কড়ির যুগের বিএনপির ভিশন ২০৩০!

আপডেট: মে ১০, ২০১৭, ১২:২৫ পূর্বাহ্ণ

আনিস আলমগীর


একাদশ সংসদ নির্বাচনের কাজ শুরু করেছে সব বড় দল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তো আজকাল কোনও জনসভায় উপস্থিত হলেই নৌকায় ভোট চেয়ে বক্তব্য রাখছেন। হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ ছোট ছোট অগণিত দল নিয়ে জাতীয় পার্টির নেতৃত্বে বিরাট এক জোটের ঘোষণা দিয়েছেন। গত রবিবার এ জোট আত্মপ্রকাশ করেছে। বেগম খালেদা জিয়া ৫১টি গ্রুপ গঠন করে দিয়েছেন, তারা জেলায় জেলায় সাংগঠনিক সফরও শুরু করেছে। কর্মীসভায় মারামারিও হচ্ছে। সেটাও ভালো। ঢাকায় বসে বসে অলস সময় কাটানোর চেয়ে মফস্বল শহরে মারামারির মহড়া দেখাও ভালো। সেটাও তো একটা কাজ।
বড় দলগুলোর নেতারা এসব পরিস্থিতিতে আত্মতৃপ্তির জন্য বলে থাকেন বড় দলে কিছু আত্মকলহ তো থাকবেই। আমিও বলি তাতো স্বাভাবিক। পত্রিকায় ফটো দেখেছি বিএনপির মাথা ফাটা কর্মীকে ধরাধরি করে হাসপাতালে নিচ্ছে। আওয়ামী লীগ মাথা ফাটানোর তালে নেই। তারা চিনে খতম। আগামী ১৮ মাস তাই বলা চলে মাথা ফাটানো আর খতমের মহড়া চলবে। ২০১৯ সালের ২৮ জানুয়ারি বর্তমান সংসদের মেয়াদ শেষ হবে। ২০১৯ সালের ২৮ জানুয়ারির মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে হবে। আগামী নির্বাচন এখন থেকে এখনও এক বছর আট মাস দূরে।
বেগম জিয়া নির্বাচনে যোগ দেওয়ার কথা পরিষ্কারভাবে এখনও বলেননি। গত একমাসে বিএনপি’র নেতারা নির্বাচনে যোগদান প্রসঙ্গে বহু রকমের কথা বলেছেন। শামসুজ্জামান দুদুতো বলেছেন তারা ক্ষমতার কিনারায় এসে উপস্থিত হয়েছেন। শুনছি বেগম জিয়া সংবাদ সম্মেলন করে নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা দেবেন আবার নাকি ২০৩০ সালের মেয়াদে এক রূপকল্পও ঘোষণা করবেন। ১০ মে ২০১৭ তারিখে রাজধানীর একটি তারকা হোটেলে অনুষ্ঠিতব্য ‘বাংলাদেশের জন্য ভিশন ২০৩০’ ঘোষণা প্রদান অনুষ্ঠানে যাওয়ার জন্য একটি নিমন্ত্রণপত্রও হাতে পেয়েছি। সময় পেলে যাবো স্থির করেছি।
অবশ্য রূপকল্পের কিছু কিছু কথা এর মধ্যে পত্রিকায় দেখেছি। যেটুকু প্রকাশ পেয়েছে, রূপকল্প মনে হয় সুদক্ষ লোক দিয়ে তৈরি করানো। সুন্দর সুন্দর কথা দিয়ে রূপকল্পটাকে সাজানো হয়েছে। বিনএনপি বড় সংগঠন। তাদের জনসমর্থনও রয়েছে। তবে রূপকল্পের কর্মসূচি তাদেরকে দিয়ে বাস্তবায়ন সম্ভব হবে বলে ব্যক্তিগতভাবে আমার বিশ্বাস হয় না। এটা যেন যোগির ঘরে কোরআন পাঠ। যে দলের নেতা কর্মীদের থেকে সৎ কর্মী বের করার জন্য বাটি চালান দিতে হবে সে দল কিভাবে এ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করবে! আওয়ামী লীগের অন্য নেতাদেরকে বাদ দিলাম। উন্নয়ন নিয়ে শেখ হাসিনার কথাকে দেশের মানুষ বিশ্বাস করে কিন্তু বেগম জিয়ার ওপর সে আস্থা জনগণের আছে মনে হয় না।
