গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস ভুলে গেলে চলবে না

আপডেট: ফেব্রুয়ারি ৫, ২০২০, ১২:০৬ পূর্বাহ্ণ

প্রশান্ত সাহা


প্রকৃতি ও মানুষ একেঅপরের সাথে পুরোপুরি সম্পৃক্ত। তবে মানুষকে প্রকৃতির জীব হিসেবে প্রকৃতিকে নিয়েই বাঁচতে হয়। প্রকৃতি যা সৃষ্টি করে তা সৃজনশীলতার আধারে। কিন্তু মানুষ সেই আধার নিজের স্বার্থে যখন ভেঙে ফেলে তখন শুরু হয় বিপর্যয়। আবার মানুষ মানুষের জন্য যে কর্মকাণ্ড করে তা কিন্তু বিপর্যয় আনে না, কারণ যদি সে কর্মকাণ্ডে সাধারণ মানুষের মুক্তির বার্তা থাকে। সেই বার্তা গণজোয়ারের সৃষ্টি করে ইতিহাস পাল্টে দিয়ে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করে। তখন মানুষের শোষণ, বঞ্চনা ও ষড়যন্ত্রের অবসান ঘটায়।
পাকিস্তান সৃষ্টির মাধ্যমে যে অবাস্তব রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল তাতে বাংলার জনগণের মুক্তির বার্তা ছিল না। যদিও পাকিস্তান সৃষ্টির পেছনে এদেশের জনগণ নির্দ্বিধায় মুসলিম লীগকে ভোট দিয়ে পাকিস্তান সৃষ্টিতে প্রধান ভূমিকা পালন করে। কিন্ত পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রযন্ত্র পূর্ব পাকিস্তানের ওপর চাপিয়ে দেয় ঔপনিবেসিক শাসন ও শোষণ।
ষাটের দশকের মধ্যভাগে বঙ্গবন্ধুর ঘোষিত ছয় দফা দাবির পেছনে এদেশের মানুষ তাদের দীর্ঘ দিনের অর্থনৈতিক শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে নতুন এক আশার আলো দেখতে পেল। পাকিস্তান সৃষ্টির পর কোনো রাজনৈতিক নেতা তা দেখাতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। ফলে জনগণ ছয় দফার দাবিকে তাদের প্রাণের দাবিতে পরিণত করলো। এই দাবিকে বাস্তবায়নের জন্য জনগণ যে গণজোয়ার বা গণঅভূ্যুান সৃষ্টি করলো তা ইতিহাসে বিরল। আর এ সৃষ্ট জোয়ারে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ূব খান বাধ্য হলো তার ক্ষমতা হস্তান্তরে। এর ধারাবাহিকতায় বাংলার জনগণ পেলো সত্তরের নির্বাচন ও মুক্তিযুদ্ধ।
কিন্তু আজকাল দৈনিক পত্রপত্রিকায় গণঅভ্যুত্থান স্মরণে খুব বেশি হলে প্রথম পাতায় একটি কলাম নির্দিষ্ট থাকে। এই নিয়ে প্রকাশ হয় না কোনো সম্পাদকীয় বা উপসম্পাদকীয়, হয়তো দু’একটি বাদে। পূর্ব পাকিস্তানে গণঅভ্যুত্থান সত্তরের নির্বাচনসহ মুক্তির সংগ্রামের নিয়ামক ছিল তা অস্বীকার করা যাবে না। বর্তমান প্রজন্মের অনেককেই বলতে শুনি, ‘তাই নাকি এমন একটা ঘটনাও এদেশে ঘটেছিল?’ জানিনা, একে দুর্ভাগ্য বলবো না অতীতের ঘটনা প্রবাহ না জানতে দেয়ার অপচেষ্টা? আমাদের বর্তমান তরুণরা ইতিহাস বাদ দিয়ে ক্যারিয়ার তৈরিতে ব্যস্ত, পরিবারের অন্য সদস্যরাও এতে খুশি। যদিও একটি পরিবর্তন লক্ষ্য করছি শিক্ষার ক্ষেত্রে। বাংলাদেশের অভ্যুদয় নামে একটি বই শিক্ষার্থীদের সব লেভেলে কম্পালসারি করা হয়েছে। তবে শিক্ষার্থীদের যেসব শিক্ষক এই বইটি পড়ান তারা কতটুকু সঠিকভাবে উপস্থাপন করেন? কারণ, তারা কি জানেন বইটি কতখানি ব্যতিক্রমধর্মী এর সাথে সাধারণ মানুষের নাড়ির কত গভীর যোগাযোগ?
