খোকা থেকে বঙ্গবন্ধু

আপডেট: মার্চ ১৭, ২০১৭, ১২:১১ পূর্বাহ্ণ

ড. কাজী মুহাম্মদ ওয়াজীর হায়দার


যুগ পরিক্রমায় দেশে দেশে অনেক মহামানবেরই জন্ম হয়েছে। তবে তাঁদের কেউ ইতিহাসের একটি পঙ্ক্তি, কেউ একটি পাতা, কেউবা একটি অধ্যায়। কিন্তু কেউ আবার সমগ্র ইতিহাস। তাঁদের জন্মের কারণেই একটি বিশেষ অঞ্চল, বিশেষ ভাষাভাষি মানুষ, বিশেষ বৈশিষ্ট্য, আদর্শ, নীতি, স্বাধীনতা ও মুক্তি, কৃষ্টি ও পথের সন্ধান পায়। এ কারণেই হয়তো ইংরেজ কবি ও নাট্যকার  ডরষষরধস ঝযধশবংঢ়বধৎব বলেছেন- ‘‘ঝড়সব ধৎব নড়ৎহ মৎবধঃ, ংড়সব ধপযরবাব মৎবধঃবহবংং, ংড়সব যধাব মৎবধঃহবংং ঃযৎঁংঃ ঁঢ়ড়হ ঃযবস.” একজন মহান মানুষের কারণেই অত্যাচার-নিপীড়ন, পরপদানত জাতি মুক্তি পায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রর জনক জর্জ ওয়াশিংটন, গণতন্ত্রের মহান কারিগর আব্রাহাম লিঙ্কন, ভারতের জাতির পিতা মোহনদাস করমচাঁন গান্ধী, সোভিয়েত মুক্তিদূত লেলিন, চিনের মুক্তিকামী মানুষের নেতা মাও সেতুং, মিশরের মুক্তির দূত জামাল আবদাল নাসের, ভিয়েতনামের মহান নেতা হো চি মিন, স্প্যানিশ ভাষাভাষী ল্যাটিন আমেরিকার মুক্তি সংগ্রামী সাইমন বলিভার, নব্য তুরস্কের নেতা কামাল আতার্তুক, আর্জেন্টিনীয় মার্কসবাদী বিপ্লবী আর্নেস্তো চে গুয়েভারা, যুগোশ্লাভিয়ার জোসেফ ব্রজ মার্শাল টিটো ও দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট নেলসন ম্যান্ডেলাসহ অনেকেই বিশ্ব ইতিহাসের আধুনিক শতাব্দীর বর্ষগুলিতে আলোর দ্যূতি ছড়িয়ে দেশে-বিদেশে চিরঞ্জীব হয়ে আছেন। মরেও অমর হয়ে আছেন তাঁরা। ঠিক তেমনি ত্রিশ লাখ শহিদের আত্মদান, দু’লাখ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে ও রক্ত¯œাত সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে জন্মগ্রহণকারী এই বাঙালি জাতির মুক্তিদূত হিসেবে কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে যিনি চিরস্মরণীয়, চিরভাস্বর তিনিই আমাদের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। জীবন-যুদ্ধে জয়ী সংগ্রামী এক ধ্রুবতারার নাম শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর অসামান্য প্রতিভা, অসীম ধৈর্য, অক্লান্ত পরিশ্রম, সুদৃঢ় পরিকল্পনা, মহৎ উদ্দেশ্য, স্থির প্রতিজ্ঞা, অসাধারণ চরিত্রবল, দূরদর্শিতা, নিঃস্বার্থপরায়ণতা, সাহসিকতা ও নেতৃত্ব দানের ক্ষমতা বাঙালি জাতিকে মুগ্ধ করেছে। কালের আবর্তে তিনি হয়ে উঠেছিলেন নির্যাতিত, নিপীড়িত বাঙালি জাতির ত্রাণকর্তা ও মুক্তির দিশারী। তিনি সৃষ্টি করেছেন এক নতুন ইতিহাস। উনিশ শতকী জাতীয়তাবাদী চেতনায় তিনি বিশ শতকের প্রাগ্রসর মুক্তিচিন্তার অগ্নিস্ফুলিঙ্গের যোগ ঘটিয়েছেন। তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের অবিসংবাদিত নেতায়। তিনি ইতিহাসের মানস-সন্তান।
আজ থেকে প্রায় দু’শ বছর পূর্বে ইসলাম ধর্ম প্রচারের দায়িত্ব নিয়ে এ দেশে আসেন সৌদি শেখ বংশের একটি সম্ভ্রান্ত পরিবার। বসতি গড়ে তোলেন নদী বিধৌত প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও সুষমাম-িত ছোট্ট গ্রাম ‘টুঙ্গীপাড়া’তে। আত্মনির্ভরশীল এই ছোট্ট গ্রামেই বাংলা ১৩২৭ সালের ২০ চৈত্র, ইংরেজি ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ মঙ্গলবার রাত ৮ টায় জন্ম গ্রহণ করেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, বাংলাদেশ নামের এই মানচিত্রের সফল স্বপ্নদ্রষ্টা ও স্বপ্নের রূপকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। শেখ লুৎফর রহমান ও সায়েরা খাতুনের চার কন্যা