গুপী-বাঘার অমর ¯্রষ্টা সত্যজিৎ রায় এর প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি

আপডেট: মে ৪, ২০১৭, ১২:১৪ পূর্বাহ্ণ

ফিকসন ইসলাম


(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
একসময়ে আমার জীবনে সেই মহেন্দ্রক্ষণ এলো। ঘড়ির কাঁটা তখন সাড়ে ৯টা ছুইছুই করছে। হাজির হয়ে গেলাম সেই বাড়ির দরজায়। এবার আর নিরাশ হতে হলো না। সেই নারীই দরজা খুলে বললেন, বসুন। এবং সোজা ড্রয়িংরুমের সোফাতে বসার জন্য ইঙ্গিত করলেন। আমি যেন আসমানের চাঁদ হাতে পাচ্ছি। খোদ সত্যজিৎ রায় এর বিশাল ড্রয়িংরুমে বসে অপেক্ষার পালা। কখন দেখা পাবো, এই বড়মাপের মানুষটির। খুব বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয়নি আমাকে। একটা ভারী-গলার আওয়াজ পেলাম পাশের ঘর থেকে। তিনি বললেন, কে আছেন? কে এসেছেন বাংলাদেশ থেকে ভেতরে আসুন… আমি খানিকটা থতমত খেয়ে উঠে দাঁড়ালাম, কিংকর্তব্যবিমুঢ়। দেখি তিনি পাশের ঘর থেকে আমাকে ডাকছেন। আমি দু হাত তুলে অভিবাদন জানালাম তাঁকে। তিনি প্রতুত্তর দিলেন এবং পার্শ্বের স্টাডি (পড়ালেখার জন্য পৃথক ঘর) তে নিয়ে গেলেন। ঘরটির চারদিকে আলমারি। কেবল বই আর বই। যেন বই এর সমুদ্র বলা ভুল হবে, মহাসমুদ্র। ৬ ফুটেরও বেশি লম্বা মানুষটির কাছে নিজেকে কেন জানি অসহায়ত্ব বোধ করছিলাম। ঠিক যেন গ্যালিভারের পাশে আমি লিলিপুট দাঁড়িয়ে আছি। আমাকে বসতে বলে তিনিও একটা চেয়ার টেনে বসলেন। আমার কাছে জানতে চাইলেন, কেন তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতে এসেছি? কোথায় বাড়ি, কী করা হয়- এসব প্রশ্ন একসাথে করলেন। আমিতো বাকরহিত হয়ে পড়েছি। ভয়ে ভয়ে উত্তর দিচ্ছি তাঁর কথার। আমি সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে যেন নিজেই সাক্ষাৎকার দিচ্ছি এই মানুষটির কাছে।
খুব বেশি সময় থাকা হয়নি। ঘড়ি দেখে মনে হয়েছে ৩০ থেকে ৩৫ মিনিট তাঁর সান্নিধ্যে ছিলাম। এক সময় চা ও বিস্কুট এলো। তিনি চা খেলেন না। খুব সম্ভবত এক গ্লাস চিরতার রস পান করলেন। অন্তত পক্ষে চেহারা দেখে তাই মনে হলো। এই অল্প সময়ে অনেক কথা হলো। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র নিয়ে, প্রয়াত আলমগীর কবির ও বেবী ইসলামের কথা উঠলো। জানালাম এই দুজনের ছাত্র হবার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। তিনি যেন খানিকটা অবাক হলেন। বললেন, আপনি তো একজন ইঞ্জিনিয়ার, তবে এসব সিনেমায় আপনার এত আগ্রহ কী করে হলো?। তাঁর কথার উত্তর দিলাম আমার মত করে। আলাপ হলো আগুন্তক ছবি নিয়ে। এ ছবিটা কদিন আগেই দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। তাঁকে বললাম, শাখা-প্রশাখা, পথের পাঁচালী, অপুট্রিলজী, গুপীগাইন বাঘা বাইন, পরশপাথর অনেক অনেক ছবি নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা হলো। এক পর্যায়ে গুপী বাঘা ফিরে এলো কবে নাগাদ দর্শকদের কাছে পৌঁছবে সেটাও জানলাম। তাঁর স্টুডিওতেই পটাপট কয়েকটা ছবি তুলে নিলাম। চা পর্ব শেষ হতেই তাঁর কাছে বিদায় চাইলাম। বুঝতে পারছিলাম তাঁর অনেক তাড়া আছে-কাজ আছে। তিনি স¯েœহে আমাকে বুকে জড়িয়ে আলিঙ্গন করলেন এবং সহাস্যে বিদায় জানালেন। আমি তাঁকে বাংলাদেশে আসার আমন্ত্রণ জানালাম। তিনি বললেন, ইদানীং শরীরটা ভাল যাচ্ছে না। দুজনে হাঁটতে হাঁটতে সদর দরজায় পৌঁছে গেলাম। নিজে দরজা খুলে আমাকে বিদায় দিলেন যা আমার জীবনের অতি পরম পাওয়া। এটা কোনদিন কল্পনায়ও আনতে পারিনি যে, এই মহৎ চিত্রকর এর সাক্ষাৎ পাবো। কিন্তু সেদিন জানতে পারিনি আমার সাথে দেখা হবার ১৬৭ দিন পর তিনি স্বর্গবাসী হবেন।
বিশ্ববরেণ্য চলচ্চিত্র পরিচালক, সঙ্গীত পরিচালক, কাহিনিকার গীতিকার সুরকার চিত্রকর এবং সুসাহিত্যিক সত্যজিৎ রায় এর জন্ম বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জ জেলায়। তাঁর ডাকলাম ছিলো মানিক। তাঁকে নিয়ে বাঙালি মাত্রেই গর্বের শেষ নেই। আক্ষরিক অর্থেই তিনি ছিলেন, বহুমুখি প্রতিভার অধিকারী। প্রিয় লেখক ও চলচ্চিত্র পরিচালক, ছোটদের জন্য-দারুণ সব গল্প উপন্যাস লিখেছেন তিনি। ‘ফেলুদা’ প্রফেসর শঙ্কুর মত চমকপ্রদ চরিত্রতো তাঁরই সৃষ্টি। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চলচ্চিত্রকার ১৯৯২ সালের ২৩ এপ্রিল কলকাতার বেলভিউ নার্সিং হোমে মৃত্যুবরণ করেছিলেন। সত্যজিৎ রায়ের আগের দুই পুরুষও আমাদের চির পরিচিত। টুনটুনি গল্পকার ও আবোল তাবোল এর ছড়াকার হিসেবে যথাক্রমে উপেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী ও সুকুমার রায় এর নাম শোনেনি এমন কেউ নেই। ভারতের বাইরে তিনি হলেন, একমাত্র “অস্কার” বিজয়ী ভারতীয় চলচ্চিত্রকার। গদার, কুরোশাওয়ারের সঙ্গে তাঁর আসন। আর সমগ্র ভারত উপ-মহাদেশে ইংরেজি অনুবাদের কল্যাণে তিনি লেখক ও ফেলুদার ¯্রষ্টা হিসেবেও সমান খ্যাত। ভারতের চলচ্চিত্র জগতের সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি এবং চলচ্চিত্র জগতের রবীন্দ্রনাথ বলা হয় সত্যজিৎ রায়কে।
বিশ্ববরেণ্য জাপানি চলচ্চিত্রকার ‘রশোমন’ খ্যাত আকিরা কুরোশাওয়ার সেই বিখ্যাত উদ্ধৃতিটি উল্লেখ করতেই হয়। তিনি সত্যজিৎ রায় সম্পর্কে বলেছিলেন-“এই পৃথিবীতে বাস করে সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্র না দেখা চন্দ্র সূর্য- না দেখার মতই অদ্ভুত ঘটনা।
সত্যজিৎ রায় পরিচালিত চলচ্চিত্রের কালানুক্রমিক তালিকা
