খরা-জরা-মারি : কৈশোর স্মৃতি

আপডেট: জুলাই ৪, ২০২১, ১২:০৯ পূর্বাহ্ণ

গোলাম কবির:


আজ আমার ‘জগতে আনন্দ যজ্ঞে’ আসার কাল ৮০ বছর পূর্ণ হলো (৩০-০৪-২০২১)। সেই শৈশবে দেখেছি চারপাশের প্রকৃতির বিচিত্র সুধাভরা মাধুরী। পরিচিত হয়েছি নানা পেশার মানুষের সাথে। জীবন-জীবিকার কাজে-অকাজে ফন্দি-ফিকিরে থাকায় সবস্মৃতি ধূলি মলিন হয়ে পড়েছিলো। আজ অশীতিবর্ষ বয়স পূর্ণ হলো, যেন এক দমকা বাতাসে সবধুলো উড়িয়ে নিয়ে গেল। সব স্মৃতি একসাথে লুটোপুটি করছে। কোনখান থেকে শুরু করি।
বৃটিশ বাংলায় ভূমি জরিপের প্রথম দিকের চরজোতপ্রতাপ মৌজার একটি জনবসতির নাম পোল্লাডাংগা। পোল্লা চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চলে পটল সবজির অপভ্রংশ নাম। এক সময় হয়তো চরজোতপ্রতাপের এ অংশে পটল উৎপাদন হতো। তাই এর নাম পোল্লাডাংগা। লোকালয়টি চাঁপাই নবাবগঞ্জ শহর সংলগ্ন। তবে এর চারপাশে ঝোপ-ঝাড়-বনস্পতি মিলে প্রগাঢ় সবুজের মেলা।
সমবেত বিচিত্র পাখির ডাকে সকাল হবার আগে অতি ভোরে (‘ঝুঝকি’ থাকতে) প্রত্যুষে জেগে উঠতাম। কারণ ঘুমাতাম রাতের প্রথম প্রহরে। বিকেলে বাঁশ বাগানের শুকনো পাতা-মাড়িয়ে আম-কাঁঠালের বাগানে খেলায় মেতে উঠতাম। সন্ধ্যা আসন্ন হলে ওই বাঁশবাগানের ভেতর গা ছমছম করা পথে ঘরে ফিরতাম। সন্ধ্যার পর বাঁশ বাগানগুলোতে যেন আলোর ফুল ফুটতো। জোনাকি আর জোনাকি। যতীন্দ্রমোহন বাগচির ‘কাজলা দিদি’, কবিতার হৃদয় মোচ্ড়ানে ‘ থোকায় থোকায় জোনাক জ্বলা পরিবেশের কল্পলোক।
মহানন্দা বেষ্টিত হলেও প্রায় প্রতি বছর নবাবগঞ্জ অঞ্চল খরাকবলিত হতো। চারপাশে একাধিক পুকুর আর বিল থাকলেও এপ্রিল মে মাসে বেশির ভাগ পুকুরের পানি কমে গিয়ে বিবর্ণ হয়ে যেত। আর বিলগুলো পানিহীন হয়ে উদর ফেটে চৌচির। একটু দূরে হলেও বেশির ভাগ মানুষ মহানন্দায় গোছল করতেন। কোমর পর্যন্ত পানি ছিলো ঝক্ঝকে। ¯্রােতের ফাঁক দিয়ে নদীর পেটের রূপালি বালি চমক দিতো। বিশেষ বিশেষ জায়গা ছাড়া নদীর অধিকাংশ স্থানে ডুব সাতার পানি থাকতো না। আমরা ওই কিশোর বয়সেই হেঁটে মহানন্দা পার হতাম। গোছল করতে গিয়ে সে ছিলো নিত্যদিনের ‘জলক্রীড়া’। কী অনাবিল আনন্দ ছিলো সেই কৈশোর অবগাহনে! খরায় লোকালয়ে খাবার পানির সংকট দেখা দিত। অগভীর পাতকুয়া প্রায় শুকিয়ে যেত। কোথাও কোথাও বড়ো ইন্দারায় পানি থাকলেও প্রয়োজনের তুলনায় কম। তাই শেষ রাতের দিকে পানি সংগ্রহের জন্য মেয়েদের লাইন ধরতে হতো। তখনো নলকূপের সাথে আমরা পরিচিত হইনি। মাঠে আউস ধান আর কচি পাট-চারা শুকিয়ে যাবার উপক্রম হতো। মাঠে মাঠে পানির আকুলতায় ইস্তেসকার নামাজ আদায় করতো মানুষ। শুনতাম নামাজ আদায়ের সময় আকাশ থেকে ঝরঝর বৃষ্টি নামতে দেখেছে আগের মানুষ। আমার সে সৌভাগ্য হয়নি। এ ছিলো এক ধরনের দৈবনির্ভরতা।
আমার কিশোর বেলায় দেখেছি ষাট বছরের মানুষ এমন জবুথবু বৃদ্ধ যে বানপ্রস্থেরও অযোগ্য। অধিকাংশ মানুষই জরাগ্রস্ত হয়ে পড়তো। ম্যালেরিয়া, টাইফয়েড, হেপাটাইটিস, কিডনিরোগ, আলসার, হৃদয় বিষয়ক রোগ তখনো ছিলো; কিন্তু সে সব রোগ নির্ণয় বা প্রতিবিধানের সহজলভ্যতা ছিলো না। মানুষ কখনো কখনো অশরীরী আত্মার প্রভাব মনে করে ঝাড় ফুঁকের দ্বারস্থ হতো। নিদেনপক্ষে কবরেজ অথবা হাতুড়ে ডাক্তার। এতে লোকক্ষয় কম হতো না। সান্ত¦না ছিলো, ভুক্তভোগীরা বিধির বিধান বলে মেনে নিত।
