গাছে গাছে ঝুলছে গুটি আম, উৎকণ্ঠায় চাষিরা

আপডেট: এপ্রিল ২৪, ২০২০, ১২:০৪ পূর্বাহ্ণ

আমানুল হক আমান, বাঘা ও সাজেদুল হক সাজু, চাঁপাইনবাবগঞ্জ


গাছে গাছে ঝুলছে গুটি আম, উৎকণ্ঠায় চাষিরা

দেশে বাড়ছে করোনা ভাইরাসের আক্রান্তের সংখ্যা, বাড়ছে সাধারণ ছুটি, চলছে লোকডাউন। এরমধ্যে দিয়ে প্রকৃতির নিয়মে গাছে গাছে বড় হচ্ছে গুটি আমের আকৃতি। সেইসাথে অন্য মৌসুমের চেয়ে আশানুরূপ মুকুল না আসা ও কালবৈশাখী ঝড়ের আশঙ্কা। এসব নিয়ে সামনে আমের বাজারজাতকরণ নিয়ে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায় রয়েছেন রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার আমচাষিরা। কারণ প্রত্যেক মৌসুমেই এই ফলের উপর নির্ভর করে দুই জেলার অর্থনৈতিক কর্মকা-।
রাজশাহী কৃষি-সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্র জানায়, চলতি মৌসুমে রাজশাহী জেলায় আম চাষ হয়েছে ১৭ হাজার ৫৭৪ হেক্টর জমিতে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২ লাখ ৯৩ হাজার ৭৮ মেট্রিক টন। এরমধ্যে বাঘা উপজেলায় ৮ হাজার ৩৬৮ হেক্টর জমিতে আমবাগান রয়েছে। এ বছর বাগানে আম কম থাকায় উৎপাদন ধরা হয়েছে হেক্টর প্রতি ৬ থেকে ৭ মেট্রিক টন। গত বছর রাজশাহী জেলায় আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ লাখ ১৩ হাজার ৪২৬ মেট্রিক টন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, এ বছর জেলায় আম চাষের জমির পরিমাণ ৩৩ হাজার ৩৫ হেক্টর। গত বছর ছিল ৩১ হাজার ৮২০ হেক্টর এবং গাছের সংখ্যা প্রায় ২৫ লাখ ৩৯ হাজার ৬৩০।
আমচাষিদের ভাষ্য অনুযায়ী, আমের গাছগুলোতে এখন গুটি এসেছে। সঠিক পরিচর্যার মাধ্যমে যেটুকু ফলনের আশা করেছিলেন চাষিরা তাতেও পড়ছে প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসের নেতিবাচক প্রভাব। জেলায় লকডাউনের কারণে কৃষি উপকরণ, কীটনাশক ও শ্রমিক সংকট এরই মধ্যে প্রকট আকার ধারণ করেছে। ফলে আমের যতœ নিতে বেগ পোহাতে হচ্ছে তাদের। এছাড়াও লকডাউন চললেও কৃষি উপকরণ সরবরাহ চালু রাখার নির্দেশনা দিয়েছে সরকার। কিন্তু অন্য দোকানের পাশাপাশি সার-কীটনাশকের দোকানও বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। তবে দেন-দরবার করে কীটনাশক ও সার মিললেও তা অপ্রতুল। এছাড়া লকডাউন থাকায় রাজশাহীতে মিলছে না শ্রমিক।
রাজশাহীর পবা উপজেলার কর্ণহার গ্রামের আমচাষি সুরমান আলী জানান, ব্যাপক হারে আমের গুটি ঝরে পড়ছে। একটু বড় হয়ে ওঠা গুটিতে ছত্রাক লেগে খসে পড়ছে, গাছে পোকাও খুব। তাই বাজারে কীটনাশক পাচ্ছি না। কীটনাশকের দোকান বন্ধ করে দিয়েছে প্রশাসন। পরিচিত দোকানিকে অনুরোধ করে অল্প কিছু কীটনাশক কিনেছি। আমারবাগানের তুলনায় তা অনেক কম। স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তাদের জানালেও তারা কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছেন না।
রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার জামিরা গ্রামের আমচাষি মহির উদ্দিন বলেন, গাছ থেকে ব্যাপক হারে গুটি ঝরে যাচ্ছে। বাগানে সেচ দিচ্ছি, সারও দিয়েছি। কিন্তু লকডাউনের মধ্যে এখন বাগানে স্প্রে করার জন্য শ্রমিক মিলছে না। অথচ বর্তমানে অন্তত ১৫ জন শ্রমিক প্রয়োজন ছিল। তাই নিজে এবং ভাইদের নিয়ে বাগানের পরিচর্যার কাজ যতটুকু পারছি, করছি। কিছু করার নেই।
রাজশাহী ফল গবেষণা কেন্দ্রের গবেষক ড. আলীম উদ্দিন বলেন, প্রতিকূল আবহাওয়ার সময় পরিচর্যা বেশি প্রয়োজন। এখন গুটি ও পাতায় স্প্রে এবং গোড়ায় সার, পানি দিতে হবে। তিনি আরও বলেন, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, সার-কীটনাশকসহ সব কৃষি উপকরণ সরবরাহ নিশ্চিত রাখার কথা। চাষিরা আমাদের ফোন করে এসবের অপ্রতুলতার বিষয়ে অভিযোগ করছেন। বর্তমানে স্থানীয় প্রশাসনকে বিষয়টি জানানোর জন্য আমরা চাষিদের পরামর্শ দিচ্ছি।
রাজশাহী কৃষি-সম্প্রসারণ অধিদফতরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক উম্মে সালমা বলেন, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে যদি কেউ সার-কীটনাশক না পেয়ে থাকেন, তবে স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তা বা জেলা অফিসেও মোবাইলে যোগাযোগ করতে পারেন। আমরা কৃষি উপকরণ নিশ্চিত করবো।
