পান করি, এমন পরিবেশে কাজ করি যে আগে থেকেই সমস্তপ্রকার প্রতিকূলতাকে সহ্য করতে শিখি জন্মের পর থেকেই। যে অবস্থা ও পরিবেশে আমেরিকা বা ইউরোপের একটা গরু কিংবা শুকর একটা দিনও সুস্থ থাকতে পারবে না সেই অবস্থাতে ও পরিবেশে আমরা জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত দিব্বি কাটিয়ে দিতে পারি। এ দেশে কোভিড পরীক্ষার ব্যবস্থা অপ্রতুল সন্দেহ নেই কিন্তু কোভিড নিয়ে কোটিরও বেশি মানুষ রিক্সা চালাচ্ছেন বা অর্ধেক লোক খেতে কাজ করছেন বা অন্যান্য কায়িক পরিশ্রম করতে পারছেন এটা অবিশ্বাস্য। এক কথায় আমি বলতে চাই বা দাবি করতে চাই যে, আমাদের বেশিরভাগ মানুষই আমরা সুস্থ (কোভিডমুক্ত) জীবন যাপন করছি দু-চারজন অরেকর্ডভূক্ত কোভিড রোগী থাকলেও তাঁদের সংখ্যা নিতান্তই নগন্য এবং তাঁরা অধিকাংশই নিয়ম মতো অন্যের সক্সেগ বিচ্ছিন্নতা বজায় রেখে চলছেন। এরও কারণ আছে, আমরা আমাদের আত্মীয়-স্বজন, ব›ধুবা›ধব ও পাড়া-প্রতিবেশিকে পৃথিবীর অন্য যে কোনো মানবগোষ্ঠির চেয়ে বেশি ভালবাসি। আমার জন্য আরেকজন মারা যাবে এটা আমরা কিছুতেই মেনে নিতে পারি না। একই কথা খাটে আফ্রিকার গরিব মানবগোষ্ঠির জন্য বলে আমার বিশ্বাস। তা ছাড়া, আমরা ভয় করতে শিখেছি। আমরা জানি এটা প্যানডেমিকই হোক আর এপিডেমিকই হোক তা কী ধরনের ধ্বংশলীলা করে যেতে পারে। জীবন দিয়ে এ ভয় আমরা অর্জন করেছি। তাই, সমুদ্র সৈকতে নাইতে যেতে বা রেস্টুরেন্টে খেতে যেতে বা পার্কে ঘুরতে যেতে না পারলে আমরা পাগল হয়ে যাই না।
আমার মনে আছে, জুন-জুলাইয়ের দিকে টরোন্টোতে লকডাউন একটু শিথিল করা হলে মানুষ পাগলের মতো পার্কে, বিচে গিয়ে এমনই অসভ্যপনা শুরু করল যে তা সামাল দিতে পুলিশ নামাতে হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রেও একই দৃশ্য দেখেছি। ফ্লোরিডার বিচে, টেক্সাসের বিচে মানুষ স্বাভাবিক অবস্থার মতো ভিড় করে ঘুরেছেন। তাঁদের ভয় নেই। যদি তারা একটি এপিডেমিকও দেখতেন, আপনজনদের হারাতেন তবে, আমার বিশ্বাস, তাঁরাও একে গুরুত্ব দিতেন এবং এ বিষয়ের বিষেশজ্ঞদের কথা মেনে চলতেন।
রেকর্ড অনুযায়ী আমাদের দেশে এ যাবত মারা গেছেন ৯ হাজারের কিছু বেশি। একটু সুক্ষ¥ভাবে নিরীক্ষণ করলে আমরা দেখতে পাব যে, এঁদের অধিকাংশই উচ্চ শ্রেণির মানুষ অথবা প্রবাসী সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের সংখ্যা নিতান্তই কম। এই শ্রেণির মানুষদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের চেয়ে অনেক কম। এ দিয়ে আমি কোনোভাবেই বলতে চাচ্ছি না যে, আমাদের গরিবই থেকে যেতে হবে এবং অস্বাস্থ্যকর জায়গাতেই জীবন যাপন করে যেতে হবে। আমি কেবল বাস্তব অবস্থাকে বিশ্লেষণ করবার চেষ্টা করছি।
এই প্যানডেমিক বিশ্ব অর্থনীতির উপরে এক বিরাট প্রভাব ফেলেছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে, তা যতটা প্রকট হওয়ার কথা ঠিক ততটা কী না তা ভাববার বিষয়। দু-এক দশক আগে হলেও বিশ্ব অর্থনীতি এ এক বছরে পক্সগু হয়ে পড়তো। কিন্তু তা হয় নি। এখানে মূলত দুটো জিনিস সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে বলে আমার মনে হয়েছে। এ বিষয়ে কথা বলা যদিও আমার ধৃষ্টতা, তবু বলি, ওই দুটোর মধ্যে একটি হচ্ছে দারিদ্র এবং অন্যটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি। দারিদ্র বিশ্বের এক বিশাল জনগোষ্ঠিকে কাজে নিয়োজিত রেখেছে। আর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বাকি প্রায় সমস্ত মানুষকে ঘরে বসে কাজ করার সুযোগ করে দিয়েছে। এমন কী, এলিমেন্টারি থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকেও তাদের কাজ পুরোপুরি ব›ধ করে দিতে হয় নি। অফিস-আদালতের কাজও সীমিত আকারে হলেও চালিয়ে যেতে পেরেছে। কিছু কিছু সেক্টর এ দিয়ে চলতে পারে নি (বিমান চলাচল, কিছু কিছু শিল্প-কারখানা, হোটেল-রেস্টুরেন্ট ইত্যাদি), কিন্তু তাদেরও অনেকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সাহায্যে সামাজিক দূরত্ব ও উন্নত ধরনের সেনিটাইজারের বদৌলতে কাজ এগিয়ে নিয়ে গেছে পুরো সময়টা তাদের সব কিছু ব›ধ করে বসে থাকতে হয় নি। মোট কথা, অর্থনীতি একেবারে পক্সগু হয়ে পড়ে নি।
ইউরোপ-আমেরিকার একটা বিশাল জনগোষ্ঠি বছরধরে ঘরবন্দি, অর্থনীতিতে কিছুটা তো প্রভাব পড়বেই; কিন্তু, ইউরোপ-আমেরিকা মিলে যতো মানুষ কেবল চিন আর ভারতেই তার চেয়ে বেশি মানুষ। আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর জনশক্তিকে নিয়ে পৃথিবীর অর্ধেকেরও অনেক বেশি মানুষ কাজ করে গেছেন এই সমস্ত সময়জুড়ে। বিশ্বে খাদ্যাভাব প্রায় দেখা যায় নি। সারা পৃথিবীজুড়ে মানুষ শাক-শবজি, ফলমুল খেকে শুরু করে প্রায় সব ধরনের খাবারই পেয়েছেনÑ এটাও কোনো ছোটখাটো বিষয় নয়! এগুলো তো উৎপাদন করতে হয়েছেÑ পূর্বের স্টক থেকে আসে নি। এ সমস্ত পণ্য এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যেতে হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তার হাতে পৌঁছে দিতে হয়েছে। প্রতিটি কাজই করতে হয়েছে ভিন্ন ভিন্ন পেশার মানুষকে।
শুরুর দিকে কানাডায় দেখেছিলাম, প্রথম সপ্তাহেই পেট্রোলের দাম কমতে কমতে এক তৃতীয়াংশে নেমে এসেছিল। দুমাসের মধ্যেই সেটা স্বাভাবিকে ফিরেও গিয়েছিল। অর্থাৎ, মানুষের চলাচল কিছুটা কমে গেলেও ট্রাক-বাস বা অন্যান্য পরিবহনকে চলতেই হয়েছে। এবং এ দৃশ্য সারা বিশ্বের জন্য একই। তাই, আমার ধারণা বিশ্ব অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কিন্তু যতটা হতে পারতো তার তুলনায় ত্রিশ শতাংশের বেশি নয়। খুব বেশি ধনাঢ্য ব্যক্তিরা হয়তো একটু বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন! তা হলে, এ থেকে কী শিখলাম বিশ্ববাসী আমরা?
আমার কাছে মনে হয়েছে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যেটা আমাদের শিখিয়ে গেল এ প্যানডেমিক তা হচ্ছে, আমাদের শান্ত মাথায় ও ধৈর্যের সক্সেগ যে কোনো সক্সকটকে মোকাবেলা করতে হবে। এটা অবশ্য নতুন কিছু নয়, কিন্তু সেই পুরনো কথাটিকেই পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করে গেল কোভিড-১৯। আরও যা শিখলাম তা হচ্ছে, যতো ক্ষুদ্র বা সামান্যই হোক না কেন তা আমাদের বিশাল কিছু দিতে পারে। মনে পড়ে গেল আমার এক আত্মীয়ের কথা। তাঁর বুকে একটু ব্যথা হয়েছিল। তিনি ডাক্তার দেখালেন, নানান পরীক্ষা-নিরিক্ষা করালেন। তারপরে, ডাক্তার তাঁকে ইকোস্প্রিন ৭৫ খেয়ে যেতে বললেন যার তখন ১০টা ট্যাবলেটের দাম দুটাকা। সে আত্মীয় আমাকে বলেছিলেন, হাজার হাজার টাকা খরচ করে নানান পরীক্ষা-নিরিক্ষা করালাম, ডাক্তারকেও দিলাম একেকবারে হাজার টাকা আর ওষুধ দিলেন দুপয়সা দামের তিনি হয়তো অতটা খুশি হতে পারেন নি! তেমনি, কেবল মুখ ঢাকা, হাত ধোয়া আর দূরত্ব বজায় রেখে চলা এমন একটা অজানা শত্রুকে মোকাবেলা কীভাবে করে! কিন্তু এই সামান্য জিনিসগুলোই মানুষকে বাঁচিয়েছে, যারা মানেন নি তাঁরাই মারা গেছেন। মূল কথা, বিজ্ঞানের উপর আস্থা রাখতে হবে।
সক্সকট এখনও কাটে নি! তবে টিকা আমাদের নাগালে। এ পরিস্থিতিতে ধৈর্যসহকারে একে প্রতিহত করে আমরা সকলে সুস্থ থাকব এই আশা নিয়ে।
লেখক : স্থপতি