১৯৬৮ সালে সামরিকজান্তা বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করলো এবং ১৯৬৯ সালে অন্তরীণ বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দিয়েও জেলগেটে আবার গ্রেফতার করা হলো। এবারের গ্রেফতারে আর্মি, নেভি অ্যান্ড এয়ারফোর্স অ্যাক্টে গ্রেফতার করে নিয়ে গেল কুর্মিতলা ক্যান্টনমেন্টে। সাথে ২জন সিএসপি অফিসার সহ ২৮জনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। আর সরকারি প্রেস নোটে বলা হয়েছিল, ‘গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিরা ঢাকাস্থ ভারতীয় ডেপুটি হাই কমিশনারের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে আসছিল, এবং পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার উদ্দেশ্যে সংঘবন্ধ প্রচেষ্টা চালাচ্ছিল।’
এর বিরুদ্ধে সর্ব প্রথম জগন্নাথ কলেজের ছাত্ররা ১৯ জানুয়ারি ১৯৬৮ তে ধর্মঘট করেন। ২১ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটি এক জরুরি সভায় বঙ্গবন্ধুর আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগসহ সরকারের কাছে প্রকাশ্যে বিচারের দাবি জানায়। ওই সালের ১৯ জুন বিপুল সংখ্যক দেশি বিদেশি সাংবাদিকদের উপস্থিতিসহ ঢাকার কুর্মিটোলা সেনানিবাসে আগরতলা ষড়যন্ত্র নামে বঙ্গবন্ধু ও অন্যদের মামলা শুরু হলো। সুপ্রিম কোর্টের সাবেক বিচারপতির নেতৃত্বে একটি ট্রাইব্যুনাল গঠন করে এই ষড়যন্ত্রের নামে সরকার পূর্ব বাংলার জনগণের স্বাধিকারের প্রশ্নকে অঙ্কুরে বিনষ্ট করতে ষড়যন্ত্র শুরু করলো তৎকালীন অবিসম্বাদিত নেতা বঙ্গবন্ধুকে হত্যার।
এই গ্রেফতার ও ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে এদেশের মানুষ শুধু গর্জে উঠেনি, বিদেশেও এর প্রতিক্রিয়া হয়েছিল। ভারতীয় আকাশবাণী ও দূরদর্শনের সিইও জহর সরকার তার এক স্মৃতিচারণে বলেছেন, ‘মাসটা ছিল ১৯ জানুয়ারি, আমার একাদশ শ্রেণির বোর্ড পরীক্ষার ঠিক এক মাস পরের কথা। আমার রাজনৈতিক দীক্ষাগুরু বলেছিলেন, পাকিস্তানি হাইকমিশনের বাইরে শেখ মুজিবের জেল থেকে মুক্তির দাবিতে আমাদের এক প্রতিবাদ অবস্থানে অবশ্যই শামিল হতে হবে।… সেই উত্তাল সময়টা ছিল যখন পৃথিবীজোড়া ছাত্র আন্দোলনের ঢেউ প্যারিস, লন্ডন, বার্লিন থেকে ওহায়ো এবং চীন অবধি কাঁপিয়ে দিচ্ছিল। আমার বয়স তখন ১৭ বছর। আমাদের প্রজন্ম তখন বাম আদর্শ থেকে উৎসারিত শক্তি দ্বারা সম্পূর্ণরূপে নিমজ্জিত ছিল।