‘ঘরোয়া ক্রিকেটে দর্শক থাকে না’

আপডেট: জুলাই ২৯, ২০১৭, ১২:৩৪ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক    


বাংলাদেশের ক্রিকেটের অবিস্মরণীয় নাম মোহাম্মদ রফিক। দেশের প্রথম আন্তর্জাতিক ওয়ানডে জয়টি এসেছে তার হাত ধরেই। প্রথম টেস্ট জয়েও ছিল দারুণ অবদান। দেশের হয়ে দুই সংস্করণেই প্রথম শত উইকেট শিকারি তিনি। যে রেকর্ড ভেঙে ফেলা আর কোনো বাংলাদেশির সম্ভব নয়। খেলোয়াড়ি জীবনে বল হাতে যেমন প্রতিপক্ষকে শাসন করতেন তেমনি তার ব্যাটিং তা-বেও উড়ে গেছে অনেক প্রতিপক্ষ। ক্রিকেটটা ছাড়লেও ক্রিকেটের মায়াটা ছাড়তে পারেন নি। বিসিবি ডাকলেই ছুটে যান। তবে স্থায়ী জায়গা চেয়েও পান নি। অভিমানটা ফুটে ওঠে তার কথাতে। এখন কিংবদন্তি এই ক্রিকেটার মাস্টার্স ক্রিকেট কার্নিভাল নামের ফান ক্রিকেট খেলতে আছেন কক্সবাজারে। শুক্রবার সেখানেই পরিবর্তন প্রতিবেদক রামিন তালুকদার এর সঙ্গে দীর্ঘ আলাপ হলো মোহাম্মদ রফিকের। সেই আলাপ তুলে ধরা হলো পাঠকদের জন্য।
ক্রিকেটতো ছেড়েছেন অনেকদিন, এখন কি করছেন?
রফিক : রংপুরের সাথে আছি বিপিএলে। মাঝে আবাহনীর সঙ্গে ছিলাম, কিছুদিন বিরতি পড়ে গেছে হজ্বের কারণে। আমাদের বিদ্যুৎমন্ত্রী বিপু ভাই একটা স্টেডিয়াম করে দিয়েছে আমাদের এলাকায়। কাজ অনেকটা হয়ে গেছে, এখন ড্রেসিংরুম আর ইনডোরের কাজ বাকি আছে। ওইখানে কেরানীগঞ্জের নামেই পেশাদারভাবে একটা একাডেমি করবো।
বাংলাদেশের প্রথম ওয়ানডে জয়টা এসেছে আপনার ব্যাট থেকেই। ওইটা কি আপনার সবচেয়ে সেরা ইনিংস?
রফিক : সত্যি বলতে, আমার পছন্দ, শুধু আমার না, সবাই বলবে। বাংলাদেশের প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচে ম্যাচসেরা হয়েছিলাম।
টেস্টে সেঞ্চুরি অবশ্যই বিশাল কিছু। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে আপনি একটা টেস্টে সেঞ্চুরিও করেছিলেন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ছাড়ার পরও ঘরোয়াতে অনেক ভালো খেলেছেন বেশ ক বছর। আরও কিছু দিন খেলতে পারলে হয়তো নামের পাশে আরও কিছু যোগ হতো?
রফিক : অতো কিছু মনে নেই। বেশি খেললে হয়তো আরও বেশি করতাম। ১১১ করেছি, সেটা কাটিয়ে ১২০ করতাম হয়তো। পেশাদার হতে হলে নিজের রেকর্ড নিজে ভাঙবেন। সাকিব-তামিমকে দেখেন। নিজের রেকর্ড নিজে ভেঙেই এতোদূর এসেছে। কোনো দেশে এমন যদি চার-পাঁচটা খেলোয়াড় থাকে, তাহলেই দেশের ক্রিকেট এগিয়ে যায়।
আপনারা যখন ঘরোয়া ক্রিকেট খেলতেন তখন অনেক দর্শক হতো। এখন ঘরোয়া ক্রিকেট প্রায় দর্শকশুন্য। এটা আপনাকে কতটুকু কষ্ট দেয়?
রফিক : আমি ৮৮ থেকে ঢাকা লিগ খেলেছি। বিমানে প্রথম ঢুকি। তখন এতো টাকা ছিল না। কিন্তু ক্রিকেটাররা ক্ষুধার্ত ছিল, কিভাবে খেলার উন্নতি করা যায়। আল্লাহর রহমতে এখন ক্রিকেটে অনেক টাকা পয়সা হয়েছে। কিন্তু আমরা পিছিয়ে যাচ্ছি। ঘরোয়া ক্রিকেটে দর্শক থাকে না। কারণ আছে। এখন তো আগের মতো দর্শক সুবিধা নেই, নিরাপত্তা নেই।  বিকেএসপি বা ফতুল্লায় দুই দল ছাড়া কে যায়? আমরা ঢাকা স্টেডিয়ামে (বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম) খেলেছি, আবাহনী মাঠে খেলেছি, কতো দর্শক। মোহামেডানের হয়ে আবাহনীর মাঠে খেলতে গেছি। আমাদের ক্রিকেট হয়তো এখন আরও ফোকাস হয়েছে, কিন্তু দর্শক প্রাপ্তির দিকে আমরা পিছিয়ে গেছি।
এ সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য কি করা উচিৎ বলে মনে করেন?
