গান্ধীজির নীতি

আপডেট: জুলাই ২৭, ২০১৭, ১২:৫১ পূর্বাহ্ণ

শুভ্রারানী চন্দ


গান্ধীজির প্রকৃত নাম মোহন দাস করমচাঁদ গান্ধী। জন্ম ১৮৬৯ সালের ২ অক্টোবর তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের গুজরাটের পোরবন্দরে। ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনে লেখা পড়া করেন। সহধর্মিনী কস্তুরবা গান্ধী। চার পুত্র সন্তানের জনক ছিলেন তিনি। প্রতিহিংসাজনিত হত্যাকা-ের শিকার হন তিনি ৩০ জানুয়ারি ১৯৪০ সালে।
গান্ধীজির বিশ্বাস বা তাঁর মতবাদ ‘গান্ধীবাদ’ নামে পরিচিত। গান্ধীবাদের মূল নীতিগুলো হচ্ছেÑ
১. সত্য, ২. অহিংসা, ৩. নিরামিষভোজন, ৪. ব্রহ্মচর্য, ৫. বিশ্বাস, ৬. সরলতা
সত্যানুসন্ধানের জন্য গান্ধিজী তাঁর জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। মানুষ নিজের জীবনের ভুল থেকেই সত্যের সন্ধান পায়। মানুষ যদি নিজের কৃত ভুলের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করতে সক্ষম হন, তাহলে তিনি সত্যের সন্ধান পান। আর সত্যের সন্ধান পেলে নিজের জীবনের অন্ধকার ভয় ও নিরাপত্তাহীনতাকে কাটিয়ে ওঠা যায়।
অহিংসা পরম ধর্ম। অহিংসা মানুষের সাথে মানুষের আত্মিক বন্ধন দৃঢ় করে। হিংসা ধ্বংসাত্মক পরিণতির দিকে নিয়ে যায় মানুষকে, সভ্যতার অগ্রযাত্রাকে স্তব্ধ করে দেয়। অহিংসা সাময়িকভাবে কাউকে বিব্রত বা ক্ষতিগ্রস্ত করলেও পুরো বিশ্বের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, শেষ পর্যন্ত অহিংসা ও ভালোবাসারই জয় হয়েছে সর্বত্র। সুতরাং, হিংসা পরিত্যাগ করা সব মানুষের অবশ্য পালনীয় কাজ।
আমরা জানি, মানুষের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা অনেকটাই নির্ভর করে খাদ্যাভ্যাসের ওপরে। নিরামিষ ভোজনে শরীর ও মন প্রশান্ত থাকে। তাঁর মতে মুখকে নিয়ন্ত্রণ করা অর্থাৎ খাদ্যাভ্যাসকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে আত্মসংযম সম্ভব নয়। লন্ডনে অধ্যয়নকালে তিনি নিরামিষ খেতেন। দেশে ফিরে তিনি নিরামিষ ভোজনের পক্ষে মত তৈরির চেষ্টা করেন। তাঁর সময়ে অনেক ভারতীয়ের আয় অনেক কম ছিল। তিনি মনে করতেন, নিরামিষ ভোজনে একদিকে শরীরের চাহিদা পূরণ হয় এবং অন্যদিকে মাছ, মাংস খেতে যত অর্থ ব্যয় হয়, নিরামিষে তা অনেক কম হয়। ফলে তাঁর সময়ে নিরামিষ ভোজন শুধুমাত্র আন্দোলন না থেকে বাস্তবে রূপ নেয়।
গান্ধীজির মতে, ব্রহ্মচর্য মানে, ‘চিন্তা, বাক্য ও কর্মের নিয়ন্ত্রণ’। কোন খারাপ চিন্তা না করা, কারো সম্পর্কে খারাপ ভাবনা না করা, কাউকে কটু কথা বা খারাপ কথা না বলা এবং কথার দ্বারা কারো দুঃখ বা মনোকষ্টের কারণ না হওয়া ব্রহ্মচর্যের আদর্শ। কাজ করা মানুষের অবশ্য পালনীয় ধর্ম। কিন্তু সব কাজের সময় নির্ধারিত থাকা উচিৎ। যদি তা না থাকে তাহলে অনিয়ন্ত্রিত কাজের ফলে জীবনে নিজের বা অন্যের অনেক বড় ক্ষতি হতে পারে- যা সারা জীবন অনুশোচনা করলেও আর ফেরত পাওয়া যায় না। সুতরাং, সংযমী হওয়া জীবনে সফল হবার অন্যতম চাবিকাঠি।
