গতিশীল উন্নয়নের জাতীয় বাজেট ‘জনপ্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটেছে’

আপডেট: জুন ৯, ২০২২, ১১:৫৮ অপরাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক:


বিশ্ব মহামারী করোনার কষাঘাত পেরিয়ে ঘুড়ে দাঁড়ানোর বাজেট সংসদে পেশ হয়েছে। জাতীয় সংসদে ২০২২-২৩ অর্থবছরের জন্য ৬ লাখ ৭৮ হাজার ৬৪ কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপন করেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে স্বাধীন বাংলাদেশের ৫১তম বাজেট নিয়ে আশাবাদী রাজশাহীবাসী।
‘কোভিডের অভিঘাত পেরিয়ে উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় প্রত্যাবর্তন’ শিরোনামের এই বাজেটকে জনপ্রত্যাশিত বাজেট হিসেবে দেখছেন নগর আওয়ামী লীগ ও সুশীল সামাজের প্রতিনিধিরা।

তবে বিরোধী দলীয় নেতারা মনে করেন, উচ্চাভিলাসী এই বাজেট কখনোই জনপ্রত্যাশিত হতে পারে না। বাজেট নিয়ে বিভিন্ন রাজনীতির দল, ব্যবসায়ী সংগঠন ও রাজশাহী বিশ্ব বিদ্যালয়ের শিক্ষকের প্রতিক্রিয়া নিচে উপস্থাপন করা হলো।

নগর আওয়ামী লীগের (ভারপ্রাপ্ত) সভাপতি মোহাম্মদ আলী কামাল জানান, এই বাজেট অবশ্যই একটি ভালো বাজেট। উচ্চ আকাঙ্খা না থাকলে, স্বপ্ন না দেখতে জানলে মানুষ কখনো বড় হতে পারে না। তেমনি উচ্চ আকাঙ্খা নিয়ে বাজেট না করলে দেশের উন্নয়ন হবে না। এই বাজেটে একটা টার্গেট ফিক্সড করা হয়েছে। জনকল্যাণকে সামনে রেখে এই টার্গেট। এখানে অর্থ বিষয় না। টার্গেট ফিক্সড হলে অর্থ চলে আসবে।

তিনি বলেন, বিরোধী দলে যারা আছেন তারা পদ্মা সেতুকেও উচ্চভিলাসী বলে সমালোচনা করেছেন। সেই পদ্মা সেতু কি আজ দৃশ্যমান হয় নি? তাদের কাজই সমালোচনা করা। তবে জাতীয় স্বার্থে কিছু বিষয়ে ঐক্যমত পোষণ করা প্রয়োজন। এই বাজেট অবশ্যই জনপ্রত্যাশিত ও জন উন্নয়নের বাজেট।

রাজশাহী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মাসুদুর রহমান টিংকু বলেন, ২০৪১ সালের মধ্যে সমৃদ্ধ দেশ গড়ার যে লক্ষ্য সেই টার্গেটকে সামনে রেখে এই বাজেট করা হয়েছে। ৬ লাখ ৭৮ হাজার ৬৪ কোটি টাকার এই বৃহৎ বাজেট দৃঢ় সময়োপযোগী সাহসী পদক্ষেপ। এই বাজেটকে আমি সাধুবাদ জানাই। এটি একটি সুদূর প্রসারী চেতনা সমৃদ্ধ বাজেট।

তিনি বলেন, ৭.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যকে সামনে রেখে প্রস্তাবিত এবারের বাজেটে রাজশাহী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির প্রস্তাবিত বিষয়গুলোর প্রতিফলন থাকছে। দেশকে উন্নয়নের ধারায় ফিরিয়ে আনার জন্য কৃষি, খাদ্য, নতুন কর্মসংস্থান সৃজন, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় আনা, রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট সংকট মোকাবিলা করে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং ভর্তুকির চাপ সামাল দেওয়াসহ শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া সরকারের উন্নয়নের সদ্বিচ্ছার বহিঃপ্রকাশ। আমরা আশাবাদী প্রধানমন্ত্রী তার উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় এ বাজেটের মাধ্যমে রাজশাহীকে অধিক গুরুত্ব দেবেন।

রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. আব্দুল ওয়াদুদ বলেন, বাজেট প্রতিবারই কিছু বৃদ্ধি পায়। সরকার প্রবৃদ্ধির হার ৭ শতাংশ করেছে। মুদ্রাস্ফতি ৫.৬ শতাংশ। কিন্তু আমরা দেখি বাজেট ঘোষণা হবার পর এই মানটা সরকার ধরে রাখতে পারে না। এগুলো অর্জন করতে পারলে অবশ্যই ভালো।

মানুষের জীবন যাত্রার ওপর চাপ পড়তো না। সরকার মুড়ি ও চিনির দাম কমানোর কথা বলেছে। কিন্তু নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য চাল, ডাল, লবণ তেলের কথা উল্লেখ করা নেই। এগুলোর বিষয়েও উল্লেখ থাকতে পারতো। এছাড়া সরকার করপোরেট ট্যাক্স কমিয়েছে। ব্যবসায়ীরা লাভবান হবে। জনগণ আদৌ কি এর সুবিধা পাবে কি না প্রশ্ন থেকেই যায়। শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতকে এক সঙ্গে দেখিয়ে বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে। এই দুটো সেক্টর আলাদা করে বাজেট ঘোষণা করা উচিত ছিলো।

