খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় তৎপর বিএনপি, এত দেরিতে কেন?

আপডেট: জুন ২৪, ২০২১, ১:০৬ অপরাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলেও গত এপ্রিল থেকে তার বিদেশে উন্নত চিকিৎসার বিষয়টিকে ‘পারিবারিক’ বলেই মন্তব্য করছিলেন বিএনপির নেতারা। এর প্রায় দু’মাস পর গত ২০ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে দলীয়প্রধানের চিকিৎসার দাবিটিকে এজেন্ডাভুক্ত করে দলটির নীতিনির্ধারণী ফোরাম-জাতীয় স্থায়ী কমিটি। দেরিতে হলেও খালেদা জিয়ার উন্নত চিকিৎসায় এটাকে ‘ইতিবাচক অগ্রগতি’ বিবেচনা করছেন স্থায়ী কমিটির সদস্যরা।
বাংলা ট্রিবিউনকে কমিটির কয়েকজন জানিয়েছেন, সরকার খালেদা জিয়ার বিদেশযাত্রা দীর্ঘায়িত করছে। এ কারণে বাধ্য হয়ে রাজনৈতিকভাবে প্রসঙ্গটি সামনে আনা হয়েছে।
বুধবার (২৩ জুন) সন্ধ্যায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আরও আগেই উন্নত চিকিৎসার জন্য খালেদা জিয়ার বিদেশে যাওয়ার কথা। কিন্তু সরকার দীর্ঘায়িত করেছে। একজন মানুষ চিকিৎসা নেবেন, এটা তার সাংবিধানিক ও নাগরিক অধিকার।’
আমীর খসরু আরও বলেন, ‘এটা নিয়ে তো বিএনপি রাজনীতি করতে চায়নি। কিন্তু এখন দল মনে করেছে, তাই চিকিৎসার কথা দলীয়ভাবেও বলা হয়েছে। এটা একজন মানুষের বাঁচামরার বিষয়।’
স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, ‘আমরা তো সব সময়ই ম্যাডামের চিকিৎসার বিষয়টি বলে এসেছি। এখন দলীয়ভাবেও বলা হবে।’
স্থায়ী কমিটির কয়েকজন সদস্য জানান, ইতোমধ্যে বিভিন্ন সমমনা রাজনৈতিক দলের সঙ্গেও নানা উপায়ে যোগাযোগ করা হয়েছে। তবে স্থায়ী কমিটির জ্যেষ্ঠপর্যায়ের দুই-তিনজন সদস্যকে এ ব্যাপারে কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে বলে জানান কমিটিরই একাধিক সদস্য। দল চাইলে বেগম জিয়ার বিষয়টি নিয়ে সামনে আগাতে ইতিবাচক তারা।
দুয়েকদিনের মধ্যেই পরিষ্কার হবে
বিএনপির জোটভুক্ত একাধিক দলের প্রধান বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, অনানুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় সম্মিলিতভাবে গত মে মাসের মতো চলতি সপ্তাহে খালেদা জিয়াকে বিদেশে যাওয়ার সুযোগ দেওয়ার দাবি তোলার আহ্বান জানানো হয়েছে।
বিএনপির দলীয় ও সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোর একাধিক নেতা জানান, খালেদা জিয়াকে সরকার লন্ডন যেতে দেবে না। সেক্ষেত্রে তৃতীয় একটি দেশে শুধু চিকিৎসার জন্য সুযোগ দেওয়া হতে পারে।
বিএনপির জোটভুক্ত একটি দলের প্রধান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, পুরো প্রক্রিয়াটি অনেকদিন ধরেই পর্দার আড়ালে। ব্যাপারটি একটি ইতিবাচক অবস্থায় আসার কারণেই বিএনপির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
দলের চেয়ারপারসনের কার্যালয়ের প্রভাবশালী এক দায়িত্বশীল জানান, সরকারের বর্তমান অবস্থান বিবেচনায় নিয়ে বিএনপিকে পদক্ষেপ নিতে হচ্ছে। এই সূত্রের মতে, দুয়েকদিনের মধ্যে সরকারদলীয় দায়িত্বশীলদের বক্তব্যেই সব পরিষ্কার হয়ে যাবে। জানা যাবে পরিস্থিতি কোনদিকে যাবে।
কোন দেশে যাবেন খালেদা জিয়া?
