কোভিড-১৯: ‘ঢিলেমি ভাবে’ ফের সংক্রমণ বাড়ার প্রবণতা

আপডেট: মার্চ ৮, ২০২১, ২:৪৯ অপরাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


সম্প্রতি জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে এ্ই কর্মসূচি পালনকারীদের পাশাপাশি গণমাধ্যমকর্মীদের মধ্যেও স্বাস্থ্যবিধি পালন দেখা যায়নি। একই অবস্থা ছিল সেখানে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদেরও। ফাইল ছবি
সম্প্রতি জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে এ্ই কর্মসূচি পালনকারীদের পাশাপাশি গণমাধ্যমকর্মীদের মধ্যেও স্বাস্থ্যবিধি পালন দেখা যায়নি। একই অবস্থা ছিল সেখানে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদেরও। ফাইল ছবি
গত বছরের মার্চে যে আতঙ্ক ছড়িয়ে করোনাভাইরাস এসেছিল বাংলাদেশ; এক বছর পর টিকা স্বস্তি দিলেও আবার সংক্রমণ বাড়ার প্রবণতা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানুষের মধ্যে এক ধরনের গাছাড়া ভাব চলে এসেছে, যা আশঙ্কার। এখন সংক্রমণ কমিয়ে রাখতে হলে আগের মতো স্বাস্থ্য বিধি মেনে চলতে হবে।
চীনের উহান থেকে ছড়িয়ে নতুন করোনাভাইরাস বিশ্বজুড়ে মহামারী বাঁধিয়েছিল ২০২০ সালের শুরুতেই। ওই বছরের ৮ মার্চ বাংলাদেশে প্রথম কোভিড-১৯ রোগী শনাক্ত হয়েছিল, যার বছর পূর্ণ হল রোববার।
মার্চের পর থেকে সংক্রমণের গতি দ্রুত বাড়লেও গত কয়েক মাস ধরে তা নিম্নমুখী।
মোটা দাগে পরীক্ষা বিবেচনায় শনাক্তের হার এখন ৫ শতাংশের নিচে, যাকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ‘নিয়ন্ত্রিত’ পরিস্থিতি হিসেবে বিবেচনা করে।
গত বছরের মাঝামাঝিতে যে সংক্রমণের হার ২০ শতাংশের উপর ওঠেছিল, তা এবছর ফেব্রুয়ারিতে ৩ শতাংশের নিচে নামলেও মার্চের প্রথম সপ্তাহে ওঠানামার মধ্যেও বেড়ে তা ৪ শতাংশের উপরে ওঠেছে।
যদিও এর মধ্যেই গত ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে গণহারে কোভিড-১৯ টিকা দেওয়া শুরু হয়েছে। এক মাসে ৩৫ লাখের মতো মানুষ টিকাও নিয়েছেন।
সংক্রমণের নিম্নগতি এবং টিকা দেওয়া শুরুর পর স্বাস্থ্যবিধি পালনে মানুষের মধ্যে ঢিলেমির ভাব এখন স্পষ্ট।
২০২০ সালের ৮ মার্চ বাংলাদেশে প্রথম তিনজনের দেহে নতুন করোনাভাইরাস সংক্রমণ ধরা পড়ার কথা সরকার জানায়। এক বছর পর রোববার (৭ মার্চ) শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ছাড়িয়েছে সাড়ে পাঁচ লাখ, এখন পর্যন্ত মারা গেছেন ৮ হাজার ৪৫১ জন।
বাংলাদেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের ধারা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ৮ মার্চ প্রথম মার্চে সংক্রমণ শুরুর পর জুলাই পর্যন্ত দৈনিক শনাক্ত রোগী বেড়েছে। এর মধ্যে ১ জুলাই একদিনে সর্বোচ্চ ৪ হাজার ১৯ জন রোগী শনাক্ত হয়। ১৭ জুন ৪ হাজার ৮ জন এবং ২৯ জুন ৪ হাজার ১৪ জনের করোনাভাইরাস ধরা পড়ে।
এছাড়া আর কখনও দৈনিক শনাক্ত ৪ হাজারের ঘর ছাড়ায়নি।
জুলাইয়ের পর সংক্রমণ নিম্নগামী হতে শুরু করে। অগাস্ট , সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে সংক্রমণ কমলেও নভেম্বরে কিছুটা বেড়ে যায়। আর গত ডিসেম্বর থেকে সংক্রমণ কমের দিকে।
সংক্রমণের হারের ওঠানামার গড় মাসিক হিসাব পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২০ সালের ৮ মার্চ শনাক্ত হওয়ার পর ওই মাসে দৈনিক গড় সংক্রমণের হার ছিল ৩ দশমিক ১৮ শতাংশ। তবে তা বাড়তে বাড়তে জুলাইয়ে সর্বোচ্চ ২২ দশমিক ৪৬ শতাংশে ওঠে, যেটা সর্বনিম্ন ছিল গত ফেব্রুয়ারিতে ২ দশমিক ৮২ শতাংশ।
তবে মার্চের প্রথম সপ্তাহে তা কিছুটা করে বাড়ছে এবং রোববার তা ৪ দশমিক ৩০ শতাংশে উঠেছে।
এক বছরে করোনাভাইরাস সংক্রমণের গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, শুরুতে সংক্রমণ বাড়ার পর কমেছে। গত কয়েকদিন ধরে আবার সংক্রমণের প্রবণতা বাড়ছে। সংক্রমণের হার ৩ শতাংশের নিচে চলে গিয়েছিল। সেটা আবার পাঁচের কাছাকাছি চলে গেছে, যদিও এটা অল্প।
