গান্ধীর মতোই মূল্য চুকিয়ে সত্যের জন্য লড়াই করতে হবে

আপডেট: সেপ্টেম্বর ২৫, ২০১৭, ১২:৪৬ পূর্বাহ্ণ

সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত


ভারতের লোকসভা নির্বাচন যতই এগিয়ে আসছে, কংগ্রেস ততই মোদি সরকারের ব্যর্থতা, অসত্য ভাষণ এবং সাম্প্রদায়িক নীতিকে একটার পর একটা চ্যালেঞ্জ করে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে কংগ্রেস জননেত্রী সোনিয়া গান্ধী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে একটি চিঠি দিয়ে দাবি করেছেন, ২০১০ সালে কংগ্রেস যখন ক্ষমতায় ছিল, তখন রাজ্য সভায় সংসদ বিধানসভা এবং বিধান পরিষদে এক তৃতীয়াংশ আসন নারী প্রার্থীদের জন্য বিল পাশ করিয়েছে। অথচ প্রায় পৌনে চার বছর ক্ষমতায় থাকালীন বিজেপি তথা সঙ্ঘ পরিবার লোকসভায় বিলটি পাশ করাতে ইতস্তত করছে। কেন ইতস্তত করছে, সে ব্যাপারটা সঙ্ঘ পরিবারই জানে। কিন্তু দেশের মানুষ চাইছে লোকসভায় বিলটি আগামী নভেম্বরের অধিবেশনেই পাশ করানো হোক। এমনকী বর্তমান উপরাষ্ট্রপ্রতি (রাজ্যসভার চেয়ারম্যান) বেঙ্কাইয়া নাইডু যখন মন্ত্রী ছিলেন তখন লোকসভায় দাঁড়িয়ে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, বিলটি পাশ করানো হবে।
প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য সোনিয়া গান্ধীর প্রয়াত স্বামী রাজীব গান্ধী যখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, তখন তিনি পঞ্চায়েত, জেলা-পরিষদ এবং পুরসভাগুলিতে এক তৃতীয়াংশ নারীদের জন্য সংরক্ষিত করে গিয়েছিলেন। শুধু তই নয়, তিনি ভোটাধিকারের বয়স ২৫ থেকে কমিয়ে ১৮ করে গিয়েছিলেন। এই দুটি বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত নেয়ার ফলে সারা দেশে নারীদের হাতে প্রচুর ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। কিন্তু লোকসভায় বিলটি পাশ করানোর বিজেপির আপত্তির প্রধান কারণ হল, বিজেপি নিজেই এত নারী প্রার্থী দিতে পারবে না। ইতোমধ্যে আমেরিকায় হার্ভাডসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে রাহুল গান্ধী ভারতের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে মন্তব্য করেছেন, সে মন্তব্য ঘিরে বিজেপি ও গেরুয়া বাহিনী রাহুল বিরোধী লম্ফঝম্প শুরু করুক না কেন, ভারতের সমস্ত মিডিয়া রাহুলের সফর এবং মন্তব্যকে ১৬ আনা সমর্থন করেছে। শনিবার ইংরাজি স্টেটসম্যান পত্রিকায় প্রাক্তন সম্পাদক সুনন্দদত্ত রায় টেলিগ্রাফে একটি নিবন্ধে বলেছেন, রাজনীতি এবং ব্যবসায় বংশপরম্পরা রক্ষার চল সারা পৃথিবীতে রয়েছে। আনন্দবাজার পত্রিকার প্রথম সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে আমেরিকায় অত্যন্ত শাণিত ভঙ্গিতে মোদি সরকারকে তুলোধনা করেছেন রাহুল গান্ধী। অথচ তা করতে গিয়ে কোথাও তিনি শালীনতায় মাত্রা অতিক্রম করেনি। বিজেপির আপত্তি ছিল বিদেশের মাটিতে রাহুলের সমালোচনা করা নিয়ে। কিন্তু দেশ চালাতে গিয়ে মোদি যা করছেন, রাহুল কেবল তার সমালোচনাই করেছেন।
লোকসভায় নারী সংরক্ষণ বিল পাশ করাতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে চিঠি দিলেন কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী। ওই চিঠিতে তিনি জানিয়েছেন, লোকসভায় বিলটি পেশ করলে কংগ্রেস সমর্থন জানাবে। সোনিয়ার লেখা চিঠিটি প্রকাশ করেন দলের নারী সংগঠনের প্রধান সুস্মিতা দেব। তিনি মোদিকে প্রশ্ন করেছেন, তিন বছর পরেও বিলটি পাশ করাতে এত দেরি হচ্ছে কেন?
রাজ্যসভায় নারী সংরক্ষণ বিলটি পাশ হয় ২০১০ সালের ৯ মার্চ। কিন্তু এখনও পর্যন্ত বিলটি লোকসভায় পাশ করানো হয়নি। কেন্দ্রের পক্ষ থেকে বারবার বিলটি পাশ না করানোর অজুহাত হিসেবে বলা হয়েছে, ঐকমত্যের ভিত্তিতে বিলটি পাশ করানো হবে। কিন্তু ঐকমত্য গঠনের কোনো উদ্যোগও কেন্দ্রীয় সরকার নেয়নি।
সারা ভারত গণতান্ত্রিক মহিলা সমিতিসহ বামপন্থী নারী সংগঠনটি বারবার জানিয়েছে, দেশের কোনো নীতি, আইন তৈরির ক্ষেত্রে ঐকমত্যের পরোয়া করেনি সরকার। স্বাভাবিক সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরেই একের পর এক বিল পাশ করানো হয়েছে। তাহলে নারীদের সংরক্ষণের জন্যই কেন ঐকমত্যের প্রয়োজন হবে?
গত শুক্রবার সুস্মিতা দেব সোনিয়া গান্ধীর চিঠিটির অংশ প্রকাশ করেছেন। সোনিয়া লিখেছেন- লোকসভায় বিজেপি’র সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। এই গরিষ্ঠতার জোরেই লোকসভায় সরকার বিলটি পাশ করাক। দেশে নারীদের ক্ষমতায়নকে এই পদক্ষেপ আরো অনেকটা এগিয়ে দেবে। সুস্মিতা দেব অভিযোগ করে বলেন, লোকসভায় বিলটি পাশ করানো সুনিশ্চিত করছে না কেন সরকার? নারী বিল পাশ করানো নিয়ে দায়বদ্ধতার কথা তো মোদি সরকারই বলেছি। সংসদীয় মন্ত্রী থাকাকালীন বেঙ্কাইয়া নাইডু আশ্বাস দিয়ে বলেছিলেন, বিলটি দ্রুত পাশ করানোর ব্যাপারে চিন্তাভাবনা করছে সরকার।
বিদেশের মাটিতে ভারতীয়দের মধ্যে নরেন্দ্র মোদির জনপ্রিয়তা এবার ভাগ বসিয়ে এলেন কংগ্রেসের সহসভাপতি রাহুল গান্ধী। সপ্তাহের মাঝখানে কাজের দিনে নিউইয়র্কের টাইমস স্কোয়ারে রাহুলকে ঘিরে যেভাবে সেলফি তোলার ধুম পড়েছিল, তাতে নরেন্দ্র মোদির চিন্তিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল। রাহুলকে ঘিরে মুহূর্মুহ জিন্দাবাদ ধ্বনি উঠতে থাকে। এতদিন পর্যন্ত আরএসএস-বিজেপি দাবি করত, সনাতন ভারতের প্রতিনিধি তারাই। মার্কিন সফরের শেষ লগ্নে সে তত্ত্ব খারিজ করে রাহুল গান্ধী বলে এলেন, কংগ্রেস সংগঠন শতাব্দীপ্রাচীন হতে পারে, কিন্তু তার দর্শন হাজার হাজার বছরের প্রাচীন ভারতের। সহিষ্ণুতা, শান্তি, সম্প্রীতির বার্তা বহন করে তাঁর দল। মোদি জমানায় সেটাই নষ্ট হচ্ছে। তাঁর সফরসঙ্গী স্যাম পিত্রোদা বলেছেন, জনপ্রিয়তা ও জাতীয়তাবাদের নাম করে আসলে বিভাজন ছড়ানো হচ্ছে। সেটাই উদ্বেগের।
রাহুল গান্ধী সফরের প্রথম দিকে তাঁর কিছু মন্তব্য ঘিরে রে রে করে উঠেছিল বিজেপি। কিন্তু সফর যত এগিয়েছে, ততই তাঁর কৌশল বদলে ফেলেছেন রাহুল গান্ধী। নিউইয়র্কে প্রবাসী কংগ্রেসিদের অনুষ্ঠানে রাহুল বলেছেন, ডেমোক্র্যাট-রিপাবলিকানদের সঙ্গে দেখা করার আগেই তাঁদের প্রশ্নে আমি বিস্মিত। তাদের সিংহভাগই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ভারতের সহিষ্ণুতা ও সম্প্রীতির কী হল? এরপরেই রাহুল যোগ করেন, হাজার হাজার বছর ধরে ভারত বিশ্বকে সম্প্রীতির পথ দেখিয়েছে। আর এখন একটা শক্তি দেশে বিভাজন তৈরি করছে। এটা বিপজ্জনক। বিশ্বের দরবারে ভারতে বদনাম হচ্ছে। অনেক দেশই মনে করে হিংসার পরিবেশেও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের উত্তর হল ভারত। এই সম্পদকে আমরা হারিয়ে যেতে দিতে পারি না। কংগ্রেসকেই তা রক্ষা করতে হবে।
প্রতিপক্ষ যাই হোক, গান্ধীর মতোই মূল্য চুকিয়ে সত্যের জন্য লড়াই করতে হবে। প্রতিটি কথাতেই নরেন্দ্র মোদিকে বিঁধেছেন রাহুল।
লেখক: জেষ্ঠ্য সাংবাদিক, কলকাতা