গ্রন্থ আলোচনা শিশুসাহিত্য : মনস্তাত্ত্বিক প্রাধান্যে সুখেন মুখোপাধ্যায়

আপডেট: জুন ১১, ২০২১, ১:১২ পূর্বাহ্ণ

এস এম তিতুমীর:


সাহিত্য হলো মনকে সজীব রাখার উৎকৃষ্ট উপায়। আর কল্পনার জগত প্রসারিত করতে সাহিত্যের ভূমিকা অনবদ্য। কেবল শিশুদের নয় সাহিত্য বড়দেরও কল্পনার জগত প্রসারিত করে। আমরা যদি মান বিচারের প্রশ্ন উৎরিয়ে পাঠাগ্রাহ্যের দিকে যায় তাহলেও দেখি সাহিত্য তা তার চুম্বকীয় দর্শনে করে থাকে। অ তে অজগর আ তে আম এমন
সব উপমা দিয়েই তো বর্ণপরিচয়ের পাশাপাশি পারপাশের বাস্তব জ্ঞান উঠে আসে। সাথে সাথে শিশু মনে তৈরি হয় তার নিজস্ব কল্পনার জগত। সে তখন নিজের মত করে দেখে প্রকৃতি। আর আস্তে আস্তে বাড়তে থাকে জানার পরিধি। কবিগুরু বলছেন ‘সহ কথা যায় না বলা সহজে’। সহজ করে বলা বোধকরি সত্যিই কঠিন। বিশেষ করে শিশুদের উপযোগি করে কোনো কিছু বলা বা লেখা। কিন্তু চেষ্টার কি অন্ত আছে ?। না, নাই। আর অন্ত নাই বলেই আমাদের শিশুতোষ সাহিত্য এখনো শিশুদের মানসিক পুষ্টি সাধন করে চলেছে। খগেন্দ্রনাথ মিত্রের বাংলা শিশুসাহিত্য অথবা আশা গঙ্গোপধ্যায়ের শিশুসাহিত্যের হাত ধরে এই সাহিত্য পৌঁছে গেছে বিশ্বসাহিত্যের সমকক্ষে। বাংলা শিশুসাহিত্যের কৃতিমান পুরুষ উপেন্দকিশোর রায় চৌধুরী যে জগত তৈরি করে দিয়েছেন তা আজও উজ্জ্বল হয়ে আছে। সুখেন মুখোপাধ্যায় বাংলা শিশুসাহিত্যে হাজির হয়েছেন তার ‘নীল পাখির পালক’ নিয়ে। তার দিয়েই তিনি তৈরি করেছেন দারুণ এক মেন্টাল কনডাক্টিং যা বাংলা শিশুসাহিত্যের উত্তরকালকে ছাপিয়ে মিলে যায় নতুন ধারায়। আর এখানেই তিনি তার মুন্সিয়ানার সাক্ষর রেখেছেন। যে ধারায় শিশুদের পাঠ্যাভাসমুখি করে তোলার প্রাণান্তকর প্রয়াস অব্যাহত আছে। আমরা যে যেভাবেই যা কিছুই বলিনা কেনো তার সবটাই চলে যায় প্রসারের খাতায়। আসলে মনে প্রসার ঘটানোই হলো মূল লক্ষ্য। ‘নীল পাখির পালক’ -এ গল্পের মূল চরিত্র মউ। গাছের মরা ডালের গর্তে পাখির ছানা খেতে একটা সাপ যখন জিভ বের করে আর লেজ উঁচিয়ে উদ্যত তখন মউয়ের বুকের মধ্যে ঢিপ ঢিপ করছে। এই যে ছানাগুলোর জন্য তার মনোবেদনা তা ছড়িয়ে যাবে অন্য সব শিশুদের মাঝেও। আবার ‘অ্যানাকোন্ডা বধ’-এতে সুখেন মুখোপাধ্যায় এক অলৌকিক রমণীর অভিশাপ দিয়ে রাজপুরীর গল্প বলেছেন। সেখানেও গভীর জ্ঞানে কথা এসেছে-‘ অপূর্ব জ্যোর্তিময় বালক আনন্দ’র সামনে এসে দাঁড়াল। আনন্দকে প্রণাম করে বরল- হে মাহশক্তিমান সত্যবাদী আনন্দ, আমি গত দশ বছর ধরে তোমার আপেক্ষাতেই ছিলাম। আমি আসলে একজন গণ্ধসঢ়;ধর্বপুত্র। এক যোগীর অভিশাপে এতদিন সাপ হয়ে ছিলাম। কথা ছিলো কোন এক সত্যবাদী বালকের আঘাতে আমি আমার স্বরূপ ফিরে পাবো।’ তারপর ‘আনন্দ আশ্রম’ এখানে উঠে এসেছে কিশোরদলের দুরন্তপনা। আর ভূত-প্রেতের কথা যদি বলি তাহলে বলতে হয় তা শিশু-কিশোর মনে এক অদম্য কৌতূহল। এখানে দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার অবশ্যই স্মরণীয়। ঠাকুর মা’র ঝুলি না থাকলে হয়তো বাংলা শিশু সাহিত্যে অসন্তোষ থেকে যেত। সুখেন মুখোপাধ্যায় ভূত-প্রেত এড়িয়ে যাননি। লিখেছেন ‘গাছবাড়ির ভূত’। বৃতা মানের শিমু মন কথা বলে ভূতের সাথে। মনস্তাত্ত্বিক সাধনায় সুখেন মুখোপাধ্যায় যথাযথ চিন্তার ব্যবহার করতে পেরেছেন। শিশুসহিত্যে সুকুমার রায় যেমন হাসিয়েছেন শিশু মন তেমনি হাসির রসদও এসেছে এখানকার গল্পে। মানুষের মন যতো প্রসারিত হবে ততই মানুষ নিঁচুতা ও গ্লানির মধ্যে সুন্দরের সন্ধান পাবে। শিশুদের মন স্বর্গীয় ফুলে মতন। তাদের পরিচর্যা আর নতুনের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়া বড়দের দায়িত্ব। নীল পাখির পালক সুখেন মুখোপাধায়ের অনবদ্য শিশু-কিশোর গল্পের সংকলন । শিশুদের আনন্দ-ন্বপ্ন এবং কল্পনার জগতের নানা বিষয় উঠে এসেছে এই গল্পগ্রন্থে। বিচিত্র বিষয়ের অবতারনা করে সুখেন মুখোপাধ্যায় এই গ্রন্থটিকে সমৃদ্ধ করছেন। এখানে অবশ্য জীবনভিত্তিক অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানের সংমিশ্রণ স্বর্ণ আকরে পরিস্ফূট। এগল্পগুলো পড়ে শিশুরা আনন্দের পাশাপাশি সত্যসুন্দর ভাবনা ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হওয়ার প্রেরণা পাবে। সুখেন মুখোপাধ্যায় মূলত শিশু মনস্তাত্ত্বিক লেখক। পেশাগত জীবনে শিশুদের নিয়ে ছিলো তার নিরন্তর কর্মচাঞ্চল্য। তাই বিবিধ প্রসঙ্গ নিয়ে তিনি লিখেছেন। এ গ্রন্থে মোট উনিশটি গল্প সংযোজিত হয়েছে। রামছাগলের ছানার নাম ‘তুফান’ তা দিয়েই গল্প জমে উঠেছে কোথাও। আবার কোথাও ‘কিসমত’ নামে দাদাজির কথা দিয়ে। গল্পগুলো পড়লে যে শুধু শিশুরাই আনন্দ পাবে তা না। সেখানে রূপকথার ছলে বড়দের জন্যও অনেক বার্তা তিনি দিয়েছেন। এখানকার সব গল্পে সব বয়সিই ঢুকে যেতে পারবেন অনায়াসে। পাঠেই জাগ্রত হোন মনোজগত। যা মানসিক সুস্থতার জন্য খুব প্রয়োজন।