‘খাটুনির বেলায় সমান করলেও ট্যাকা পাই অর্ধেক’

আপডেট: মার্চ ৮, ২০১৭, ১২:৩০ পূর্বাহ্ণ

সেলিম সরদার, ঈশ্বরদী



বছরের পর বছর মজুরি বৈষম্যের শিকার হয়ে আসছেন ঈশ্বরদীর আদিবাসী, কৃষি নারী শ্রমিক ও ‘চাতাল কন্যা’রা। একই কর্মক্ষেত্রে পুরুষের সমান কায়িক পরিশ্রম করেও পারিশ্রমিক প্রাপ্তির ক্ষেত্রে দারুনভাবে বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন তারা। এ নিয়ে তাদের হাজারো অনুযোগ থাকলেও তাদের কথা শোনারও যেন কেউ নেই। ফলে অনেকটা বাধ্য হয়েই নারী শ্রমিকদের জীবন-জীবিকার সংগ্রাম চলছে পরিহাস ও প্রতিবন্ধকতার সাথী হয়ে। অগ্রসরমান নারী নীতিতে নারীদের সমান অধিকারের বিষয়টির বাস্তবায়ন এক্ষেত্রে প্রায় অনুপস্থিত। ঈশ্বরদীর কর্মজীবী নারীদের মধ্যে কৃষিকাজ ও ধান চাতালের শ্রমিক হিসেবে এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির ক্ষেত্রে নারী শ্রমিকদের অংশগ্রহণ রয়েছে উল্লে¬¬¬¬¬খ করার মতো। উত্তরাঞ্চলের বৃহত্তম ধান-চাতাল মোকাম ঈশ্বরদীতে প্রায় ১ হাজার ধান-চাতালে পুরুষদের পাশাপাশি কর্মরত রয়েছে ৫ সহস্রাধিক নারী শ্রমিক। প্রতিদিন ধান সেদ্ধ থেকে শুরু করে চাল উপযোগী করতে প্রতিটি কর্মকান্ডেই নারী শ্রমিকদের রয়েছে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহন। পুরুষ শ্রমিকদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সমান তালে পরিশ্রম করলেও মজুরি প্রাপ্তির ক্ষেত্রে দারুন বৈষম্যের শিকার হন এ সকল নারী শ্রমিকরা। ঈশ্বরদীর জয়নগর মোকামের চাতাল কন্যা (নারী শ্রমিক) আনোয়ারা খাতুন জানান, ওদের মতো (পুরুষ শ্রমিক) আমরাও প্রতিদিন ধানে পা দেওয়া, চাতাল ঝাড়– দেওয়া থেকে শুরু করে সকল কাজ সমান তালে করে থাকি। তবে মজুরি যা পাই তা পুরুষের অর্ধেক। শ্রমিক সফুরা বেগম বলেন- ‘খাটুনির বেলায় সমান করলেও ট্যাকা পাই অর্ধেক’। নাজমা আক্তার বলেন, দফায় দফায় পুরুষদের মজুরি বাড়লেও তাদের এখনও সন্তষ্ট থাকতে হয় খুদ আর গুড়া নিয়ে। তিনি জানালেন স্বামী-সংসারে নির্যাতিত হয়ে কিংবা তীব্র অভাবের যাতনায় ভাগ্য তাদের চাতাল শ্রমিক করেছে। মালিকরা অত্যাধিক পরিশ্রম করিয়ে নিলেও মজুরির বিষয়ে বরাবরই বৈষম্য করে থাকেন তারা। সবজি প্রধান এলাকা খ্যাত ঈশ্বরদীর ফসল উৎপাদনে নারী শ্রমিকরা নিবেদিত থাকলেও তাদের বিষয়ে সু-নজর নেই সংশ্লি¬ষ্টদের। ফলে সমান পরিশ্রম করেও অর্ধেক বা তারও কম মজুরিতে সন্তষ্ট থাকতে হয় নারী শ্রমিকদের। ঈশ্বরদীর সবজি প্রধান এলাকা মুলাডুলি ও ছলিমপুর ইউনিয়নের নারী কৃষি শ্রমিকরা জানান, কাজের ধরণ অনুসারে কৃষি কাজে নিয়জিত পুরুষ শ্রমিকরা প্রতিদিন ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা মজুরিতে কাজ করে থাকেন। একই কাজ নারী শ্রমিকদের দিয়ে করানো হয় মাত্র ২০০ টাকায়। সাবিনা খাতুন নামের এক শ্রমিক জানান, পুরুষ শ্রমিকদের পাশাপাশি প্রতিদিন তিনি সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত শিমসহ বিভিন্ন ক্ষেতে কাজ করেন। পুরুষ শ্রমিকদের হাজিরা ৩০০ টাকা দেওয়া হলেও তাকে দেওয়া হয় মাত্র ২০০ টাকা। নারী শ্রমিক জোবেদা খাতুন জানান, মুলাডুলির শিম, বেগুন, ঢেঁড়স, বরবটিসহ বিভিন্ন সবজি ফসল উৎপাদনে প্রায় দেড় হাজার নারী শ্রমিক প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে নিয়োজিত আছেন। তারা সকলেই মজুরিসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে চরমভাবে বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। এদিকে ঈশ্বরদীতে বিভিন্ন আদিবাসী নারী শ্রমিকরাও মজুরি বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। একই কাজ আদিবাসী নারী শ্রমিকরা করলে তাদের দেওয়া হয় মাত্র ১০০ থেকে ১৫০ টাকা। জীবন-জীবিকার তাগিদে অনেকটা বাধ্য হয়েই তারা এ অযৌক্তিক ‘নিয়ম’ মেনে কাজ করছেন বলে জানান বারবি কস্তা নামের এক আদিবাসী নারী শ্রমিক। তিনি ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, কর্মক্ষেত্রে তারা চরম বৈষম্যের শিকার হন, তার মতে শুধুমাত্র মুলাডুলি ইউনিয়নেই প্রায় ৫ শতাধিক আদিবাসী নারী শ্রমিক কৃষি উৎপাদনে সরাসরি সম্পৃক্ত। তারা ধান রোপন, পরিচর্যা ও মাড়াই থেকে শুরু করে সবজি ফসলের মাচা তৈরি ও পরিচর্যার কাজ করে থাকেন। ক্ষেত্র বিশেষ বাজারজাতকরণেও এসকল আদিবাসী নারী শ্রমিক প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখেন।
এ প্রসঙ্গে ঈশ্বরদী উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকতা শাহিনা সুলতানা জানান, সরকারী ভাবে এসব বিষয়ে কোন নির্দেশনা না থাকায় তেমন কোন পদক্ষেপ নেওয়া যাচ্ছে না। তবে নারীদের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে স্বাবলম্বী করে তোলা হচ্ছে। নারীরা তাদের অধিকারের বিষয়ে আগের চেয়ে অধিক সচেতন হয়েছেন দাবি করে তিনি বলেন, কর্মক্ষেত্রে পুরুষদের পাশাপাশি নারীদের বৈষম্য থাকা উচিত নয়। ঈশ্বরদী উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. শাকিল মাহমুদ বলেন, নারী-পুরুষের সমান অধিকারের কথা আমরাও বলি। ঈশ্বরদীতে কর্মরত হাজার হাজার নারীদের এসব বৈষম্য রোধে নারীদের প্রতিবাদী হতে হবে এবং সংশ্লি¬¬ষ্ট কর্মস্থল কিংবা সংস্থাগুলোর ইতিবাচক ভূমিকা রাখা উচিত বলে তিনি মন্তব্য করেন।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