খাদ

আপডেট: জুলাই ২৮, ২০১৭, ১২:৩৪ পূর্বাহ্ণ

সন্তোষ কুমার শীল


ভয়ঙ্কর নির্জন, অরণ্যময় দুর্গম পাহাড়ী পথে অনেকদিন পর ঘটাঙ্ঘট, ঝন্াঝন্ নানা রকম বিকট আওয়াজ ওঠে।  আর তারপরেই গগণ বিদারী একটা আর্তচিৎকার পাহাড়ে পাহাড়ে ধ্বনিত হতে থাকে। সাইকেলটা বেশ কতদূর সামনে ছিল। মাথা ঘুরিয়ে একবার পিছনে তাকায়। তারপরই অস্ফুটে একটা শব্দ বের হয়ে আসেÑ হায়, একী হল ! মোটর সাইকেলটা পাহাড়ের ঢাল বেয়ে তীব্রবেগে গড়াতে গড়াতে নিচে নামছে আর নানা রকম অদ্ভুত ধাতব শব্দ হচ্ছে।  পাশেই জোয়ান আরোহী কিছুদূর গড়িয়ে একটা গাছের সাথে আটকে গেছে। তার মাথা ফেটে অঝোর ধারায় রক্ত ঝরছে। মোটর সাইকেল আর তার ভীষণ দর্শন আরোহীর উপর দীর্ঘদিনের ক্ষোভ সাইকেলটার। এ রাস্তায় এসে যখন তখন গোঁ গোঁ শব্দ তুলে অহঙ্কারী ভঙ্গীতে সাইকেলটার গায়ে কখনো বা জলকাদা আবার কখনো বা ধুলা ছড়িয়ে দিয়ে চলে যেতো ওটা, মনে মনে তখন খুব কষ্ট পেতো সাইকেলটা। কিন্তু ভয়ে মুখ ফুটে কিছু বলত না। প্রথম দিকে একবার বলতে গিয়ে তো প্রাণটাই হারাতে বসেছিল। সাইকেলটার কোন দোষ ছিল না। ইচ্ছে করেই মোটর সাইকেলটা ধুলা-কাদা ছিটিয়ে দিয়ে একটা ঈর্ষা পূরণের আনন্দ পেত। নিরীহ, মুখচোরা বলে সাইকেলটা নতমুখে সব হজম করে যেত। একবার মজা করতে গিয়ে সাইকেলটাকে কাদাজলে একাকার করে দেয়। সাইকেলটা সেবার চুপ করে থাকতে পারেনি। মোটর সাইকেলটাকে বিনীতভাবে বললÑ তুমি কিন্তু অহেতুক জুলুম করছ আমার উপর। আমি তো তোমার ক্ষতি করি না। এমনকি তোমার চলার পথেও ব্যাঘাত ঘটাই না। তাহলে কেন আমার সাথে এই নিষ্ঠুর আনন্দ করে তুমি আমায় কষ্ট দাও? মোটর সাইকেলটা যেন কিছু শুনতেই পায়নি। এমনি নির্বিকার অথচ ভয়ঙ্কর শীতল চোখে তাকিয়েছিল শুধু সাইকেলটার দিকে। তারপর বিকেলে ফেরার পথে আচমকা পিছন থেকে এমন ধাক্কা দেয় যে সাইকেলটা খাদে পড়তে পড়তে কোনমতে প্রাণে বেঁেচ যায়। মোটর সাইকেলটা চাপা গর্জন করে বলেÑ এরপর যদি কখনো কথা বলতে আসিস তো সোজা খাদে ফেলে প্রাণে মেরে দেব।
সেই থেকে সাইকেলটা আর কোনদিন প্রতিবাদ করার সাহস পায়নি। যত অন্যায় অত্যাচারই তার উপর হোক সে মুখ বুজে সহ্য করেছে আর মনে মনে উপরওয়ালার স্মরণ করেছে এই উগ্র, দাম্ভিক, ভয়ঙ্কর মোটর সাইকেলটার হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য। সাইকেলটা দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরেছে। তার মালিকের কাছে দেশ-বিদেশের কথা শুনেছে। সারা জীবন সংবাদ বয়ে বয়ে অনেক খবর সে জেনেছে। তার দেশের নারীদের, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদেরও এমনি হাজারো অন্যায়-অত্যাচার-নির্যাতন মুখ বুজে সহ্য করতে হয়। নইলে তাদেরও প্রাণসংশয়। রাজনৈতিক দলবাজী না বোঝা নিরীহ এবং সাধারণ মানুষদেরও সারাজীবন কোণঠাসা থাকতে হয়। শুধু কি তার দেশে? পৃথিবীর  সবখানেই এই পাশবিকতা আছে। হয়তো তার ভূখ-ে একটু বেশি। তাই মোটর সাইকেলটাকে সে ঘৃণায়, আতঙ্কে এড়িয়ে চলত আর বুকভরা দুঃখ বয়ে বেড়াত।  কবে ওটা পাহাড়ের খাদে ভেঙ্গেচূরে  পড়বে এই আশায় বুক বেঁেধ থাকত।
আজ যখন তার স্বপ্ন পূরণ হল, কোথা থেকে মনে একটা চিনচিনে ব্যথার ¯্রােত বইতে শুরু করল, তার ন্যায়বোধ জেগে উঠল। বিবেক আর কর্তব্যবোধ তাকে যেন ঠেলে মৃত্যুর মুখে পতিত সেই অত্যাচারী, ভয়ঙ্কর মোটর সাইকেলটার দিকে নিয়ে যায়। অত্যাচারী পাপ করেছে।  কিন্তু তাই বলে কি এই বিপদের সময় সে দূরে থাকবে! তাহলে সেও পাপের ভাগীদার হবে না?
সাইকেলটা পাহাড়ের খাড়া চরাই-উৎরাই ভেঙে অত্যন্ত কষ্টে খাদের দিকে নামতে শুরু করে। হঠাৎ মনে হল, আগে আরোহীর কাছে যাওয়া প্রয়োজন। কোনমতে গড়াতে গড়াতে  তার কাছে পৌঁছানোর আগেই খাদে পড়া মোটর সাইকেলটা কর্কশ স্বরে আর্তনাদ করে ওঠেÑ “যাস না ও শালার কাছে। ও-ই তো সারাজীবন আমার উপর চেপেছিল। যা খুশি তাই করত আমাকে দিয়ে। আমায় এমনি করে ব্যবহার করেছে যে আমার স্বভাবটাই খারাপ হয়ে গেছে। কতবার গুলি পর্যন্ত খেয়েছি ওটার জন্য। আর আজ এই ভীষণ খাদে আমার অস্থিমজ্জা একাকার করে ফেলে দিল। ও শালার কঠিন মৃত্যু হোক। তুই পারলে আমায় একটু দয়া কর। আর একটি বার আমায় উঠতে দে, একটু ভাল হয়ে ভাল পথে চলি।” একবারে এতগুলো কথা বলে মোটর সাইকেলটা যন্ত্রণায় গোঙাতে থাকে।
সাইকেলটা জঙ্গলে আটকে থাকা রক্তাক্ত আরোহীর কাছে এসে দেখেÑ আগেই সে জীবনহীন হয়ে গেছে। আগে তাকে দেখে বিভিষীকা জাগত মনে, এখন দেখে ঘৃণা করছে। বীভৎসও লাগছে। সে দাঁড়িয়ে বুকে হিমধরা শীতল দৃষ্টির সাঙ্ঘাতিক লোকটার খাদে পড়ে অসহায় মৃত্যুর কথা ভাবে, আর বিস্মিত হয়Ñ এমন প্রচ- ক্ষমতাধরের এমনি তুচ্ছ মৃত্যুও সম্ভব!
মৃত লোকটির কাছ থেকে এসে খাদের নিচে মটর সাইকেলটার কাছে যেতে শুরু করে সাইকেলটা। কিন্তু জঙ্গলে এমনভাবে আটকে যায় যে কিছুতেই  নিচে নামতে পারে না সে।  নিজেকে ছাড়িয়ে নেবার অনেক চেষ্টা করেও সে ব্যর্থ হয়। মোটর সাইকেলটাকে ডেকে বলে, আমি যে আটকে গেছি আর তো নামতে পারছি না!
তোর পারার কথাও নয়। খাদে কেউ  ইচ্ছে করে তো নামে না! কর্মফল টেনে নামায়। তুই তো আমার মত দুষ্কর্ম করিসনি, তাই চাইলেও ভাগ্য তোকে এতো নিচে আনবে না। ঠিক আছে, তুই ওইখানে বসেই আমার দুর্ভাগ্যের কাহিনী শোন। আর তো কোনদিন সোজা, মসৃণ রাস্তায়  ধুলা উড়িয়ে চলতে চলতে নিজের কথা বলতে পারব না! কতদিনে কেউ এসে নাট-বল্টু খুলে নিয়ে ফেরিওয়ালার ঝুড়িতে ফেলবে তার অপেক্ষায় দুঃসহ দিনে কাটাতে হবে।
আজ সত্যিই তোর জন্য বড্ড কষ্ট হচ্ছে। এত কষ্ট হচ্ছে যে তোর এতদিনের দুর্ব্যবহার, নির্যাতন ভুলে গেছি। একটা কথা বল দেখিÑ তুই রাস্তায় চলা একটা দ্বিচক্রযান আর আমিও। তাহলে তুই তোর আপন জ্ঞাতির প্রতি এত রূঢ়, নিষ্ঠুর আচরণ করতি কেন? আমি তো তোর প্রতি ভুলেও কোনদিন দুর্ব্যবহার করিনি! বরং এই জনপদের প্রত্যেক দুয়ারে ঘুরে ঘুরে দেশ-বিদেশের সংবাদ বিলিয়ে বেড়াতাম। তোর সওয়ারের কুকীর্তির কাহিনীও ছিল কয়েকবার। তুই কেন এই ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করতি যার ফলে এই ভয়াল খাদে আছড়ে-পাছড়ে, ভেঙ্গেচুরে একাকার হয়ে গেলি?
মোটর সাইকেলটা কিছুক্ষণ নিরব থাকে। তারপর ক্ষীণ গলায় বলেÑ সেদিন কি জানতাম যে, রাজনীতি আমার মত একটা যন্ত্রজানকেও এই পথে ঠেলে দেবে! আমার ব্রান্ডটা দেখেছিস? জাপান থেকে জাহাজে চেপে তোদের দেশে এসেছিলাম। অনেক স্বপ্ন ছিল বুকেÑ ভাল কাজের সওয়ারীদের নিমেষে গন্তব্যে পৌঁছে দেব। প্রথমেই উঠলাম গিয়ে শো-রুমে। সেদিন বিকেলেই এক শিক্ষক আমাকে দেখে আমার প্রেমে পড়ে গেল। কতবার যে আমায় ছুঁয়ে দেখল তার হিসেব নেই! প্রথম প্রেমে পড়া যুবতীর মত আমার বুকে সুখের তরঙ্গ ছলাৎ ছলাৎ করে ওঠে। কিন্তু দুর্ভাগ্য, লোকটা অর্থে কুলিয়ে উঠতে পারল না। যাবার সময় আমার দিকে আড়চোখে চেয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চলে গেল। সারারাত সেই শিক্ষকের আশাহত মুখখানা আমার মনে উঁকি দিয়েছে। আর একটা কথা অবাক হয়ে ভেবেছিÑ একজন শিক্ষকের কেন আমায় কেনার সামর্থ হল না?
নতুন এসেছি কেবল। এখানকার শিক্ষকদের যে তোরা প্রায় ফকিরের মত করে রেখেছিস তা তো তখনও জানি না!  খুবই কষ্ট পেয়েছিলাম তখন।  দিন দুই পর আসে ভীষণ-দর্শন এক যুবক। একহাতে সিগারেট আর হাতে মোটা একটা চেইন। সিটের উপর শপাং করে বার দুই  আঘাত করে ঘড়ঘড়ে গলায় দাম জিজ্ঞেস করে। তখনই আমার গায়ে কাঁপুনি ওঠে। কিন্তু শো-রুমের বিক্রেতা দেখলাম কেমন যেন অসহায়। তটস্থ হয়ে লোকটার পাশে হাত কচলে কেমন মিন্ মিন্ করছে। সেদিনের মত লোকটা বিদায় নেয়। পরদিনই এক দাপুটে নেতার ফোন আসে। দোকান মালিকের ফ্যাকাশে মুখ দেখে আমি লক্ষ্য করে শুনি। একটা কর্কশ গলা ওপাশ থেকে বলছেÑ বাইকটা এক্ষুণি দিয়ে দাও। আমার লোক যাচ্ছে। নইলে ওকে তো চেন। কোন ঝামেলা হলে কিন্তু আমি সামলাতে পারব না। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেইÑ সাঙ্ঘাতিক চেহারার যুবক এসে দাঁড়ায়। দোকানদার মনে মনে গালাগাল দিতে দিতে হতাশার শ্বাস ফেলে। তারপর বদমাশটার হাতে আমায় দিয়ে দেয়।
পিঠে চড়ে স্টার্টারে কষে এক লাথি দেয় তারপর আমায় উড়িয়ে নিয়ে চলে হাইওয়ে ধরে। যেখানটায় থামে জায়গাটাকে রাজপ্রাসাদ বললেও বোধ করি কম বলা হয়। ভিতর থেকে ভদ্রলোকের পোষাক পড়া একজন মানুষ বের হয়ে এসে প্রশংসার দৃষ্টিতে আমায় দেখে। অল্প কথায় বলেÑ নতুন গাড়ি দিয়েছি কাজটা আজই করে ফেল। নতুন গাড়িটা উদ্বোধন করা যাক। এক তাড়া নোট আর ধাতব চকচকে কোন বস্তু গুঁজে দিয়ে লোকটা ঘরের দিকে পা বাড়ায়।
দ্বিধান্বিত যুবক পিছন থেকে বলেÑ লিডার, আমি একা এত বড় কাজ পারব? তার চোখে অসহায়ত্ব ফুটে ওঠে।
লিডার বিশ্রী একটা হাসি হেসে বলেÑ গাড়িও  নতুন, ওটাও নতুন।  তুই শুধু পুরনো। তোর জায়গায়ও কি নতুন কাউকে দেখতে চাস?
যুবক আর কোন কথা বলে না। সে ভয় খাওয়া দৃষ্টিতে আমায় নিয়ে ছুটে চলে। কিছুক্ষণের মধ্যেই দুর্গম এক জায়গায় উপস্থিত হয়।  পকেট থেকে নতুন জিনিসটা বের করে একটা ঘরে ঢোকে। দ্রুম্ দ্রুম করে বার তিনেক শব্দ হয়। তারপর টলতে টলতে বেড়িয়ে এসে আবার ছোটে। প্রথমদিনই এই আমার জীবন শুরু হয়। ভিতর থেকে  একদল লোক বেড়িয়ে এসে এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়ে। আমার গায়েই দু’বার লাগে। তবু কোনমতে বেঁেচ যাই তেলের ট্যাংকে আগুন না লাগায়।
তারপর শুরু হয় আমার অন্ধগলিতে যাত্রা। স্বপ্নছিল আজীবন রাজপথে চলব। সূর্যের আলো গায়ে মাখব। কিন্তু তা আর হলনা। যতসব নিষ্ঠুর আর নোংরা কাজে আমায় ব্যবহার করত।
অবশ্য কিছুদিনের মধ্যে একটা পরিবর্তন ঘটে। সেই লিডার কি যেন জঘন্য অপরাধের দায়ে বিদেশে পালিয়ে যায়। আমিও দীর্ঘদিন পড়ে থাকি আলোবাতাসহীন একটা গ্যারেজে। সেখানে বসেই শুনতে পাইÑ রাজনীতিতে দল বদল হয়েছে। পুরোনোরা এত ভাল কাজ করেছে যে তারা সবাই প্রায় লুকিয়ে চুরিয়ে আছে।
কয়েক মাস পর বদ্ধ গুমোট গ্যারেজ থেকে লোকটা আমায় বের করে নিয়ে লিডারের বাড়ি যায়। কিন্তু এ-তো সে বাড়ি নয়। যে লিডার আসে সেও একটা ভদ্রলোকের পোষাকই পড়া। কিন্তু আগের লোকটা নয়। আমি মনে মনে আশ্বস্ত হইÑ এবার হয়তো স্বপ্নপূরণ হবে। আমি রাজপথে অন্যান্য যানবাহনের সাথে পাল্লা দিয়ে চলতে পারব। কিন্তু কিছুদিন যেতেই ভুল ভাঙে। প্রাক্তন লিডার তার অনুগত খুনী লোকটাকে উপঢৌকন দিয়েছিল আমায় নিয়ে অন্ধকারে পাপকর্ম করাবে বলে। আজ দল বদল হলেও লোকটা তো আর বদল হয়নি। তাহলে আমার স্বপ্নপূরণ হবে কী করে?
