বঙ্গবন্ধুর শততম জন্মবার্ষিকী

গ্রামীণ জনপদে নজরুল চর্চা কেন্দ্র্র্র্র্র

আপডেট: December 8, 2019, 1:01 am

ড. মোহা. আজমল খান


অন্যায় অবিচার ও শোষণের দাবানল থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য সোচ্চার হয়ে মানুষে মানুষে ভ্রাতৃত্ববোধ ও শোষণ বৈষম্যমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার অদম্য আগ্রহ নিয়ে কাজী নজরুলের কণ্ঠে যখন উচ্চারিত হয়েছিল-
“গাহি সাম্যের গান
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই
নাই কিছু মহীয়ান”
একে শ্লোগান হিসেবে ধারণ করে কতিপয় উদ্যোক্তারা অবিভক্ত বাঙলার পূর্ব বাংলার গ্রামীণ জনপদ দিনাজপুর জেলার রাণীর বন্দরে ১৯৪৮ সালের কোনো এক তারিখে গড়ে তোলেন শাহ আমিনুল এর বৈঠক খানায় ‘আনসার ক্লাব’ নামে একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান। এ ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন জনাব শাহ আফতাব উদ্দিন আহম্মেদ এবং সম্পাদক ছিলেন জনাব এসএম মাহতাব বেগ। এ সকল উদ্যোক্তারা ‘নজরুল’ চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ১৯৫৪ সালের ২৫ মে মোতাবেক ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৩৬১ বঙ্গাব্দে নজরুলের জন্ম তারিখকে উপলক্ষ করে আনসার ক্লাবকে রূপান্তর করেন ‘নজরুল পাঠাগার ও ক্লাব’ নামে। প্রতিষ্ঠিত হয় এক ভিন্নধর্মী প্রতিষ্ঠান যাকে আমরা গ্রামীণ জনপদে নজরুল চর্চা কেন্দ্র এবং সংস্কৃতি বিকাশের প্রতিষ্ঠান হিসেবে অভিহিত করতে পারি। এ প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে যারা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন তাঁরা হচ্ছেন সর্বজনাব শহিদ এসএম মাহতাব বেগ, শাহ আফতাব উদ্দিন আহম্মেদ ও মরহুম শাহ আমিনুল হক। তাঁদের এ মহৎ উদ্যোগে নজরুল চর্চার সুযোগ হয়েছে এ গ্রামীণ জনপদে যা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। এ প্রতিষ্ঠানটি জন্মলগ্ন থেকে শিক্ষা, সংস্কৃতি, খেলাধুলা ও সমাজকল্যাণ মূলক কাজে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা পালন করে আসছে। ফলে অনাড়ন্বরভাবে ১৯৮১ সালে ‘রজত জয়ন্তী’, ২০০৮ সালে ‘সুবর্ণ জয়ন্তী’, ২০১০ সালে ‘নজরুল জন্ম জয়ন্তী’ এবং ২০১২ সালে বিশ^কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সার্ধশততম এবং বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামে ১১৩ তম জন্মজয়ন্তী পালন করে। এসব অনুষ্ঠানে এপার ও ওপার বাংলার গুণিজনদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে এ গ্রামীণ জনপদ। এ প্রতিষ্ঠানের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য শাহ আফতাব উদ্দিন আহম্মেদ এর সহযোগিতায় ১৯৬৫ সালে ১.০৬ একর জমির উপর নজরুল পাঠাগার ও ক্লাবসহ সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে ওঠে রাণীরবন্দর নজরুল ইন্সটিটিউট ও বয়ন বিদ্যালয় যা পরবর্তীতে রাণীর বন্দর এনআই গার্লস হাইস্কুলে রূপান্তরিত হয়ে বিদ্যমান রয়েছে। ২০১৪ সালে নজরুল পাঠাগার ও ক্লাবের ৬০ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে দু’মাসব্যাপি এক বর্ণাঢ্য কর্মসূচি আয়োজনের মাধ্যমে এপার ওপার বাংলার গুণিজনদের এক মিলন মেলার আসর বসে। এ আসরে কাজী নজরুল ইসলামের জীবন ও সাহিত্য নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে নজরুল প্রেমী ও নজরুল চর্চার পথকে সম্প্রসারিত করেছে। এ প্রতিষ্ঠানটির গুনগত দিক বিচারে দেখা যায়, দেশ-বিদেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের পদধুলির ছোঁয়া লেগেছে পরিদর্শন বই এ স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে। প্রতিষ্ঠানটির সংগৃহীত বইয়ের তালিকায় বিভিন্ন ধরনের ৩৩৮০ টি বই স্থান পেয়েছে, যা গ্রামীণ জনপদের জন্য অত্যন্ত প্রশংসনীয়। এ প্রতিষ্ঠানটি ২০১২ সালে বিশ^ কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সার্ধশততম এবং বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামে ১১৩ তম জন্ম জয়ন্তীতে ‘ঢেউ’ নামে স্মরণিকা প্রকাশ করে এবং ৬০ বছর পূর্তিতে (১৯৫৪-২০১৪) স্মরণিকা ‘পারাবার’ প্রকাশ করেছে। গুণী লেখক ও প্রাবন্ধিকদের অনেক রচনা এ স্মরণিকাদ্বয়ে স্থান পেয়েছে যা নজরুল প্রেমী ও গবেষকদের বহু অজনা তথ্য লাভের মাধ্যমে তথ্য ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করার পথ সুগম করেছে। আমাদের জাতীয কবিকে তরুণ প্রজন্মের জানবার জন্য তার সৃষ্ট সাহিত্য কর্মকে বিকশিত করার লক্ষে নজরুল পাঠাগার ও ক্লাবের ন্যায় নজরুল চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশের অভ্যন্তরে শহর থেকে গ্রামীণ জনপদে গড়ে ওঠুক আরো নজরুল চর্চা কেন্দ্র। এ হোক মোদের প্রত্যাশা।
লেখক: নজরুল গবেষক