খাদ্য কর্মকর্তা রহিমের ১০ কোটি টাকার সম্পদের খোঁজে দুদক

আপডেট: অক্টোবর ৩১, ২০১৬, ১২:০১ পূর্বাহ্ণ


নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজশাহী সদর খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কমকর্তা (ওসি-এলএসডি) আবদুর রহিমের বিরুদ্ধে আয় বহির্ভুত বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধান করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। রাজশাহী দুদকের সহকারী পরিচালক রাশেদুল ইসলাম অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে খাদ্য বিভাগকে রহিমের বেতনভাতাসহ  বছরভিত্তিক আয়ের তথ্য চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছেন। অন্যদিকে আরডিএ, রাসিক ও জেলা ভূমি অফিস ছাড়াও বিভিন্ন ব্যাংকে আবদুর রহিমের কী পরিমাণ সম্পদ ও টাকা রয়েছে সেসব তথ্য  চেয়েও দুদক থেকে সংশ্লিষ্ট দফতরে চিঠি পাঠানো হয়েছে। আগামি ৮ নভেম্বরের মধ্যে এসব তথ্য  প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে দুদক সংশ্লিষ্ট দফতরকে অনুরোধ করেছে।
এদিকে এরই মধ্যে গত ২৫ অক্টোবর দুদক রাজশাহী কার্যালয়ে খাদ্য কর্মকর্তা রহিমকে একদফা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে তার অবৈধ সম্পদের ব্যাপারে। তার নিজের নামে, স্ত্রী ও ছেলে মেয়েসহ পরিবারের অন্যদের নামের সম্পদের ব্যাপারেও রহিমকে দীর্ঘসময় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। এছাড়া রহিমের ঘনিষ্ঠ বন্ধু রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (আরডিএ) প্রশাসনিক সহকারী মোস্তাক আহমেদের সঙ্গে কী কী ব্যবসা আছে তার অনুসন্ধান শুরু করেছে দুদক। উল্লেখ্য, একাধিক দুর্নীতি মামলায় রহিমের বন্ধু মোস্তাক গত দুই বছর ধরে আত্মগোপনে রয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, খাদ্য কর্মকর্তা  আবদুর রহিমের বিরুদ্ধে গত বছরের নভেম্বরে আয় বহির্ভুত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনে একটি অভিযোগ আসে। দাফতরিক অনুমোদনের পর রহিমের আয় বহির্ভুত সম্পদের তথ্য অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত হয়। রাজশাহী দুদকের সহকারী পরিচালক রাশেদুল ইসলামকে অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়। আয় বহির্ভুত সম্পদের তথ্য পেতে দুদক কর্মকর্তারা রহিমের চাকরি ও বেতন-ভাতাসহ বিভিন্ন আয়ের প্রাথমিক তথ্য ইতোমধ্যেই সংগ্রহ করছেন। তবে এসব তথ্য সরকারিভাবে পেতে দুদক খাদ্য অধিদফতরকে চিঠি দিয়েছে।
দুদক সূত্র আরো জানায়, তাদের কাছে অভিযোগ আসে, রাজশাহী সদর খাদ্য গুদামের কর্মকর্তা আবদুর রহিম বিপুল সম্পদ অর্জন করেছেন দুর্নীতির মাধ্যমে। অভিযোগ মতে, রাজশাহীর শিরোইল বাস টার্মিনাল সংলগ্ন গোধুলী, ও পার্শ্ববর্তী পূবালী মার্কেট এবং নগরীর উপকণ্ঠ নওদাপাড়া বাস টার্মিনাল মার্কেটে রহিম নামে-বেনামে ৭০টির বেশি দোকানের মালিক। রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (আরডিএ) থেকে এসব দোকান তিনি স্থায়ীভাবে কিনেছেন। অভিযোগে আরো বলা হয়, সরকারি চাকরি করায় এক্ষেত্রে তিনি বিশেষ কৌশলের আশ্রয় নেন। রহিম দোকানগুলি কেনেন স্ত্রী আরিফা সুলতানার নামে যদিও আরিফা সুলতানা একজন গৃহবধু।
একইসঙ্গে তিনি শিরোইল টার্মিনালের পশ্চিমের গোধুলী মার্কেটের উপরে আনজুমান ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি বিলাসবহুল আবাসিক হোটেলের মালিক। প্রায় ২২ হাজার বর্গফুটের এই হোটেলটিও রহিমের স্ত্রীর নামে যার নির্মাণ ও সাজসজ্জ্বা খরচ হয়েছে প্রায় সাড়ে ৩ কোটি টাকা। এছাড়া বাস টার্মিনাল এলাকায় আনজুম নামের একটি চাইনিজ রেস্টুরেন্টের মালিক খাদ্য কর্মকর্তা রহিম।
এদিকে রাজশাহী নগরীতে রহিমের রয়েছে কয়েকটি বাড়ি ও প্লট। এসব বাড়ি ও প্লটের দামও কয়েক কোটি টাকা। প্রায় ৯৯ লাখ টাকা মূল্যে নওগাঁ শহরের প্রাণকেন্দ্র দয়ালের মোড়ে একটি বাড়ি কিনেছেন রহিম যা বর্তমানে ক্লিনিক হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। নীলফামারীর সৈয়দপুরে রহিমের রয়েছে একটি পাটের বস্তা তৈরির কারখানাÑ যার বাজারমুল্য প্রায় দেড় কোটি টাকা। এছাড়া নাটোরের লালপুরে শ্বশুরবাড়ি এলাকায় জমি ও বাড়ি কিনেছেন রহিম যার মূল্য কোটি টাকার বেশি। জানা গেছে, রহিমের নিজের বাড়ি পাবনার ইশ্বরদীতেও রয়েছে তার বিপুল সম্পদ। সব মিলে রহিমের সম্পদের পরিমাণ ১০ কোটি টাকার বেশি বলে দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধান থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে।
দুদক সূত্র আরো জানায়, দীর্ঘদিন ধরে সরকারি খাদ্য গুদামে ধান চাল ও গম ক্রয়ে ব্যাপক দুর্নীতির মাধ্যমে আব্দুর রহিম বিপুল অবৈধ সম্পদ অর্জন করেন বলে তারা তথ্য পেয়েছেন। ব্যবসায়ী সেজে নিজে সিন্ডিকেট গড়ে তুলে রহিম নিজেই ধান, চাল ও গম সরবরাহ করে আসছেন অনেকদিন ধরে। এ কাজে সিনিয়র অফিসাররা টাকার বিনিময়ে তাকে সহযোগিতা করে আসছেন।
খাদ্য বিভাগের একাধিক সূত্র জানায়, গত বছর জুলাইতে রহিম তার অধীন তিন নারী খাদ্য কর্মকর্তার চোখ উপড়ে নিতে চেয়েছিলেন। এসব নারী কর্মকর্তা তার অবাধ দুর্নীতিতে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন বলে সূত্রটি জানায়। তবে রহিমের ইশারায় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তারই ইশারায় চলেন বলে প্রতিবাদী নারী কর্মকর্তাদের অন্যত্র সরিয়ে দেয়া হয়েছিল।
এদিকে দুদকের পাশাপাশি গত বছরের ১৪ জুলাই থেকে খাদ্য কর্মকর্তা আবদুর রহিমের বিরুদ্ধে দুর্নীতির তদন্ত করে খাদ্য অধিদফতর। তদন্ত শেষে দুর্নীতি অনিয়মের অভিযোগের প্রমাণসহ তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করা হয়। শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে গত বছর ২৯ নভেম্বর খাদ্য অধিদফতর  আবদুর রহিমকে রাজশাহী থেকে বরিশাল আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক অফিসে বদলি করা হয়। তবে রহিম উচ্চ আদালতে রিট করে বদলি স্থগিত করেন। এরপর রহিমকে আবারো খুলনা আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক অফিসে বদলি করা হয়। এবারও রহিম রিট করে বদলি ঠেকাতে সক্ষম হন। এরপর থেকে রহিম রাজশাহী সদর খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা পদেই বহাল রয়েছেন।
অভিযোগের ব্যাপারে আবদুর রহিমের মতামত জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার নিজের কোনো সম্পদ নেই। আমার স্ত্রী তার বাবার কাছ থেকে সম্পদ পেয়েছেন। এসব সম্পদ দিয়েই রাজশাহী নগরীতে বাড়ি করা হয়েছে। এছাড়া অন্য কোন স্থানে আমার সম্পদ নেই। শাস্তিমূলক বদলি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একটি মহল আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। তারা আমার সুনাম ক্ষুণœ করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। উচ্চ আদালতের নির্দেশে তিনি আগের কর্মস্থলে আছেন।
এ ব্যাপারে রাজশাহী বিভাগের আঞ্চলিক খাদ্য কর্মকর্তা জামাল হোসেন বলেন, আমি মাত্র কয়েকদিন আগে রাজশাহীতে যোগদান করেছি। খাদ্য কর্মকতা আবদুর রহিমের ব্যাপারে  তেমন কিছু জানি না। তবে তার বেতন ভাতাদির বছরভিত্তিক তথ্য চেয়ে দুদক কার্যালয় রাজশাহী থেকে একটি চিঠি এসেছে খাদ্য বিভাগে।  আমরা নির্ধারিত সময়ে দুদকের চাহিদামতো তথ্য পাঠিয়ে দেব।
আবদুর রহিমের আয় বহির্ভুত বিপুল সম্পদ অর্জন সম্পর্কিত অনুসন্ধানের ব্যাপারে দুদক রাজশাহী কার্যালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সহকারী পরিচালক রাশেদুল ইসলাম বলেন, গত ২৫ অক্টোবর সকালে আবদুর রহিমকে দুদক কার্যালয়ে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তার অর্জিত সম্পদের বিবরণ চাওয়া হয়েছে। এছাড়া তিনি ১৯৯১ সাল থেকে খাদ্য বিভাগে কর্মরত। ওই সময় থেকে সরকার থেকে প্রাপ্ত তার মূল বেতনসহ অন্য ভাতাদির বিবরণ আগামি ৮ নভেম্বরের মধ্যে দাখিলের জন্য খাদ্য বিভাগকে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
তিনি বলেন, আবদুর রহিমের রাজশাহী সিটি করপোরেশন (রাসিক), রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (আরডিএ), নওগাঁ, নাটোরের লালপুর এবং সৈয়দপুর এলাকায় সম্পদ রয়েছে বলে অভিযোগ আছে। এজন্য রাসিক, আরডিএ এবং ভূমি অফিস ও বাংকসহ সংশ্লিষ্ট দফতরগুলোকে ইতোমধ্যে তার সম্পদের বিবরণ চেয়ে চিঠি দেয়া হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, সম্পদ বিবরণ সংবলিত এসব চিঠির জবাব পেলে অনুসন্ধান তরান্বিত হবে। অনুসন্ধানে আয় বহির্ভুত সম্পদ অর্জনের সত্যতা পেলে তার বিরুদ্ধে মামলা করে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