বঙ্গবন্ধুর শততম জন্মবার্ষিকী

ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের শেষ যুদ্ধ

আপডেট: December 14, 2019, 1:04 am

মো. নওশের আলী


১৪ ডিসেম্বর ভোর ৫ টায় আমি ৩ জন মুক্তিযোদ্ধাকে সাথে নিয়ে ৮১ এমএম গানের শেষ রেনজিং ও প্রয়োজনীয় রেকি করতে বের হলাম। ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীর সাহেবের নির্দেশ ছিল এই পর্যায়ে স্থানীয় কোনো লোকের কথায় বিশ্বাস না করে নিজেদের মতো খোঁজ খবর নিয়ে কাজ করতে। আমরা সেইভাবেই কাজ শুরু করলাম। কিন্তু আমরা যখন রেকি করতে শুরু করেছি তখন স্থানীয় অনেকেই আমাদের সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসে। তারা পাকিস্তানি আর্মিদের নানা তথ্য আমাদের দিতে থাকে। নতুন জায়গা, আমরা পথঘাট কিছু তেমন চিনি না। এ দিকে ক্যাপ্টেন স্যারের নিষেধ-কারণ এই পর্যায়ে কোনো ভুল তথ্য আমাদের সর্বনাশ ডেকে আনতে পারে। নানা চিন্তায় করণীয় নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে যাই। এই সময় ১১/ বছরের এক ছেলে- নাম আলাউদ্দিন। ওখানেই বাড়ি, এসে বললো যে, সে এমন জায়গাতে আমাদের নিয়ে যাবে সেখান থেকে আমরা পাকিস্তানি আর্মিদের সর্ব দক্ষিণ বাংকার দেখতে পাবো কিন্তু ওরা আমাদের দেখতে পাবে না। আমি ওকে পরীক্ষা করার জন্য শক্ত ধমক দিলাম। আমার সঙ্গী মুক্তিযোদ্ধারা অস্ত্র উঁচিয়ে ওকে বললো মিথ্যা বললে বুঝেছিস? ছেলেটি বললো স্যার আমি মিথ্যা বলছি না, ‘মায়ের কসম’।
ও যে ভাবে বলছে তাতে কথা বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছিল। তবুও ভয় দেখিয়ে আমরা আলাউদ্দিনকে সঙ্গে নিয়ে ওর কথা মতো যেতে থাকলাম। একটা গলিপথের মোড় ঘুরতেই দেখি একটা বড় বাংকার। মাত্র ৩০/৪০ গজ দূরে। তাড়াতাড়ি পাশে একটা বাড়িতে ঢুকে গেলাম। আলাউদ্দিন বললো ভয় নাই স্যার ওরা আমাদের দেখতে পাবে না। দেখলাম বেশ বড় বাংকার আমাদের দিকে অর্থাৎ দক্ষিণে দিকে বাংকারের কোনো জানালা নেই। আমরা ওই বাড়ি থেকে দ্রুত আরো কিছুদূর পিছিয়ে এসে আর একটা বাড়ির ভিতরে ঢুকে ম্যাপ বের করলাম। দূরত্ব নির্ধারণ করে ওয়ারলেসে মর্টার পজিশনকে একটা শেল নিক্ষেপের নির্দেশ দিলাম। বিকট ওয়াজে শেল ফাটলো- আমাদের বেশ কিছু আগে। শব্দ অনুমান করে হিসাব ঠিক করে আর একটা মারার নির্দেশ দেওয়ার সাথে সাথে শেলটি একেবারে কাক্সিক্ষত বাংকারের অতি নিকটে বিস্ফোরিত হয়ে কালো ধোঁয়ায় সমগ্র এলাকা ভরে গেল। আমি মনে মনে খুব আনন্দ অনুভব করলাম এই ভেবে যে, এতো সহজে হিসাব মিলে যাওয়ায় শেলটি কাক্সিক্ষত জায়গাতে আঘাত হেনেছে। এবার আমি দ্রুত ওই স্থান ত্যাগ করে মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীরের নিকট রিপোর্ট করলাম। এসে দেখলাম লে. কাইউম বিপুল সংখ্যক মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে নদী পার হয়ে এসেছেন এবং ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীরের সাথে আলাপ করছেন। আমাকে ম্যাপ বের করতে বললেন। তখন ওখানে উপস্থিত ছিলেন লে. কাইউম, শাহজাহানসহ কয়েকজন সেকশন ও প্লাটুন কমান্ডার। সেক্টর কামান্ডার কর্নেল জামানের ছেলে নাদিমও উপস্থিত ছিল। নাদিমকে সাধারণ মুক্তিযোদ্ধারা লে. নাদিম বলে মনে করতো। আমার সাথে নাদিমের বেশ খানিকটা বন্ধুত্ব হয়েছিল। ম্যাপ দেখিয়ে ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীর যুদ্ধের পরিকল্পনা বুঝয়ে কার কোন দায়িত্ব তা ভাগ করে দিলেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী নদীর পাড় ধরে নেতৃত্ব দেবেন ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীর নিজেই।
তিনি সর্ব দক্ষিণ বাংকার আক্রমণ করবেন। লে. কাইউম সর্ব দক্ষিণ বাংকারের ২০০ গজ পূর্বে অবস্থিত বাংকারে আক্রমণ করবেন, নাদিম লে. কাইউম-এর সাথে থাকবেন। এর পূর্ব দিকে অবস্থান নেবেন শিবগঞ্জের প্রফেসর শহাজাহান (পরে এমপি) তার দল নিয়ে। সকাল ৬ টায় ঘন কুয়াশায় ঢাকা চতুর্দিক। এর মধ্যে পরিকল্পনা অনুযায়ী স্ব স্ব জায়গাতে সকলে অবস্থান গ্রহণ করে ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীরের নির্দেশের অপেক্ষা করছে। প্রথমে ক্যাপ্টেন আমাকে সর্ব দক্ষিণ বাংকার শেল নিক্ষেপ করতে বললেন। আমি নির্দেশ দিতেই একটি শেল বাংকারের উপর আঘাত হানলো। সঙ্গে সঙ্গে বাংকারের ভিতর থেকে এলএমজি ফায়ার করলো পাকিস্তানি আর্মিরা। ক্যাপ্টেন সাহেব সর্ব দক্ষিণের পূর্বে ২০০ গজ দূরে অবস্থিত বাংকার এবং সর্ব দক্ষিণের বাংকার মিলিয়ে ঘন ঘন কিছু শেল বর্ষণ করতে বললে আমি সেইভাবে উভয়স্থানে ঘন ঘন বেশ কয়েকটি শেল নিক্ষেপ করলাম। এবার তিনি কাইউম ও শাহজাহানকে ফায়ার অর্ডার দিলেন। প্রচণ্ড যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। এ দিকে ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীরের সাথে আমরা ক্রলিং করে সামনের দিকে অগ্রসর হতে হতে বাংকারের একেবারে কাছে চলে এসেছি। বাংকারের দক্ষিণ ধার ঘেঁষে প্রায় ২০ ফুট চওড়া রাস্তার উপর ২০০ গজ পূর্বের বাংকার থেকে এলএমজি দিয়ে অনবরত ব্রাশ ফায়ার করে চলেছে পাকিস্তানি আর্মি। ফলে এই দূরত্ব অতিক্রম করে যাওয়া খুবই দূরহ ব্যাপার। আমরা সকলে বাংকার সংলগ্ন রাস্তার দক্ষিণ পাশে একটা বিল্ডিঙের আড়ালে আছি। এই পর্যায়ে ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীর ৩/৪ জনকে নিয়ে এক সঙ্গে দ্রুত গিয়ে বাংকারে গ্রেনেড চার্জ করার নির্দেশ দিলেন। এখানে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মুক্তিযোদ্ধাকেই বেশ কয়টি করে গ্রেনেড দেয়া হয়েছিল। এর মধ্যে দ্রুত কয়েক জন বাংকারের কাছে ছুটে যায়Ñ এর মধ্যে লাল মুহাম্মদ লালু প্রথমে বাংকারে গ্রেনেড চার্জ করে। সঙ্গে সঙ্গে বাংকার ধ্বংস হয়ে যায়। এ অবস্থায় ২০০ গজ পূর্বের বাংকার