ঘুমরাতের জড়োয়া

আপডেট: জুলাই ৩০, ২০২১, ১২:১৯ পূর্বাহ্ণ

আরিফুল হাসান:


স্বপ্নের ভেতর দিয়ে মানুষ কোথায় যায়? ফ্রয়েড এ নিয়ে ব্যাখ্যার অন্ত রাখেননি, কিন্তু কোথায় যেনো একটু গোঁজামিল রয়ে গেছে। স্বপ্নের ব্যাখ্যাটা ঠিক স্বপ্নের মতো হয়নি। স্বপ্ন মানুষকে আরও উন্নত করে, আরও বেশি নিচে নামিয়ে দেয়। একটা স্বপ্নভাবনা কীভাবে একটা মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করে, তা যেনো ঠিক বুঝে উঠতে পারে না তাত্ত্বিকেরা। স্বপ্নবানের কাছে, বিশেষ করে তার স্বপ্নটা নিছক কল্পনাপ্রসূত নয়। আবার স্বপ্নবাজের কাছে, একটি স্বপ্ন একেকটা মিশন। একেকটা গোলাপ ফোটানোর মতো, একেকটা জ্যোৎস্না ঝরানোর মতো। স্বপ্ন তাই মানুষকে বন্দি করে, আবার অবমুক্ত করে দেয় উন্মুক্ত আকাশে। অনেকদিন ধরে এ স্বপ্নটিই দেখে যাচেছ রাহুল। একটি দাঁতাল শুয়োর তাকে দৌড়াচ্ছে আর সে পালিয়ে যেতে চাইছে। যেতে যেতে একসময় তার পেছনে শুয়োরটা অদৃশ্য হয়ে যায়, কিন্তু তার চলা থামে না। দৌড়াচ্ছে তো দৌঁড়াচ্ছেই। কতো অজানা নদ-নদী, কতো বন জঙ্গল তেপান্তর পেরিয়ে সে ছুটতে থাকে। তার গন্তব্য শেষ হয় না। মনের ভেতর ভয়টা টুপ করে মুখ লুকিয়ে নেয় না। তাকে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে রাখে। ভয়ের স্রোত তার মেরুদন্ডে প্রবাহের ঝড় তোলে। আর তখন তার ভয় আরও বেড়ে যায়। সে আরও প্রাণপণে দৌড়াতে থাকে। ছুটতে ছুটতে তার গলা কাঠ হয়, বুক শুকিয়ে শ্মশান হয়ে যায়। নদীর পাড় ধরে দৌড়ানোর সময়ও সে নিচু হয়ে পানি পান করে না, ঝর্ণা অতিক্রমের সময় একবিন্দু দাঁড়িয়ে শরীর জুড়িয়ে নেয় না, এমনকি ক্যাকটাসে পা রক্তাক্ত হলেও সামন্য জিরোনোর ছলে একপ্রস্ত নিস্তার দেয় না সে নিজেকে। তার এ ছুটে চলা যেনো অনন্ত আশ্চর্য। তার এ ধাবমান পরিপ্রপাত যেনো নিয়তি নির্ধারিত। তাই সে দৌড়াতে থাকে, দৌড়াতে থাকে এবং দৌড়াতে থাকে। রাত তিনটা বেজে পয়তাল্লিশ মিনিট। একটু আগেই সুবহে কাজেব কেটে গেছে। রাহুল জগ থেকে জল ঢেলে খায়। সারা গা তার ভিজে গেছে। কিছুক্ষণ স্থির হয়ে বসে বাড়িয়ে দেয়া পাখার নিচে। নিজের বুকের ধুকপুক টের পাচ্ছে সে। পাশের ঘরে কি রাহেলা জেগে উঠেছে?, ফিসফিস কথা শোনা যাচ্ছে রাহেলার। তার স্বামী কেমন যেনো চুপ মেরে আছে। একটি দীর্ঘনিশ্বাস শোনা যায় রাহেলার কণ্ঠে। শেষ হয়ে আসা রাতের হাত ধরে সে দীর্ঘশ্বাস রাহুলকে কোথায় যেনো উড়িয়ে নেয়। তারপর দিন আসে। রাহেলা স্বামীকে গুঁছিয়ে-গাছিয়ে কাজে পাঠিয়ে রাহুলের দরজায় এসে দাঁড়ায়। রাহুল