গোদাগাড়ীর দুই সাঁওতাল কৃষকের মৃত্যু : আরও কিছু প্রশ্ন ও কিছু কথা

আপডেট: মে ৯, ২০২২, ১২:১৩ পূর্বাহ্ণ

ইলিয়াস উদ্দীন বিশ্বাস:


আমার নিজ উপজেলা গোদাগাড়ীর দুই সাঁওতাল কৃষকের অকাল মৃত্যু খুবই দুঃখজনক। ছোট বেলায় গ্রামের সাঁওতাল ছেলেদের সঙ্গে খেলাধুলা এখনো স্মৃতিপটে ভেসে উঠে। গ্রামে গেলে তাদের বাড়িতে গিয়ে সবার খোঁজ খবর নিয়ে থাকি। তবে সাম্প্রতিক ইউটিউবে ভাইরাল হওয়া একাত্তর ও এসএ টিভিতে প্রচারিত ঈশ্বরীপুর ও নিমঘুটু গ্রামের মানুষের বক্তব্য ও গভীর নলকূপের অপারেটর সাখাওয়াত হোসেনের বিরুদ্ধে দুই সাঁওতাল কৃষকের আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় অভিযোগকারীদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করে প্রতীয়মান হয় যে সাখাওয়াত হোসেন ষড়যন্ত্রের শিকার।

আর এই ষড়যন্ত্রের মূল হোতা পিয়ারুল ইসলাম ও তাঁর চাচা সিরাজুল ইসলাম। কারণ অভিনাথ মারডী ও তাঁর চাচাতো ভাই রবি মারডীর অসুস্থতার পরপরই পূর্বশত্রতার জেরে ষড়যন্ত্রকারীরা রটান যে সাখাওয়াত পানি না দেওয়ার কারণে অভিনাথ বিষ পান করেছে এবং অভিনাথের মৃত্যুর পর তাঁরা গভীর নলকূপের ঘরে তালা দেওয়ার জন্য হম্বিতম্বিও করেন।

এছাড়াও শাখাওয়াতের বিরুদ্ধে মামলা করতে ইন্ধন দেন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য কেউ বা কোনো সংস্থা এটার সত্যতা যথাযথভাবে যাঁচাই না করেই একমাত্র সাখাওয়াতকে দায়ী করে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে। ফলে এটা যেন একটা জাতীয় ইস্যুতে পরিণত হয়।

অভিনাথ মারডীর স্ত্রী রোজিনা হেমব্রম ২৫/৩/২০২২ এজাহারে উল্লেখ করেছেন যে ‘২৩/৩/২০২২ খ্রি. তারিখ বিকাল আনুমানিক ৪ ঘটিকার সময় উক্ত ডিপকলে আসিয়া ডিপকলের অপারেটর আসামি সাখাওয়াত হোসেনকে আমাদের জমিতে পানি দিতে বলে এবং জমিতে পানি না দিয়ে কেন তালবাহানা করিতেছে তা জানিতে চাইলে উক্ত আসামি আমার স্বামীকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করতে থাকে।

একপর্যায়ে উক্ত আসামি আমার স্বামীকে বলে যে, আমি তোর জমিতে পানি দিব না। তুই যা পারিস করিস।” তখন আমার স্বামী বলে যে, জমিতে পানি না দিলে আমি বিষ খাবো। তখন উক্ত আসামি বলে,” তুই বিষ খাগা।” আমার স্বামী উক্ত আসামির কথায় প্ররোচিত হইয়া মনের দুঃখে ২৩/৩/২০২২ খ্রি. তারিখ বিকাল ৪:৩০ ঘটিকা হইতে ৫:৩০ ঘটিকার সময়ের মধ্যে যে কোনো সময় কীটনাশক বিষ পান করে।

একই তারিখ ৫:৩০ ঘটিকার সময় আমার স্বামী আসামি সাখাওয়াতকে বলে যে আমি বিষ পান করেছি। তখন আসামি সাখাওয়াত স্বাক্ষী ১। বাপ্পি মারডী (৪০), পিতা- কবিরাজ মারডী, সাং নিমঘুটু, থানা- গোদাগাড়ী, জেলা- রাজশাহী সহ ডিপকলের সামনে থেকে আমার স্বামীকে আমাদের বসত ঘরে রেখে আসে এবং রাত্রী অনুমান ৮ঃ৩০ ঘটিকার সময় বিষ পানের ফলে ছটফট করিয়া মৃত্যু বরণ করে।

