কোরবানির পশুর চামড়া ছাড়ানো ও সংরক্ষণে নিয়ম

আপডেট: সেপ্টেম্বর ১, ২০১৭, ১:০১ পূর্বাহ্ণ

এই কোরবানি ঈদে আপনারা অনেকেই হৃষ্ট-পুষ্ট  ও নিখুঁত গরু, ছাগাল, ভেড়া কোরবানি করে থাকেন। এসব কোরবানি পশুর চামড়া একটি মূল্যবান জাতীয় সম্পদ। প্রতি বছর এসব চামড়া ও চামড়াজাত দ্রব্যাদি রপ্তানির মাধ্যমে জিডিপি‘তে প্রাণিসম্পদ খাত উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে চলেছে। কিন্তু সঠিকভাবে চামড়া ছাড়ানো ও তা সংরক্ষণের পদ্ধতি না জানার কারণে অনেক সময় আশানুরূপ উন্নতমানের চামড়া পাওয়া যায় না। প্রায়ই দেখা যায়, চামড়ার নানা স্থানে কাটা দাগ, ছুরির দাগ ও পচন ধরার চিহ্ন থাকে। তাই নিখুঁতভাবে চামড়া ছাড়ানো ও সংরক্ষণ এবং এর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উপর জনসচেতনতা গড়ে তোলা উচিত।
চামড়া ছাড়ানোর নিয়মাবলি
    পশুকে জবেহ্ করার পূর্বে ভালভাবে গোসল করিয়ে নিবেন- যেন দেহে কোন প্রকার ময়লা না থাকে।
    জবেহ্ করার অন্তত ২ ঘণ্টা পূর্বে পশুকে পর্যাপ্ত পানি পান করাতে হবে। এতে দেহ থেকে চামড়া ছাড়ানো সহজ হয়।
    কোরবানির উদ্দেশ্যে জবেহ এর পশুকে সাবধানে মাটিতে শোয়াবেন যেন দেহে কোন আঘাত না লাগে, আঘাত লাগলে চামড়া থেতলিয়ে যেতে পারে।
    জবেহ্ এর জন্য নক্দার বা ধারালো ছুরি এবং চামড়া ছাড়ানোর জন্য মাথা বাকানো কম ধারালো ছূরি ব্যবহার করবেন।
    জবেহ্ করার পর পশু দেহ অসাড় বা নিস্তেজ হয়ে এলে পশুকে চিৎ করে শুইয়ে দু‘পাশে ঠেঁস দিয়ে দেবেন- এতে ছুরির কাটা দাগ লাগার আশংকা কম থাকে।
    ধারালো ছুরির অগ্রভাগ দিয়ে জবেহ্ করার স্থান থেকে গলা, সিনা ও পেটের ওপর দিয়ে সোজাসুজি দাগ কেটে নেবেন। এরপর সামনের দু‘পায়ের হাঁটু থেকে সিনা পর্যন্ত আর একটি দাগ কেটে প্রথম দাগের সাথে যোগ করুন এবং পেছনের দু‘পায়ের হাটু থেকে লেজের কাছাকাছি পর্যন্ত দাগ কেটে প্রথম দাগের সাথে যোগ করুন। দাগ যেন কোন ক্রমেই বাঁকা না হয়।
    সম্ভব হলে পশুকে গাছের ডালে বা ঝুলনে ঝুলিয়ে চামড়া ছাড়াবেন, এতে চামড়া নষ্ট হয় না। ঝুলিয়ে চামড়া ছাড়ানো সম্ভব না হলে দাগ কাটার পর প্রথমেই গলার অর্ধেক ছাড়াবেন। তারপর সামনের পা ছাড়িয়ে সিনা, কাঁধ ও পেটের চামড়া ছাড়াবেন। পেছনের পা ছাড়িয়ে পিঠ পর্যন্ত নেবেন। সিনা  ও পেছনের হিপে চামড়া লেগে থাকে, কাজেই এসব স্থানের চামড়া সাবধানে ছাড়াতে হবে, যাতে ছুরির দাগ না পড়ে বা কেটে না যায়।
    দেহ থেকে চামড়া ছাড়ানোর পর মাটিতে ছেঁচড়াবেন না। রক্ত, গোবর ও কাদাযুক্ত মাটি যাতে চামড়ার না লাগে সে দিকে লক্ষ্য রাখবেন।
    ছাড়ানো চামড়া যথাশিগগিরই বিক্রয়ের ব্যবস্থা নেবেন। ৫/৬ ঘণ্টার মধ্যে বিক্রয় করা সম্ভব না হলে সঠিব পদ্ধতি অনুসরণ করে চামড়া সংরক্ষণ করতে পারেন।