তিনি বলেন, আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশের কথা বলছি। দেশকে ডিজিটাল ধারায় এগিয়ে নিতে হলে ডিজিটাল পণ্যের দাম বাড়ালে তো হবে না। কিন্তু বাজেটে সকল ধরণের ডিজিটাল পণ্যের দাম বাড়ানো হয়েছে। বেকারত্ব দেশের বড় সমস্যা। কিন্তু কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে কি কি পদক্ষেপ নেয়া হবে সেই বিষয়ে আরও সু-স্পষ্ট করা উচিত ছিলো।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক আব্দুর রশীদ কবির লিখন বলেন, বাজেটের পরিমাণ নিয়ে অনেকের মনে প্রশ্ন থাকতে পারে। অনেকে ভাববে এত বড় বাজেট কেন করা হলো। করোনা পরবর্তীতে অর্থনীতিকে সচল রাখতে বাজেটের পরিল্পনায় বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করা হয়েছে। করোনার পর আমাদের আরেকটি চ্যালেঞ্জ এসে দাঁড়িয়েছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। যার কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরণের প্রভাব পড়েছে।

আমাদের দেশের অর্থনীতিও এর দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে। এখান থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের বড় শিল্পের দিকে না গিয়ে ছোট ছোট শিল্পের দিকে নজর দিতে হবে। ছোট ছোট বাণিজ্যগুলোকে আরও বেশি প্রণোদনা দিতে হবে। কৃষির বহুমূখীকরণ হয়েছে। কৃষিতে আরও সু-নজরে রাখতে হবে।

তিনি আরও বলেন, মুদ্রাস্ফতি একটি চ্যালেঞ্জ। সরকারের এটি বাজেটের মধ্যে রয়েছে। বাজেট একটি ডিসিপ্লিন। সরকারকে এটি ধরে রাখার পাশাপাশি দীর্ঘ মেয়াদী শিল্পের যে ঋণ এবং ব্যাংকিং খাতকে আরও সু-শৃঙ্খল করতে যে সকল প্রতিষ্ঠান রয়েছে সেগুলোর সহযোগীতায় বিদেশে পাচারকৃত অর্থ ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

আরও কিছু বিকল্প ভাবনার মধ্যদিয়ে আমার মনে হয় শেয়ার বাজারকে ব্যবহার করে সেচ প্রকল্প তথা আমাদের উত্তর রাজশাহীর তিস্তা সেচ প্রকল্পের অর্থায়নও কাজে লাগাতে পারি। এর মাধ্যমে আমরা ডামস্টিক ফইনান্সিং করতে পারি। একবার এই দৃষ্টান্ত স্থাপন হয়ে গেলে এটি ল্যান্ড মার্ক হয়ে থাকবে।

ওয়ার্কাস পার্টির মহানগর সভাপতি লিয়াকত আলী লিকু বলেন, উচ্চভিলাসী বাজেট শেষে সাধারণ মানুষের ভাগ্যের উপরেই আচড়ে পড়ে। দেশে উন্নয়ন আছে। তবে জনপ্রত্যাশার উন্নয়ন ভিন্ন। করোনার পর যখন দেশে আকাল পড়েছে, দেশের অর্থনীতিতে সংকট রয়েছে। সে সময় এমন বাজেট জনপ্রত্যাশিত বাজেট হতে পারে না।

বাজেটে জবাবদিহিতার কোন জায়গা নাই। জনপ্রশাসনে বড় বরাদ্দ ও শিক্ষা-স্বাস্থ্যের নগণ্য বাজেট দেখেই বোঝা যায় বাজেট কেমন। আর কালো টাকা অর্জনকারীদের শাস্তিমূলক ব্যবস্থার আওতায় না এনে সাদা করার সুযোগ দিয়ে লুটেরাদের প্রণোদনা দেয়া হচ্ছে। জনপ্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ এই বাজেট।

বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির ত্রাণ ও পুনর্বাসন বিষয়ক সহ-সম্পাদক এবং রাজশাহী মহানগর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট শফিকুল হক মিলন জানান, উচ্চভিলাসী দেশি-বিদেশি ঋণ নির্ভর এই বাজেট কখনোই জন প্রত্যাশিত হতে পারে না। বাজেটের ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৫ হাজার ৬৪ কোটি টাকা। বিপুল পরিমাণ এই ঘাটতি নিয়ে বাজেট কিভাবে জন প্রত্যাশিত হতে পারে। বাজেটে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। মূল্যস্ফীতি ধরা হয়েছে ৫ দশমিক ৬ শতাংশ। এটাও কি বাস্তবিক চিত্র?

তিনি বলেন, এই বাজেটে সরকার একটি বিষয় শিকার করেছে। তারা ক্ষমতায় থাকাকালীন বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার করা গেছে। যেই কালো সাদা করার রাস্তা সরকার ঠিক করছে। দুর্নীতিকে প্রশয় দিয়ে দুর্নীতিবাজদের প্রণোদনা দেয়া হচ্ছে। এরপরও যদি পাচার হওয়া অর্থ সরকার দেশে ফিরিয়ে আনতে পারে তবে এটা বাজেটের ইতিবাচক হবে। এছাড়া এই বাজেটের ইতিবাচকতা দেখি না।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