…. পার্ক সার্কাস অঞ্চলের একটি বিশেষ স্থানে আমরা মিলিত হলাম, যেখানে মিছিল করে আসা নানা মতাবলম্বী বামপন্থি ছাত্র ও শ্রমিকদের সঙ্গে আমাদের দেখা হলো। অবিলম্বেই আমরা কিছু চেনা বুদ্ধিজীবীকে দেখতে পেলাম। অবশেষে অন্তত একবার, জীবনে প্রথম নিপীড়িত মানবজাতির সঙ্গে খোলা রাস্তায় প্রতিবাদ মিছিলে শামিল হলাম, যার অনুভূতিটা সত্যিই অসাধারণ ছিল। আমরা প্লাকার্ড হাতে সুশৃঙ্খল সারিতে হাঁটছিলাম; কিন্তু অদূরে পাকিস্তানি অফিসের রাস্তার পুরো ট্রাফিক যাতে গতিরুদ্ধ হয়, সেটা বিশেষভাবে নির্দেশিত ছিল। চারদিকে অজস্র পুলিশ দেখে আমি ঢোক গিললাম; আমায় নিশ্চয় ওরা গ্রেফতার করবে। এটা আমার কাছে আশাতীত ছিল এবং আশঙ্কা ছিল, কোনো না কোনো আত্মীয় আমায় দেখে ফেলবে। আমার মা-বাবাকে জানিয়ে দেবে। কিন্তু আমায় হতাশ হতে হলো, কারণ তেমন উত্তেজনা কিছুই ঘটল না। নিষিদ্ধ দরজাগুলোর একশ গজের মধ্যে পুলিশের ব্যারিকেডে আমরা বাধাপ্রাপ্ত হলাম এবং ওইখানে বসে বসেই গলা ফাটিয়ে উত্তপ্ত স্লোগান দিতে নির্দেশ দেওয়া হলো আমাদের। এরই মধ্যে কিছু রক্তচাপবর্ধক মুহূর্ত তৈরি হয়েছিল, যখন কয়েকজন অসম সাহসী প্রতিবাদী হঠাৎ করেই লাফ দিয়ে উঠে পুলিশ ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টা করে। কিন্তু হায়! কড়া হাতের ধাক্কায় পিছিয়ে আসতে হয় তাদের, যার সঙ্গে কয়েক ঘা লাঠিও তাদের পিঠে পড়ে। এরপর দুপক্ষ থেকেই গালাগালির বন্যা বয়ে যেতে থাকে। আমার রক্তচাপ তরতর করে বেড়ে চলে। কিন্তু শশাঙ্ক আমায় শান্ত করে সঠিক মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করতে বলে। গাদা গাদা গরম গরম বক্তৃতা শুনতে হলো আর শেষমেষ এক ছোট আকারের প্রতিনিধিদলকে ভেতরে যেতে অনুমতি দেওয়া হয়েছিল, যারা পাকিস্তানি হাইকমিশনের পদাধিকারীদের হাতে তাদের আবেদনপত্রটি দিয়ে আসবে।’
২০ জানুয়ারি ছিল ৬৯’র গণআন্দোলনের মাইলফলক। এই তারিখের ঘটনায় বদলে যায় আন্দোলনের চরিত্র। কারণ ছয় দফার সঙ্গে তখন যুক্ত হয়েছে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফা। এইদিন বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়নের আসাদুজ্জামান গুলিতে মৃত্যুবরণ করেন। ফলে ২১,২২ ও ২৩ জানুয়ারি ঘোষণা হয় হরতালের। আসাদের গায়েবি জানাযাতে লক্ষ লক্ষ মানুষ ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে অংশগ্রহণ করে। আসাদের রক্ত মাখা শার্ট হাতে নিয়ে লক্ষাধিক মানুষ শহর প্রদক্ষিণ করে। মিছিলে অংশগ্রহণ করে ছাত্র-ছাত্রী, নারী, শ্রমিক, কর্মচারি, দোকানদার, আইনজীবী, রাজনৈতিক নেতাকর্মী সহ শিল্পী সাহিত্যিকরাও। ওইদিন গুলি বর্ষণে ছয় জন নিহত ও ১৪ জন আহত হয়। ২৪ তারিখে মানুষের ঢলে প্লাবিত হয় রাজপথ। পুলিশ, ইপিআর নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে সেনাবাহিনী তলব করা হয়। এই