এদিকে একই দিনে অসুস্থ রবি মারডীকে ২৩/৩/২২ তারিখ রাত্রে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২৫/৩/২২ তারিখ রবি মারডী মারা যান। তাঁর ভাই সুশীল মারডী ২৭/৩/২২ তারিখে থানায় এজাহারে সাখাওয়াত হোসেনকে দায়ী করে তাঁর বিরুদ্ধে প্রায় একই ধরনের বক্তব্য উপস্থাপন করেন।

অথচ উভয় এজাহারে উল্লিখিত ১ নম্বর সাক্ষী অভিনাথ মারডীর চাচাতো ভাই বাপ্পি মারডী এসএ টিভির প্রতিনিধিকে বলেন, “কাশতে কাশতে উঠে আসছে দুজন, হেটে উঠে আসছে। তখন অভিনাথ কাশছিল আর লাখ থেকে পোটা (সর্দি) বারাচ্ছে আর একটু লাল (লালা) পড়ছে। আমি অভিনাথকে জিজ্ঞেস করলাম, “এই তুই বিষ সত্যি সত্যি খেয়েছিস না কিরে? তো বলছে যে, হ্যাঁ আমি খেয়েছি।” কেন খেয়েছিস? বলছে যে, টেনশনে খেয়েছি।

একটু ভাবলে উভয় ক্ষেত্রেই এজাহারকারীদের বক্তব্যে ও ১ নম্বর সাক্ষী বাপ্পি মারডীর বক্তব্যে অনেক গরমিল রয়েছে তাকি স্পষ্ট হয় না? এখন যদি নিকট আত্মীয় হওয়ার কারণে এজলাসে দাঁড়িয়ে এজাহারকারীদের সুরে সুর মেলিয়ে কথা বলেন তবে সেটা কতটা গ্রহণযোগ্য হবে?

রোজিনার এজাহারে উল্লিখিত সাক্ষী কাবিল একাত্তর টিভির প্রতিনিধিকে বলেন, ” ছেলেটা ৮/১০ কাজে যায়নি, এব্যাপারে বলি তুই কাজে যাসনা ক্যান?” বলছে,”পানি পাইনা।” আরেক সাক্ষী মাইকেল হাজদা জানিয়েছেন,”রাত্রে পানি দিয়েছে, আমরা আইসা (এসে) দেখছি কোদাল নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

কার ভুইয়ে পানি যাচ্ছে, অভিনাথের ভুইয়ে পানি যাচ্ছে।” এছাড়া রবি মারডীর মা এসএ টিভির প্রতিনিধিকে বলেন, ” আমাদের পাড়ার ডিপে গেলছিল, ভুইয়ে আবার পানি লিছে (নিচ্ছ), ভুইয়ে খেয়েছে না কোথায় খেয়েছে তা বলতে পারছি না।” তাঁর এ বক্তব্যের সঙ্গে সুশীল মারডী তাঁর মায়ের উদ্ধৃতি হিসেবে যে সব কথা এজাহারে উল্লেখ করেছেন সেটার কোনোই মিল নেই।

একজন সাঁওতাল কৃষক একাত্তর টিভির প্রতিনিধিকে জানিয়েছেন যে, কয়েকদিন ঘুরে ঘুরে পানি দেয় না, পানি পায় না। এতে টেনশনে রাগ করে আত্মহত্যা করেছে। এছাড়া হাবিল মুর্মু জানিয়েছেন, “পানি আছে কিন্তু কিছু পা বসছে না, একটুকুও পা বসছে না। জমিতে ফাটাল আছে, ফাটাল বুঝা যাইতেছে, রাত্রে পানি দিয়েছে।”

এজাহারে উল্লিখিত কোনো সাক্ষী বা অন্য কেউ মিডিয়ায় সামনে কথা বলার সময় অভিনাথ মারডী বা রবি মারডীকে সাখাওয়াত বিষ খেতে বলেছেন বা অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেছেন তো দূরের কথা তাঁদের মধ্যে কোনো কথপোকথন হয়েছে তা বলেননি। এমনকি রোজিনা হেমব্রমও মিডিয়ায় সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেননি। তিনি এসএ টিভির প্রতিনিধির কাছে বলেন,”সকালে ভাত খেয়ে ডিপে গেলছে। ডিপে গেল, আমি কাজে গেনু। ডিপে গিয়ে বিষ পান করেছে পানি দিচ্ছে না তার জন্য।”