রাহেলাকে বুকে জড়িয়ে দরজা বন্ধ করে দেয়। তারপর নাস্তাপানি করে রাহুল কলেজের দিকে রওয়ানা হয়। স্নাতক তৃতীয় বর্ষে পড়ছে সে। মেসে থাকতে ভালো লাগে না তাই একটা ছোট পরিবারের সাথে সাবলেট থাকে। আসলে তার অন্য সমস্যা আছে, সে ধূমপায়ী এবং রীতিমতো মাদক গ্রহণ করে। কিন্তু বাইরে কাউকে কিছু বুঝতে দেয় না। খুব ফিটফাট থাকে। কিন্তু মাদক গ্রহণের জন্য তার নিভৃতির প্রয়োজন হয়। মেসে সে সে সুযোগটা পায় না। তাই তার সাবলেট জীবন। রাহেলার স্বামী একটি সিকিরিটিজ কোম্পানিতে কাজ করে। রাতে দিনে তার ডিউটি থাকে। একসপ্তাহ রাতে ডিউটি পড়লে পরের সপ্তায় দিনে ডিউটি পরে। এখন তার ডে সিজন। সকাল আটটা থেকে রাতের আটটা পর্যন্ত ইউনিফর্ম পড়ে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে এক্সিম ব্যাংকের এটিএম বুথের সামনে। রাহেলার স্বামী শাকিলের বেতন দশ হাজার টাকা। বাড়ি বরিশালের দিকে। কুমিল্লায় আছে দ্’ুবছরের অধিক। প্রথমে এসেই রাহেলাদের ভাড়া বাসার ছোট্ট একটি পাশে মেসে উঠে। সে সহ সাতজন, ওরা নতুন চাকরিতে জয়েন করেছে। বেতন তখন পেতো প্রত্যেকে সাড়ে ছয় হাজার সাত হাজার করে। এ টাকায় বাসা ভাড়া দিয়ে খানাপিনা, একটুখানি বাড়িতে পাঠানো, কিইবা থাকতো তাদের? তাই তারা নিজেদের রান্না নিজেরাই করতো পালাক্রমে। একদিন রাহেলার মা রাহেলাকে পাঠায় মেস থেকে দুটো রসুন চেয়ে আনতে। রাহেলা আমতা আমতা করে রাজি হয়। মেসে এসে দেখে শাকিল রান্না করতে গিয়ে হাত পুড়িয়ে বসে আছে। কি করবে রাহেলা! বিব্রত হলেও রসুনের কথা বললো। শাকিল জানে, শেষ রসুনটা আজ সে শাকের সাথে কুটেছে। পকেটে বিশ পঁচিশ টাকা আছে। সে রাহেলাকে বুঝায়, হাতে মলম লাগিয়ে আমি নিজে গিয়ে দিয়ে আসছি। রাহেলা চলে যায়, মলিন জানালার পর্দায় চোখ রেখে দেখে শাকিল শার্টের বোতাম লাগাতে লাগাতে দোকানের দিকে ছুটছে। রাহেলার বাবা বুট-বাদাম বিক্রি করে। গলায় একটা সিলভারের বড় বল ঝুলিয়ে সেখানে কযেকটা খোঁপ করে রাখে বাদাম, বুট দ্’ুরকমের ও সিমের বিচি ভাজা। এ দিয়ে তার সংসারের চাকা চলে, হয়তো চলে, কিন্তু জীবনের চাকা খুব দ্রুতই ক্লান্ত হতে থাকে। ফলে রাহেলা ও শাকিলের ভাব ভালোবাসায় কোনো পক্ষেরই অসমর্থন থাকে না আর। ছ’মাস প্রেম করে শাকিল রাহেলাকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। তার দরিদ্র বাবা এটাই হয়তো চেয়েছিলেন মনে মনে। তিনি তিনদিনের মধ্যে মৌলভী কাজী ডেকে আল্লা-রসুলকে সাক্ষী রেখে রাহেলাকে তুলে দেয় শাকিলের হাতে। কিন্তু শাকিলের হাত বড়ো নড়বড়ে। এটি