বাঘা উপজেলার আমোদপুর গ্রামের আমচাষি আকবর আলী বলেন, করোনা ভাইরাস শুরু হওয়ার আগে আমার ৬ বিঘা জমির উপর আমবাগানের দাম বলেছিল এক লাখ ৮০ হাজার টাকা। বর্তমানে এই বাগান এক লাখ টাকাতে নিতে চাচ্ছে না। ফলে এ মৌসুমে আম নিয়ে কী হবে ভেবে পাচ্ছিনা। আম নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।
আড়ানীর আমচাষি বাদশা আহম্মেদ জানান, গত দুই বছর কিছু অসাধু ব্যাবসায়ীর কারণে সরকারিভাবে সময় বেঁধে আমপাড়া শুরু হয় এবং বাজারমূল্য ভাল না পাওয়ায় আমের সাথে সম্পৃক্তরা আর্থিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চলতি মৌসুমে আমের উৎপাদন তুলনামূলক কম হয়েছে। ফলে বাজারমূল্য ভাল হওয়ার কথা। কিন্তু করোনা ভাইরাসের কারণে সে আশা ভেস্তে যেতে বসেছে।
বাঘা উপজেলার মনিগ্রামের আম চাষি জিল্লুর রহমান জানান, শতাধিক বিঘার আমবাগান লিজ নিয়ে চাষ করেছি। গাছে যথেষ্ট আম আছে। মহামারি করোনাভাইরাস নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি। আমপাড়া শুরু হওয়ার আগে এই মহামারি স্বাভাবিক না হলে অনেক ব্যবসায়ী ও চাাষির পথে বসতে হবে। আবার সামনে যে কোনো সময়ে কালবৈশাখী ঝড়ের ভয় আছে।
বাঘা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শফিউল্লাহ সুলতান জানান, এক বছর গাছে ভাল আম হলে অন্য বছর কম হয়। পরপর দুই বছর প্রচুর পরিমাণ আম উৎপাদন হয়েছে। সেই তুলনায় এ বছর গাছে আম কম রয়েছে। মহামারি করোনা ভাইরাস কেটে গেলে আশা করছি চাষিরা ভাল দাম পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে করোনা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন সবাই।
এদিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার মহারাজপুর, পৌর এলাকার উপরাজারামপুর, শিবগঞ্জ উপজেলার কানসাট, মনাকষা, শাহাবাজপুরের বেশ কয়েকটি বাগান ঘুরে দেখা যায়, আমের গুটি অনেকটাই বড় হয়ে গেছে।
মনাকষা ইউনিয়নের আম ব্যবসায়ী সফিকুল ইসলাম জানান, চলতি বছর গাছে গাছে পর্যাপ্ত আম না হলেও আমের বাজার নিয়ে শঙ্কার মধ্যে আছে বাগান মালিকরা। কারণ হিসাবে তিনি উল্লেখ্য করেন, সরকারি সাধারন ছুটি বৃদ্ধি হলে আমের বাজার ধরে রাখা সম্ভব হবে না। সেক্ষেত্রে বাগান মালিক ও আম ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
কানসাট আম আড়তদার সমিতির সভাপতি কাজী এমদাদ বলেন, আম বাজারজাতকরণে আমাদের প্রস্তুতি ভালোই রয়েছে। তবে করোনাভাইরাসের জন্য আমের বাজার কী হবে তা এমুহূর্তে বলা যাচ্ছে না।
চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়নের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা আহমেদ আবু আলামিন বলেন, এবার চর অঞ্চলে ছোট গাছগুলোতে অনেক আম এসেছে। আশা করছি আমের উৎপাদন ভালোই হবে।
ছত্রাজিতপুর ইউনিয়নের আমবাগান মালিক হারুন অর রশীদ জানান, চলতি বছর মুকুল ফোটানোর সময় ফাল্গুনের বৃষ্টিতে মুকুলের প্রচুর ক্ষতি হলেও আশানুরূপ গুটি আমবাগানে রয়েছে। কোনো প্রাকৃতিক দূর্যোগ না হলে আমের ফলন ভালোই হবে। আর এখন পর্যন্ত পোকার আক্রমণ ঠেকাতে আগাম আমগাছ স্প্রে করা হচ্ছে। করোনা ভাইরাসের জন্য আমের বাজার নিয়ে আম ব্যবসায়ীদের মাঝে হতাশা নেমে এসেছে। কারণ সাধারন ছুটি আর কত দিন থাকবে?
চাঁপাইনবাবগঞ্জের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মো. নজরুল ইসলাম জানান, সবকিছু মিলিয়েই ভালো ফলনের আশা করা যাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, এবছর ২ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।
আম বাজারজাতকরণ প্রসঙ্গে কৃষিবিদ নজরুল ইসলাম বলেন, আম ব্যবসায়ী ও বাগান মালিকদের আমরা আশ্বস্ত করেছি তাদের আমের বাজার নিয়ে সকল ধরনের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছেÑসেক্ষেত্রে আম বিক্রয় ও চালানে কোনো অসুবিধা হবে না।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. জমিরুদ্দীন আহম্মদ জানান, ভালো মানের আম উৎপাদনে আমচাষিরা যাতে কোনো সমস্যায় না পড়েন সেদিক বিবেচনা করে বাগান ঘুরে চাষিদের পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