গ্রন্থ-আলোচনা ‘ফিরে দেখা : রাজনীতির দর্শন ও মুক্তিযুদ্ধ’

আপডেট: নভেম্বর ২৬, ২০২১, ১২:১৯ পূর্বাহ্ণ

তসিকুল ইসলাম রাজা:


জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের একজন বীরমুক্তিযোদ্ধা এবং বিশিষ্ট আইনজীবী, রাজনীতিক ও সমাজহিতৈষী জনাব মো. সাইদুল ইসলাম রচিত ‘ফিরে দেখা : রাজনীতির দর্শন ও মুক্তিযুদ্ধ’ গ্রন্থটি একনজর দেখার আমার সৌভাগ্য হয়েছে। চমৎকার ও দৃষ্টিনন্দন চাররঙা প্রচ্ছদ, অফসেট কাগজে ছাপা, গেটআপ-মেকআপ অসাধারণ এবং ৪৭১ পৃষ্ঠার এ গ্রন্থটি হাতে নিলেই যে কোনো বিদগ্ধ পাঠক আলোড়িত হবেন। গ্রন্থটি প্রথম প্রকাশ করেছে মৌমিসি প্রকাশন ষষ্ঠীতলা, রাজশাহী। প্রথম প্রকাশ : জুলাই ২০২০ এবং ৩য় সংস্করণ অক্টোবর ২০২১। প্রচ্ছদ পরিকল্পনায় বিশিষ্ট সাংবাদিক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা জনাব মুস্তাফিজুর রহমান খান আলম। মূল্য :- ৬৫০ টাকা। এমন একটি মূল্যবান ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক আকর গ্রন্থ রচনার জন্য লেখককে প্রথমেই আমরা স্যালুট জানাই।
এ গ্রন্থটির সূচিপত্রের দিকে একবার চোখ বুলালে দেখা যাবে, লেখক অত্যন্ত সচেতন ও দক্ষতার সঙ্গে তাঁর কলম শক্তিকে কাজে লাগিয়েছেন এবং একবারে নতুন দৃষ্টিভঙ্গির আলোয় আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের অজানা অনেক বিষয় নতুন মাত্রায় যুক্ত করেছেন। বিশেষত মুক্তিযুদ্ধে বিভিন্ন আদর্শ ও দর্শন সম্পর্কে তাঁর নিজস্ব মূল্যায়নও প্রশংসাযোগ্য। তবে তাঁর ভাবনার জগতে এ গ্রন্থে ১৫টি অধ্যায় রয়েছে এবং অধ্যায় বিভাজনে মুন্সিয়ানার পরিচয়ও দিয়েছেন। দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধ থেকে শুরু করে দ্বি-খন্ডিত ভারতবর্ষ, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠাসহ নাচোল কৃষক বিদ্রোহ ও খাপড়া ওয়ার্ড, রাজশাহী কেন্দ্রীয় জেলখানায় হত্যাকা-, মাতৃভাষা বাংলা রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম, ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে বাঙালির বিজয়. জেনারেল আইয়ুব খানের শাসন আমল, বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা, ছাত্রদের এগারো দফা, পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি বৈষম্য, বঙ্গবন্ধুর সেই ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ ও স্বাধীনতা ঘোষণা, অপারেসন সার্চ লাইট ও পঁচিশ মার্চ গণহত্যার বিভীষিকাময় রাতের বর্ণনা, রাজশাহীর আকাশে জেট বিমান যুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধ শুরু এবং চারঘাট আলাইপুর হয়ে পদ্মানদী পাড়ি দিয়ে ভারত গমন ও লেখকের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ।
এছাড়াও আমাদের বিজয় অর্জন এবং রাজশাহী শহর সংলগ্ন পদ্মানদীর তীরে টি-বাঁধে ঐতিহাসিক বাবলা বনের বধ্যভূমি থেকে ৩০ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে অগণিত লাশ উদ্ধার। জাতিসঙ্ঘে বঙ্গবন্ধু, সংগ্রামী ভিয়েতনামের পাশে বাংলাদেশ, তারপর উচ্চ আদালতের রায়. প্রয়াত নেতৃবৃন্দের একাংশের ছবি প্রদর্শন, গেজেট ও তালিকা প্রকাশ, বিশেষত গেরিলা বাহিনীর তালিকা প্রকাশ, বৃহত্তর রাজশাহী জেলা ন্যাপ কমিউনিস্ট পার্টি ও ছাত্র ইউনিয়নের বিশেষ গেরিলা বাহিনী, নারী বাহিনীর কর্মপ্রয়াসসহ, নানা ধরনের স্লোগান সংযুক্ত রয়েছে। তারপর সবশেষ কৃতজ্ঞতা স্বীকার, লেখক বাম রাজনীতির পুরোধা ব্যক্তিত্ব বীরমুক্তিযোদ্ধা পঙ্কজ ভট্টাচার্য, ন্যাপনেতা, বীরমুক্তিযোদ্ধা ও সাংবাদিক মুস্তাফিজুর রহমান খান আলম, মাওলানা মুফ্তি মো. শাহাদাত আলী, ছোট বোনকে চিঠি, একটি কৈফিয়ত এবং আত্মপরিচয়, প্রাসঙ্গিক কিছু কথা ও তথ্যসূত্র বিবৃত করেছেন।
