খাদ্য মন্ত্রণালয়ের আতপ চাল নিয়ে সমালোচনা

আপডেট: সেপ্টেম্বর ১৯, ২০১৭, ১:৩৬ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


বাজারে চালের দাম যখন চড়ছে, তখন শুরু হয়েছে ওএমএসের মাধ্যমে কম দামে চাল বিক্রির কর্মসূচি। তবে এই কর্মসূচিতে আতপ চাল বিক্রি হওয়ায় তা কিনতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না সাধারণ মানুষ। রোববার থেকে ওএমএসের মাধ্যমে আতপ চাল বিক্রি শুরু হলেও দ্বিতীয় দিন সোমবারে এসে ক্রেতাদের অনেকেই বলছেন, আতপ চালের ভাত তারা খাবেন না। তাদের কেউ কেউ বলছেন, পিঠা খাওয়ার জন্য ব্যবহার করা চাল ৩০ টাকা কেজিতে কেনার চেয়ে রুটি খাওয়াও ভালো। পেটের পীড়ায় পথ্য হিসেবে এই চাল খাওয়া হয় বলেও মন্তব্য তাদের। সব মিলিয়ে চালের চড়া বাজারের পরিস্থিতিতে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ওএমএসে আতপ চাল বিক্রির সিদ্ধান্ত। যদিও খাদ্যমন্ত্রী বলছেন, এক সপ্তাহ পর আতপ চাল কেনার জন্য মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়বে।
খাদ্য ও পুষ্টি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পুষ্টি গুণাগুণে খুব একটা হেরফের না থাকলেও অভ্যাসগত কারণেই এই অঞ্চলের মানুষ আতপ চাল খেতে চান না। সেদ্ধ চালের স্বাদ ও ভাত রান্নার প্রক্রিয়া সহজ হওয়ার কারণেই তাদের মধ্যে সেদ্ধ চালের ভাত খাওয়ার অভ্যাস গড়ে উঠেছে। তাছাড়া, আমাদের এই অঞ্চলের মানুষের মধ্যে তরকারি দিয়ে ভাত খাওয়ার যে ধরণ প্রচলিত, আতপ চালের ভাতে সেই খাবার একদিকে যেমন সুস্বাদু হয় না, অন্যদিকে পেটেও অনেকক্ষণ থাকে না।
এদিকে, দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আমাদের প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, ওএমএসে বিক্রি করা আতপ চাল কিনতে ক্রেতারা আগ্রহী নন।
হাওরাঞ্চলে আগাম বন্যা ও সারাদেশে ব্লাইট রোগের কারণে চলতি বছরে বোরো উৎপাদন ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়। এতে স্থানীয় পর্যায় থেকে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী চাল সংগ্রহ করতে পারেনি অধিদফতর। এ পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়ে চাল আমদানির সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। চলতি অর্থবছরে সরকারি পর্যায়ে সাড়ে চার লাখ টন চাল আমদানি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। সরকারের চাল আমদানির প্রথম চালানের জাহাজ গত জুলাইয়ে পৌঁছায় চট্টগ্রাম বন্দরে। খাদ্য অধিদফতর সে সময় জানায়, ভিয়েতনাম থেকে সরকারি পর্যায়ে (জিটুজি) ২ লাখ টন আতপ চাল আমদানি করা হয়েছে। একইসঙ্গে থাইল্যান্ড থেকে ৫০ হাজার টন সেদ্ধ চাল ও ভারত থেকে ২ লাখ টন আতপ ও সেদ্ধ চাল আমদানি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এরই মধ্যে মিয়ানমার থেকে এক লাখ টন আতপ চাল আমদানির সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন খাদ্যমন্ত্রী। এখন শুরু হওয়া ওএমএসে ভিয়েতনাম থেকে আমদানি করা আতপ চালই বিক্রি করা হচ্ছে। মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, ভিয়েতনাম মূলত আতপ চালই উৎপাদন করে থাকে। আর খাদ্যমন্ত্রীও বলেছেন, এই চালের মান সেদ্ধ চালের চেয়েও ভালো।