বৃহত্তর দল হিসেবে বিএনপির নেতৃত্ব ভিশনারি নয়, রাষ্ট্রের জন্য তারা কি ভিশন দেবে চিন্তায় আসে না। আর ওই ভিশন বাস্তবায়ন করবে কারা! বর্তমানে বিএনপির যে নেতৃত্ব- সেখানে ক’জন ভিশনারি লোক রয়েছেন? কিছু তোষামোদকারী আর পারিবারিক সূত্রে নেতৃত্ব পাওয়া লোক দিয়ে দল চলে না। রাষ্ট্র কি চলবে! কাগুজে ভিশন তারা দেবে সত্য, দেওয়া সহজ- বাস্তবায়ন নিয়ে তাই প্রশ্ন থাকবে। আগে দলটিকে ভিশনারি নেতৃত্বের প্রমাণ দেখাতে হবে। যুদ্ধাপরাধী কোনও দলীয় নেতার ফাঁসি হলে তার স্থলে যদি ওই নেতার সন্তানকে রিক্রুট করা হয়- সেটি ভিশনারি নেতৃত্বের প্রমাণ দেয় না। আবার ৫ শ’ নেতার কেন্দ্রীয় কমিটি বানানোও ভিশনারি নেতৃত্ব নয়। ওই নেতাদের মধ্যে যাকে যেখানে দরকার সেখানে দেওয়া, নতুন নেতৃত্ব সৃষ্টি- ভিশনারি নেতৃত্বের লক্ষণ।
অতীতেও দলটি ভিশনারি প্রমাণ দিতে পারেনি। বরং ক্ষমতায় গিয়ে দলটি প্রমাণ রেখে গেছে তাদের কোনও ভিশন নেই। বাড়ির পাশ দিয়ে সাবমেরিন ক্যাবল লাইন যাওয়ার সময় বিনা পয়সায় সংযোগ নেওয়ার আহ্বান জানালেও বিষয়টাকে বেগম জিয়ার সরকার উপক্ষো করেছিল। বিএনপির অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান কখনও রাষ্ট্রকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে দিতে চাইতেন না। তার কথা ছিল খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হলে বিদেশের সাহায্য পাওয়া যাবে না। এমন কী প্রাকৃতিক দুর্যোগকেও ওই লোকটি ভিক্ষা পাওয়ার জন্য আশির্বাদ মনে করতেন (১৯৯১ এর দুর্যোগে তাই বলেছিলেন)। বিদেশে গিয়ে ধার ভিক্ষা আনা আর বসে বসে রাজস্ব খাওয়াই ছিল বিএনপির রাষ্ট্র পরিচালনার বৈশিষ্ট্য।
সাইফুর রহমান সাহেব বাজেট দেওয়ার আগে প্যারিসের দাতাদেশগুলোর কনসোটিয়াম বৈঠকের প্রতি মুখিয়ে থাকতেন। এখন কিন্তু কনসোটিয়ামের অস্তিত্বই নেই। ৯৭ শতাংশ উন্নয়নের অর্থ সরবরাহ করে বাংলাদেশ নিজস্ব তহবিল থেকে। পদ্মা সেতুর মতো মেগা প্রজেক্টের সম্পূর্ণ অর্থ সরবরাহ করছে বাংলাদেশ নিজে। তাতে করে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের মর্যাদার স্তর উন্নীত হয়েছে। চীন, রাশিয়া, ভারত, ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকা ব্রিকস ব্যাংক গঠন করেছিলো। এ ব্যাংকটিও বিশ্ব ব্যাংক, আইএমএফ-এর সম পর্যায়ের ব্যাংক। এখন উদ্যোগতারা বাংলাদেশকে এ ব্যাংকে যোগদান করতে অনুরোধ করছে আর বাংলাদেশও যোগদানের বিষয়ে সম্মত হয়েছে। এটাতে বাংলাদেশের মর্যাদা আরও বাড়াবে।
বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে কী করবে না তা নিয়ে এখনও অনেকে সংশয়ের মাঝে রয়েছেন। ২০১৪ সালের নির্বাচন বিএনপি বর্জন করেছিলো দল নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে। সে দাবিতে এখন বিএনপি নেই। এখন নির্বাচনকালীন সময়ের একটা সরকারের রূপরেখা তারা দেবেন এবং রূপরেখার সরকার পেলেই তারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন। তবে শেখ হাসিনার পদত্যাগের দাবি তুললে আওয়ামী লীগ সে দাবি হয়ত প্রত্যাখান করবে। অনুরূপ পরিস্থিতির উদ্ভব হলে বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে নাকি আন্দোলনে যাবে তা স্থির করা আপাতত মুশকিল। আন্দোলনে গেলে মনে হয় না যে বিএনপি তাদের দাবি মানতে সরকারকে বাধ্য করতে পারবে। তবে বিএনপি তাদের দাবি আদায়ের ব্যাপারে বহিঃশক্তির ওপর নির্ভর করে থাকে বেশি। বিদেশি শক্তি কোনটাকে কতটুকু সমঝোতায় আনতে পেরেছে তা খোলা কর্মকা- আরম্ভ না করলে বুঝে ওঠা মুশকিল।
তবে শেখ হাসিনাকে জোর খাটিয়ে বাধ্য করা অনেকটা অসম্ভব ব্যাপার। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনকে গ্যাস বিক্রির বিষয়ে ‘না’ বলতে তিনি দ্বিধা করেননি। তাও ছিল প্রথমবার কোনও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ঢাকা সফরের সময়ে। এতে পরবর্তী নির্বাচনে তার পরাজয় নিশ্চিত হয়েছিলো। বাংলাদেশ ছোট দেশ। ভারত আর আমেরিকা সম্মিলিত প্রচেষ্টা চালালে নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে পারে। তবে আওয়ামী লীগের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে বিএনপি ক্ষমতায় আসলেও গ্যাস বিক্রি করতে পারেনি। মাটির নিচে গ্যাস ফেলে রেখে লাভ কী বরং গ্যাস বিক্রি করে উন্নয়নের কাজ করাই ভালো হবে এরূপ কথাবার্তা অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান বলাবলি করলেও হালে পানি পায়নি।
সাম্প্রতিক সময়ে আরেকটি জটিল অবস্থায় মাঝে পড়তে যাচ্ছে নির্বাচন। কারণ আওয়ামী লীগ ই-ভোটিং এর ব্যবস্থার দাবি তুলেছে আর বিএনপি তার তীব্র বিরোধিতা করছে। কুমিল্লার প্রথমবার মেয়র নির্বাচনে ই-ভোটিং এর ব্যবস্থা করায় বিএনপি দাবি করেছিলো নির্বাচনে কারচুপি করার জন্য সরকার এ ব্যবস্থার প্রবর্তন করেছে। তখন তারা কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের নির্বাচন বয়কট করেছিলো। সাক্কু দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে নির্বাচন করেছিলো এবং নির্বাচিতও হয়েছেন। বিএনপির চিন্তা চেতনা আধুনিক নয়। তারা প্রাচীনকে আকড়ে ধরে রাখতে চায়। কড়ির যুগে ফিরে যাওয়াতো এখন সম্ভব নয়। কিন্তু শেখ হাসিনার প্রচ- লোভ আধুনিকতার প্রতি। যশোরে যে আইটি পার্ক স্থাপন করেছেন আর উপগ্রহ ছাড়ার যে প্রস্তুতি গ্রহণ করেছেন তা বিএনপি কখনও কল্পনাও করে না।
যাক, আগামী সংসদ নির্বাচন সম্পর্কে আওয়ামী লীগ এবং জাতীয় পার্টির প্রস্তুতি দেখে মনে হচ্ছে বিএনপি নির্বাচনে না এলেও যথা সময়ে নির্বাচন হয়ে যাবে। জামায়াত ইসলামী বিএনপির মার্কা নিয়ে নির্বাচন করবে না স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করবে তা এখনও পরিষ্কার নয়। তাদের এখন মুরুব্বি-হারা অবস্থা। সিনিয়র নেতাদের ফাঁসি হয়েছে। যুদ্ধাপরাধে ফাঁসির কারণে তারা ঘৃণা কুড়িয়েছে আবার সহানুভূতিও যে কিছু মিলছে না তাও নয়। তবে জামায়াত কঠিন সংকটে রয়েছে। আগের মতো অর্থ তহবিলও নেই। তারা কিছুদিন রাজনীতিতে বিরতি দিয়ে সমাজিক কাজ কর্মে আত্মনিয়োগ করা যায় কিনা এমনও নাকি চিন্তা ভাবনায় আছে।
ডানদের কিছুটা আভাস পাওয়া গেলেও বামদের নির্বাচনে লড়ার ক্ষেত্রে অবস্থান কী হবে এখনও বুঝা যাচ্ছে না। যতই নির্বাচন কাছে আসবে রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচন কেন্দ্রীক চিন্তাভাবনা আরও পরিষ্কার হবে হয়তো।
লেখক: শিক্ষক ও সাংবাদিক
( বাংলা ট্রিবিউন- এর সৌজন্যে)

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