ও দুই পুত্রের মধ্যে তৃতীয় সন্তান শেখ মুজিব। জন্মের পর বঙ্গবন্ধুর নানা শেখ আবদুল মজিদ নাতির আকিকার সময় নাম রাখেন শেখ মুজিবুর রহমান। বাবা-মা আদর করে ডাকতেন ‘খোকা’। আর ভাইবোন ও গ্রামবাসীর কাছে তিনি ছিলেন মিয়া ভাই। পরবর্তী সময়ে এই ‘খোকা’ই হয়ে উঠলেন বঙ্গবন্ধু ও বাঙালি জাতির জনক। বংশের বড় ছেলে হিসেবে সমস্ত আদর সোহাগ তিনিই পেয়েছেন। পূর্বপুরুষদের গড়ে তোলা গিমাডাঙ্গা প্রাথমিক বিদ্যালয়েই শুরু হয় তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা। স্কুলে যাওয়ার পথে খোকা যাতে বৃষ্টিতে না ভেজে তার জন্য বাবা ছাতা কিনে দিয়েছিলেন। খোকা তো আর নিজের কথা ভাবেনা। সবার দুঃখকষ্ট লাঘবের জন্য জন্ম হয়েছে তাঁর। খোকা সেই ছাতাটা একটিন দান করেন গরীব বন্ধুকে। ছাতা পেয়ে বন্ধুটি চোখ উজ্জ্বল করে তাকিয়ে ছিল খোকার দিকে। বন্ধুর খুশিই যেন খোকার খুশি। একদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে খোকা দেখেন রাস্তার ধারে গাছের নিচে বসে এক দুখী ভিখারি শীতে ঠকঠক করে কাঁপছেন। খোকা নিজের গায়ের চাদর বুড়ো ভিখারির গায়ে জড়িয়ে দিয়ে বলেছিলেন, ‘চাদরটা আপনাকে দিলাম।’ মানুষের প্রতি খোকার ভালোবাসা দেখে বাবা বুঝতে পেরেছিলেন তাঁর খোকা আর সবার মতো না, অন্যরকম। এই ছেলেটিই একদিন দুখী মানুষের পাশে দাঁড়াবে, দেশ গড়ে তুলবে এবং বিশ্ব খ্যাতি অর্জন করবে।
বঙ্গবন্ধুর শৈশব কেটেছিল টুঙ্গীপাড়াতেই। পরবর্তীতে বাবা শেখ লুৎফর রহমানের কর্মস্থল গোপালগঞ্জ হওয়ায়, একরত্তি ছেলে, চোখের মনি, গোটা বংশের দুলাল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ভর্তি করা হয় গোপালগঞ্জ মিশনারি স্কুলে। খোকার বয়স তখন সবে চৌদ্দ। মাদারীপুরের পূর্ণচন্দ্রদাসের অনুসারীরা পনেরো-ষোল বছরের ছেলেদের তাদের দলে ভেড়াতেন। তখন বিপ্লবীদের নজর পড়ে খোকার ওপর। একবার এই পূর্ণচন্দ্র দাসের সংবর্ধনা সভায় বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম এক মানপত্র পাঠ করেছিলেন। সেখানে বিদ্রোহী কবি ‘জয় বাংলা’ শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন। কিশোর মুজিবের মাথায় সেখান থেকেই ‘জয় বাংলা’ শব্দটি স্থান করে নেয়।
১৯৩৪ সালে শেখ মুজিব যখন সপ্তম শেণির ছাত্র, তখন ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েন। আব্বা তাঁকে কলকাতায় নিয়ে যান চিকিৎসা করাতে। ১৯৩৬ সালে তাঁর চোখে গ্লুকোমা ধরা পড়ে। ডাক্তার চোখ অপারেশনের পরামর্শ দিলেন। কলকাতা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চোখ অপারেশন করা হল। চিকিৎসকের পরামর্শে চশমা পরা শুরু হল এবং কিছুদিন তাঁকে লেখাপড়া বন্ধ রাখতে হল। ১৯৩৭ সালে তিনি আবার স্কুলে যাওয়া শুরু করলেন। কৈশোরেই শেখ মুজিব খুব বেশি অধিকার সচেতন ছিলেন। ১৯৩৯ সালে একবার যুক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শেরে বাংলা ফজলুল হক ও মন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী গোপালগঞ্জ সফরে যান এবং স্কুল পরিদর্শন করেন। সেই সময় সাহসী কিশোর মুজিব তাঁর কাছে স্কুল ঘরে বর্ষার পানি পড়ার অভিযোগ তুলে ধরেন এবং মেরামত করার অঙ্গীকার আদায় করে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। গোপালগঞ্জ স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাশ করে তিনি কোলকাতায় ইসলামিয়া কলেজে পড়তে যান। থাকতেন বেকার হস্টেলে। এই সময় তিনি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সংস্পর্শে আসেন। সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়েন হলওয়ে মনুমেন্ট আন্দোলনে। এই সময় থেকেই তাঁর রাজনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ শুরু হয়।
