ঘটনাবহুল ৭ নভেম্বর কার সাথে কাদের বিপ্লব, সংহতিই বা কাদের সাথে, জানা দরকার!

আপডেট: নভেম্বর ৮, ২০১৯, ১২:৫৫ পূর্বাহ্ণ

৭ নভেম্বর ১৯৭৫-এর দিনটি বেশ ঘটনাবহুল। ওই ঘটনার মধ্য দিয়েই বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতি জটিল এবং ওলট-পালট হয়ে যায়। ঘটনার ৪৪ বছর পরেও জাতীয় রাজনীতি সেই জটিল অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে পারে নি। ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট পক্ষ এবং ঘটনা থেকে সবিধা লাভকারীপক্ষ দিবসটি নানা অভিধায় পালন করে থাকে। এবারেও তার অন্যথা হয় নি। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক সংগঠন পৃথক নামে দিবসটি পালন করেছে। বিএনপি ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ হিসেবে, জাসদ ‘সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান দিবস’ হিসেবে। আর প্রগতিশীল দল ও সংগঠনগুলোর অনেকে ‘মুক্তিযোদ্ধা সৈনিক হত্যা দিবস’ হিসেবে পালন করেছে।
যে ভাবেই দিবসটি পালন করা হোক না কেন ওই দিনের ঘটনা এখনো বিভ্রান্তির মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। ঘটনাকে পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ, সংশ্লিষ্ট পক্ষসমূহের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কী ছিল এবং ওই ঘটনার নেপথ্যে দেশি ও বিদেশি কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা ছিল কিনা সে ব্যাপারে কোনো পর্যবেক্ষণ কিংবা তদন্ত নেই। ফলে ঘটনার পর থেকেই ওই ঘটনা সম্পর্কে একই ধরনের বক্তব্য চলে আসছে।
৭ নভেম্বর কেন বিপ্লব, কার বিরুদ্ধে কার বিপ্লবÑ সংহতিই বা কার সাথেÑ এসব প্রশ্নের উত্তর আজো অজানা থেকে গেছে। জনগণ যেখানে সম্পৃক্তই হলো না- সেটাকে গণলতান্ত্রিক রাজনৈতিক পরিভাষায় ‘বিপ্লব’ বলা যায় কি? আর কে কার সাথে সংহতি প্রকাশ করলোÑ এখানেও তো জনগণের কোনো অংশগ্রহণ ছিল না। একটি হঠকারী রাজনৈতিক দলের কমি-সমর্থকরা অভ্যূত্থানকারী সেনাবাহিনীর গাড়িতে উঠে উল্লাস প্রকাশ করাই কি সংহতি? অর্থাৎ ৪৪ বছর ধরে দেশের মানুষকে ধাধার মধ্যেই রাখা হয়েছে। ৭ নভেম্বরের ঘটনা পরিষ্কার করার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে না।
সংবাদ মাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর অভ্যুত্থান জাসদের পরিকল্পনায় হলেও এর পুরোপুরি সুফল পেয়েছেন তখনকার সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান। রাজনীতিতে অমন ল্যাং মারার ঘটনা কম নেই। ৭ নভেম্বরের ঘটনার উদ্দেশ্য তো একইÑ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করা। সেটা অবশ্যই গণতান্ত্রিক পন্থায় হয়নি। একটি গণতান্ত্রিক সরকারকে নৃশংস হত্যাকা-ের মধ্য দিয়ে সরিয়েই ক্ষমতা দখলের উদ্দেশ্য সাধন করা হয়েছে। জাতির পিতাকে হত্যা করার মত ধৃষ্টতাই এই ক্ষমতা দখলের মূল উদ্দেশ্য ছিল। উভয় পক্ষ একই উদ্দেশ্য নিয়েই কাজ করেছে। এর মধ্যে কোথাও জনগণ ছিল না। আর জনগণ থাকলে এ দেশে আওয়ামীলীগের রাজনীতি আর কখনোও মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারতো না। জনগণ যে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের কোনো বিষয় ছিল না- সেটা ওই সময়ের জাসদের রাজনৈতিক ধারা থেকেই স্পষ্ট হয়। তথ্যমতে ১৯৭৪ সালে জাসদ তাদের চিন্তাধারা তৈরি হলো, “আন্দোলন মানে সশস্ত্র সংগ্রাম আর সংগঠন মানে সেনাবাহিনী।” সেই লক্ষে জাসদের ছত্রছায়ায় গড়ে উঠে বিপ্লবী গণবাহিনী। এছাড়া সামরিক বাহিনীর মধ্যে ১৯৭৩ সালে থেকে কাজ করছিল বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা। তাদের উদ্দেশ্যই ছিল বঙ্গবন্ধু সরকারকে উৎখাত করা। ৭ নভেম্বর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে দিয়েই রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করতে চেয়েছিল। কিন্তু জিয়া সেটা নিজেই কুক্ষিগত করে।
১৫ আগস্ট ও ৩ নভেম্বর ট্রাজেডি এবং ৭ নভেম্বরের ফল ছিল বাংলাদেশকে পাকিস্তানি ধ্যান-ধারণাই পরিচালনা করা। এবং সেটা জিয়া-বিএনপির হাত ধরে স্বাধীনতাবিরোধীরা রাষ্ট্র ক্ষমতায় পর্যন্ত অধিষ্ঠিত হয়েছিল। অর্থাৎ প্রতিবিপ্লব হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরুদ্ধে আর সংহতি হয়েছে পাকিস্তানি ধারার রাজনীতির সাথে।
অতএব ১৫ আগস্ট ও ৩ রা নভেম্বরের ট্রাজেডি এবং ৭ নভেম্বরের নেপথ্যের কারিগরদের মুখোশ উন্মোচন করার সময় এসেছে। শক্তিশালী একটি কমিশন গঠন করে ওইসব ঘটনার সাথে কার কতটুকু দায় ছিল, এর নেপথ্যে কে বা কারা জড়িত ছিল সেগুলি চিহ্নিত হওয়া বাঞ্ছনীয়। একই সাথে সংশ্লিষ্টদের বিচারের আওতায় আনতে হবে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