ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ

আপডেট: মার্চ ১৬, ২০১৭, ১২:০৪ পূর্বাহ্ণ

শুভ্রিারানী চন্দ


আমরা সকলেই কম-বেশি অবগত আছি কেন্দ্রীয়করণ সম্পর্কে। খুব সংক্ষেপে যাকে আমরা জানি ক্ষমতা কুক্ষিগত করার অন্য নাম বা পরিশীলিত নামে। ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ বা কোন প্রাতিষ্ঠানিক কাজের কেন্দ্রীকরণ প্রকারান্তরে উপকারের চেয়ে ক্ষতিই করে বেশি। কেন্দ্র যদি ক্ষমতা আত্মীকরণ করে কিংবা নীতি নির্ধারণ করে তাহলে সেখানে এক বা হাতে গোনা কিছু মানুষের অংশগ্রহণ থাকে- যেটা ব্যাপক সংখ্যক মানুষের কাছে আদৌ গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে। কিংবা এমন কোন বড় ধরনের ত্রুটি থেকে যেতে পারে যা এককভাবে কারো নজর এড়িয়ে যেতে পারে। কিন্তু যখন গণমানুষের মতামত প্রদানের সুযোগ থাকে এবং সেটা সুচিন্তিতভাবে বিচার-বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় তখন সেটা সব মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য না হলেও বেশিরভাগ মানুষের কাছেই গ্রহণযোগ্যতা পায়। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হয়তো কোনভাবে চললেও চলতে পারে। কিন্তু সেখানেও ভোক্তার চাহিদা, রুচি, আয়, শিক্ষা ভৌগলিক অবস্থান, সংস্কৃতি এবং আরো অনেক বিষয় বিবেচনায় রাখা হয়। তা না হলে প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্যই অর্জিত হবে না। শুধু তাই নয় কোন পলিসি তৈরি ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যদি সংশ্লিষ্ট সকলের মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় তাহলে বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ একদিকে অনেক সহজ হয় এবং অন্যদিকে পলিসি বাস্তবায়নে কোন সমস্যা দেখা দিলে আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত সে সমস্যার সমাধান করা যায়। প্রাতিষ্ঠানিক কাজে যদি স্বাধীনতা না থাকে এবং নমনীয় না হয় তাহলে ওই কাজ একটা সময় নিজস্ব গতি হারাতে এবং স্থবির হয়ে যাবে।
সংগঠনের প্রকৃতি, কাজের ধরণ এবং কর্মপরিধি বিবেচনায় রেখেই কর্তৃত্ব বিকেন্দ্রীকরণ প্রয়োজন হয়। তবে যে ধরনের সংগঠনই হোক না কেন সব দায়িত্ব যদি কেন্দ্র আত্মীকরণ করে, যথাযথ তদারকি না করে, সকলের মতামত নির্দিষ্ট সময়ান্তর গ্রহণ ও যাচাই-বাছাই না করে এবং তা চূড়ান্ত গ্রহণ করে অন্যের উপর চাপিয়ে দেয়, তাহলে সেটা বাস্তবায়িত করা সম্ভব হলেও অনেক মতানৈক্য থেকে যাবে এবং সে সিদ্ধান্ত অকার্যকর হবার সম্ভাবনাই বেশি থাকে।
ক্ষমতা যদি সব সময় একটা বিশেষ ব্যক্তি মহল বা অঞ্চলের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকে এবং সে কাজের মান প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তাহলে মানুষের আগ্রহ ক্রমান্বয়ে কমতে থাকে তা সে যত গুনী মানুষই হোক না কেন। শুধু তাই নয়, সে ব্যক্তিটিও ওই বিশেষ মহল যদি পরমতসহিষ্ণু বা গ্রহণেচ্ছু ব্যক্তি না হয়ে একরোখা হন, তহালে একটা সময় পর্যন্ত মানুষ সে মত গ্রহণ করলেও প্রকারান্তরে মানুষের শ্রদ্ধা, ভয়, সম্মান বা গ্রহণযোগ্যতা এক সময় নষ্ট হতে থাকবে।
সারা বছরে কেন্দ্র কিংবা দায়িত্বরত ব্যক্তিবর্গ কোন খোঁজ না রেখে শুধুমাত্র একটা কমিটি নিজেদের মন মতো তৈরি করে এক বছর বা দুই বছর পর কিছু কথা বললেই দায়িত্ব পালন করা হয় না।
একটা সংগঠনের ঐতিহ্য তথা তার রূপকার বা রূপকারদের প্রতি দায়বদ্ধতা, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও সম্মান প্রদর্শনের জন্যও তার আদর্শকে লালন, ধারণ ও চর্চা করা বিশেষ প্রয়োজন। তা না হলে ওই সংগঠনের কাজ অন্য আরো অনেক সংগঠনের মতো জলো বা গতানুগতিক হয়ে যায়। সংগঠনের মূল চালিকাশক্তি বা অন্তর্নিহিত সত্য বিলুপ্ত করে সংগঠন চালু থাকলেও তাতে প্রাণ থাকে না।
