গডম্যান রাম রহিমের ভূ-তল পতন

আপডেট: আগস্ট ৩০, ২০১৭, ১:১১ পূর্বাহ্ণ

কলকাতা থেকে দীপঙ্কর দাসগুপ্ত


শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত প্রসাদে দুশো ছায়াসঙ্গীনি নিয়ে চূড়ান্ত ব্যাভিচার জীবনযাপন করা গডম্যানের যে এই পরিণতি হবে, তা বোধহয় ঘৃণাক্ষরেও আন্দাজ করতে পারেননি তিনি। আপাতত উত্তর ভারতের হরিয়ানা ৭০০ একর জমির ওপর তৈরি প্রাসাদের বিলাস বৈভব ছেড়ে ধর্ষক বাবা রাম-রহিম সিংকে কাটাতে হচ্ছে কারাগারের অন্ধকারে। সাজা লঘু করাতে সব রকম চেষ্টা করেছিলেন বোহতকের জেল-এজলাসের ভেতরে। এমনকী আকুল কান্নাকাটিও জুড়েছিলেন শেষ মহূর্তে। কিন্তু স্বঘোষিত ধর্মগুরু হরমিত রাম-রহিম সিংকে কোনো রকম ছাড় দিতে চাননি বিশেষ সিবিআই আদালতের বিচারপতি জগদীস সিং। তাই আগামী ২০ বছর কারাগারেই কাটাতে হবে রক স্টার বাবাকে। দুটি ধর্ষণের মামলায় ২০ বছরের সাজা হয়েছে তার। আর সেই সঙ্গেই ইতি পড়েছে গত চারদিনের হাই-টেনশন বাবা-নাটকের। রাম-রহিমের সাজা ঘোষণার পর উত্তরপ্রদেশে ধর্ষণের দায়ে অভিযুক্ত আসারাম বাবাসহ এমন বাকি ভ–প্রতারক বাবাজিদের ভবিষ্যৎ নিতে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। গোটা দেশেই দাবি উঠেছে, রাম-রহিমের যদি কারাদ- হতে পারে, তাহলে আসারাম বাবাদের মামলাগুলি ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে কোন যুক্তিতে?
সনারিয়া জেল চত্বরেই বসা বিশেষ সিবিআই আদালত সূত্রের খবর দু’পক্ষের আইনজীবীকে  সোমবার দশ মিনিট করে নিজেদের বক্তব্য বলার সুযোগ দিয়েছিলেন বিচারপতি। তারপর তিনি নিজের রায় শোনান। দুটি ধর্ষণের জন্য ১০ বছর করে মোট কুড়ি বছর সশ্রম কারাদ- ভোগ করতে হবে ধর্ষক বাবাকে। একই সঙ্গে দুটি মামলায় ১৫ লক্ষ করে মোট ৩০ লক্ষ টাকা জরিমানা দিতে হবে। এর মধ্যে ১৪ লক্ষ টাকা পাবে দুই নির্যাতিতার পরিবার। রায়ের পরে এই কথা জানান সিবিআইর’র আইনজীবী এস কে গগ নাবানা।
সাজা ঘোষণার আগেও যথাসম্ভব নাটকীয় পরিস্থিতি তৈরি করেছিলেন বাবাজি। হাত জোড় করে ক্ষমা প্রার্থনার পাশাপাশি রীতিমতো হাউমাউ করে কান্নাকাটিও করেন। তার আইনজীবী বলেন, জনগণের জন্য যে সেবামূলক কাজ গুরমিত করেন, তা মাথায় রেখে সাজা দেয়া হোক। কিন্তু বিচারপতি সিং সে কথায় কর্ণপাত না করে ধর্ষণের অপরাধে সর্বোচ্চ ১০- বছরের সাজাই শুনিয়েছেন। রায় শুনে কাঁদতে কাঁদতে আদালতের মেঝেতে বসে পড়ে বাবা রাম-রহিম। কার্যত তাকে টেনে-হিঁচড়ে বাইরে নিয়ে যেতে হয়।
এরপর কান্নাকাটি থামিয়ে চা খেতে চায় বাবা। কিন্তু নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা অফিসাররা সাফ জানিয়ে দেন-চা দেয়া যাবে না। এরপর ফের তিনি বলেন, তার শরীর খারাপ লাগছে। উপস্থিত চিকিৎসকরা স্যাক্স-বাবাকে পরীক্ষা করে বলেন, তার শরীরে কোনো গোলমাল নেই। আদালতে উপস্থিত সিবিআই’র আইনজীবীরা বলেছেন, বেশ খানিকক্ষণ ধরে কান্নাকাটি করে বাঁচার চেষ্টা করেছিলেন বাবা গুরমিত। একবার বলেন, আদালতের ওপর তার অগাধ আস্থা, যা রায় দেয়া হবে তা তিনি মাথা পেতে নেবেন। বিচারপতির দিকে তাকিয়ে বলেন, রেহাই দিন দয়া করে। চিৎকার করে বলতে থাকেন, আমি গডম্যান। কেউ আমাকে বাঁচাও। আদালত চত্বরে রীতিমতো হাস্যরসের উপাদান তৈরি করেন তিনি। চিৎকার করে বলতে থাকেন, আমার শরীর খারাপ করছে, আমার কিছু হয়ে গেলে তার জন্য বাদি দায়ী থাকবে। কিন্তু তার কোনো আবেদন-নিবেদনই কাজে লাগেনি।
কারা দপ্তরের কর্তারা বলেছেন, বাতানকল পরিবেশে থাকতে অভ্যস্থ রাম-রহিম জেলের একটি মাত্র ফ্যানের হাওয়ায় থাকতে পারছেন না। সৌখিন রেশমি-মখমলের পোশাক ছেড়ে তাকে পরানো হয়েছে কয়েদিদের পোশাক। বিলাসবহুল শয্যা ছেড়ে এবার তাকে থাকতে হবে অন্যান্য কয়েদিদের সঙ্গেই। তবে রাম-রহিমকে কারাগারে পাঠানো হলেও তার ডেরা সাচা সোদা নিয়ে এখনও সংশয় থেকে গিয়েছে। গোটা দেশে প্রায় ৫ কোটি ভক্ত রয়েছে বাবার। এই বিশাল সা¤্রাজ্যের পরবর্তী অধিকারী কে হবেন, সেদিকেই এখন নজর সকলের।
এই প্রশ্ন শুধু ডেরা সাচ্চাভক্তদেরই নয়, আমজনতার মনেও ঘুরপাক খেতে শুরু করেছে। সেক্ষেত্রে বাবার উত্তরসূরি হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে আছেন তারই ছায়াসঙ্গী তথা পালিতা-কন্যা হানিপীত ইনসান। নিজেকে বাবার যোগ্য মেয়ে বলেই মনে করেন হানিপীত। পাঁচকল থেকে রাম-রহিমকে হেলিকপ্টারে করে রোহতকের জেলে নিয়ে যাওয়ার সময়ও বাবার সঙ্গে ছিলেন এই হানিপীত। সে সময় প্রশ্ন উঠেছিল, কঠোর নিরাপত্তার সত্ত্বেও ধর্ষক-বাবার সঙ্গে কী করে হেলিকপ্টারে উঠলেন হানিপীত?
জন্মসূত্রে প্রিয়াঙ্কা তানেজা ১৯৯৯ সালে সাচা সৌদা ভক্ত বিশ্বাস ও গুপ্তাকে বিয়ে করে হানিপীত ইনসান নাম গ্রহণ করেন। ২০০৯ সালে তাকে দত্তক নেন রাম-রহিম।