আমাদের এ গ্রন্থের লেখক বীরমুক্তিযোদ্ধা এ্যাড মো. সাইদুল ইসলাম দীর্ঘকাল বাম ঘরানার রাজনীতির সঙ্গে সংযুক্ত ছিলেন এবং এখনো জড়িত রয়েছেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় গেরিলা বাহিনীর সদস্য হিসেবে জীবনটা হাতের মুঠোয় নিয়ে বাংলাদেশ নামক স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রামে লিপ্ত থেকেছেন। স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পূর্তিতে এই গ্রন্থে দুর্লভ, তথ্যসমৃদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধের অনেক অজানা কথা তুলে ধরেছেন লেখক। এজন্য তাঁকে বারবার সাধুবাদ জানাই। মু্্ক্িতযুদ্ধের সময় ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি ও ছাত্র ইউনিয়নের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই সংকট কালে মুক্তিযুদ্ধকে সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য একটি অত্যন্ত উচ্চপর্যায়ের উপদেষ্টা ম-লী বোর্ড গঠন করা হয়। সেখানে আওয়ামী লীগ দলের কয়েকজন সদস্য ছাড়াও সংগ্রামী জননেতা মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, কমিউনিস্টি পার্টির নেতা মণি সিং, ন্যাপনেতা অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ ও বাংলাদেশ কংগ্রেস পার্টির মনোরঞ্জন ধরকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। পাকিস্তান হানাদার ও তাদের দোসররা সাধারণ মানুষকে অমানবিক ও নির্মম হত্যাকা-, নারীদের অবাধে ধর্ষণ ও হত্যা এবং গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়েছে। এই হত্যাকান্ডের বিরুদ্ধে এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে শক্ত অবস্থান গ্রহণের নিমিত্তে মস্কোপন্থি ন্যাপনেতা অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ রাশিয়া যান এবং তিনি রাশিয়ার প্রেসিডেন্টকে পরাশক্তি হিসেবে আমেরিকার বিরুদ্ধে ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের জন্য অনুরোধ জানান। এ প্রেক্ষিতে, রাশিয়ার বলিষ্ঠ ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যমন্ডিত। এ জন্য আমরা রাশিয়ার তৎকালীন সরকারপ্রধান ও জনগণের কাছে অশেষ ঋণে আবদ্ধ।
লেখক গ্রন্থের শুরুতেই আমাদের প্রাণপ্রিয় জননেতা ও রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের মেয়র জনাব এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন সম্পর্কে ও লেখক সম্পর্কে চমৎকার মন্তব্য করেছেন। তিনি যথার্থই মন্তব্য বলেছেন ‘১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বিশ্বের মানচিত্রে খোদিত হয় আরো একটি নাম- ‘স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ।’ এ স্বাধীনতা আমাদের তথা বাঙালি জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন, সবচেয়ে গৌরবের, সবচেয়ে আনন্দ-দু:খ-কষ্ট-বেদনার। লাখো শহিদের বুকের তাজা রক্তে ভেজা, কত শত-হাজার-লক্ষ মা-বোনের আত্মত্যাগ আর নারী নির্যাতন ও সম্ভ্রমের বিনিময়ে পাওয়া স্বাধীনতা, কত অশ্রু গাঁথা স্বাধীনতার এই কত আনন্দ-বেদনার, রক্ত কুসুমে নির্মাল্যখানি।’