এদিকে দেওপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান একাত্তর টিভির প্রতিনিধিকে জানিয়েছেন, “এখানে কোনোদিন কেউ আমাকে অভিযোগ করেনি বা কমপ্লেন দেয়নি যে পানি পাচ্ছিনা, চেয়ারম্যান সাহেব, আপনারা দেখেন। এখানে জনপ্রতিনিধি যাঁরা আছেন তাঁদেরকেও বলেনি।” আর তদন্তের পর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা একাত্তর টিভির প্রতিনিধির নিকট কোনো মন্তব্য করেননি কেন? সেটা কি কেউ ভেবেছেন? পানির অভাবে ক্ষেতের ধান নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

একারণে অভিনাথের আত্মহত্যা এমন কিছু আলামত তিনি পাননি বলেই কোনোরুপ মন্তব্য থেকে বিরত থেকেছেন এমনটাই আমার ধারণা। এক্ষেত্রে অভিনাথের মৃত্যুর আগে বা পরে ক্ষেতে পানি দেওয়ার বিষয়টি মুখ্য নয়। কারণ ধানের চারাগুলো নষ্ট হয়ে যায়নি। যা বিএমডিএসহ বিভিন্ন তদন্ত সংস্থা তদন্তে করে দেখেছেন। ক্ষেতে ধান এখনো আছে আর কিছু দিনের মধ্যে তা কাটা পড়বে।

আবার রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২৪ মার্চ আত্মীয় স্বজনের উপস্থিতিতে এসএ টিভির প্রতিনিধির এক প্রশ্নের জবাবে রবি মারডী বলেন, ” পানি খেতে গেছিলাম।” কোথায়? এ প্রশ্নের জবাবে বলেন, “দামকুড়িয়াতে।” তাঁর এ বক্তব্যের মাধ্যমে এটাই প্রতীয়মাণ হয় যে তাঁরা দামকুড়ার সন্নিকটে ডাইং পাড়ায় পানীয় (চুয়ানি) খেয়েছিলেন যা সাঁওতালদের অত্যন্ত পছন্দের পানীয়।

চুয়ানি পান করার বিষয় সম্পর্কে দামকুড়ার মুর্শেদ ফার্মেসীর চিকিৎসক মুর্শেদ সাহেব (যিনি অভিনাথ মারডীকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেন) এসএ টিভির প্রতিনিধিকে বলেন,” আমি বমি করানোর জন্য মেডিসিন দিয়ে মানে ওকে চেষ্টা করলাম।” আরেক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ” চুয়ানি, বিষের কিছু পায়নি। বিষ হলে কিছু প্রশ্নই উঠে না। চুয়ানি, গন্ধ বের হচ্ছিল।” এলাকাবাসীর অনেকেই এসএ টিভির প্রতিনিধিকে চুয়ানি পান করার কথা জানিয়েছেন। এসব কারণে ভিসেরা রিপোর্ট নিয়ে এলাকার অনেক মানুষের মনেই প্রশ্নের উদ্রেক হয়েছে।

যখন কোনো ব্যক্তি তাঁর মৃত্যুর আগে মৃত্যুর কারণ হিসেবে সুইসাইড নোট লিখে যান তা আত্মহত্যার প্ররোচনা হতে পারে । তবে সেক্ষেত্রেও বাংলাদেশে প্রচলিত সাক্ষ্য আইন-১৮৭২ এর ৩২ ধারা অনুযায়ী প্ররোচনার বিষয়টি প্রমাণের প্রয়োজন পড়ে।
এমতাবস্থায় জমিতে সময়মতো পানি না পাওয়া, কিছু গালমন্দ শোনা ও বিষ খেতে বলা আত্মহত্যার অনিবার্য কারণ, এমন সম্ভাবনা স্বাভাবিক বোধসম্পন্ন যে কোনো মানুষের ধারণাতীত।

আইনের দৃষ্টিতে এসবে কোনোভাবেই প্ররোচনার অপরাধ ঘটে না। কারো বিরুদ্ধে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগ যখন সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়ে থাকে তখনই কেবল শাস্তি প্রদান করা যায়।
লেখক: প্রফেসর, উপাচার্য, নর্থ ইস্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ।