কোরবানির পশুর বর্জ্য যায় থাইল্যান্ড মিয়ানমার চিন ও জাপানে

আপডেট: সেপ্টেম্বর ৫, ২০১৭, ১১:৪০ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


কোরবানির পশুর কোনও কিছুই এখন ফেলনা নয়। গরুর হাড়, শিং, চামড়া, নাড়িভুঁড়ি, মূত্রনালি, চর্বি, রক্তের মতো বর্জ্যগুলো সঠিকভাবে সংরক্ষণ করে প্রক্রিয়াজাত করা গেলে এগুলো যেমন লাগতে পারে জীবন সাজানোর কাজে, তেমনি জীবন বাঁচানোর কাজেও রয়েছে এগুলোর ব্যবহার। শুধু তাই নয়, এসব বর্জ্যের অনেকগুলোই রফতানিযোগ্য, যা থেকে উপার্জিত হতে পারে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রাও। এসব পশুর বর্জ্যের বড় বাজার হলো থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, চিন ও জাপান। এ খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও প্রচার নিশ্চিত করা গেলেই কোরবানির পশুর বর্জ্য হয়ে উঠতে পারে দেশের অর্থনীতির অন্যতম একটি খাত।
বাংলাদেশ মাংস ব্যবসায়ী সমিতি সূত্রে জানা গেছে, গত বছর পশুর বর্জ্য রফতানি করে আয় হয়েছে একশ ৭০ কোটি টাকারও বেশি। আশা করা হচ্ছে, এ বছর এর পরিমাণ দুইশ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। সমিতি বলছে, এ বছর কোরবানি হওয়া গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া, উট ও দুম্বা থেকে গত বছরের মতোই দেড় থেকে দুই হাজার মণ হাড়সহ অন্যান্য বর্জ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হবে। খাওয়ার পর ফেলে দেওয়া হাড় ডাস্টবিনসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে সংগ্রহের জন্য কোরবানির সময় অতিরিক্ত শ্রমিক নেওয়া হচ্ছে গত বছর থেকে। এছাড়া, চামড়া থেকে আসা বর্জ্য সংগ্রহ করা হবে বিভিন্ন ট্যানারি থেকে।
জানা গেছে, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, জাপান ও চিনে গরু মহিষের যৌনাঙ্গ, পেনিস বা লিঙ্গ অত্যন্ত দামি ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এসব দেশে পশুর একেকটি যৌনাঙ্গ ৬ থেকে ৭ ডলারেও বিক্রি হয়। এর বাইরে গরু-মহিষের দাঁত ও হাড় থেকে তৈরি হয় ক্যাপসুলের কাভার।
এদিকে, ট্যানারি থেকে পাওয়া উচ্ছিষ্ট চামড়া দিয়ে তৈরি জুতার সোল ও প্রক্রিয়াজাত করা চামড়ার ফেলে দেয়া অংশ থেকে সিরিশ কাগজ তৈরি হয়। পশুর রক্ত সংগ্রহের পর তা সেদ্ধ করা হয় এবং শুকিয়ে গুঁড়ো করা হয়। পরে সেই গুঁড়োর সঙ্গে শুঁটকি মাছ, সয়াবিন তেল ও যব মিলিয়ে তৈরি দানাদার মিশ্রণ ব্যবহার করা হয় মুরগি ও পাখির খাবারের জন্য। পশুর চর্বি দিয়ে তৈরি হয় সাবান। আর শিং থেকে আগে অডিও-ভিডিও ফিল্ম তৈরি হতো, ডিজিটাল ডিভাইসের বহুল ব্যবহারের কারণে যার চাহিদা অনেকটাই কমে গেছে। এখন শিংয়ের মূল ব্যবহার বোতাম ও চিরুনি তৈরিতে। আবার মহিষের শিংয়ের ডগা ব্যবহার করে জাপানে এক ধরনের খেলনা তৈরি করা হয়। গরু ও মহিষের নাড়ি প্রক্রিয়া করে মানুষের খাবারও তৈরি করা হয়। জাপানের জনপ্রিয় ও দামি ‘শোস্যাট রোল’ নামের খাবারটিও গরু ও মহিষের নাড়িভুড়ি দিয়েই তৈরি।
বাংলাদেশ মাংস ব্যবসায়ী সমিতির তথ্য অনুযায়ী, গত বছর শুধু কোরবানির পশু থেকে এক হাজার মণ হাড়, ছয় হাজার কেজি যৌনাঙ্গ ও পাঁচশ মণ গোল্লা (নাড়িভুড়ি) সংগ্রহ করা হয়েছিল। সাধারণভাবে সমিতি সারাদেশ থেকে মাসে আড়াইশ মণ হাড় সংগ্রহ করতে পারে। সেই হিসাবে বছরজুড়ে সংগ্রহ করা হাড়ের এক-তৃতীয়াংশই আসে কোরবানির সময়। এ কারণে এসময় বর্জ্য সংগ্রহে লোকবল বাড়ানো হয়।
বাংলাদেশ রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, গত বছর একশ ৭০ কোটি টাকার পশুর হাড়, যৌনাঙ্গ ও গোল্লা বিভিন্ন দেশে রফতানি করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, বাংলাদেশের পশুর বর্জ্যের বড় বাজার হলো থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, চীন ও জাপান।