“আমরা শূন্যের কোঠায় আসতে পারি নাই। সংক্রমণের এটা একটা স্থিতিশীল অবস্থা। কিন্তু তাতে সাময়িক স্বস্তি মিললেও তুষ্টিতে ভোগার কিছু নেই। সংক্রমণ আবার বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে।”
আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা বলেন, “আমরা যদি স্বাস্থ্যবিধি না মানি, আমরা যদি মাস্ক না পরি, কর্মস্থলে দূরত্ব বজায় না রাখি, তাহলে সংক্রমণটা আবার বেড়ে যাবে।
“সার্ভিলেন্স সিস্টেমটা ঠিক রাখতে হবে। কন্ট্রাক্ট ট্রেসিং, জিনোমিক সিকোয়েন্স করা দরকার। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে এগুলো করা খুব দরকার।”
গত বছরের মাঝামাঝিতে সামাজিক দূরত্ব মেনেই নামাজ হত, এখন আর তা নেই। ফাইল ছবি: সুমন বাবুগত বছরের মাঝামাঝিতে সামাজিক দূরত্ব মেনেই নামাজ হত, এখন আর তা নেই। ফাইল ছবি: সুমন বাবু
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২০ সালের ২১ জানুয়ারি দেশে করোনাভাইরাসের নমুনা পরীক্ষা শুরু হয়। ৩১ মার্চ পর্যন্ত ১৬০২টি নমুনা পরীক্ষায় সংক্রমণ ধরা পড়ে ৫১ জনের, সংক্রমণের হার ৩ দশমিক ১৮ শতাংশ, এপ্রিলে ৩ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ। মে মাস থেকে শনাক্তের হার বাড়তে থাকে।
ওই মাসে ১৬ দশমিক ১৭ শতাংশ, জুনে ২১ দশমিক ৪৯ শতাংশ, জুলাইয়ে ২২ দশমিক ৪৬, অগাস্টে ২০ দশমিক ১৮, সেপ্টেম্বরে ১২ দশমিক ৭০ শতাংশ, অক্টোবরে ১১ দশমিক ৩৬ শতাংশ, নভেম্বরে ১৩ দশমিক ১২, ডিসেম্বরে ১০ দশমিক ৬৮, চলতি বছরের জানুয়ারিতে ৫ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ এবং ফেব্রুয়ারিতে ২ দশমিক ৮২ শতাংশে নেমেছে সংক্রমণের হার।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেবে, টানা দুই সপ্তাহ দৈনিক শনাক্ত রোগী পাঁচ শতাংশের নিচে থাকলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আছে বলে ধরা হয়।
বাংলাদেশে গত ১৪ জানুয়ারি থেকে দৈনিক সংক্রমণের হার ৫ শতাংশের নিচে আসে। এরপর থেকে ১৯ জানুয়ারি থেকে ৭ মার্চ পর্যন্ত পরীক্ষা বিবেচনায় শনাক্ত রোগীর হার ৫ শতাংশের নিচেই আছে। তবে ফেব্রুয়ারিতে শনাক্তের ৩ শতাংশের নিচে নেমে এলেও মার্চের প্রথম সপ্তাহে তা বাড়ার প্রবণতার মধ্যে ৪ শতাংশের উপরে উঠেছে।
একুশে পদক জয়ী অনুজীব বিজ্ঞানী ড. সমীর কুমার দে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বাংলাদেশে সংক্রমণের হার, মৃত্যুর হার কমেছে। সম্প্রতি এটা কিছুটা বেড়েছে মানুষের অসাবধানতার কারণে। আমরা নিজেরা সতর্ক থাকছি না। মাস্ক পরছি না। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখছি না। ঘরে থাকছি কম।
“আমরা হঠাৎ করেই রিল্যাক্সড হয়ে গেছি। বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমেও মনে হচ্ছে আগের মতো প্রচারণা চলছে না।”
মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করেছে সরকার। কিন্তু মানা কী হচ্ছে? ছবি: আসিফ মাহমুদ অভিমাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করেছে সরকার। কিন্তু মানা কী হচ্ছে? ছবি: আসিফ মাহমুদ অভি
নতুন করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরুর পর থেকে ভাইরাসটির অনেক মিউটেশন হয়েছে, যেটা বাংলাদেশেও ঘটেছে বলে মনে করেন সমীর।
তিনি বলেন, “তবে ওই মিউটেশন বাংলাদেশে তেমন কোনো প্রভাব ফেলেনি। দক্ষিণ আফ্রিকার ধরন দেশে এসেছে কি না, এখনও নিশ্চিত না। কিন্তু যুক্তরাজ্যের নতুন ধরনটি বাংলাদেশে এসেছে।
“এই ধরন যুক্তরাজ্যে অনেক কিছু করছে আমরা জানি। কিন্তু আমাদের দেশে এখনও পর্যন্ত খুব একটা প্রভাব ফেলতে পারেনি। সংক্রমণ অনেক বেশি হওয়ার কথা। কিন্তু আমরা এখন পর্যন্ত ঠিক আছি। আমরা যদি সতর্ক থাকি। তাহলে আমাদের ওপর এটা খুব প্রভাব ফেলতে পারবে না।”
তথ্যসূত্র: বিডিনিউজ