সে টের পায় বিয়ের রাতেই। তার বাহুর বন্ধন থেকে খুব সহজেই আলগা হয়ে যেতে থাকে রাহেলা। তাদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়, কিন্তু পিতার সংসারের সামর্থের কথা চিন্তা করে রাহেলা শাকিলকে কিছু বুঝতে দেয় না। এমনকি কখনো কোনো অভিযোগও দাঁড় করায়নি শাকিলের কাছে। সবসময় ভরসা দিয়েছে, সব ঠিক অইয়া যাইবো। শাকিল মনে মনে অপেক্ষা করছে, হাতে কিছু টাকা আসুক, ভালো একজন ডাক্তার দেখাতে হবে। শাকিলের বর্তমান ডিউটি পড়েছে রাতে। তিনদিন হয় তার শিফট চেঞ্জ হয়েছে। সারারাত টেবিলের উপর বসে থেকে পায়ে খিল্ লেগে যায়। কাছেপিঠে একটা চায়ের দোকান থাকাতে তাও রক্ষে। শাকিল সেখানে যায় মাঝে মাঝে চা খেতে। চায়ের সাথে একটা পাইলট সিগারেটও জ্বালায়। এমন সময় কলি সুন্দরীর রিকসা এসে থামে। কলি সুন্দরী শাকিলকে কটাক্ষ করে বলে, যাইবা নাকি নাগর? শাকিল কেমন জানি লজ্জায় আড়ষ্ট হতে থাকে। দোকানদার পরিচিত, ঠাট্টা করায় -হালার তো ব্যারাম! কলি সুন্দরী বলে, সব ব্যারাম ভালা কইরা দিমু। ভোরের আলো ফুটলে শাকিল অপেক্ষা করে কখন আটটা বাজবে। আটটা বাজলে সে আর একমুহুর্তও দেরি করে না। একটা অন্যরকম চাপ আজ সে অনুভব করছে। একেবারেই অন্যরকম। আজ মনে হয় সে পারবে। তার মনে হয়, পাহাড় অনড়তা আজ তার ঘুঁচবে নিশ্চয়ই। তলপেটটা গরম হয়ে উঠে। মুহূর্তেই মনে পড়ে রাহেলার মুখ। আহা রাহেলা, প্রিয়তমা আমার। আজ তোমার সব অভাব ঘুঁচিয়ে দেবো। পূর্ণ করবো তোমায়। দেড় বছর ধরে যে অপ্রাপ্তির জ্বালায় তুমি জ্বলছো, আজ তোমার সব আগুন নিভিয়ে দেবে তোমার শাকিল। শাকিল রিক্সা নিয়ে দ্রুত বাসায় চলে আসে। রাহেলা শাকিলের তড়িঘড়ি আগমনে কিছুটা হকচকিয়ে যায়। সারারাত সে রাহুলের সাথে আনন্দ করেছে। ভোরের আলো ফুটলে বেরিয়ে এসেছে নিজের কক্ষে। রাহুল তার কলেজে যাবার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। রাহেলা এখনো প্রস্তুত হতে পারেনি। সারারাত সে জোয়ারে ভেসেছে। ভেসে ভেসে নিঃশেষ হয়ে গভীর শ্রান্তিতে সে ঘুমিয়ে পড়েছিলো। এলায়িত চুল বাঁধতে বাঁধতে সে ক্লান্তপায়ে হেঁটে গিয়ে দরজা খোলে। যেনো দরজা খোলার শক্তিটুকুও আর অবশিষ্ট নেই। তুমি আইয়া পড়ছো? প্রশ্নের মুখে একটু হোচট খায় শাকিল। আমি দ ভাত রানছি না, শইলডা ভালা নাই। নাস্তা কইরা আইছো? শাকিলের রাতে ডিউটি পড়লে সবসময় আসার পথে নাস্তাটা দোকানেই সেরে আসে। সারারাত সজাগ থেকে ভোরের দিকে আর খিদাকে দমিয়ে রাখা যায় না। তাই আটটার সময় অপরজন আসলেই শাকিল দৌড়ে গিয়ে পরোটার দোকানে ঢুকে। আর