চামড়া সংরক্ষণের নিয়মাবলি
    চামড়া ভালভাবে পরিস্কার পানিতে ধুয়ে নিতে হবে।
    চামড়ায় লেগে থাকা অতিরিক্ত গোশ্ত, চর্বি এবং ঝিল্লি ভালভাবে ছুরি দিয়ে উঠিয়ে ফেলবেন, নইলে ওই সব জায়গায় লবণ প্রবেশ করতে পারবে না।
    চামড়ার গোশতের পিঠ উপরের দিকে রেখে মুঠি মুঠি লবণ চামড়ায় ছড়িয়ে হাতে দিয়ে ভালভাবে ঘষে লাগিয়ে দেবেন এবং প্রথমবারের লবণ চুষে নিলে দ্বিতীয় বার একই নিয়মে লবণ লাগাবেন।
    চামড়া সংরক্ষণের জন্য এভাবে লবণ লাগাতে প্রতিটি গরুর চামড়ার জন্য ৫ থেকে ৭ কেজি এবং প্রতিটি ছাগল/ভেড়ার চামড়ার জন্য ১.৫ থেকে ২ কেজি লবণের প্রয়োজন হবে।
চামড়া সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা আমার, আপনার সকলের দায়িত্ব। এই জাতীয় সম্পদ সুষ্ঠুভাবে সংরক্ষণের মাধ্যমে ও বাজারজাতকরণের ফলেই উপযুক্ত মূল্য পাওয়া যায় এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে সহায়ক হয়।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনা
পশুর রক্ত ও বর্জ্য থেকে উৎকৃষ্ট জৈব সার পাওয়া যায়। এতে শতকরা প্রায় ১০ ভাগ নাইট্রোজেন থাকে, যা ইউরিয়া সারের মত কাজ করে। এছাড়া এতে রয়েছে ফসফরাস ও পটাসিয়াম। জমির উর্বরতা বাড়ানোর জন্য এ সার খুবই উপযোগী। তাই পশুর এ বর্জ্যকে ফেলনা মনে করে অপচয় করা মোটেই উচিত নয়।
যেখানে সেখানে গরু জবাই না করে সিটি কর্পোরেশন কর্তৃক নির্দিষ্ট স্থানে অথবা সম্ভব হলে যে জমিতে সহসাই ফসল উৎপাদন করবেন, সে জমিতে পশু জবাই করুন। পশু জবাইয়ের পর কেবল রক্তের ওপর মাটি চাপা দিন। কিছু দিনের মধ্যেই তা পচে সারে পরিণত হয়ে যাবে। পশুর নাড়ি ভুঁড়ি ও মল ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকলে নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। অথচ এগুলোকে এক জায়গায় গর্ত করে পচালে তা থেকে মূল্যবান সার পাওয়া যায়। শহর অঞ্চলে মাটি চাপা দেয়ার ব্যবস্থা না থাকলে নিজ উদ্যোগে বস্তায় ভরে একটি নির্দিষ্ট স্থানে রাখতে হবে- যাতে কর্পোরেশনের পরিচ্ছন্ন কর্মিরা তা সহজেই নির্ধারিত সংরক্ষিত স্থানে নিয়ে যেতে পারে। মনে রাখতে হবে, কোন অবস্থাতেই কোরবানির বর্জ্য ড্রেনে বা খোলা জায়গায় ফেলে রাখা যাবে না। এতে পরিবেশ দুষিত হবে এবং স্বাস্থ্যহানিকর বিভিন্ন রোগের বিস্তার ঘটাতে পারে।
তাই আসুন, আসন্ন ঈদ-উল-আযহা উপলক্ষ্যে আমরা আমাদের কোরবানিকৃত পশুর চামড়া যেন নিখুঁতভাবে পাই এবং তা যথাযথভাবে সংরক্ষণের পাশাপাশি সঠিকভাবে এর বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় জনসচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে পরিবেশের সুরক্ষা নিশ্চিত করি।
সূত্র : মৎস্য ও প্রাণি সম্পদ তথ্য দপ্তর, রাজশাহী।