জানা গেছে, রাজধানীতে রয়েছে পশুর বর্জ্যের বিশাল বাজার। বুড়িগঙ্গা নদীর ওপারে কেরানীগঞ্জে রয়েছে এর দু’টি বাজার একটি জিঞ্জিরায়, অন্যটি হাসনাবাদ এলাকায়। আগে কেবল ঢাকার আশপাশ থেকে এই বাজারে শিং ও হাড় এলেও এখন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকেই এই বাজারে আসছে গরু-মহিষের শিং ও হাড়। এখানে প্রতিমণ শিং ৬শ টাকা ও প্রতিমন হাড় বিক্রি হয় ৭শ থেকে সাড়ে ৭শ টাকা দরে।
প্রথমদিকে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার ডাস্টবিন ও রাস্তার পাশে পড়ে থাকা গরু-মহিষের হাড় ও শিং সংগ্রহ করে এ বাজারে বিক্রির জন্য আনত টোকাইরা। কেউ কেউ হাজারীবাগ ও পোস্তা এলাকা থেকেও এগুলো সংগ্রহ করত। তবে এখন টোকাইদের কাছ থেকে এসব হাড় ও শিং কিনে নেন মৌসুমী ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। তারাই ভ্যানে করে এসব বর্জ্য নিয়ে আসেন কেরানীগঞ্জের এই দুই বাজারে। এখান থেকে কেনা হাড় ও শিং চলে যায় ভারত ও থাইল্যান্ডে।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, কেরানীগঞ্জের জিঞ্জিরা ও হাসনাবাদে বসেছে গরু-মহিষের হাড় ও শিংয়ের মৌসুমী বাজার। প্রতিবছরই কোরবানির ঈদের পরের দিন শুরু হয় এই বাজার, চলে ১০ থেকে ১২ দিন। এরপর আর এ বাজার চোখে পড়ে না। যারা এই হাড় ও শিং কিনতে এখানে আসেন, তারা এই ১০/১২ দিনের প্রস্তুতি নিয়েই আসেন।
জানা গেছে, চুন মেশানো পানির মধ্যে ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখা হয় এই বাজার থেকে কেনা হাড় ও শিং। এতে শিংগুলো পরিষ্কার হয়। হাড়গুলোয় জড়িয়ে থাকা পচা ও ময়লা মাংসও পরিষ্কার হয়। তাতে ভালো দাম পাওয়া যায় বলে জানিয়েছেন ক্রেতারা।
স্থানীয়রা জানান, আগে টোকাইদের কাছ থেকে নগদ টাকা দিয়ে এসব বর্জ্য কেনা হতো। তবে এখন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের কাছ থেকেই কেনা হয় এগুলো। হাসনাবাদ এলাকার বাজারে কথা হয় আবদুর রব হাওলাদার নামের এক ব্যবসায়ীর সঙ্গে। হাড় ও শিং কিনতে তিনি এসেছেন সাতক্ষীরা থেকে। তিনি বলেন, ‘তিন বছর ধরে এই বাজারে আসছি হাড় ও শিং কেনার জন্য। রাজধানীর পাশে বলে এখানে বেশি পরিমাণ মাল পাওয়া যায়। আমাদের এলাকায় এগুলো খুব বেশি পাওয়া যায় না।’
রব হাওলাদার বলেন, ‘সব মাল একসঙ্গে ট্রাকে করে নিয়ে যাই সীমান্তে। ওপারের ব্যবসায়ীরা এসে সেখান থেকে মাল নিয়ে যায়। অনেক সময় ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধি থাকে। তাদের দিয়েও মাল পাঠিয়ে দেই। হাড় ও শিং একটু বেশি পরিষ্কার হলে ভালো দাম পাওয়া যায়।’ বছরে এক মৌসুমের ব্যবসায় আয় ভালোই বলে জানান তিনি।
বাংলাদেশ মাংস বিক্রেতা সমিতির মহাসচিব রবিউল আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বর্জ্য সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতের বিষয়টিতে প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। উৎসাহিত করলে এই খাত থেকেও কোটি কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব।’ তিনি আরও বলেন, ‘একইসঙ্গে এর প্রচার-প্রসারও প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে গণমাধ্যম বড় ভূমিকা রাখতে পারে। গণমাধ্যমে এ বিষয়টি ঠিকভাবে উঠে এলে কেউ আর পশুর বর্জ্য ফেলে দেবে না।’ এ বিষয়ে তাই গণমাধ্যমকে আরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব শুভাশীষ বোস বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এখনও বাংলাদেশের রফতানি পণ্যের তালিকায় গরুর শিং ও হাড়ের নাম ওঠেনি। তবে গরু ও মহিষের শিংসহ বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য রফতানির কথা আমিও শুনেছি। এ কাজটি কারা, কিভাবে করেÍ তা আমার জানা নেই।’
তথ্যসূত্র: বাংলা ট্রিবিউন