রফিক : বঙ্গবন্ধুতে ক্রিকেট ফিরলে আরও অনেক দর্শক হবে। দেশি-বিদেশি বলেন, সবাই তো বঙ্গবন্ধু মাঠকেই চেনে। বালির ওপর মাঠ করলে তো হবে না। ক্রিকেট মাঠ ক্রিকেটের মতো করে তৈরি করতে হবে। পরিকল্পনা করতে হবে।
আপনি এক সময় টেস্ট ও ওয়ানডেতে সর্বোচ্চ উইকেটশিকারী ছিলেন। এখন সাকিব-মাশরাফিরা আপনার রেকর্ড ভেঙে ফেলছে। এটা কেমন লাগে?
রফিক : আমি যে পর্যায়ে খেলেছি, তিন বছরে একটা এশিয়া কাপ খেলেছি। এখন তো তিন বছরে ৬০-৭০টা ম্যাচ হয়। আমি এতো সুযোগ পেলে আমার আরও বেশি উইকেট থাকতো। আমি একটা পর্যায় পর্যন্ত এনে দিয়েছি। এখন সাকিবরা যেভাবে খেলছে, পরবর্তী প্রজন্ম আরও ভালো খেলবে। আর বাংলাদেশে টেস্ট বা ওয়ানডেতে প্রথম ১০০ উইকেট আমার। এটাতো কেউ ভাঙতে পারবে না। বাংলাদেশে ক্রিকেট যতোদিন থাকবে, রফিকের নাম থাকবে। ৫০০ বছর পরও স্মরণ করবে।
অনেকদিন পর খেলছেন, এখনও দারুণ খেলেন। মনে হচ্ছে সর্বোচ্চ পর্যায়ে খেলার জন্য তৈরি…
রফিক : আসলে ক্রিকেটের বাইরে থাকলে একরকম অনুভূতি থাকে, ক্রিকেট মাঠে আরেকরকম। আমি যে পর্যায়েই খেলি না কেন, মানসিকতা একই থাকে। হয়তো একটা তরুণ ছেলের সাথে আমি দৌড়ে পারবো না, কিন্তু আমার ইচ্ছা থাকবে তাদের সাথে প্রতিযোগিতা করার।
এখন খেললে কোন পর্যায়ে থাকতেন বলে মনে করেন?
রফিক : আমি পাওয়ার ক্রিকেট পছন্দ করতাম, সেটাই এসেছে। টি-টোয়েন্টি, তখন এমন থাকলে, আজ সাকিব যেমন আমিও সেভাবে থাকতাম।
আপনি যখন ক্রিকেট ছেড়েছেন তখন টি-টুয়েন্টি ছিলোনা। এখন এ সংস্করণই বিশ্ব মাতাচ্ছে। আফসোস হয় কি? কারণ আপনি খুব পাওয়ার হিটার ছিলেন।
রফিক : আমরা যখন যেটা খেলেছি, সেটাই সেরা ছিল। তবে আমি যদি এখন খেলতাম, তাহলে দেখা যেতো আমিই সেরা ক্রিকেটার থাকতাম। কারণ আমি পাওয়ার ক্রিকেট খেলতাম। আফসোসের কিছু নাই। আমরা যে ধারায় খেলেছি, এখন টি-টোয়েন্টি এসেছে। সামনে আরও নতুন কিছু আসবে। পরিবর্তন হচ্ছে। ক্রিকেটার যতো খেলবে, ততো অভিজ্ঞতা বাড়বে, মেধাবি ক্রিকেটার আরও বেড়িয়ে আসবে।
আপনাদের সময় এমন কোন ক্রিকেটার ছিল যাকে আপনার বল করতে ভয় করতো। আপনার দৃষ্টিতে সেরা ব্যাটসম্যান কে ছিল?
রফিক : আগে ভালো ক্রিকেটার ছিল। নান্নু বা বুলবুলের মতো ব্যাটসম্যান খুব কম ছিল। তারা অনেক মেধাবি ছিল। অনেক কঠিন ব্যাটসম্যান ছিল।
আপনার ক্রিকেট ক্যারিয়ারের সেরা উইকেট কোনটি। যাকে আউট করার স্মৃতি এখনও আপনাকে আনন্দ দেয়?
রফিক : সেরা অনেক আছে। সব দলেই একজন দুইজন মাথা থাকে। তাকেই আমি লক্ষ্য করতাম। যেমন ভারতে শচীন ছিল। ভারতের সঙ্গে খেললেই আমি টেন্ডুলকারকে আউট করতে চাইতাম। একবার পন্টিংকে বোল্ড করেছিলাম। পন্টিং ভেবেছিল, হয়তো কিপার ধরে উইকেট ফেলে দিয়েছে। পরে থার্ড আম্পায়ার কল করে দেখলো, না, বোল্ড।
দেশের সেরা স্পিনার ছিলেন। অভিজ্ঞতাও অনেক। দেশের ক্রিকেটের জন্য কিছু করার লক্ষ্য আছে?
রফিক : ম্যানেজমেন্ট তো সেভাবে চিন্তা করে না। আমি খেলার সময়ই বলেছি, আমি কাজ করতে চাই অবসরের পর। আমাকে কাজে নিযুক্ত করেন। তারা করে নাই। একটা মানুষকে আর কতো বলা যায়।
শুনেছি ভারতের কোন একটি একাডেমির সঙ্গে কাজ করছেন?
রফিক : ভারতে গাঙ্গুলির একটা একাডেমি আছে। ওইখানে গিয়ে খেলি, কাজ করি। কালিঘাট ক্যান্টনমেন্টের কাছে। গাঙ্গুলি বিশাল একটা মাঠ দিয়েছে, ওর একাডেমি। ১৫-১৬টা নেট আছে। অনেক বাচ্চারা আসে, খেলে। এমনি ভারত গেলে ওদেরকে জানাই, ওরা সব ব্যবস্থা করে। সঙ্গে আমার কাজটাও হলো।