সংস্কৃতি মানুষকে পরিশীলিত করে। একজন সংস্কৃতিবান মানুষ জাতির বিবেক। তিনি শেখান মানুষকে ভালোবাসতে। দেশ ও দেশের ঐতিহ্যকে ভালোবাসতে। সৎ, চরিত্রবান, নীতিবান, উদার, দায়িত্ব ও কর্তব্যপরায়ণ, দরদী, পরহিতৈষী ও নিবেদিত হতে। কিন্তু সে ক্ষেত্রটি যদি পক্ষপাতদুষ্ট হয়, দায়িত্ব পালনে অনীহা প্রকাশ করে, দায়িত্ব পালনে পারঙ্গম না হয়- তাহলে দেশ ও জাতির জন্য তা ভয়ঙ্কর।
যে সাংস্কৃতিক চেতনা ও মূল্যবোধ মানুষে মানুষে আত্মিক বন্ধন তৈরি করে সময় ও কালের সীমানা পেরিয়ে, দেশ-জাতি তথা বিশ্বকে দেয় সঠিক পথের দিশা সে সংস্কৃতি যদি আক্রান্ত হয়, প্রশ্নবিদ্ধ হয় কিছু মানুষের অহমিকা, ক্ষমতা কেন্দ্রীকরণ এবং আত্মতুষ্টির কাছে তাহলে তা গ্রহণযোগ্যতা হারাবে অচিরেই। কোন বিশেষ ব্যক্তিত্ব ভাবমূর্তির কাছে মানুষ হয়তো বা নমনীয় হবার কারণে জোর আপত্তি তোলে না-এ কথা সত্য কিন্তু তাঁর অবর্তমানে মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হবে।
সব কিছুকে এভাবে কেন্দ্রীভুত করতে থাকলে এবং সময় সংগঠনের শাখাগুলো নিষ্ক্রিয় হয়ে যাবে এবং শাখাগুলো অকেজো হরে কেন্দ্র আপনা-আপনিই অকেজো হয়ে যাবে। সারা দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা শাখাগুলোই কেন্দ্রকে বাঁচিয়ে রাখে। সুতরাং, এসব শাখাকে গুরুত্ব না দিলে একসময় কেন্দ্রই অস্তিত্বহীন হয়ে পড়বে। দায়িত্বশীলতা ও অন্যকে সম্মান করা কিংবা অন্যের মতামতের গুরুত্ব দেওয়া, অন্যের ভালো কাজের স্বীকৃতি দেওয়া ও প্রশংসা করতে জানাও সংস্কৃতির অপরিহার্য অংশ। নিজেকে জাহির করা কিংবা কোন কিছুর বিনিময়ে কাউকে কিছু শেখানো, অথবা নৈতিক স্খলন ঘটিয়ে কারো উন্নয়নের প্রস্তাব দেওয়াটা অপসংস্কৃতি। শুধু তাই নয়, সংস্কৃতির নামে এ ধরনের হীন প্রবৃত্তি অনেক অমিত সম্ভাবনা ও সুকুমার বৃত্তির অপমৃত্যু ঘটায় যা অনভিপ্রেত ও অনাকাক্সিক্ষতও বটে।
জানা যায়, জাতীয় পর্যায়ের কোন একটি বিশেষ সংগঠন, বাংলাদেশের সব জেলায় যার শাখা আছে তার কেন্দ্রীয় দায়িত্বে থাকা বিশিষ্টজন সারা বছরে মাত্র ৫টি শাখা পরিদর্শন করেছেন। অথচ ১টি শাখার দায়িত্বে থাকা একজন নিবেদিত প্রাণ সভাপতি বছরে ৩০টি শাখা পরিদর্শন করেন। সংগত কারণেই এবারে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বটি তাকে দেবার প্রস্তাব থাকলেও ঢাকা শহরের একজন অত্যন্ত ব্যস্ত মানুষকে এ দায়িত্বটি দেয়া হয়েছে- যিনি সারা বছরে ১টি শাখাও পরিদর্শনের সময় পাবেন বলে মনে হয় না। কিন্তু এ দায়িত্ব ঢাকার বাইরের কাউকে দেয়া হবে না। কারণ এটি করলে ঢাকাস্থ লোকের কর্তৃত্ব থাকে না।
দেশের অন্যান্য সংগঠনের সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো যখন এ ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়, তখন বিবেকবান, সৎ সুস্থ চিন্তা করার মানসিকতা কিংবা সৃষ্টিশীলতা বাধাগ্রস্ত হয় পদে পদে। এ পরিস্থিতি বিশেষভাবে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে অনাকাক্সিক্ষত।
এধরনের খ্যাতনামা সংগঠনের মান অনেকটাই ক্ষুণœ হয়েছে কেন্দ্রের নানা ভুল সিদ্ধান্তের কারণে। এখনও সময় আছে। হারানো গৌরব পুনরুদ্ধারের জন্য পথপ্রদর্শক বরেণ্য সেসব কীর্তিমান পুরুষের আদর্শ অনুসরণ করা, তাঁদের হৃতগৌরব পুনরুদ্ধার করা কেন্দ্রের পবিত্র দায়িত্ব।
সুতরাং, সর্বমহলে গ্রহণযোগ্য তাঁদের অক্লান্ত পরিশ্রম যাতে বৃথা না যায় সেজন্য পরবর্তী সময়ে কেন্দ্রের দায়িত্ব নিবেদিতপ্রাণ দেশপ্রেমী ও নিঃস্বার্থ কোন ব্যক্তির হাতে অর্পণ করা কেন্দ্রের পবিত্র দায়িত্ব। ক্ষমতা, অর্থ ও পতিপত্তির সাথে আপোষ নয়, জাতির বিবেককে জাগিয়ে তুলতে নিজ স্বার্থ ভুলে গণমানুষের স্বার্থকে গুরুত্ব দিতে হবে। এক্ষেত্রে কেন্দ্রের সুযোগ্য নেতৃত্ব ও তদারকি থাকবে নিশ্চয়ই।
সা্স্কংৃতিক আন্দোলন বেগবান হোক, পক্ষপাতহীন যোগ্য নেতৃত্ব পাক জাতি, নতুন নতুন সৃষ্টির পথ প্রসারিত হোক, নতুন দিনের নতুন আলোয় উদ্ভাসিত হোক সৃষ্টিশীল প্রতিভা, বিকশিত হোক বাংলা ও বাঙালি জাতিসত্ত্বা বিশ্বময়।