দিনটিকেই পরবর্তী সময়ে গণঅভূত্থান বলে অ্যাখ্যায়িত করা হয়। পরবর্তী সময়ে নিহত হন দশম শ্রেণির ছাত্র মতিউর রহমান। ঢাকা শহর নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। পশ্চিম পাকিস্তানেও আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। ফলে পাকিস্তানে সামরিকজান্তা নতিস্বীকারে বাধ্য হয়। ১ ফেব্রুয়ারি বেতার ভাষণে আইয়ুব খান বলে,‘শীঘ্রই আলাপ আলোচনার জন্য আমি রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিনিধিদের আমন্ত্রণ জানাবো।’ ১১ ফেব্রুয়ারি গ্রেফতারকৃত রাজবন্দিদের মুক্তি দেয়া হয় বিনাশর্তে। আওয়ামী লীগ জানিয়ে দেয় আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার এবং বঙ্গবন্ধুর মুক্তি ছাড়া বৈঠকে যোগ দেয়া হবে না। ১৬ ফেব্রুয়ারি সার্জেন্ট জহরুল হকের মৃত্যুর ঘটনায় ঘৃতাহুতি দেয়া হলো। দাউ দাউ করে জ¦লে উঠলো ঢাকা শহর। ১৭ ফেব্রুয়ারি সারাদেশে পূর্ণ হরতাল পালিত হলো। ১৮ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. শামসুজ্জোহাকে বিশ^বিদ্যালয় গেটের সামনে পাকিস্তানি সেনারা বেয়নেট চার্চ করে নির্মমভাবে হত্যা করলো। একই দিন সোনাদিঘির পাড়ে নিহত হন ছাত্র নূরুল ইসলাম। ঢাকায় কারফিউ উপেক্ষা করে মুক্তিপাগল মানুষ সেনাবাহিনীর বুলেটের সামনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। নির্বিচারে গুলি চালায় সেনাবাহিনী, পিছপা হয়নি জনতা। ২০ ফেব্রুয়ারি শাসক গোষ্ঠী প্রস্তাব দিলো গোলটেবিল বৈঠকের, বঙ্গবন্ধু প্যারোলে মুক্তি নিতে অস্বীকৃতি জানান। শাসক গোষ্ঠী বাধ্য হলো আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করে সকল অভিযুক্তদের বিনাশর্তে মুক্তি দিতে। মুক্তিলাভ করেই বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করলেন,‘ সংগ্রামী ছাত্ররা যে ১১ দফা দিয়েছেন তার প্রতি আমারও সমর্থন রহিলো। কারণ ১১ দফার মধ্যে আমার দলের ৬ দফার রূপরেখাও রয়েছে।’ ২৩ ফেব্রুয়ারি ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে তাকে বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত করা হলো।
জনতা গণঅভ্যুত্থানে যে স্লোগান দিয়েছিল, ‘জেলের তালা ভাঙবো, শেখ মুজিবকে আনবো।’ সেই স্লোগানকে রক্ত দিয়ে বাস্তবায়ন করলো জনতাই। বঙ্গবন্ধু জনতার রক্তের দান কোনোদিন ভুলেন নি। মুক্তি সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর তাই তিনি বার বার বলেছেন মানুষের রক্তের ঋণ আমি শোধ করবই। তাদের রক্তের সাথে আমি বেঈমানি করবো না। তার এই প্রতিজ্ঞা তিনি নিজের রক্ত দিয়ে প্রমাণ করেছেন এই বাংলার মাটিতেই।