কোভিড-১৯ একটি প্যানডেমিক

আপডেট: এপ্রিল ৬, ২০২১, ১২:০৮ পূর্বাহ্ণ

রাজিউদ্দীন আহ্মাদ:


কোভিড-১৯ কথাটি আজ বিশ্বের প্রায় সকল মানুষের জানা। প্যানডেমিক শব্দটিও সবাই জেনে গেছেন। তবু এ বিষয় নিয়ে যখন লিখতে বসেছি, এদের সম্পর্কে সংক্ষেপে দুচারটা কথা বলে মূল বিষয়ে প্রবেশ করব। কোভিড-১৯ নামটি বিশ্ব স্বা¯থ্য সং¯থা বা ওয়ার্ল্ড হেল্থ অরগানাইজেশন বা ডাব্ল্উিএইচও দিয়েছে গত বছরের ১১ ফেব্রুয়ারি যেখানে কো দিয়ে কোরোনা, ভি দিয়ে ভাইরাস, ড বা ডি দিয়ে ডিজিজ বা রোগ আর ১৯ দিয়ে ২০১৯ সাল বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ কোভিড-১৯ একটা রোগ যা এক প্রকার কোরোনা ভাইরাস দ্বারা ছড়ায়, এবং তা প্রথম দেখা যায় ২০১৯ সালে। তা, এক প্রকার কোরোনা ভাইরাস মানে কী?
ভাইরোলোজিস্টগণ (ভাইরাস বিশেষজ্ঞ) নানা ধরনের ভাইরাস আবিষ্কার করেছেন। এদেরকে তাঁরা আকার-আকৃতি ও প্রকৃতির উপর ভিত্তি করে প্রাথমিকভাবে কয়েকটি ভাগে ভাগ করে নিয়েছেন। এদেরই একটা ভাগ কোরোনা। কোরোনা শব্দটি তাঁরা নিয়েছেন সূর্যের কোরোনা থেকে। সূর্য বোঝানোর জন্য আমরা একটা বৃত্ত এঁকে তার চারিদিকে কিছু দাগ টেনে দিয়ে এর রস্মি বা কোরোনাকে বুঝাই। এই ভাইরাসগুলোও সূর্যের মতো গোলাকৃতি ও তাদের গায়ে সূর্যের দাগগুলোর মতো প্রোটিনের তৈরি কিছু স্পাইক (সরু বস্তু) থাকে। সেই থেকে এদের নামকরণ কোরোনা ভাইরাস। বিজ্ঞানিগণ কয়েক হাজার কোরোনা ভাইরাস চেনেন।
গত বছরের নভেম্বরের দিকে চিনের উহান শহরে দেখা যায় এক নতুন ধরনের কোরোনা ভাইরাস, প্রাথমিকভাবে যাকে নোভেল (অপরিচিত/নতুন) কোরোনা ভাইরাস বলা হতো। এ ভাইরাস মানুষের মধ্যে নিউমোনিয়ার মতো এক মারাত্মক ধরনের ফুসফুসের ব্যাধি তৈরি করে। ব্যাপকভাবে এই ভাইরাসজনিত রোগ ছড়াতে থাকে উহান শহরে। কয়েক দিনের মধ্যে হাজার হাজার মানুষ আক্রান্ত হয়ে পড়েন এই নতুন রোগে এবং তা ছড়াতে থাকে অতিদ্রুত বেগে। প্রাথমিকভাবে মানুষ কেবল এটুকুই জানতে পারে যে, ওই ব্যাধির কারণ এক নতুন ধরনের কোরোনা ভাইরাস কিন্তু তাঁরা জানেন না এরা আসল কোথায় থেকে বা এর চিকিৎসাই বা কী। তবে, তাঁরা অল্প কিছু দিনের মধ্যেই জানতে পেরেছেন এটা ছড়াচ্ছে কীভাবে। সেই জ্ঞানের উপর ভিত্তি করে প্রশাসন মানুষের চলাফেরা ও মেলামেশা সম্পূর্ণভাবে নিষি™ধ করে দেয়, এমন কী বাজার ও অফিস-আদালতও ব›ধ করে দেয়। কিন্তু তার মধ্যেই এই ভাইরাস ও রোগ নিয়ে ওই শহর থেকে প্রচুর মানুষ পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে চলে যান।
শুরুর দিকে ইতালি, ফ্রান্স, ইংল্যান্ডসহ ইউরোপের আরও কিছু দেশে এ রোগ ব্যাপকভাবে ছড়াতে থাকে। চিনের পাশের দেশ দক্ষিণ কোরিয়া, ভিয়েতনাম এমন কি দ্বীপ দেশ ফিলিপাইনও আক্রান্ত হয়। সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতেও এ রোগ দেখা যায়। অচিরেই আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রে এ রোগ ব্যাপকভাবে ছড়াতে থাকে। এমন এক পর্যায়ে গত বছরের ১১ মার্চ বিশ্ব স্বা¯থ্য সং¯থা একে প্যানডেমিক ঘোষণা দেয়। প্যানডেমিক হচ্ছে এমন একটি মহামারি বা ছোঁয়াচে রোগ যা কোনো ছোট এলাকায় সীমাব™ধ নয়, ছড়িয়ে পড়েছে একটা ব্যাপক ভৌগলিক এলাকাজুড়ে। সেই প্যানডেমিক ঘোষণার বর্ষপূর্তি হলো সম্প্রতি। এই এক বছরে পৃথিবী কীভাবে দিন কাটাল, কী দেখল আর কী শিখল, আমরা এখন কোন পর্যায়ে ইত্যাদি নিয়ে এবারে একটুখানি আলোচনা করব Ñ একে পর্যালোচনাও বলা যেতে পারে।
১১ মার্চ ২০২০ তারিখেও পৃথিবীর বহু মানুষ বুঝে উঠতে পারেন নি কোভিড-১৯ কতোটা ভয়াবহ হতে পারে। সেই সময়ে এ রোগ বা ভাইরাস চিনের পরে সবচেয়ে বেশি ছড়িয়েছিল ইতালি ও যুক্তরাষ্ট্রে। ইউরোপের আরও কিছু দেশে এর বিস্তার ঘটছিল বেশ দ্রুত গতিতেই। অল্প কিছু দিনের মধ্যেই আমেরিকা মহাদেশদ্বয়ের বেশ কিছু দেশে এ ভাইরাস ব্যাপকভাবে ছড়াতে থাকে তার মধ্যে কানাডা অন্যতম। আমি তখন কানাডাতে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরবেও এর বিস্তার দেখা যায়। যে দেশেই এ ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দিচ্ছে সে দেশই লকডাউনে (অতি জরুরি অফিস বা দোকানপাট বাদে সমস্ত কিছু ব›ধ করে মানুষের চলাচল, মেলামেশা ইত্যাদির উপর নিষেধাজ্ঞা) চলে যাচ্ছে। লকডাউন কার্যকরি করার জন্য পশ্চিমা বিশ্বের কোনো কোনো দেশ তাদের দেশে বা ¯থানীয়ভাবে কোথাও কোথাও জরুরি অব¯থা জারি করছে। কানাডাতেও কোনো কোনো প্রদেশে (ব্রিটিশ কলোম্বিয়া, ওন্টারিও, কুইবেক ইত্যাদি) জরুরি অব¯থা জারি করা হয়েছিল। শুরুতে অনেক দেশ এবং অচিরেই প্রায় সমস্ত দেশ তাদের সীমান্ত ব›ধ করে দিচ্ছে। অর্থাৎ, দ্রুত পৃথিবী ¯থবির হয়ে পড়ছে। মানুষ বন্দিজীবনে যেন বাড়িভাড়া দিয়ে খেয়ে বাঁচতে পারে তার জন্য কানাডা, যুক্তরাষ্ট্রসহ বহু দেশ জরুরি আর্থিক সহায়তার ব্যব¯থা করেছে। এই অব¯থাতে স্বার্থান্বেষী কিছু রাষ্ট্রনেতা একে একটা সুযোগ হিসেবেও নিয়েছেন ও তার সদ্ব্যবহার করতেও পিছপা হন নি। এদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। শুরুতেই তিনি ৩এম-এর উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন যেন তারা কানাডাতে ফেস মাস্ক রপ্তানি না করে যার জন্য ৩এম পূর্ব থেকেই কানাডার সক্সেগ চুক্তিব™ধ ছিল। উল্লেখযোগ্যভাবে এ রোগের বিস্তার নিয়ন্ত্রণের ভিতর নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছিল চিন, ভিয়েতনাম, দক্ষিণ কোরিয়া ইত্যাদি।
এর মধ্যে সৌদি আরব, ইতালিসহ অন্যান্য দেশ থেকে বেশ কিছু বাঙালি দেশে ফিরে আসেন। স্বভবতই তারা তাঁদের সক্সেগ এই মারাত্মক ভাইরাসও নিয়ে আসেন। বাংলাদেশেও কোভিডে মানুষ অসু¯থ হতে শুরু করেন এবং কিছু মানুষ মারাও যান। এর আগে বাংলাদেশে এ রোগ দেখা দেয় নি। এ ঘটনার পর সরকার বিদেশ থেকে আগত মানুষের বাংলাদেশে প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপ করে। বিদেশ থেকে কেউ এলে তাঁকে ১৪ দিন কোয়ারিন্টিনে (রোগ-অন্তরণ) থাকতে হবে, তারপরে গন্তব্যে যেতে পারবেন। কিন্তু বাংলাদেশের মতো গরিব দেশে এতো মানুষকে কোয়ারিন্টিনে কোথায় রাখবে? শুনেছিলাম, প্রাথমিকভাবে তাঁদের থাকার ব্যব¯থা করা হয়েছিল এয়ারপোর্টের কাছে হাজি ক্যাম্পে। কিন্তু সেখানে