খালেদা জিয়ার বিবৃতি || দোষারোপের রাজনীতির শেষ কোথায় ?

আপডেট: মার্চ ৩০, ২০১৭, ১২:১২ পূর্বাহ্ণ

দেশের অন্যতম বড় দল বিএনপির চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদকে জাতীয় সমস্যা আখ্যায়িত করে এই সমস্যা মোকাবিলায় দোষারোপের রাজনীতি ভুলে ঐক্যবদ্ধ হতে ক্ষমতাসীনদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে তিনি এই তাগিদ দেন। তাঁর এই বিবৃতি দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
বেগম খালেদা জিয়ার মত দেশের মানুষও তেমনটিই উপলব্ধি করছে। কিন্তু জাতির জন্য উপহাস সবসময়ই প্রস্তুত থাকে যে, রাজনৈতিক দলগুলো জন-আকাঙক্ষা নিয়ে রাজনীতি করে ¯্রফে ক্ষুদ্র রাজনৈতিক স্বার্থে, যেনতেনভাবে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য। অর্থাৎ জন-আকাক্সক্ষার সাথে রাজনৈতিক দলের ইচ্ছার ব্যবধানটা বেশ দূরের। আস্থা ও বিশ্বাসের সঙ্কট তো আছেই। এই সঙ্কট থেকে উত্তরণের জন্য রাজনৈতিক দলে যে ধরনের শুদ্ধি দরকার তা মোটেও হচ্ছে না। অতীতে যে দোষে দুষ্ট, সেই তারাই আবার সেই দোষের সমালোচনা করছে। কিন্তু একবারের জন্যও তারা বলছে না যে, অতীতে তারা যা করেছে তা মোটেও সমীচীন হয়নি। সেটি তাদের রাজনৈতিক ভুল ছিল, ভবিষ্যতে তারা সেই ভুল আর করতে চায় না।
সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ প্রতিরোধে খালেদা জিয়া এক্যবদ্ধ হওয়ার আহবান জানালেও বিবৃতিতে ক্ষমতাসীনদের দোষারোপ করতে ছাড়েনি। অর্থাৎ তাঁর বিবৃতির মধ্যেই স্ববিরোধিতা স্পষ্ট।
তিনি বলেছেন, ‘১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হবার পর দেশব্যাপী এই সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিস্তার ঘটে। ২০০১ সালে নির্বাচিত হয়ে আমরা দায়িত্ব নেয়ার পর আমাদের সরকারও জঙ্গিবাদের এই সংকটের মুখোমুখি হয়। আমরা কঠোর হাতে তা দমন করি।’’
খালেদা জিয়ার বক্তব্যেই মিথ্যাচারের রাজনীতির স্বরূপটা খুবই পরিস্কার। দেশবাসী খুব ভালমতই জানে যে, জঙ্গি-সন্ত্রাসবাদের প্রকাশ্য উত্থানটা ১৯৯২ সালে। ‘আমরা সবাই তালেবান, বাংলা হবে আফগান’Ñ প্রকাশ্যে এই স্লোগান দিয়ে জঙ্গিরা নিজেদের অস্তিত্ব ঘোষণা দেয়। কিন্তু ওই সময় ক্ষমতাসীন বিএনপির পক্ষ থেকে কোনো ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। তিনি ২০০১ সালে জঙ্গি দমনের কথা বলেছেন কিন্তু সরকার তখনই ব্যবস্থা রিয়েছে যখন ইস্যুটি নিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি হচ্ছিল। ২০০১-২০০৫ পর্যন্ত সময়ে সারা দেশে শতাধিক জঙ্গি হামলার ঘটনা রয়েছে। কুখ্যাত বাংলা ভাই যে মুহুর্তে প্রকাশ্যে হত্যা-নির্যাতন চালাচ্ছে তখন বিএনপি সরকারের মন্ত্রী ও এমপিরা গণমাধ্যমকে দোষারোপ  করেছেন যে, ‘বাংলা ভাই, মিডিয়ার সৃষ্টি, বাংলা ভাই বলে কেউ নেই। ওই সময়ে সশস্ত্র বাংলা ভাই বাহিনীর বাগমারা থেকে রাজশাহী মহানগরীতে সশস্ত্র প্রবেশ ছিল পুলিশি প্রহরায়। বাংলা ভাই রাজশাহী অঞ্চলের ২২ জনকে পিটিয়ে হত্যা করেছে প্রকাশ্যে মঞ্চ করে, মাইকে ঘোষণা দিয়ে। পুলিশ বিভাগ বা প্রশাসনের সবাই ছিল নিরব। কেননা সরকারের মন্ত্রী- এসমপিদের আশ্রয়-প্রশ্রয় ছিল। এভাবেই সারা দেশে একই দিনে একযোগে বোমা হামলার পরও বিএনপি সরকার কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। বিএনপি আমলেই জঙ্গি হামলাই আওয়ামীলীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতা, বিচারক, আইনজীদের হত্যা করা হয়। হামলা করা হয় ব্রিটেনের রাষ্ট্রদূতের ওপর। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতার সমাবেশে গ্রেনেড হামলা, ২৪ জনের মৃত্যু পর্যন্ত বিএনপি সরকারকে মোটেও বিব্রত করেনি। গ্রেনেড হামলা মামলার জজমিয়া নাটক দেশের মানুষের সাথে স্মরণকালের তামাশা ছিল। এসব ঘটনাকে আড়াল করার মানসিকতা বদ্ধমূল থাকলে চলমান রাজনীতিকে কোনোভাবেই পরিশীলিত করা যাবে না। জাতীয় রাজনীতি নিয়ে জনগণের আস্থা ও সঙ্কটের ব্যবধান বাড়তেই থাকবে। আর এর দায় সম্পূর্ণরূপে রাজনীতিকদেরই নিতে হবে। অতীতের ভুল বা অপরাধগুলো স্বীকার করে তবেই না বলা যাবেÑ আসুন আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে জঙ্গিবাদ প্রতিরোধ করি। তা না করে অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে দিয়ে নিজের অপরাধ স্খলনের চেষ্টাও আরেক অপরাধ। এই দোষারোপের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য প্রয়োজন ঐক্যবদ্ধ হওয়া। কেবল সে ক্ষেত্রেই সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ নির্মূল করা সহজ হবে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