চলতি বছরের এপ্রিলে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হন বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। এরপর শারীরিক সমস্যা বাড়লে ২৭ এপ্রিল এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করানো হয় তাকে। হাসপাতালে করোনার ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের রোগী বাড়ায় তাকে ১৯ জুন বাসায় স্থানান্তর করা হয়।
বিএনপির লন্ডনস্থ প্রভাবশালী এক দায়িত্বশীল নেতা রবিবার (২০ জুন) বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ম্যাডাম ইতোমধ্যে সবাইকে পরিষ্কার করেছেন, “উনি ফিজিক্যালি ‘ডেড’ হলেও রাজনৈতিকভাবে মরতে রাজি না। চিকিৎসার জন্য বিদেশে আসলেও থেকে যাবেন না তিনি। দীর্ঘসময়ের জন্য লন্ডনেও আসতে রাজি নন। আবার সরকারও তাকে লন্ডনে পাঠাতে রাজি নয়। উনার ভাই-বোনরা অনেকদিন ধরেই তাকে বিদেশে পাঠানোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু তিনি রাজি হচ্ছেন না।”
এ নেতা আরও বলেন, ‘গত মের দিকে শরীর বেশি খারাপ হওয়ায় খালেদা জিয়া বিষয়টি পরিবারের ওপর ছেড়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু সে পরিস্থিতি এখন নেই। দলের একটি অংশ চাইছে, যুক্তরাজ্য ছাড়াই অন্য কোনও দেশে চিকিৎসা করাতে।’
দলের একাধিক নেতার ভাষ্য, খালেদা জিয়াকে আমেরিকা, ব্যাংকক বা সিঙ্গাপুর— এই তিন দেশের কোনও একটিতে নেওয়া হতে পারে। চিকিৎসা শেষে তিনি দেশে ফিরবেন। তবে কবে ফিরবেন, তা নিয়ে রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ চলমান বলে জানান তারা।
পাশাপাশি খালেদা জিয়া বিদেশে গেলে সাংগঠনিকভাবে বিএনপি বিপদে পড়বে, এমন আশঙ্কাও জানিয়েছেন জোটভুক্ত একাধিক নেতা।
মঙ্গলবার (২২ জুন) বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘উনার পরিবার তাকে বিদেশে পাঠানোর কথা বলেছিল। আমরা এবার পার্টির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে রেজুলেশন নিচ্ছি যে, তার বিদেশে চিকিৎসা দরকার। এজন্য যা কিছু সরকারের করা দরকার, তা দ্রুত করা উচিত।’
এই আলোচনা কতখানি ফলপ্রসূ হচ্ছে, এমন প্রশ্নের জবাবে স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘এটা ফলপ্রসূ হওয়ার বিষয় না। ম্যাডামের বিদেশ যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে বড় ধরনের অবহেলা করা হয়েছে।’
কোন দেশে যাবেন খালেদা জিয়া, জানতে চাইলে বিএনপির ফরেইন রিলেশন্স কমিটির টিম লিডার আমীর খসরু বলেন, ‘এটা উনার ব্যাপার। ট্রিটমেন্টের জন্য যেখানে সম্ভব যাবেন। তার অ্যাডভান্স ট্রিটমেন্টের কথা চিকিৎসকরা কোভিডের আগে থেকেই বলে আসছেন। সরকারের সদিচ্ছা থাকলে এটা তো একদিনের ব্যাপার। কোথায় আটকে আছে তা আমরা জানি।’
বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার পাসপোর্ট গত মে মাসে নবায়ন করতে দেওয়া হলেও বুধবার পর্যন্ত কোনও অগ্রগতি হয়নি। খালেদা জিয়ার একান্ত সচিব আব্দুস সাত্তার এদিন সন্ধ্যায় বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা পাসপোর্ট অফিসের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করছি। তারা বলেছে, ক্লিয়ালেন্স পেলে জানাবে।’
জানতে চাইলে আব্দুস সাত্তার জানান, ‘খালেদা জিয়ার শরীর ভালো নেই। হাসপাতাল থেকে ফেরার পরও উন্নতি হচ্ছে না। চিকিৎসকরা নিয়মিত দেখভাল করছেন।’
তথ্যসূত্র: বাংলাট্রিবিউন