খান বাহাদুর এমাদউদ্দীনের ৮৬তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

আপডেট: মে ৭, ২০১৭, ১২:১০ পূর্বাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক


খান বাহাদুর এমাদউদ্দিন-সংগৃহীত

খান বাহাদুর এমাদউদ্দিনের ৮৬তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। তিনি ১৯৩১ সালের এই দিনে ইন্তেকাল করেন।
১৮৭৫ সালের কোন এক শুভক্ষণে (তারিখ সম্পর্কে কোন তথ্য পাওয়া যায়নি) তৎকালীন মালদহ জেলার নবাবগঞ্জ থানাধীন রাজারামপুর গ্রামে এমাদ উদ্দীন এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম হেমায়েতুল্লাহ বিশ্বাস এবং মাতার নাম জরিমন নেসা। এমাদ উদ্দীন সাহেবের প্রতিষ্ঠানিক পড়াশোনা শুরু হয় গ্রাম্য পাঠশালায়। জানা যায়, বৃত্তিসহ প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে তিনি নবাবগঞ্জ হাইস্কুলে ভর্তি হন। কিছুদিন পর তিনি সেখান থেকে মালদহ জেলা স্কুলে গিয়ে ভর্তি হন, কিন্তু সেখানেও বেশি দিন থাকেননি। সেখান থেকে চলে আসেন রাজশাহীতে এবং রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি হন। এখান থেকেই কৃতিত্বের সাথে এনট্রান্স পাশ করেন। এরপর রাজশাহী কলেজ থেকে এফ.এ (ফার্স্ট আর্টস), বি.এ. এবং বি.এল পাশ করে ১৯০৫ সালে আইনজীবী হিসেবে রাজশাহী আদালতে যোগদান করেন। দীর্ঘ ৩০ বছর তিনি এ পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। কেশরহাট লুটের ফৌজদারি মামলায় কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখে তিনি প্রভূত খ্যাতি অর্জন করেন।
এমাদ উদ্দীন সাহেব রাজশাহী শহরের ছোট-বড় প্রায় সমস্ত সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করেছিলেন। রাজশাহী শহরের তৎকালীন প্রায় সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কার্যনির্বাহী পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আঞ্জুমান ইসলাম ও মুসলিম এসোসিয়েশনে তিনি যথাক্রমে সম্পাদক ও সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তৎকালীন জেলা বোর্ডে তিনিই প্রথম বেসরকারি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে একটানা ১৬ বছর (১৯২০-১৯৩৬) কৃতিত্বের সঙ্গে অধিষ্ঠিত থাকেন। তার আগে দুবছর ভাইস-চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। জেলা বোর্ডের চেয়ারম্যান থাকাকালীন বৃহত্তর রাজশাহী জেলায় এবং রাজশাহী শহরে বহু উন্নয়নমূলক কাজ করেন। এ সময়েই রাজশাহী-নাটোর রোডের পুনঃসংস্কারের কাজ প্রশংসনীয়ভাবে সম্পন্ন করা হয়। তাঁর চেষ্টাতেই নওগাঁর লিটন ব্রিজ নির্মিত হয়। রাজশাহী গার্লস জুনিয়র মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতাও তিনি, যা আজ ‘রাজশাহী গার্লস হাইস্কুল’ নামে প্রতিষ্ঠিত। লোকনাথ উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী সভাপতি ও সদস্য হিসেবে বহুদিন সংযুক্ত থেকে এ বিদ্যালয়ের উন্নয়ন কাজে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন। রাজশাহী কলেজের ‘ফুলার হোস্টেল’ও তাঁর চেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত।
জেলা বোর্ডের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার দু’বছরের মাথায় অর্থাৎ ১৯২২ সালে এমাদ উদ্দীন সাহেব ‘খান বাহাদুর’ উপাধিতে ভূষিত হন। এ সময় তিনি মিউনিসিপ্যাল বোর্ডের সদস্যও ছিলেন। স্বল্পকাল সদস্য থাকার পর তিনি চেয়ারম্যান পদে উন্নীত হন। এক মেয়াদ (১৯২২-১৯২৬) তিনি এ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। তিনিই প্রথম মুসলিম যিনি এ পদ অলঙ্কৃত করেন।
১৯৩১ সালে খান বাহাদুর এমাদউদ্দীন বাংলা প্রদেশের আইন পরিষদের (Bengal Legislative council)সদস্য নির্বাচিত হন। এক পর্যায়ে তিনি ডেপুটি প্রেসিডেন্ট পদে উন্নীত হন। এম.এল.সি. হিসেবে তিনি যথাযোগ্য ভূমিকা রাখেন এবং নিজেকে অত্যন্ত সম্মানিত অবস্থানে অধিষ্ঠিত করেন।
তাঁর কর্মকৃতির অন্যতম একটি নিদর্শন হলো, তিনি দরিদ্র ও পল্লি শিক্ষকগণের মঙ্গল ও প্রাথমিক শিক্ষার উন্নতির চিন্তায় তাঁরই নেতৃত্বে রাজশাহী প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি গঠিত হয়।
খান বাহাদুর এমাদউদ্দীনের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যও ছিল উল্লেখ করার মত। সেই সময়ে তাঁর মত সংস্কারমুক্ত, অসাম্প্রদায়িক চিন্তা-চেতনার মানুষ সত্যিই বিরল। তাঁর নিজস্ব গাড়ি থাকা সত্ত্বেও বাড়ির বউ-ঝিদের পায়ে হাঁটিয়ে স্কুলে পাঠাতেন। এর পেছনে সম্ভবত তাঁর দুটো উদ্দেশ্য ছিল। প্রথমত, মুসলিম সমাজে নারী-শিক্ষার ব্যাপক প্রসার ঘটানো; দ্বিতীয়ত, সাধারণ মুসলিম পরিবারের মেয়েদের সাথে এ্রকাত্ম হওয়া। তাঁর বাড়ির তিনজন মেয়ে তখন পিএন. গার্লস হাইস্কুলে পড়তেন। প্রথমজন, বেগম নূরমহল, দ্বিতীয়জন, বেগম নূরমহলের ছোটবোন তাইয়েবাতুন্নেসা এবং তৃতীয়জন, এঁদের ভাবী যুবাইদা খাতুন। উল্লেখ্য, এঁরা পি.এন স্কুলের যথাক্রমে দ্বিতীয়, তৃতীয় এবং চতুর্থ মুসলিম ছাত্রী। প্রথম মুসলিম ছাত্রী ছিলেন, সৈয়দ মুজতবা আলীর স্ত্রী রাবেয়া আলী।
রাজশাহী শহরের তৎকালীন মুসলিম সমাজ খান বাহাদুরের গুণগ্রাহী ও ভক্ত তো ছিলেনই, সম্পূর্ণভাবে সাম্প্রদায়িতকামুক্ত হওয়ার কারণে তৎকালীন হিন্দু সমাজেরও তিনি ছিলেন প্রিয় ও নমস্য ব্যক্তিত্ব। এক তথ্যে জানা যায়, ১৯৩৬ সালের ৭ মে তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর শবানুগমনে শহরের সকল হিন্দু-মুসলমান একত্রে অংশগ্রহণ করেছিল এবং শোকসভা পালন করেছিল।