গুরুদাসপুরে বেড়েছে গরু-ছাগল চুরি || ব্যক্তিগত নিরাপত্তায় রাত জেগে পাহারা

আপডেট: জানুয়ারি ২৮, ২০১৭, ১২:০৯ পূর্বাহ্ণ

গুরুদাসপুর প্রতিনিধি


অবসরে পাওয়া টাকায় নয়টি গরু কিনে খামার গড়েছিলেন সেনাসদস্য আল মামুন। গত বছরের ১২ অক্টোবর রাতে গরুগুলো চুরি যায়। এ ঘটনায় পথে বসেন তিনি। গরুগুলো উদ্ধারে থানায় মামলা ও র‌্যাবের সহযোগিতা নিয়েও ব্যর্থ হয়েছেন তিনি। নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার ধারাবারিষা ইউনিয়নের তালবাড়িয়া গ্রামে আল মামুনের বাড়ি।
শুধু সেনাসদস্য আল মামুনই নয়, তার মতো উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নের গ্রামাঞ্চলে প্রায় প্রতি রাতেই শত শত কৃষকের গোয়াল থেকে গত চারমাস ধরে গরু চুরির ঘটনা ঘটছে। ফলে সর্বশান্ত হয়ে পড়ছে আবাদ নির্ভরশীল কৃষক পরিবার ও খামার মালিকরা। কিন্তু চুরিরোধ ও চুরি যাওয়া গরুগুলো উদ্ধারে পুলিশের সক্রিয় ভূমিকা নেই বলে জানালেন ভুক্তভোগী কৃষক ও জনপ্রতিনিধিরা।
এদিকে যথেচ্ছাভাবে গরু চুরিরোধে উপজেলার গ্রামে গ্রামে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বাড়িয়েছেন গরুর মালিকরা। তারা নিজ উদ্যোগে জনবল নিয়োগ করে রাতজেগে পাহারা বসিয়েছেন। জনপ্রতিনিধি (ইউপি চেয়ারম্যান) ও থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) দিলীপ কুমার দাস রাতজেগে গরু পাহারা বসানোর তথ্যটি নিশ্চিত করেছেন।
আকস্মিক গরু চুরিবৃদ্ধির কারণ হিসেবে ওসি দিলীপ কুমার দাস মনে করেন, অক্টোবর মাসে শীত শুরু হয়, রাতও বাড়ে। মানুষ গভীর ঘুমে অচেতন থাকেন। তাছাড়া বন্যার পানি নামতে শুরু করায় গ্রামের সড়কগুলো শুকিয়ে যায়। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সংঘবদ্ধ চোরের দল চুরিতে সক্রিয় হয়ে ওঠে।  বিশেষ করে উপজেলার ওপর দিয়ে বনপাড়া-হাটিকুমরুল মহাসড়ক চলে যাওয়ায় স্থানীয় চোর দলের সঙ্গে আন্তঃগরুচোর দল সংঘবদ্ধ হয়ে ওঠে। স্বল্প সংখ্যক পুলিশ দিয়ে গ্রামে শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না। তবে গরু চুরিরোধে উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়ন ও বিশেষ বিশেষ গ্রামে মানুষ, গরুর খামারি ও কৃষকসহ নানা শ্রেণি পেশার মানুষেল সমন্বয়ে সচেতনতাসভা করা হয়েছে।
থানা পুলিশ, জনপ্রতিনিধি ও ভুক্তভোগী কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত চারমাস ধরে উপজেলার বিয়াঘাট, খুবজীপুর, মশিন্দা, নাজিরপুর, চাপিলা ও ধারাবারিষা ইউনিয়ন থেকে রাতের অন্ধকারে গরুচোর চক্র গরুগুলো চুরি করে থাকেন। চুরিকরা গরুগুলো শ্যালোচালিত নছিমন, করিমন, ট্রাক ও কাভার্ডভ্যানে করে নিয়ে যায়।
