গোদাগাড়ীর জঙ্গি আস্তানা গ্রামটি এখনো থমথমে

আপডেট: মে ১৬, ২০১৭, ৩:১৯ পূর্বাহ্ণ

গোদাগাড়ী প্রতিনিধি


রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে জঙ্গি আস্তানার গ্রামটিতে এখনো থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। গত বৃহস্পতিবার উপজেলার মাটিকাটা ইউনিয়নের মাছমারা বেনিপুর গ্রামে জঙ্গিবিরোধী অভিযানে এক দমকল কর্মী ও ৫ জঙ্গি নিহত হয়। এরপর থেকেই বেনীপুর ও আশে পাশের গ্রামগুলিতে মানুষের মাঝে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। বেনীপুর গ্রামের মৃত মতিনের ছেলে ও নব্য জেএমবির শীর্ষ নেতা নিহত সাজ্জাদ আলীর পরবার নিয়ে এলাকাবাসী কথা বলতে চাইছে না।
গতকাল সোমবার সকালে বেনীপুর গ্রামে গেলে প্রতিবেশীরা জানায়, ঘটনার দেড় মাস আগে ফাঁকা মাঠে টিনশেড বাড়ি তৈরি করে নিহত জঙ্গি সাজ্জাদ আলী। বাড়ি তৈরির সময় চারপাশে ধানের চারা রোপণ থাকায় তার বাড়ির লোকজনকে খুব একটা দেখা যেত না। তবে নিহত জঙ্গির মা মারজান বেগম বলেন, তার ছেলে সাজ্জাদ আলী ২৬ বছর আগে বিয়ে করে শ্বশুর বাড়ির পাশে মাছমারা গ্রামে বসবাস করত। এরপর থেকে মারজান বেওয়া ও তার আত্মীয় স্বজনের সঙ্গে একেবারে বন্ধ করে দেয় জঙ্গি সাজ্জাদ আলী।
মাছমারা গ্রামের লোকজন জানায়, সাজ্জাদ আলী ও তার স্ত্রী ছেলে মেয়েরা গ্রামের লোকজনের সঙ্গে তেমন মিশতো না। শুধুমাত্র সাজ্জাদ আলীর পরিবাররের সদস্যরা তার শ্বশুর লুৎফর রহমানের বাড়িতে যাতায়াত করতো। মাঝখানে ছয় মাসের জন্য সাজ্জাদ আলী পরিবার নিয়ে কিছুদিন রাজশাহীতে ও এরপর উপজেলা সদর কুঠিপাড়াতে বাসা ভাড়া নিয়ে ছিল। তারা আরো জানায়, মাছমারা ও বেনীপুর এলাকার জামায়াত-বিএনপির ঘাটি হিসেবে পরিচিত। সাজ্জাদ আলী ফেরি করে কাপড় ব্যবসা করার সময় ছোট বড় সকলকে সালাম ও ইসলামের দাওয়াত দিত। তাই এলাকাবাসীর ধারণা সাজ্জাদ জামায়াতের সমর্থক ও ধার্মিক হওয়ায় এই কাজটি করে থাকে। কিন্তু ফেরি করে কাপড় ব্যবসার আড়ালে সাজ্জাদ আলী জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে তা বুঝে উঠতে পারে নি এলাকাবাসী।
প্রতিবেশীরা জানান, সাজ্জাদ আলীর মাছমারার বাড়িতে মাঝে মধ্যে অপরিচিত কিছু যুবক আসা যাওয়া করতো। এমনকি রাতে অবস্থান করার পর সকালে উঠে চলে যেত। তবে সাজ্জাদ আলী ও তার স্ত্রী ছেলে মেয়েরা জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার বিষয়টি তার শ্বশুর লুৎফর রহমান জেনে গিয়েছিল। এই নিয়ে দেড় মাস আগে সাজ্জাদ আলীর সঙ্গে বিরোধ সৃষ্টি হয় লুৎফুর রহমানের। এমনকি লুৎফর রহমান একদিন তার মেয়ে বেলিয়ারা ও জামাই সাজ্জাদ আলীকে মারধর করে এলাকা ছেড়ে যেতে বলে। তখনই সাজ্জাদ তার পৈত্রিক ভিটা বেনীপুরে টিনশেড বাড়িটি তৈরি করে বসবাস শুরু করে। এরপর থেকে সাজ্জাদ আলীর সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ ছিল বলে লুৎফুর রহমান দাবি করেন।
স্থানীয় বিএনপি নেতা আহম্মদ আলী জানান, ২০০৪ সালের দিকে বাগমারা উপজেলায় বাংলা ভাই আসলে তখন সাজ্জাদ আলী ও তার চাচাত ভাই মনিরুজ্জামান মনির বাংলা ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করে। এলাকায় বাংলা ভাইয়ের সংগঠনের পক্ষে প্রচারণা চালাই সাজ্জাদ আলী। এই নেতার ধারণা তখন থেকেই জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে সাজ্জাদ আলী।
স্থানীয় লোকজন আরো জানান, সাজ্জাদ আলী তেমন লেখাপাড়া না জানলেও নম্র, ভদ্র ও ধার্মিক প্রকৃতির লোক হওয়ায় খুব সুন্দর করে কথা বলতো। এজন্য সাজ্জাদ আলীকে মিষ্টু নাম উপাধি দেয় এলাকাবাসী। ১১ মে অপারেশন সান ডেভিল চলাকালীন জঙ্গিদের হামলায় দমকল কর্মী আবদুল মতিন খুন হয়। আর আত্মঘাতি বোমার বিস্ফরণ ও গোলাগুলিতে জঙ্গি সাজ্জাদ আলী, তার স্ত্রী বেলিয়ারা, ছেলে আল আমিন, মেয়ে কারিমা খাতুন ও বহিরাগত জঙ্গি আশরাফুল ইসলাম নিহত হয়। এসময় সাজ্জাদ আলীর মেয়ে সুমাইয়া আক্তার পুলিশের কাছে আত্মসর্মপণ করে। ১০ দিনের রিমান্ডে সুমাইয়া আক্তারকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ। আর সেই সময় বাড়িতে ছিলো না সাজ্জাদ আলীর আরেক ছেলে জঙ্গি সোয়েব আলী।
এ বিষয়ে গোদাগাড়ী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) হিপজুর আলম মুন্সি বলেন, সোয়েবসহ জঙ্গি কর্মকা-ের সাথে জড়িতদেরকে আটক করতে পুলিশ অভিযান অব্যাহত রেখেছে। এদিকে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে সুমাইয়া আক্তার অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিচ্ছে। তার দেয়া তথ্য যাচাই-বাছাই করে সেই মোতাবেক পুলিশ ব্যবস্থা নিবে। সুমাইয়ার তথ্য অনুযায়ী তার স্বামী জঙ্গি জহরুল ইসলাম রাজশাহী অঞ্চলের জঙ্গিদের মূল বস ছিলেন। আর সামরিক কমান্ডার ছিলেন আশরাফুল ইসলাম। জহরুল ইসলাম ২০১৬ সালের ২৮ অক্টোবর জেলা ডিবি পুলিশের হাতে আটক হয়। জঙ্গি জহরুল বর্তমানে কাশিমপুর জেলহাজতে রয়েছে।