গৃহকর্মী আদুরি নির্যাতন মামলার রায় || রায় দ্রুত কার্যকর হোক

আপডেট: জুলাই ২০, ২০১৭, ১২:৪৯ অপরাহ্ণ

প্রায় চার বছর আগে মিরপুরের পল্লবীতে নির্মম নির্যাতনের পর শিশু গৃহকর্মী আদুরিকে মুমূর্ষু অবস্থায় ময়লার স্তূপে ফেলে রাখার ঘটনায় গৃহকর্ত্রী নওরীন জাহান নদীকে যাবজ্জীবন কারাদ- দিয়েছে আদালত।
ঢাকার ৩ নম্বর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক জয়শ্রী সমাদ্দার মঙ্গলবার এ মামলার রায় ঘোষণা করেন।
আসামি নদীকে যাবজ্জীবন কারাদা-ের পাশাপাশি এক লাখ টাকা জরিমানার আদেশ দিয়েছেন বিচারক। ওই অর্থ আদায়ের পর তা নির্যাতিত কিশোরী আদুরিকে দিতে হবে। আর জরিমানা দিতে ব্যর্থ হলে আরও এক বছরের কারাদ- ভোগ করতে হবে নদীকে। এ সংক্রান্ত প্রতিরেবদন দৈনিক সোনার দেশসহ দেশের বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশিত ও প্রচারিত হয়েছে।
গৃহকর্তী নদীকে দোষি সাব্যস্ত করে আদালতের যাবজ্জীবন কারাদ-ের রায় দেশের মানুষ ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবেই দেখছেন।
আমাদের চারপাশে তাকালে দেখা যায়, আদরীর মতো শিশুরা বিভিন্ন বাসায় গৃহকর্মী হিসেবে নিয়োজিত রয়েছে। সংসারের সার্বক্ষণিক দেখাশুনা ছাড়াও সন্তান পালন, পানি তোলা, ঘর মোছা, হাড়িবাসন ও কাপড়-চোপড় পরিষ্কার করা, সবজি কাটা, বাটনা বাটা যাবতীয় কাজ তারা করে থাকে। তার বিনিময়ে তারা পায় ন্যূনতম খাবার সংস্থান (যার বেশির ভাগই উচ্ছিষ্ট, পঁচা-বাসী খাবার), ব্যবহৃত পোষাক পরিচ্ছদ। তারা ব্যবহার পায় ক্রীতদাসের মতো। তাদের ঠিক মানুষ বলে গণ্য করা হয় না। তাদের হাসতে মানা, তাদের কাঁদতে মানা, তাদের অনুভূতি প্রকাশ করতে মানা, তাদের পড়াশুনা করতে মানা। আর চলাচলের ওপর থাকে কড়া নজরদারি। তাদের বোবা ভাষাগুলো চার দেয়ালে গুমরে গুমরে কাঁদে। অনেক সময় গৃহকর্তা-গৃহকর্ত্রী তাদেরকে তালাচাবি বন্ধ করে কর্মক্ষেত্রে যান। ফলে কার্যত তারা কারাজীবন কাটাতে বাধ্য হয়।
এ শারীরিক ও মানসিক আঘাত পাওয়া তাদের অনেকেই ভাগ্যলিপি বলে মেনে নিয়েছে। তাদের অধিকার, পাওনার কথা খুব কমই গোচরে আসে। গোচরে আসে কেবল তখনই, যখন তারা মৃত্যুশয্যায়। যে মা-বাবা তাদের প্রিয় সন্তানকে অভাবের তাড়নায় বাসায় কাজ করতে পাঠায় তারা মনে করে হয়তো ভালোই আছে তাদের আদরের সন্তান। তবে বাস্তবতা হলো দু’টির জায়গায় তিনটি মরিচ পোড়ানোর জন্য, ভাত বেশি গলে বা পুড়ে গেলে, গৃহকর্ত্রীর সন্তান একটু আঘাত পেলে, প্লেট ভেঙ্গে ফেললে, আরো কত রকম কারণে একজন গৃহকর্মী নির্যাতনের শিকার তার হিসাব কেউ রাখে না। অনেক সময় তারা যৌন নির্যাতনেরও শিকার হয়।
এসব ক্ষেত্রে তারা বেশির ভাগ সময়ই পাশে পায় না কাউকে। পৃথিবীর সমস্ত বঞ্চনা যেন তাদের জন্য রাখা হয়েছে। তাদের প্রায় ১২-১৫ ঘণ্টা কাজ করতে হয়। তাদের নেই কোনো ছুটি, নেই কোনো অবসর। তাদের খাবার দেয়া হয় সবার শেষে। বসতে দেয়া হয় সবচেয়ে নিচুতে, ঘুমাতে দেয়া হয় মেঝেতে। অবশ্য সব গৃহে গৃহকর্মীর অবস্থা এরকম নয়। তবে এদের সংথ্যা নেহাতই কম।
গৃহকর্মী শিশু নির্যাতনের যেসব চিত্র আমরা দেখতে পাই তার সবই মধ্যযুগীয় বর্বরতা। অথচ এরা অধিকাংশ শিক্ষিত পরিবারে কাজ করে। তাহলে নিষ্পাপ এ মুখগুলোর জন্য কেন দয়া বা বিবেকবোধ কাজ করে না তা একবার ভাবার সময় এসেছে।
প্রতিটি শিশু নির্যাতন- সেটা যে ভাবেই হোক না কেন তা আইনের আওতার মধ্যে আসতে হবে। আদুরি যে আইনি সুরক্ষা পেয়েছে, বিচার পেয়েছে এই নিশ্চয়তা দেশের সব নির্যাতিত শিশুর ক্ষেত্রে নিশ্চিত করতে হবে। এটা যেমন সরকারের দায়িত্ব তেমনি শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে সামাজিক উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ। সর্বক্ষেত্রে শিশুদের সুরক্ষার তাগিদ শিশু আইন ও শিশু নীতিমালার মধ্যে স্পষ্ট আছে। শিশুর সুরক্ষার দায় পরিবার থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত সকলকেই নিতে হবে।
আদুরি নির্যাতনের হোতা গৃহকর্তী নদীর শাস্তির রায় দ্রুত কার্যকর হবে এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