গুপী-বাঘার অমর ¯্রষ্টা সত্যজিৎ রায় এর প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি

আপডেট: মে ৩, ২০১৭, ১২:৫৯ পূর্বাহ্ণ

ফিকসন ইসলাম



বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম প্রাণপুরুষ ও অমর স্রষ্টা সত্যজিৎ রায় এর জন্মদিন ছিল সোমবার। ২ মে ১৯২১ সালে তিনি জন্মেছিলেন। মাত্র ৯দিন আগে এই মহাপুরুষ চলচ্চিত্রকার এর ২৫তম প্রয়াণ দিবস ছিলো। ১৯৯২ সালের ২৩ এপ্রিল সত্যজিৎ রায় ইহলোক ত্যাগ করেন।
আমার জীবনের সবচেয়ে সেরা ঘটনা ও স্মৃতির একটি,  হলো- চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব সত্যজিৎ রায়ের সাক্ষাৎ পাওয়া। আজ থেকে ২৫ বছরের বেশি সময় আগে মানে যেদিন তিনি স্বর্গবাসী হয়েছেন ঠিক তার ১৬৭ দিন আগে সৌভাগ্যক্রমে বা নেহায়েত কপাল গুনে এই মানুষটির সাক্ষাৎ পেয়েছিলাম। জানি না ভাগ্য দেবতা আমার প্রতি সুপ্রসন্ন ছিলেন কিনা, তবে এটা বলবো আমার জীবনে এটি ছিল স্বপ্নেরই মত। সত্যজিৎ রায়ের মুখোমুখি হতে পারার পর আমি খানিকটা নির্বাক হয়ে পড়েছিলাম। নিজের শরীরে চিমটি কেটে পরখ করছিলাম, আমি সত্যি সত্যি বাস্তবে আছি নাকি এই কলকাতা শহরের হোটেলে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখছি।
তারিখটা ছিলো ৮ নভেম্বর, ১৯৯১। সপ্তাহ খানেক আগে ভারত বেড়াতে গেলাম। কোলকাতা জীবনের প্রথম দেখা। আমার মা’র কাছে কোলকাতার অনেক গল্প শুনেছি। মা বলতেন, যে কিনা কোলকাতা দেখেনি, সে নাকি মায়ের গর্ভেই আছে। ফলে মা যখন একথা বলেছেন, নিশ্চয় কোলকাতা না দেখলেই নয়। আর ভূপেন হাজারিকার কোলকাতা-এই আমাদের কোলকাতা হাত বাড়ালেই বন্ধু মেলে- প্রেমের কতকথা… গানটা শুনতে শুনতে একটা অন্যরকম আকর্ষণ হয়ে উঠেছিলো।
যেদিন বাবু সত্যজিৎ রায় এর সাথে আমার সাক্ষাৎ ঘটে বা তাঁকে দেখতে পেয়েছিলাম তার দিন তিনেক আগে কোলকাতা এসে পৌঁছেছিলাম। ট্রেনে শিয়ালদহ স্টেশনে নেমে কাছাকাছি একটা হোটেলে উঠেছিলাম। এবং পরের দুইদিন একরকম কোলকাতা শহর চষে বেড়িয়েছি। বিশেষ করে মেট্রোরেলে উঠে সকল স্টেশন ঘুরেছি। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল, এসপ্লানেও, গড়ের মাঠ, কোন কিছুই বাদ ছিলেনা। টাউন সার্ভিস আর ট্রামে করে বিভিন্ন এলাকা, দর্শনীয় স্থান ঘুরেছি। একদিন ট্রামে করে বেড়াচ্ছি। পাশে বসা এক যাত্রীর সাথে আলাপ হলো, তিনিও আমার মত চলচ্চিত্রের পাগল। তাঁর সাথে আলাপ হলো সত্যজিৎ রায় প্রসঙ্গে। ওই বছরেই সত্যজিৎ রায়ের শেষ ছবি ‘আগুন্তক’ মুক্তি পেয়েছে। এবং ‘গুপি বাঘা ফিরে এলো’ ছবির কাজ চলছে। ওই ছবিটি তাঁর সুযোগ্য পুত্র সন্দীপ রায় পরিচালনা করছিলেন। তবে নির্দেশনার পুরো বিষয়টি তিনি নিজেই দেখভাল করছিলেন। যাহোক, সত্যজিৎ রায়কে দু’চোখে দেখার একটা অভিপ্রায় পাশে বসা যাত্রীর (নাম-শ্যামলেন্দু ভট্রাচার্য) কাছে জানতে চাইলাম- আচ্ছা দাদা বলুনতো সত্যজিৎ রায়ের সাথে দেখা করবো- তাঁর দেখা পাওয়া কি সম্ভব? তিনি জানালেন, এটা খুব কঠিন কাজ। তিনি সচরাচর কারো সাথে সাক্ষাৎ করেন না, সাক্ষাৎকার দেন না। আমি বললাম, আমিতো বাংলাদেশ থেকে এসেছি। সাংবাদিকতা আমার নেশা, কিছুটা ফ্রিল্যান্স বলতে পারেন। তবুও দেখা পাবো না? তিনি মৃদু হেসে বললেন চেষ্টা করে দেখতে পারেন। আপনার ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলে পেয়ে যেতেও পারেন, চেষ্টা করতে দোষ কি? আমি কিন্তু তখনো জানি না, এই মহামানব কোথায় থাকেন, ঠিকানা কী? আমার অসহায়ত্ব দেখে ভদ্রলোক অবলীলায় আমাকে তাঁর বাড়ির ঠিকানাটা দিলেন, ৯, বিশপ লেপ্রয় রোড, দোতলায় থাকেন। কীভাবে যেতে হবে- সেটাও জানালেন, তাঁকে অশেষ ধন্যবাদ জানালাম।
রাতে হোটেলে ফিরে এসে ঘুম আসতে চাইছিলো না। কখন সকাল হবে। হাজির হবো তাঁর সামনে। পথের পাঁচালী আর গুপী বাঘার ¯্রষ্টা সত্যজিৎ রায় কে দেখতে পাবো? এসব ভাবতে ভাবতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি জানি না- সকাল ৭টার দিকে হোটেল বয় এর ডাকে ঘুম ভাঙলো। খুব তড়িঘড়ি করে, হালকা নাস্তা সেরে হোটেল থেকে বেরিয়ে পড়লাম। সত্যজিৎ রায় থাকতেন ‘নন্দন’ এর কাছাকাছি। গতকালের ভদ্রলোকের দেয়া ঠিকানানুযায়ী মেট্রো রেলে নিকটবর্তী স্টেশনে নেমে খানিকটা পায়ে হেঁটে পৌঁছে গেলাম কাক্সিক্ষত বিপশ লেপ্রয় রোডের  ৯ নম্বর বাড়ির কাছে। ভয়ে ভয়ে সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে কলিংবেল চাপ দিলাম। ভেতর থেকে কে? বলে এক মধ্যবয়সী নারী সম্ভবত কাজের মানুষ দরজা খুলে দিলেন। অনেকটা কাঁচুমাচু হয়ে তার কাছে আমার অভিপ্রায় ব্যক্ত করলাম। জানালাম, আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি-পেশায় সাংবাদিক, সত্যজিৎ রায় এর সাথে দেখা করতে এসেছি। আমি কি দেখা পাবো? নারী উত্তরে জানালেন, তিনি এখন ঘুমুচ্ছেন সকাল সাড়ে ৯টা নাগাদ আসুন। আপনার কথা বলে রাখবো। আমি যেন অনেক দূরে একটা শীর্ণ আলোর রেখা দেখতে পেলাম। সাড়ে ৯টা মানে তখনও প্রায় দেড় ঘণ্টা বাকী, অগত্যা এই সময়টুকু প্রিয় শহর, নান্দনিক শহর কোলকাতার পথে পথে ঘুরতে লাগলাম- আর অপেক্ষায় থাকলাম- সত্যি সত্যি তাঁর দেখা পাবোতো?
( চলবে)