তবে ওএমএসে চাল বিক্রির দ্বিতীয় দিন সোমবারে বেশ কয়েকটি ট্রাকের সামনে গিয়ে দেখা গেছে, চালের তুলনায় আটার চাহিদা বেশি। কারণ জানতে চাইলে শ্যাওড়াপাড়ার রাবেয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গতকাল আতপ চাল নিয়ে গিয়েছিলাম। আমরা এ চাল খেতে অভ্যস্ত না। স্বাদ নাই, চালও ভালো না। আজকে আটা নিয়ে যাবো, আর বাজার থেকে কিছু সেদ্ধ চাল কিনবো। সেদ্ধ চালের ভাত কম খেলেও পেট ভরা মনে হয়।’
বাংলামোটরের গৃহকর্মী সুলতানা বলেন, ‘পেট খারাপ হলে আতপ চালের জাউ বানিয়ে খায় বলেই এতদিন জেনে এসেছি। আটার দাম বাড়তি থাকলে এই চাল দিয়ে কিছু কিছু পিঠাও বানাতে দেখেছি। কিন্তু ৩০ টাকা কেজিতে এই চাল কিনে ভাত খাওয়া সম্ভব না। বাচ্চারাও তো এই চালের ভাত খেতে চাচ্ছে না। চুলায় চড়ালেই ভাত গলে যায়, কোনও স্বাদও পাওয়া যায় না।’
সেদ্ধ চালের সঙ্গে আতপ চালের দাম খুব বেশি পার্থক্য নেই উল্লেখ করে খাদ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক আরিফুর রহমান অপু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিশ্বজুড়েই এখন আতপ চালটা গুরুত্ব পাচ্ছে। ভারত ও থাইল্যান্ড থেকে সামান্য পরিমাণ সেদ্ধ চাল আনতে পেরেছি। বাকি সবই আতপ চাল। সে কারণেই ওএমএসে আতপ চাল বিক্রি করা হচ্ছে।’ ভিয়েতনাম থেকে জিটুজি করে আনা ২ লাখ টন আতপ চালের মান খুব ভালো বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
নওগাঁ নিয়ামতপুরের চাতাল মালিক মামুন হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আতপ চালে খরচ বেশি। এ চাল ভেঙে যায়। আরও অনেক জটিলতা আছে। তাই আমরা আতপ চাল করি না। আমাদের এখানে আতপ চাল চলেও না।’
আতপ চাল ও সেদ্ধ চালের ব্যবহারের অভ্যস্ততা প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. খুরশীদ জাহান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘অনভ্যস্ততার কারণেই এই চালের প্রতি মানুষের আগ্রহ নেই। ওএমএসে কম টাকায় পাওয়া যাবে বলেই মানুষ তার এতদিনের অভ্যস্ততার বাইরে গিয়ে আতপ চাল কিনতে শুরু করবেন, এমন ভাবার কারণ নেই। ৫০ টাকা কেজিতে মোটা চাল কেনার সামর্থ্য নেই বলেই হয়তো কিছু মানুষ এই চাল কিনবেন। তবে খাদ্যাভ্যাসের বাইরে যাওয়ার কারণে কেউ কেউ শারীরিক জটিলাতেও পড়তে পারেন।’
একই ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক খালেদা এদিব আতপ ও সেদ্ধ চালের পুষ্টিগুণ বিষয়ে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আতপ চাল সেদ্ধ করা হয় না, ধানের ওপরের চিটা ফেলে দিয়ে এই চাল প্রক্রিয়াজাত করা হয়। ফলে চালের গায়ের লাল অংশটি মিলে নেওয়ার সময়ই চলে যায়। অন্যদিকে, ধান সেদ্ধ করে চাল বের করা হয় বলে সেদ্ধ চালে লাল অংশটা থাকে। তবে দুই ধরনের চালের পুষ্টিগুণে খুব একটা পার্থক্য নেই।’ তিনি আরও বলেন, ‘আতপ চাল খেতে স্বাদ নেই। তবে সেদ্ধ চাল না পেলে আতপ চালই খেতে হবে মানুষকে। তবে অভ্যাস না থাকায় শুরুর দিকে পেটের সমস্যাসহ বিভিন্ন ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে।’
যদিও খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম মনে করেন, এক সপ্তাহ পর পাবলিক আতপ চাল কিনতে হুমড়ি খেয়ে পড়বে। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘আমরা যে আতপ চাল আমদানি করছি, তা সেদ্ধ চালের চেয়ে ভালো।’
তথ্যসূত্র: বাংলা ট্রিবিউন