থেকেও ফায়ার বন্ধ হয়ে যায়। কিছু পরে মুক্তিযোদ্ধারা লে. কাইউমের নেতৃত্বে ওই বাংকার দখল করে নেয়। সর্ব দক্ষিণ বাংকারের পাশেই একটি বিল্ডিং ছিল। সেই বিল্ডিং এর জানালা দিয়ে আমাদের উপর প্রচণ্ড গুলি আসতে থাকে। সম্ভবত ২০০ গজ পূর্বের বাংকারের দখল ছেড়ে দিয়ে পরিখার মধ্য দিয়ে পাকিস্তানি আর্মি সর্ব দক্ষিণের বাংকারের পাশের একটা পাকা বিল্ডিং-এ ঢুকে গুলি ছুঁড়তে থাকে। মুক্তিযোদ্ধারাও প্রতিউত্তর দিচ্ছে আর জানালা লক্ষ করে গ্রেনেড ছুঁড়ে মারছে। বেশ কয়েকটি গ্রেনেড জানালার গ্রিলে লেগে বাইরে ফাটলেও কয়েকটি বিল্ডিং এর ভিতর গিয়ে ফাটলে সব ধ্বংস হয়ে যায়। বিল্ডিং এর ভিতর থেকে ফায়ার না আসায় বোঝা যায় সব শেষ। প্রথম ২টা বাংকারসহ পুরো এলাকা আমাদের দখলে চলে আসে। ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীরের নির্দেশে আমি এমনভাবে আমাদের অগ্রসরের গতির সাথে তাল মিলিয়ে সামনে শেল বর্ষণ করছি যাতে পাকিস্তানি আর্মি বাংকার ও পরিখা থেকে উপরে উঠতে না পারে। একটি ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির মধ্যে বাংকার ও সংলগ্ন এলাকা দখল করার পর মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। বেশ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা বেয়নেটযুক্ত রাইফেল নিয়ে পাকিস্তানি আর্মির বাংকার সংযোগকারী পরিখার ভিতর নেমে গুলি করতে করতে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সামনের বিপদের কথা চিন্তা করে ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীরের পরিখার মধ্যে নামার নির্দেশ ছিলো না। কিন্তু রাইফেলের অগ্রভাগে বেয়নেট বাঁধা কিছু সংখ্যক মুক্তিযোদ্ধা অতি সাহস ও উৎসাহে এই দুরূহ ও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কাজ শুরু করে। আমাদের আক্রমণের শুরুতে পাকিস্তানি আর্মির মর্টার আর্টিলারি গোলাবর্ষণ পরিকল্পিত ছিল না বলে মনে হয়। তাদের বেশিরভাগ শেল মহানন্দা নদীর পানিতে পড়ে বিস্ফোরিত হচ্ছে। এতে পানি অনেক উঁচুতে উঠে ফোয়ারার সৃষ্টি হয়েছে। তা ছাড়া আমরা তাদের এতো কাছাকাছি যে তারা শেল সেইভাবে মারতে পারছে না। এতোক্ষণে আর্মিরা তাদের আর্টিলারি শেল পরিকল্পিতভাবে আমাদের উপর নিক্ষেপ করতে শুরু করেছে। এমন ভয়াবহ পরিস্থিতিতে একটির পর একটি বাংকার দখল করে আমরা সামনের দিকে এগিয়ে চলেছি। এই অবস্থায় নৌকা ফেরিঘাটে ছোট একটি বটগাছের পাশে বড় বাংকার ছিল তা ধ্বংস করার পর ওখানে পরিখার মধ্যে দিয়ে অগ্রসরমান মোজাম্মেল হক নামে এক মুক্তিযোদ্ধা শহিদ (নিহত) হন। এতে নিজেদের মধ্যে কিছুটা ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়। শিবগঞ্জের আটরশিয়া গ্রামের নিহত মুক্তিযোদ্ধা মোজাম্মেল হক পরিখার মধ্য দিয়ে একটু বেশি (১০/১৫ গজ) সামনে গেলে পাকিস্তানি আর্মির ব্রাশ ফায়ারে বুক ঝাঁঝরা হয়ে যায় এবং মৃত্যু হলেও হাঁটুগাড়া অবস্থায় উপুড় হয়ে পড়ে থাকে। তার সাথী মুক্তিযোদ্ধা বন্ধুরা মনে করেছে যে পিছন থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের গুলিতে ও মারা গেছে এবং তার জন্য একজনকে দায়ী করছে। ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীর অতি দ্রুততার সাথে বিষয়টি মীমাংসা করেছিলেন এই বলে যে, নিহত মুক্তিযোদ্ধার বুকে গুলি লেগেছে, আর ও একেবারে সামনে ছিল। অতএব পিছন থেকে গুলি লাগার কোনো সম্ভাবনা নেই। নিহত মুক্তিযোদ্ধার সাথীরা বিষয়টি মেনে নিয়ে আবার যুদ্ধে মনেনিবেশ করলেন। আমরা দীর্ঘ সময় ধরে সামনা-সামনি যুদ্ধ করলেও এমন হাতাহাতি পর্যায়ের যুদ্ধের অভিজ্ঞতা আমাদের তেমন ছিল না। সামনে চতুর্দিক থেকে পাকিস্তানি আর্মি গোলাগুলি করতে শুরু করেছে। তাতে মনে হয় তারা সামনে বাংকারের বাইরেও অবস্থান নিতে শুরু করেছে। বাংকার থেকে গুলি করতে করতে লাফ দিয়ে উপরে উঠে কিছু কিছু পাকিস্তানি আর্মি দৌড়ে পালাচ্ছে। আবার দেখা যাচ্ছে সামনে একটু দূরে বিল্ডিং এর উপর থেকে এলএমজি ফায়ার আসছে। এতোক্ষণে ওরা বাংকারের বাইরেও অবস্থান নিয়ে আমাদের প্রতিহত করার চেষ্টা করছে। তার উপর ব্যাপক মর্টার/আর্টিলারি শেল মারা শুরু করেছে। তাদের নিক্ষেপিত শেলের একটা বড় অংশ মহানন্দা নদীর পানিতে গিয়ে পড়ছে। এমনি অবস্থায় আমরা সামনে অগ্রসর হতে হতে বর্তমান চীনমৈত্রী সেতুর কিছুটা পূর্বদিকে চলে এসেছি। আমরাও আমাদের সামনে ব্যাপকভাবে ৮১ এমএম গানের শেল নিক্ষেপ করছি যাতে শত্রুরা বাংকারের উপর না উঠতে পারে এবং বাংকারের বাইরে অবস্থান না নিতে পারে। ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীরের সাথে আমরা এক বিল্ডিং এর আড়ালে একত্রিত হয়েছি। সম্ভবত সেটা একটা ছোট মসজিদ ছিল। এই বিল্ডিং এর সামনে এবং দক্ষিণপূর্ব দিক থেকে পাকিস্তানি আর্মির একটি মেশিন গানের ফায়ার আসতে থাকায় আমরা আর অগ্রসর হতে পারছিলাম না। এমন সময় মাথার উপর শেল অতি নিকটে পড়ার শব্দ অনুভব করলাম। পাকিস্তানি আর্মিদের ছোড়া কয়েকটি শেল আমাদের হয়তো একেবারে উপরে এসে পড়বে। শেলের এমন শব্দ অনুভব করে আমি উচ্চস্বরে সকলকে পজিশনে যেতে বললাম। আমরা পজিশনে যেতেই কয়েকটি শেল কয়েক সেকেন্ড পর পর বিস্ফোরিত হলো। এ অবস্থায় সামনে গ্রেনেড বিস্ফোরণের প্রচণ্ড শব্দ শুনে সে দিকে তাকালাম- দেখি ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীর ও মুক্তিযোদ্ধা লাল মোহাম্মদ লালু পজিশনে না গিয়ে আমরা যে বিল্ডিং-এর আড়ালে আছি তার সামনে পাকিস্তানি আর্মির মেশিনগান পজিশন লক্ষ্য করে গ্রেনেড ছুঁড়ছেন এবং মেশিনগান পোস্ট ধ্বংস হওয়ার ফলে ওদিক থেকে কোনো গুলি না আসায় আমরা দ্রুত তার কাছে পৌঁছে যাই। তখন আবারো মাথার উপর শেল পড়ার শব্দ হতেই আমরা মাটির সঙ্গে মিশে পজিশন নিয়েছি। বিকট শব্দে কয়েক সেকেন্ড পরপর বেশ কয়েকটি শেল ফাটলো। এর