গিরিশচন্দ্র সেনের ১১২তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

আপডেট: আগস্ট ১৫, ২০২২, ১২:৫৫ পূর্বাহ্ণ


নিজস্ব প্রতিবেদক:


সর্বপ্রথম বাংলা ভাষায় পবিত্র কোরআন শরিফ অনুবাদ করে চমক সৃষ্টি করেন গিরিশচন্দ্র সেন। নরসিংদীর এই কৃতী সন্তানের ১১২ তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ১৯১০ সালের এইদিনে তিনি ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। জন্ম নরসিংদী সদর উপজেলার পাঁচদোনার মেহেরপাড়ায়। এখানেই তার পৈত্রিক বাড়ি ও সমাধিস্থল।

গিরিশচন্দ্র সেন পাঁচদোনা দেওয়ান দর্পনারায়ণের বংশে ১৮৩৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মাধবরাম সেন। পিতামহ ইন্দ্রনারায়ণ সেনের ভাই দর্পনারায়ণ নবাব মুর্শিদ কুলি খাঁর দরবারের প্রভাবশালী অমাত্য ছিলেন। নবাব তাকে রায় উপাধি প্রদান করেন। হিন্দু পরিবার হলেও তাদের সুনাম-সুখ্যাতি বা প্রভাব প্রতিপত্তির কেন্দ্র বিন্দু ছিল আরবি-ফার্সি ভাষা সংশ্লিষ্ট পা-িত্য ও জ্ঞানে।

শৈশবেই গিরিশচন্দ্রের পিতৃবিয়োগ ঘটে। পিতার মৃত্যুর পর ১৮৪৬ সালে বড় দাদা ঈশ্চরচন্দ্র তাকে ঢাকার ঐতিহাসিক পোগোজ স্কুলে ভর্তি করে দেন। স্কুলে প্রধান শিক্ষকের বেত্রাঘাত দেখে গিরিশচন্দ্রের মন বিষিয়ে ওঠে। পরে তাকে আর স্কুলমুখো করানো যায়নি। এ সময়ে তিনি কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের সান্নিধ্যে আসেন এবং বিখ্যাত ফার্সি পুস্তকগুলো পাঠ শেষ করেন।

১৮৫২ সালে গিরিশচন্দ্র সেন ছোট দাদা হরচন্দ্র রায়ের সঙ্গে ময়মনসিংহে চলে যান। প্রকৃতপক্ষে এখানেই তিনি জীবন গড়ার সন্ধান লাভ করেন। বিখ্যাত ফার্সি পুস্তকগুলোর সঙ্গে ব্যাপক পরিচয় ঘটে তার। ১৮৫৩ সালে সংস্কৃতি পাঠশালায় ভর্তি হয়ে সংস্কৃতি ভাষায় ঋদ্ধ হন।

১৮৫৭ সালে ২২ বছর বয়সে যুবক গিরিশচন্দ্র সেন ৯ বছর বয়সের ব্রহ্মময়ী দেবীর সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। এরপর ময়মনসিংহের জেলা স্কুলে শিক্ষকতায় যোগ দেন। এ সময় তিনি প্রগস পত্রিকায় সংবাদ ও প্রবন্ধ লিখতেন। ১৮৭১ সালে সনাতন ধর্ম ত্যাগ করে ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে গিরিশচন্দ্র সেন ‘বন্ধু’ ও ‘মহিলা’ নামের দু’টি পত্রিকা সম্পাদনা করেন। মহিলা পত্রিকায় নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া নিয়মিত লিখতেন।

১৮৭৬ সালে ৪২ বছর বয়সে গিরিশচন্দ্র, লক্ষেœৗ যান। মৌলভী এহসান আলীর কাছে আরবি ব্যাকরণ শেখেন। এক বছর পর ঢাকা চলে আসেন। ১৮৭৮ সালে বন্ধু জালাল উদ্দিনের মাধ্যমে কোরআন শরিফ কিনে অধ্যয়ন আরম্ভ করেন। ৩ বছর কঠোর সাধনার পর ১৮৮১ সালে প্রথম পারা শেরপুর চারুচন্দ্র প্রেস থেকে প্রকাশিত হয়। পরে কোলকাতায় মাসিক কিস্তিতে মুদ্রিত হতে থাকে। পরবর্তী ২ বছর পর পুরো কোরআন মুদ্রিত হয়। তার পাশাপাশি অন্যান্য গ্রন্থও প্রকাশ হতে থাকে।

গিরিশচন্দ্রের প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ৩৩টি। তার মধ্যে বাংলায় পবিত্র কোরআনের অনুবাদসহ ইসলাম ধর্ম বিষয়ক গ্রন্থ ২২টি। রাত দিন পরিশ্রমের ফলে গিরিশচন্দ্র সেন অসুস্থ হয়ে পড়েন। ১৯০৯ সালে তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হন। পরের বছরই তিনি মারা যান। তার ইচ্ছানুযায়ী গ্রামের বাড়িতে শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।

গিরিশচন্দ্রের স্মৃতি বিজড়িত পৈত্রিক বাড়িটি এখন নিশ্চিহ্নের পথে। একমাত্র ঘর ছাড়া বাড়ির আশেপাশের সব জায়গা বিক্রি করে দিয়েছেন তার উত্তরসূরীরা। জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে তার শেষকৃত্যর স্থানটিও। স্থানীয় লোকজন ভুলতেই বসেছেন এ মহান ব্যক্তিটিকে।