এছাড়াও লেখক সম্পর্কে তাঁর আরো একটি যুক্তিনিষ্ঠ ও মূল্যবান মন্তব্য হলো :‘ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যতগুলো গ্রন্থ এ পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছে এবং আমার দৃষ্টি গোচর হয়েছে, তার মধ্যে এই গ্রন্থটিকে এক শব্দে সকলের গ্রহণযোগ্য বললে বোধ হয় অত্যুক্তি হবে না। কারণ গ্রন্থটিতে মাঠ পর্যায়ের আলোচনা-তুলনামূলকভাবে বেশিস্থান পেয়েছে। এতে এমন অনেক বিষয় নিয়ে আলোচান করা হয়েছে, যা পূর্বে দৃষ্টির আড়ালেই ছিল। ’এ গ্রন্থের প্রারম্ভেই প্রখ্যাত রাজনীতিক, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও ঐক্যন্যাপের সভাপতি শ্রী পঙ্কজ ভট্টাচার্য তাঁর কথকতায় কিভাবে ভারতে গিয়ে ন্যাপ-সিপিবি-ছাত্র ইউনিয়নের প্রায় ১২ হাজার কর্মী মুক্তি বাহিনীতে যোগদানের পর পাঁচ হাজার গেরিলা বাহিনী বিশেষ ট্রেনিং নিয়ে অপারেশনের জন্য তাঁরা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেন। তিনি বলেন, উক্ত গেরিলা বাহিনী বাংলাদেশের স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অন্যতম অংশীদার/ গেরিলা বাহিনী নামাঙ্কিত শক্তির সমাবেশ বিশেষত ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়ন বাম প্রগতিশীল শক্তিসমূহ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে জাতীয়তাবাদী শক্তির পাশাপাশি পরিপূরক ভূমিকা পালন করে।’ উল্লেখ্য,..‘তৎকালীন সমাজতান্ত্রিক শিবিরের নেতৃত্বদানকারী সোভিয়েত ইউনিয়নের মুক্তি সংগ্রামে সক্রিয় সমর্থন ও সহযোগিতা। বিশেষভাবে উল্লেখ্য, তিন তিন বার জাতিসংঘে বাংলাাদেশের পক্ষে রাশিয়ার ভেটো প্রদানের ঘটনা এবং মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের প্রাক্কালে বঙ্গোপসাগরে মার্কিন সপ্তম নৌবহর প্রতিহতকরণে রুশ অষ্টম নৌবহরের উপস্থিতির হুমকির মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের বিজয়কে কণ্টকমুক্ত করে তোলা সহজ হয়েছিল।’
এ ছাড়াও গ্রন্থের সামনের অংশে বিশিষ্ট ন্যাপ নেতা ও বীর মুক্তিযোদ্ধা জনাব মুস্তাফিজুর রহমান খান আলম‘দুটি কথা’ তসিকুল ইসলাম রাজা’র অভিমত, রাজশাহীর উত্তরা প্রতিদিন পত্রিকার সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ বাবলু ‘গ্রন্থ প্রসঙ্গে’, বিশিষ্ট রাজনীতিক, কলামিস্ট ও বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রশান্ত কুমার সাহা, ‘রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞার, বহি:প্রকাশ’ ‘ফিরে দেখা- রাজনীতির দর্শন ও মুক্তিযুদ্ধ,’ ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক গোলাম জিলানী’র ‘মুক্তিযুদ্ধের নানাবিধ, সংগ্রামের ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করেছে’ ‘ফিরে দেখা- রাজনীতির দর্শন ও মুক্তিযুদ্ধ’ গ্রন্থটি এবং Enayet Rasul Bhuiyan Daily Observer’26 June 2021 Reviwed লেখাটি এখানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি ও ছাত্র ইউনিয়নের অবদানকে জাতীয়ভাবে স্বীকৃতি দেয়া হয়নি। এ জন্য বীরমুক্তিযোদ্ধা বিশিষ্ট ন্যাপনেতা ও রাজনীতিক পঙ্কজ ভট্টাচার্য হাইকোর্টে একটি মামলা করেন এবং এর ফলে, বাংলাদেশ সরকার ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় যথারীতি তাঁদের স্বীকৃতি দান করে। এ বিষয়টি নতুন একটি বিজয়ও বটে ! লেখক অত্যন্ত নিপূণভাবে ও জোরালো কমলশক্তির মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধাএবং গেরিলা বাহিনীর তৎপরতা -সে সঙ্গে মহান ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকদের ছবি, জীবনকথা, ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতি, এবং নানা বিষয়ে প্রাঞ্জল ও তথ্যনিষ্ঠ চমৎকার বর্ণনায় গ্রন্থটিকে একটি অমূল্য দলিল হিসেবে প্রকাশ করেছেন। তবে পরিশেষে লেখককে অনুরোধ করবো, গ্রন্থটিতে এখনো পীড়াদায়ক অনেক বানান বিভ্রাট রয়েছে। যেভাবেই হোক লেখক আগামীতে নির্ভুল গ্রন্থ প্রকাশ করবেন এবং গ্রন্থ শেষে একটি নির্ঘণ্ট সংযোজন করবেন এই প্রত্যাশা করি। গ্রন্থটির আরো চমৎকার ও তথ্যসমৃদ্ধ সংস্করণ হোক এবং আরো বহুল প্রচার ও প্রকাশ হোক আজ এইমাত্র কামনা। লেখকে আবারো ধন্যবাদ ও অভিনন্দন।