মধ্যে ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীরের নির্দেশে লাল মোহাম্মদ লালু দক্ষিণ পূর্ব কোণ থেকে পাকিস্তানি মেশিনগানের গুলি আসা আর একটি পোস্ট লক্ষ্য করে গ্রেনেড ছুঁড়লে নিমিষের মধ্যে তা ধ্বংস হয়ে যায়। শেল ফাটার পর মাথা তুলতেই আমি দেখি হাঁটুগাড়া অবস্থায় ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীর তার চাইনজি এসএমজি দিয়ে গুলি করছেন। পরমুহূর্তে দেখি তিনি পড়ে যাচ্ছেন। আমি দ্রুত গিয়ে তাঁকে ধরলাম। দেখি মাথায় কপালের ডান দিক দিয়ে রক্ত বেরুচ্ছে। সামনে লালুর ছোড়া গ্রেনেড বিস্ফোরণের সাথে সাথে সামনে থেকে একটি গুলি ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীরের মাথায় লাগে। ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীর মাটিতে লুটিয়ে পড়েছেন। আমি দুই হাত দিয়ে তাঁর মাথার দুই পাশ ধরে আছি। তাঁর মুখ দিয়ে গলগল করে রক্ত বেরুচ্ছে। এই অবস্থায় তিনি আমাকে কিছু বলছেন কিন্তু আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না। তাঁর কথা বলার চেষ্টার মধ্যেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন। সঙ্গে সঙ্গে আমার ওয়্যারলেসে বললাম ‘টাইগার আর নেই’। যুদ্ধে ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীরের কোড নাম ছির ‘টাইগার’। ওয়্যারলেসে আমি নাকি কান্নাজড়িত কণ্ঠে এই কথাগুলি বলেছিলাম যা পরে ৮১ এমএম গান পজিশনের এমপিসি মুক্তিযোদ্ধা মুসলিমের নিকট থেকে জানতে পারি। আসলে ওই সময় আমার মনে হচ্ছিল আমি ওয়্যারলেসে বলেছিলাম ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীর সিরিয়াসলি ওনডেড। কারণ তখন আমার কাছে মনে হয়েছিল এই মৃত্যু সংবাদে সকলে ভয় পেয়ে ছত্রভঙ্গ হয়ে না যায়। ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীরের মৃত্যুর পর ওখানে আমরা হতভম্ব হয়ে যাই। আমি তাৎক্ষণিক কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীরের মৃত্যুদেহ কিছু দূর পিছনে নিয়ে আসি এবং সকলকে সামনে অগ্রসর না হয়ে নিজ নিজ পজিশন থাকতে বললাম। এই সময় ওয়্যারলেস জ্যাম হয়ে সকলের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। আমি মুক্তিযোদ্ধা জহুরুল হক তিনুকে দায়িত্ব দিলাম কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীরের মৃতদেহ পিছনে নিয়ে যাবার জন্য। ওয়্যারলেস জ্যাম হয়ে যাওয়ায় মর্টার পজিশন, লে. কাইউমসহ কারো সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পারায় আমি লে. কাইউমকে ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীরের স্থলাভিষিক্ত হয়ে যুদ্ধ পরিচালনার কথা বলার জন্য যাচ্ছিলাম। পথিমধ্যে লে. কাইউম এর সাথে দেখা। তিনি সংবাদ পেয়ে আমাদের দিকেই আসছিলেন। তাঁকে সঙ্গে নিয়ে সামনের দিকে কিছুদুর আসতেই আমাদের উপর ব্যাপক গুলিবর্ষণ শুরু হলো। আমরা লে. কাইউমের নেতৃত্বে ধীরে ধীরে সামনে কিছুদূর অগ্রসর হয়ে দেখতে পেলাম ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীরের মৃত দেহ পড়ে আছে। আর ওখানে আমাদের কোনো মুক্তিযোদ্ধা নেই। আমাদের দিকে ব্যাপকভাবে গুলিবর্ষণ করা হচ্ছে। আমরা পজিশন থেকে খুব একটা অগ্রসর আর হতে পারছি না। আমাদের ৩০/৪০ গজ দূরে ক্যাপ্টেনের লাশ আমরা দেখতে পাচ্ছি। দেখতে পাচ্ছি টাইগারের পরনের সবুজ রঙের ২ টাকা দামের সিল্কের মাতা লুঙ্গির কিছু অংশ বাতাসে উড়ছে। পাকিস্তানি আর্মিদের প্রচণ্ড শেলিং এবং গুলি আর আমাদের ওয়্যারলেস জ্যাম হওয়ায় মর্টার বা আর্টিলারি কভার না পাওয়ায় আমরা সামনে অগ্রসর হতে পারছিলাম না। এমন সময় পিছনে এক বিল্ডিং-এর আড়াল থেকে আমাকে এবং লে. কাইউমকে ডাকছে মুক্তিযোদ্ধা নাদিম। নাদিম বলছে প্রফেসর শাহজাজান আহত হয়েছে এবং তার গ্রুপ পিছনে সরে গেছে। ধীরে ধীরে পাকিস্তানি আর্মি আমাদের দিকে অগ্রসর হচ্ছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। এ অবস্থায় আমাদের পিছনে ফিরে আসা দরকার। লে. কাইউমকে আমি বললাম স্যার, এই অবস্থান যদি আমরা ছেড়ে দেই তাহলে টাইগারের অভাবে আমরা আর এটা দখল করতে পারবো না। তা ছাড়া ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীরের লাশও নিতে হবে। আমরা নাদিমের কথায় কান না দিয়ে আবারও সামনে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করছি। কিছু পরে নাদিম আবারও এসে আমাদের বললো যে, আমরা এখনি পিছনে না ফিরলে অল্প সময়ের মধ্যে পাকিস্তানি আর্মিদের ঘেরাওয়ের মধ্যে পড়ে যাবো। সব দিক থেকে পাকিস্তানি আর্মিরা অগ্রসর হচ্ছে। আমাদের ডান ধারেও আর কোনো মুক্তিযোদ্ধারা নেই। সকলে পিছনে ফিরতে বাধ্য হয়েছে। তখন শুধু আমরা ২০/২৫ জন ওখানে যুদ্ধ করছি। এমনি অবস্থায় ক্যাপ্টেনের মৃত দেহ চোখের সামনে ফেলে রেখে আমাদের পিছনে ফিরতে মোটেও ইচ্ছে হচ্ছিল না। কিন্তু সব দিক বিবেচনা করে অনেকটা বাধ্য হয়ে লে. কাইউম পিছনে ফিরার নির্দেশ দিলেন। ধীরে ধীরে পিছনে ফিরে আমরা সবাই একত্রিত হয়েছি যেখান থেকে আমরা যুদ্ধ শুরু করে ছিলাম। মানসিকভাবে আমরা ভেঙ্গে পড়েছি। আমারও মাথা ঠিক ছিল না। এই সময় দেখতে পেলাম মুক্তিযোদ্ধা জহুরুল হক কিনুকে, যাকে ক্যাপ্টেনের মৃত দেহ পিছনে নেওয়ার দায়িত্ব দিয়েছিলাম। ওকে দেখে রাগ সামলাতে না পেরে এক চড় মেরে দিলাম। চড় খেয়ে ও বললো আমি আব্দুল মতিন তিনু, জহুরুল হক কিনু আমার বড় ভাই। প্রায় একই রকম দেখতে তাই ভুল করে ওর ছোট ভাইয়ের উপর চড়াও হয়েছি। কয়েকজন আমাকে এসে ধরলো। তার মধ্যে ছিল মুক্তিযোদ্ধা নাদিম।
ওকে দেখে আমি আরও রাগান্বিত হয়ে আমার কাছে থাকা স্টেন গান উঁচিয়ে ধরেছি। আমার তখন নাদিমের উপর রাগ হয়েছিল কেন সে পিছনে গিয়ে আমাদের ডেকে নিয়ে আসলো? যার জন্য আমরা ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীরে লাশ আনতে পারলাম না। তাৎক্ষণিক লে. কাইউমের হস্তক্ষেপে সব শান্ত হলো। প্রকৃত অবস্থা হচ্ছে আমরা নাদিমের কথায় ওই দিন ফিরে না আসলে পুরো গ্রুপের মুক্তিযোদ্ধাদের হয়তো পাকিস্তানি আর্মিদের ঘেরাওয়ের মধ্যে পড়তে হতো এবং ওখান থেকে কোনো মুক্তিযোদ্ধাই হয়তো জীবিত ফিরে আসতে পারতো না। আর মুক্তিযোদ্ধা জরুহুল হক কিনু বললো যে তারা টাইগারের মৃতদেহ বহন করার সময় ওদের উপর প্রচণ্ড গুলিবর্ষণ হলে ওরা ক্যাপ্টেনের মৃতদেহ ফেলে আসতে বাধ্য হয়। আসলে ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীরের মৃত্যু কেউ আমরা মেনে নিতে পারছিলাম না, সকলেই শোকে মৃহ্যমান। এ অবস্থায় সকলে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লাম। লে. কাইউম সকলকে নদী পার হয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। আমরা কাঁদতে কাঁদতে নদী পার হয়ে চলে আসলাম। দীর্ঘদিন ধরে আমরা ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীরের সাথে থেকে নানা প্রতিকূলতার মধ্যে যুদ্ধ করেছি। অনেক হৃদয় বিদারক ঘটনায় আমরা দুঃখ পেলেও কাঁদিনি। কিন্তু আজ কোনোভাবেই নিজেদের কেউ ধরে রাখতে পারছিলাম না। আমাদের এই সাব সেক্টরে যুদ্ধাবস্থায় কোনো মুক্তিযোদ্ধা মারা গেলে তার লাশ কোনোদিন আমরা ফেলে আসিনি। এটা ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীরের একটি নীতি ছিল। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস আজ তাঁর মৃতদেহ আমরা নিয়ে আসতে পারিনি, তাই সকলের মনে আরো বেশি যন্ত্রণা হচ্ছে।
নদীর এ পারে বারোঘরিয়ায় ফিরে আসার পর মর্টার প্লাটুনকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের পাকিস্তানি আর্মিদের অবস্থানের উপর বোমাবর্ষণের নির্দেশ দিলেন লে. কাইউম। আর্মি মর্টার পজিশনে বসে ম্যাপ দেখে আর্মিদের অবস্থানে ফায়ার দেয়া শুরু করলাম। সারাটা বিকেল- রাত অবধি শহরের গুরুত্বপূর্ণ পাকিস্তানি অবস্থানের উপর থেমে থেমে গোলাবর্ষণ চলতে থাকলো। ১৩ ডিসেম্বর ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীরের নেতৃত্বে নদী পার হয়ে ১৪ ডিসেম্বর পাকিস্তানি আর্মিদের মূল বাংকার আক্রমণের ঘটনায় পাকিস্তানি আর্মি ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং তাঁদের মনোবল ভেঙ্গে পড়ে। তারা ভাবতেই পারেনি নদী পার হয়ে এমন একটি আক্রমণ মুক্তিবাহিনী করতে পারে। সেদিন বিকেল থেকে পাকিস্তানি আর্মিরা চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহর ছেড়ে রাজশাহীর দিকে চলে যেতে থাকে। নদীর এ পার থেকে সারারাত আমরা গাড়ি চলাচলের শব্দ শুনেছি। রাতের মধ্যেই তারা চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহর ছেড়ে চলে যায়। শুধু থেকে যায় কিছু রাজাকার, যাদের পাকিস্তানি আর্মি সঙ্গে নেয়নি।
লেখক: বীর মুক্তিযোদ্ধা (‘আমার মুক্তিযুদ্ধ’ গ্রন্থ থেকে)