ততদিনে এই খুনী যুবকও হাফ লিডার হয়ে উঠেছে। তাকেও লোকে ফুলের মালাটালা  দেয়। লিডার বলে ডাকে। আমার আতঙ্ক কিছুটা হলেও কমেছে। অধিকাংশ সময় কাজ হচ্ছে নতুন লিডার যেখানে যায় তার পিছনে পিছনে অকারণ উল্লাস নিয়ে ছোটা। আমার মত দেশী-বিদেশী শত শত বাইক থাকত। আর মাঝে মাঝে দুইটা জিনিস সওয়ার হতোÑ যুবতী আর কালোটাকা। টাকা কাঁদে কিনা জানি না। কিন্তু অনেক যুবতী সম্ভ্রম হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে চোখের জলে আমায় ভিজিয়ে দিয়েছে।
তখন বেশ বয়স হয়েছে। মনে প্রায়ই একটা কথা জাগত আর বিষাদ ঘনিয়ে আসতÑ সারাটা জীবন কি এই পাপকর্মের সাক্ষী থেকেই  বিদায় নিতে হবে? ভাল কাজ কি কোনদিন দেখতে পারব না! কিন্তু পাপের পর ভালকাজই হচ্ছে খাদে পড়ে প্রায়শ্চিত্ত করা। তাই আজ হয়তো আমার জীবনে ভাল দিনটা।
অনেকক্ষণ পরে বাই সাইকেলটা কথা বলেÑ তাই যদি মনে করিস, তবে ওই ভয়ঙ্কর লোকটাকে নিয়ে আরো আগে খাদে পড়লি না কেন।
আমার মনে হয় ব্যক্তি, দল, সমাজ বা রাষ্ট্র পাপের শেষ ধাপে এসে না পৌঁছালে খাদে পড়ে না। আমি ওই খুনীটার পতনের শেষ ধাপে পৌঁছানো পর্যন্ত অপেক্ষা করছিলাম। খাদে তাকে পড়তে হতোই। শুধু একটু সময়ের অপেক্ষাÑ এই যা।
লোকটা লিডার  হয়েই উঠছিল তো! ভাল হয়ে যেতে পারত না!
তোর যেমন কথা! পাপপথে যে বেড়ে ওঠে পূণ্যপথ তাকে ঘৃণায় দূরে রাখে। সে তো ভাল পথ চিনতেই পারে না কোনদিন! পাপীর সঙ্গে থেকে থেকে আমার পর্যন্ত স্বভাব খারাপ হয়ে গিয়েছিল। বড় বড় যন্ত্রযানকেও পাত্তা দিতাম না। কারণ আমার আছে ভয়ঙ্কর শক্তিধর মালিক। কথায় কথায় খেলনার মত গুলি ছুঁেড় ওদের ফুটো করে দেবে না!
ফুটো কেউ কাউকে  করে না রে! যার ফুটো সেই নিজে করে। এই খাদে পড়ে তুই যেমন ফুটো শুধু নয়, দুমরে মুচড়ে গিয়েছিস। যাক সে কথাÑ তারপর কি হল বল দেখি।
কী আর হবে! কয়েক বছরে আবার দল বদল হল। এবারও খুনীটা রং পাল্টে নতুন দলে যোগ দেবার সর্বাত্মক চেষ্টা করল। কিন্তু নতুন লিডারের কিছুটা রাজনীতির শিক্ষা আছে। গোটা পৃথিবীর  প্রসারতা, বিকাশমানতার ধারণা কম বেশি রাখে। সে খুনীটাকে দলে তো নিলই না বরং আইনের হাতে তাকে ঠেলে দেয়। উপায়ন্তর না দেখে এই পাহাড়ী এলাকায় আত্মগোপন করে ছিল। উগ্র একটা গোষ্ঠীর সাথে হাত মিলিয়েছিল। কিন্তু পাপ তাকে পতনের  শেষ বিন্দুতে দাঁড় করিয়ে দিল। লোকটার পরিচয় জেনে গেল  প্রশাসন। গ্রেফতার এড়াতে তাই আমায় নিয়ে পালিয়ে যেতে চাইলেই সব শেষ হয়। আমারও শান্তি।
কিছুক্ষণ দু’জনেই চুপ। সাইকেলটা কথা বলতে গিয়ে কোন সাড়া না পেয়ে থম্কে যায়। চেয়ে দেখে তেলের ট্যাংকে আগুন জ্বলছে। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে উল্টো পথ ধরে। মনে মনে দুঃখের সাথে বলেÑ পাপী ভস্মীভূত হয়ে মুক্তি পাক।
চড়াই-উৎড়াই ভেঙে উপরে উঠে আর একবার নিচের দিকে তাকায় সাইকেলটা। তার বুকের ভিতরটা বিষণœতায় ছেয়ে যায়। খাদে পড়ে পাপী আর পাপ যেন চিতার আগুনে জ্বলছে।