১৯৪৩ সালে দুর্ভিক্ষ শুরু হলে সারাদেশে এক ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হয়। শেখ মুজিব এ সময় খেয়ে না খেয়ে রিলিফ প্রদানের কাজ করেন। ১৯৪৭ সালে বঙ্গবন্ধু কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ইসলামিয়া কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্সসহ ব্যাচেলর ডিগ্রি লাভ করেন করেন। একই বছর, ১৪ ও ১৫ আগস্ট ভারত-পাকিস্তান ভাগ হবার পর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হন এবং ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি তিনি মুসলিম ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দীন আইন পরিষদে ‘পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ উর্দ্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মেনে নেবে’ বলে ঘোষণা দিলে তাৎক্ষণিকভাবে শেখ মুজিব এর প্রতিবাদ জানান। খাজা নাজিমউদ্দীনের বক্তব্যে সারাদেশে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। ২ মার্চ সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। ১১ মার্চ সাধারণ ধর্মঘট আহবান করা হলে, ভাষার দাবিতে ধর্মঘট পালনকলে সহকর্মীদের সাথে সচিবালয়ের সামনে থেকে তিনি গ্রেফতার হন। মুক্তি লাভের পর ১৬ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় শেখ মুজিবের সভাপতিত্বে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে ছাত্র জনতার এক সভার আয়োজন করা হয়। এই সভায় পুলিশ হামলা চালায়। প্রতিবাদে ১৭ মার্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালনের আহবান জানানো হয়। ২১ মার্চ ঢাকার রেলগেট ময়দানের এক বিশাল জনসভায় গভর্নর জেনারেল মহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঘোষণা করেন “টৎফঁ ধহফ ড়হষু টৎফঁ ংযধষষ নব ঃযব ঝঃধঃব খধহমঁধমব ড়ভ চধশরংঃধহ”। জিন্নাহ’র ঘোষণায় উপস্থিত যেসব ছাত্রনেতা ঘড়. হড়… ধ্বনিতে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন শেখ মুজিব ছিলেন তাঁদের অন্যতম। এরপর ১৯ মে শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্য ছাত্রনেতৃবৃন্দ ঢাকা বিশ্ববিদ্যায়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের আন্দোলনে সমর্থন দেন ও সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যায়ের যে ১৫ জন ছাত্রনেতা এই আন্দোলনের কারণে বহিস্কার হন শেখ মুজিব তাঁদের অন্যতম। যদিও আলোচ্য ১৫ জনের ১৪ জনই ১০/১৫ টাকা করে ‘মুচলেকা’ প্রদান করে ‘নামকাওয়াস্তে’ লঘু শাস্তি পান কিন্তু শেখ মুজিব ‘মচলেকা দিতে’ অস্বীকৃতি জানালেন। ফলে মুজিবের ছাত্র জীবনের অবসান হলো। আইন ক্লাসের ছাত্র শেখ মুজিব বহিষ্কার হলেন এবং ১৯৪৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর তিনি গ্রেফতার হলেন। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠিত হলে কারাবন্দি শেখ মুজিবুর রহমান এর অন্যতম যুগ্মসম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৪৯ সালের জুলাই মাসে শেখ মুজিব জেল থেকে বেরিয়েই আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর সঙ্গে খাদ্য সংকটের বিরুদ্ধে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং মিছিল থেকে মওলানা ভাসানী, শামসুল হক ও শেখ মুজিব গ্রেফতার হন। কিছুদিন পর আর সবাইকে ছেড়ে দিলেও শেখ মুজিবকে সরকার বিনা বিচারে আটকে রাখলো ১৯৫২ সাল পর্যন্ত । (চলবে)