পথের পাচালী (১৯৫৫) অপরাজিত (১৯৫৬), পরশপাথর (১৯৫৮), জলশাঘর (১৯৫৮), অপুর সংসার (১৯৫৯), দেবী (১৯৬০), তিনকন্যা-পোষ্টমাস্টার, মনিহার, সমাপ্তি (১৯৬১), রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৯৬১), কাঞ্চনজংঘা (১৯৬২) অভিযান (১৯৬২) মহানগর (১৯৬৩) চারুলতা (১৯৬৪) টু (১৯৬৪), কাপুরুষ ও মহাপুরুষ (১৯৬৫), নায়ক (১৯৬৬) চিড়িয়াখানা (১৯৬৭) গুপীগাইন বাঘা বাইন (১৯৬৮) অরণ্যের দিনরাত্র(১৯৬৯) প্রতিবন্দি (১৯৭০) সীমাবদ্ধ (১৯৭১) সিকিম (১৯৭১) ঞযব রহহবৎ ঊুব (১৯৭২) অশনী সংকেত (১৯৭৩) সোনার কেল্লা (১৯৭৪) জন অরণ্য (১৯৭৫) বালা (১৯৭৬) সতরঙ্গ কি খিলাড়ী (১৯৭৭) জয়বাবা ফেলুনাথ (১৯৭৮) হীরক রাজার দেশে  (১৯৮০) , পিকুসেট ফিল্ম) (১৯৮০) সদাগতি (১৯৮১) ঘরে বাইরে (১৯৮৪), সুকুমার রায় (১৯৮৭) গণশত্রু (১৯৮৯) শাখা প্রশাখা (১৯৯০) আগন্তক (১৯৯১)।
১৯৯২ সালের এপ্রিল মাসে হৃদরোগ প্রকট আকার ধারণ করলে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। মৃত্যুর দেড় সপ্তাহ আগে অত্যন্ত অসুস্থ ও শয্যাশায়ী অবস্থায় তিনি তাঁর জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ পুরস্কার সম্মানসূচক “অক্সার” গ্রহণ করেছিলেন, ২৫ বছর আগে।
পুনশ্চ: বাংলাদেশের লজ্জা
সত্যজিৎ রায়কে সারা বিশ্ব সম্মান  জানিয়েছেন তাঁর শিল্পকর্মের জন্য। সত্যজিৎ রায় আজ আমাদের মাঝে আছেন এবং থাকবেন তাঁর অমর সৃষ্টি কর্মের মাধ্যমে। কিন্তু এই মহা-মানুষটিকে বাংলাদেশ শ্রদ্ধা জানাতে পারেনি, তার একটি উদাহরণ ও সত্য ঘটনা দিয়ে লেখাটা শেষ করতে চাই।
সত্যজিৎ রায় সম্পর্কে আমার মত মানুষের কিছু বলার বা আলোচনার প্রয়োজন পড়ে না, অবকাশও নেই। তবে যে ক্ষমাহীন অপরাধ ওই সময়ের বাংলাদেশ সরকার করেছিলো সেই ঘটনাটি সম্মানিত পাঠকদের অবগতির জন্য জানাতে চাই। সালটা বা দিনক্ষণ মনে নেই, তবে ঘটনাটা ঘটেছিলো ঢাকায়। ভারতীয় দূতাবাস যখন সত্যজিৎ রায় এর ‘জনঅরণ্য’ ছবিটি দূতাবাস কর্মী ও আমন্ত্রিত অতিথিদের দেখানোর জন্য এনেছিলো। তখন তা বাংলাদেশ ফিল্ম সেন্সর বোর্ড এ নিয়মমাফিক জমা দিয়েছিলো। সেন্সর বোর্ডের বোদ্ধা (?) সদস্যরা ছবিটির কিছু দৃশ্য অশ্লীল আখ্যা দিয়ে তা ‘কর্তন’ পূর্বক পুনরায় জমা দিতে বলেছিলো। ভারতীয় দূতাবাস সত্যজিৎ রায় এর ছবিতে কোন আঁচড় ও কাটা যাবে না জানিয়ে তাদের দেশে ফেরত পাঠায়। এখন সময় এসেছে দাবি তোলার বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার সেই নথি তলব করে ঐ সময়ে ফিল্ম সোন্সর বোর্ড এর চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান ও সদস্য কারা ছিলেন, কে কে আপত্তি দিয়েছিলেন তা বের করে প্রকাশ করুন এবং আমাদের মাথায় যে কলঙ্কের দাগ লাগানো হয়েছিলো সেই অপরাধে প্রচলিত আইনে তাঁদের বিচারের আওতায় এনে বিশেষ ট্রাইবুনালে বিচার করা হোক। তাহলেই তাঁর বিদেহী আত্মা শান্তি পাবে। আর আমরাও কলঙ্ক থেকে মুক্ত হবো। আশা করি বাংলাদেশে সরকারের মাননীয় তথ্য মন্ত্রী  এ বিষয়ে যথাযথ উদ্যোগ ও ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।
মহান চিত্র পরিচালক সত্যজিৎ রায় এর জন্মদিনে এটাই প্রত্যাশা।
লেখক: প্রকৌশলী