তাছাড়া দীর্ঘদিন খেতে খেতে বাইরের নাস্তার প্রতি একটা নেশাও যেনো হয়ে গেছে তার। কিন্তু আজ সে নাস্তা করে আসেনি। এক অনির্বচনীয় ক্ষুধা তার দেহের ক্ষুধাকে মাটি করে দিয়েছে। সে কথা লুকায়; হ, নাস্তা করছি। অহন আবার করুম। এ বলে সে রাহেলাকে জড়িয়ে ধরে। কিন্তু সারারাতের দূরন্ত উপাখ্যানে রাহেলার আর এ রাস্তায় সাড়া দিতে ইচ্ছে হয় না। সে চুপ করে থাকে। শাকিলের উত্থিত অগ্নি ক্রমশ নির্বাপিত হতে থাকে। তার বদলে ভেতরে এক অন্য আগুন জন্ম নেয়। দুপুরের খাবার খেয়ে দ্’ুতিন ঘণ্টা ঘুমিয়ে নেয় শাকিল। আজ খাবারটা যেনো মুখে কিছুতেই রুচেনি। ঘুমও আসছে না তার। তবুও মরার মতো পড়ে আছে বিচানায়। মেঝেতে রাহেলা শুকিয়ে আসা কচুর লতি নিয়ে বসেছে বাছতে। তার দুই রুমের বাসা। ভাড়া ছয় হাজার টাকা হওয়াতে রাহুলকে একটি রুমে সাবলেট দিয়েছে। এখন সে একটি রুমই ব্যাবহার করতে পারে। সুতরাং একটি রুমেই তার সংসার। পরিসর ছোটো, কিন্তু কিছু করার ছিলো না তার। দশ হাজার টাকার মাইনে থেকে ছয় হাজার টাকার বাসা ভাড়া তো আর একলা একলা দেয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়। ফলে গরিবের লজ্জা-ঘৃণা-ভয় নয় যেহেতু তাই যুবক তরুণ কলেজ ছাত্রকেও বাসায় সাবলেট নিতে অতকিছু ভাবেনি শাকিল। এখন কেনো যেনো সন্দেহ হচ্ছে। বিশেষ করে রাহেলার আজকের আচরণে। তাহলে কি রাহেলা রাহুলের সাথে…। না, আর ভাবতে পারে না সে। ভাবনারা পরস্পর বিভাজিত হয়ে কখন যেনো শাকিলের চোখ লেগে যায়। হঠাৎ খুট করে একটি শব্দে ঘুম ভাঙে তার। রাহুলের কক্ষের দরজা খোলার আওয়াজ। শাকিল দেখে অর্ধেক বাছা শুকিয়ে আসা কচুর লতিগুলো পড়ে আছে মেঝে, রাহেলা নেই! একটু পর রাহুলের কক্ষ থেকে রাহেলার মৃদু হাসির শব্দ আসতে থাকে। তখন তার মনে হয়, ওটি রাহেলা নয়, যেনো কোনো মাদি শুয়োর ঘোঁৎঘোঁৎ করছে রাহুলের পাজড়বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে। রাতে চায়ের দোকানে অপেক্ষা করতে থাকে শাকিল। তিন কাপ চা খায়। একটু পর আবার ঘুরে আসে। সিড়িৎ সিড়িৎ বাঁশির আওয়াজে রাতের নিস্তব্ধতাকে ভেদ করে সে অদূরে চায়ের দোকানটাতে আসে। এখান থেকে দশ গজ দূরেই তার এটিএম বুথ। ফলে নিরাপত্তা বিঘ্ন হবারও কোনো আশঙ্কা থাকে না। এমন সময় রাতের বুক চিড়ে কলি সুন্দরীর রিকসা এসে থামে।
কলি আজ আর শাকিলকে কটাক্ষ করে না। অন্য একটি কাস্টমারের সাথে দরদাম করছে সে। শাকিল কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। বিদ্যুৎ গতিতে এগিয়ে গিয়ে কলি সুন্দরীর হাত ধরে বলে চল্, আমার সাথে চল্।