উপজেলার মশিন্দা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান প্রভাষক মোস্তাফিজুর রহমান জানান, গত বছরের ১২ অক্টোবর ইউনিয়নের তালবাড়িয়া গ্রাম থেকে সেনাসদস্য আল মামুনের নয়টি গরু চুরি হয়। তাছাড়া গত চারমাসের ব্যবধানে উপজেলার বাহাদুরপাড়া, বিলবিয়াসপুর, মশিন্দা গ্রাম থেকে অন্ততপক্ষে ১৫ জন কৃষকের ৪০টি গরু চুরির ঘটনা ঘটেছে। এদের মধ্যে আল মামুন থানায় মামলা করলেও অন্য কৃষকরা পুলিশের প্রতি আস্থা না থাকায় মামলা করেন নি। চুরি ঠেকাতে গ্রামে গ্রামে এখন রাতজেগে গরু পাহারা দিচ্ছে গ্রামবাসী।
উপজেলার ধারাবারিষা ইউপি চেয়ারম্যান আবদুল মতিন জানান, ইউনিয়নের উত্তরনাড়িবাড়ী গ্রামের কৃষক ইউনুস আলী বাড়ি থেকে একটি গাভীসহ ছয়টি ছাগল চুরির ঘটনা ঘটে। এনিয়ে থানায় মামলা হলে পুলিশ ছয়টি ছাগল উদ্ধার করলেও দুধেল গাভীটি উদ্ধার করতে পারে নি। এছাড়া ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম থেকে প্রায় প্রতিদিনই গরু-ছাগল চুরির ঘটনা ঘটছে। এতে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে গরু-ছাগলের মালিকরা। পরিস্থিতি সামাল দিতে গ্রামে গ্রামে রাত জেগে গরু পাহারা বসিয়েছে।
উপজেলার অন্য ইউপি চেয়ারম্যানরা জানালেন, প্রায় প্রতিরাতে ৮ থেকে ১০টি গরু চুরির ঘটনা ঘটছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক চুরি যাওয়া গরু উদ্ধারের জন্য তাদের কাছে ধর্ণা দিচ্ছেন। তারা সমাধান দিতে পারছেন না। পুলিশ জানালে, তারা বলছে দেখছি বলেই দায়িত্ব শেষ করছেন। তাদের ভাষ্যমতে, উপজেলা জুড়ে মাদকের সেবনবৃদ্ধির কারণে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
গরু চুরির ফলে ক্ষতিগ্রস্ত খামার মালিক ইউনুস আলী জানালেন, অনেক কষ্ট করে তিনি এসব গরু ছাগল কিনেছিলেন। চুরি যাওয়ার পর তারা সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারছেন না। এর ওপর ঋণের ফাঁদে পড়েছেন তারা। কারণ হিসেবে তারা জানান, গ্রামের মানুষ হাল আবাদ করে খায়। গোয়ালের গরুগুলো তাদের বেঁচে থাকার অবলম্বন। যথেচ্ছাভাবে হালের বলদগুলো চুরি যাওয়ায় কৃষক, গরুর খামার মালিকরা সর্বশান্ত হচ্ছে।
থানা সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি বড়াইগ্রাম উপজেলার কালিকাপুর গ্রাম থেকে কাবিল (২৫) ও গুদরা গ্রামের নয়ন (২০) নামের দুইজন গরুচোরকে আটক করা হয়। তাদের দেয়া তথ্য মতে, একই উপজেলার কালিকাপুর গ্রামের শুকুর আলীর বাড়ি থেকে গত মঙ্গলবার ছয়টি চোরাই গরু ও ছয়টি ছাগল উদ্ধার করা হয়। এর মধ্যে দুইটি গরু সেনাসদস্য আল মামুনের। অন্য চারটি গরুর মালিকের খবর পাওয়া যায় নি। তবে কী পরিমান গরু ও ছাগল চুরির ঘটনা ঘটেছে সে তথ্য জানাতে পারে নি পুলিশ।