গতশতকের মাঝামাঝি গুটি-বসন্ত আর কলেরার প্রাদুর্ভাব ঘটতো। প্রাণহানি হতো প্রচুর। প্রতিষেধক তেমন ছিলোনা বললেই চলে। কবরেজ টোটকা আর ওলা দেবী ও শীতলা দেবীকে খুশি করে মানুষ বাঁচার পথ খুঁজতো।
গত শতকের মাঝামাঝিতে ব্যাপক গুটি-বসন্ত ও কলেরার প্রাদুর্ভাব ঘটেছিলো। প্রতিষেধক তেমন বের হয়নি। এই যে সহজলভ্য ওরস্যালাইন তখন কারো কল্পনায় আসেনি। টোটকা, কবরেজ আর স্থানীয় ডাক্তার ছিলো ভরসাস্থল। বসন্ত-কলেরার প্রকোপে কিছু গ্রাম উজাড় হয়ে যেত। কলেরাকে বলা হতো ওলা ওঠা, ভেদবমি আর গুটি-বসন্তের নাম না করে অনেকে বলতেন ঠাকুররোগ। এসব সংক্রামক থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য মানুষ ছুটোছুটি করতো। ফলে বেশিরভাগ মানুষ কুসংস্কারের আশ্রয় নিতেন। সনাতন প্রতিবেশীরা ওলা এবং শীতলা দেবীর পূজায় পরিত্রাণ খুঁজতেন। মুসলমানরা পূজা দিতেন না তবে দেবীদ্বয়কে সমীহ করতেন। কিছু কিছু সংস্কারের উভয় সম্প্রদায়ের মিল ছিলো। মুসলমানরা ভাবতেন আপদ শয়তানকে তাড়াবার অন্য ব্যবস্থা। যেসব বাঁশবাগানে দিনের বেলা একলা চলতে গা ছমছম করতো, সেখানে এবং কবরস্থানে গভীর রাতে টিন বাজিয়ে আর তকবির দিয়ে কলেরা-বসন্ত থেকে মুক্তির চেষ্টা করতেন। এ যেন অলৌকিকের কাছে যুক্তিহীন সমর্পণ।
আজকের করোনা পরিস্থিতি গোটা বিশ্বকে বিপর্যন্ত করে ফেললেও শহর অঞ্চলের মতো আমাদের গ্রামীণ জনপদে ভীতি-বিহ্বলতা নেই তেমন। থাকলে হয়তো সেই দৈবাশ্রয়ী সংস্কৃতি ফিরে আসতো, আসেনি। তবে রূপান্তরিত হয়েছে। শোনা যায় কোথাও চোনাকে মহৌষধ ভাবা হচ্ছে। কেউ-কেউ উষ্ট্রের মূত্র আবার অনেকে শুকরের মূত্রের সাহায্যে বাঁচার অবাস্তব পথ খুঁজছে। মধ্যযুগের এসব দৈবনির্ভরতা যেন বিজ্ঞানকে অস্বীকার করার সামিল!
কিছু কিছু সংক্রামক রোগ বিজ্ঞানের কাছে হার মেনে পিছু হটেছে। সেগুলো মাঝে মধ্যে নানা বেশে হানা দেয় তবে তা ব্যতিক্রম। খরার প্রকোপ বাড়ছে। সবার জানা প্রকৃতির প্রতি আমরা ব্যাভিচারী। এ নিয়ে ক্ষমতাগর্বীরা নিষ্ক্রিয় থাকতে চাইলে গ্রেটার মতো এক কিশোরী এগিয়ে এসেছে। অথচ ক্ষমতাধরদের মতলবের কাছে তা বাঁধা।
বলা হচ্ছে প্রাকৃতিক ভারসাম্য বিনষ্টের অন্যতম প্রতিক্রিয়ার বিষ ফল করোনা। এই মারণব্যাধি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য কিছু বিধিনিষেধ আছে, যা সবার পালন করা উচিত। আমরা অবহেলা করছি। জীবন রক্ষার প্রয়োজনে আমাদের ঘরের বাইরে আসতে হয়। তার জন্য সাবধানী হওয়া ছাড়াও বর্মের দরকার। বিজ্ঞানীরা বর্ম হিসেবে ভ্যাকসিন আবিষ্কার করেছেন। এতেও কিছু মানুষের অনীহা। তাতে খানিকটা নষ্ট রাজনীতি আর কিছুটা বুদ্ধির পশ্চাদপদতা কাজ করছে। ভাবছি, সেই ফেলে আসা কৈশোর স্মৃতি কি ফিরে আসছে! না, তা বোধকরি ফিরতে দেয়া যায় না। যে কোনো মূল্যে করোনা প্রতিরোধ করতেই হবে। তবে শর্ত থাকবে প্রকৃতিকে তার স্বাভাবিক ‘ট্রাকে’ চলতে দেয়া।
লেখক: সাবেক শিক্ষক, রাজশাহী কলেজ।