থাকার-খাওয়ার ব্যব¯থা নিশ্চই খুব একটা ভাল ছিল না! তা ছাড়া, প্রতিদিনই তো মানুষ আসছেন যাঁদের সংখ্যা খুব একটা কম নয়! শেষে এতো মানুষের থাকা ও খাওয়া-দাওয়ার অনিশ্চয়তা। এ নিয়ে দেশে পৌঁছানো মানুষের মধ্যে অসন্তোষ এবং যাঁরা দেশে ফেরার চিন্তা করছিলেন তাঁদের মধ্যে এক ধরনের আশক্সকা দেখা দেয়। ঠিক এই সময়ে আমাদেরও দেশে ফেরার কথা ছিল Ñ পরি¯িথতির কথা বিবেচনা করে আমরা আমাদের পরিকল্পনা ¯থগিত করি। ফলে আমাদের দেশে ফেরা ছয় মাস পিছিয়ে যায়। এর সুবাদে কানাডা ও তার কাছের দেশ যুক্তরাষ্ট্রকে খুব কাছে থেকে অনুধাবন করতে, এবং বিশ্বের অন্যান্য দেশ বিশেষ করে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো সম্পর্কে সম্যকভাবে জ্ঞাত হতে পেরেছি। বিভিন্ন দেশ এ প্যানডেমিককে কীভাবে ব্যবহার করেছে তা কিছুটা আঁচ করতে পেরেছি। এদের যেগুলো আমার ধারণাপ্রসূত তা যে অব্যর্থ এমন দাবি আমি করি না, তবে সেগুলো একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার মতোও নয় বলে আমার ধারণা। এগুলোর মধ্যে ঢোকার আগে ইতিহাসের দিকে একটু চোখ ফেরানো যাক।
প্রথম বিশ্বযু™েধর অব্যবহিত পরেই প্রায় একশ বছর আগে ১৯১৮ সালে এমন আর একটি প্যানডেমিক দেখা দিয়েছিল, নাম স্প্যানিস ফ্লু। স্প্যানিস ফ্লু নিয়ে অনেক কথাই বলা যায় কিন্তু অত কথার প্রয়োজন নাই। শুধু এটুকুই বলি, এই মারাত্মক ইনফ্লুয়েঞ্জার নাম স্প্যানিস ফ্লু হলেও তার উৎপত্তি স্পেনে হয়েছিল বলে অনেকেই মনে করেন না। এই স্প্যনিস ফ্লু প্যানডেমিক বিশ্বের ইতিহাসে ভয়াবহতম ও অতি ধংসাত্মক প্যানডেমিক। দুই বছরের সামান্য কিছু বেশি সময়ের মধ্যে এ রোগে মারা যান ১ কোটি ৭০ লাখ থেকে ১০ কোটি মানুষÑ তবে অনেকের ধারণা তা অন্তত ৫ কোটি। এতে আক্রান্ত হয়েছিলেন ৫০ কোটি মানুষ যা তখনকার বিশ্বের জনসংখ্যার এক তৃতিয়াংশ। উল্লেখ্য, স্প্যানিস ফ্লুর কোনো টিকা আবিস্কৃত হয় নি। এটিও একটি ভাইরাসজনিত রোগ তবে ওটা কোরোনা ভাইরাস ছিল না Ñ তার নাম ছিল এইচ১এন১ ইনফ্লুয়েঞ্জা এ ভাইরাস।
এরও শত বছর আগে ১৮১৭ থেকে ১৮২৪ পর্যন্ত পৃথিবী দেখেছে কলেরা প্যানডেমিক। লক্ষ লক্ষ মানুষ সে রোগে মারা গেছেন। এ রোগের কারণ ছিল পানিবাহিত একপ্রকার জীবাণু। কলেরার তা-ব আমরাও ছোটবেলায় দেখেছি তবে প্যানডেমিক হিসেবে নয়, দেখেছি এপিডেমিক বা মহামারি হিসেবে। এমন মহামারি আমরা গরিব দেশের মানুষরা দেখেছি আমাদের অনেকেরই জীবদ্দশায়। তাই, এপিডেমিকই হোক আর প্যানডেমিকই হোক তাকে আমরা ভয় করতে শিখেছি। কিন্তু উন্নত বিশ্ব এগুলো সাম্প্রতিক কালে দেখে নি, তাই তারা বুঝতে পারে না এরা কতটা ভযাবহ হতে পারে! যা-ই হোক, প্রসক্সেগ ফিরে আসি, গত দুই শতাব্দী ধরে এই ধরনের প্যানডেমিক রিপিট করে চলেছে। এর মাঝে আরও অনেক প্যানডেমিক এসেছে তাদের মধ্যে একেবারে সেদিন (২০০৯) এসেছিল সোআইন ফ্লু। তা ছাড়া প্লেগ এসেছে, যক্ষা এসেছে, বসন্ত এসেছে, কুষ্ঠ এসেছে এমন কি ম্যালেরিয়া এসেছে এবং এ সব ব্যাধি লক্ষ লক্ষ প্রাণ নিয়ে গেছে তবে সেগুলো প্যানডেমিক ছিল কী না জানি না, তবে প্রতিটিই ত্রাস ছিল।
(চলবে)