‘বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর’ অবিশ্বাস মানুষকে করুণ পরিণতির দিকে নিয়ে যায়। বিশ্বাস অবিশ্বাসের দোলাচলে মানুষের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়। মনের ভারসাম্য নষ্ট হয়। কোনো কিছুতে বিশ্বাস রাখতে না পারায় জীবনযুদ্ধে পরাজিত হতে হয়- প্রতিক্ষণে রক্তাক্ত হয় নিজের পবিত্র মন, যে যে ধর্মেরই হোক না কেন তার নিজের ধর্মে বিশ্বাস রাখা এবং সকল ধর্মের প্রতি সমান মনোভাব পোষণ করা একজন ভালো মানুষের কাজ।
গান্ধিজী সব ধর্ম নিয়ে পড়া-শুনা করেছেন এবং হিন্দুবাদ সম্পর্কে তিনি উক্তি করেছিলেন, ‘হিন্দুবাদ আমাকে পরিপূর্ণভাবে তৃপ্ত করে, আমার সম্পূর্ণ সত্তাকে পরিপূর্ণ করে। যখন সংশয় আমাকে আঘাত করে, যখন হতাশা আমার মুখের দিকে কড়া চোখে তাকায় এবং যখন দিগন্তে আমি একবিন্দু আলোও দেখতে পাইনা, তখন আমি ভগবত গীতার দিকে ফিরে তাকাই এবং নিজেকে শান্ত করার একটি পঙক্তি খুঁজে নিই; এবং আমি অনতিবিলম্বে অত্যধিক কষ্টের মধ্যেও হেসে উঠি। আমি ভগবত গীতার শিক্ষার কাছে কৃতজ্ঞ।’ তিনি বিশ্বাস করতেন, প্রতিটি ধর্মের মূলে আছে সত্য ও প্রেম। তিনি সব ধর্মের ভ-ামি, অপকর্ম ও অন্ধবিশ্বাসের বিপক্ষে থেকে সমাজ সংস্কারকের কাজ করে গেছেন। তিনি এত্ত বলেছেন “অসম্পৃক্ততা যদি হিন্দু ধর্মের অংশ হয় তাহলে তা পচা ও বর্জনীয়। নৈতিকতা হারিয়ে কখনো ধার্মিক হওয়া যায় না। যারা মিথ্যাবাদী, নির্মম ও আত্মসংযমহীন ঈশ্বর কখনো তাদের ভেতরে থাকতে পারেন না।
সরলতা না থাকলে মানুষ কখনো ব্রহ্মচর্যের পথে যেতে পারে না। যিনি মানুষের সেবা করতে চান তাঁকে হতে হবে সাদা মাটা। পোষাক-আশাক, চলনে-বলনে তিনি হবেন অতি সাধারণ মানুষ। সরলতার অর্থ অকপটতা। শুধু পোষাকে বা বাহ্যিক আচরণে সরলতা থাকলেই মানুষ সরল হয় না। চিন্তায়-চেতনায় ও কর্মে অবশ্যই সরলতার প্রতিফলন থাকতে হবে একজন ভালো মানুষের। যিনি অপ্রয়োজনীয় খরচ করেন না, সাধারণ জীবন যাপন করেন, নিজের কাজ নিজে করেন, যে কোনো বিষয় সাদা চোখে দেখেন, কোনো বিষয়কে অযথা জটিল করেন নাÑ তিনিই সরল। গান্ধীজী ছিলেন, সরলতার মূর্ত প্রতীক। তাঁর পোষাকই স্মরণ করিয়ে দেয় কতটা সাদামাটা জীবন তিনি যাপন করতেন। কর্মময় সংগ্রামী এ মানুষটি তাঁর জীবন উৎসর্গ করেছেন দেশ ও মানুষের মুক্তির জন্য। বিদেশি শাসক-শোষকের হাত থেকেই মুক্তি নয়, সব কলুষতা থেকে মানবমুক্তির কথাও তিনি বলেছেন। তিনি বিশ্বাস করতে ভোগে না, ভালোবাসায় আছে অপার আনন্দ।
আমরা গান্ধিজীর আদর্শকে সম্মান জানাই। প্রতিনিয়ত চেষ্টা করবো তাঁর মহান আদর্শকে লালন করে মানব কল্যাণে যতটুকু সম্ভব করবার।