ঘূর্ণিঝড় রেমাল আঘাত হেনেছে উপকূলে II উপকূলীয় নদীতে পানি বেড়েছে ৫-৭ ফুট

আপডেট: মে ২৬, ২০২৪, ১১:৫০ অপরাহ্ণ


সোনার দেশ ডেস্ক:


ঘূর্ণিঝড় রেমালের অগ্রভাব উপকূলে আঘাত হেনেছে। এর ফলে দেশের বিভিন্ন জেলায় বৃষ্টিসহ ঝড়োহাওয়া বয়ে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে জলোচ্ছ্বাসে পানি বেড়ে তলিয়ে গেছে সুন্দরবন। পটুয়াখালীর বিচ্ছিন্ন দ্বীপ রাঙ্গাবালী উপজেলার প্রায় ২০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। উপকূলীয় জেলাগুলোতে দমকা বাতাস ও বৃষ্টি ঝরতে শুরু করেছে। এসব এলাকার সাগর ও নদী বিক্ষুব্ধ রয়েছে।
উপকূলীয় নদীতে পানি বেড়েছে ৫-৭ ফুট
রাতের জোয়ারের সময় পানি আরও বাড়ার শঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
পটুয়াখালীর রাঙাবালী উপজেলার চরমন্তাজ ইউনিয়নের দক্ষিণ চরমন্তাজ এলাকার রোববার দুপুরে নদীর পানি উপচে লোকালয়ে প্রবেশ করছে।

ঘূর্ণিঝড় রেমালের প্রভাবে দেশের উপকূলীয় জেলাগুলোর বিভিন্ন নদ-নদীতে পানি বাড়তে শুরু করেছে। কিছু নদীতে স্বাভাবিকের চেয়ে পাঁচ থেকে সাত ফুট বেশি পানি বাড়ার খবর পাওয়া গেছে। আবাহাওয়া অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য মতে, সন্ধ্যার পর থেকেই উপকূলীয় এলাকা অতিক্রম করতে শুরু করেছে রেমাল।

আবহাওয়া অধিদফতরের তথ্যমতে, উপকূলীয় খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, বরগুনা, বরিশাল, ভোলা ও পটুয়াখালী অতিক্রম করবে ঘূর্ণিঝড়টি। ঘূর্ণিঝড়ের অগ্রভাগ আঘাত হানতে শুরু করলেও সন্ধ্যা ৬টা থেকে পরের তিন থেকে চার ঘণ্টায় তাণ্ডব চালিয়ে রেমালের কেন্দ্র স্থলভাগে ওঠে আসতে পারে। ঘূর্ণিঝড়ে কেন্দ্রেই থাকে প্রচণ্ড শক্তি।

আবহাওয়াবিদ মনোয়ার হোসেন জানান, ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষতি এড়াতে পায়রা ও মোংলা সমুদ্রবন্দরকে ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। উপকূলীয় জেলা খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, বরগুনা, বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী এবং তাদের অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরসমূহ ১০ নম্বর মহাবিপৎসংকেতের আওতায় থাকবে।

কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরকে ৯ নম্বর মহাবিপৎসংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। উপকূলীয় জেলা চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, ফেনী, কুমিল্লা, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর এবং তাদের অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরসমূহ ৯ নম্বর মহাবিপৎসংকেতের আওতায় থাকবে।

আবহাওয়া অধিদফতরের ১৩ নম্বর বিশেষ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের ৬৪ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের একটানা সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ৯০ কিলোমিটার, যা দমকা অথবা ঝড়োহাওয়ার আকারে ১২০ কিলোমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রবল ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের নিকটবর্তী এলাকায় সাগর বিক্ষুব্ধ রয়েছে।

ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে উপকূলীয় জেলায় স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে ৮ থেকে ১২ ফুট অধিক উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস হতে পারে। সারা দেশেই ভারী বর্ষণ হতে পারে। এতে পাহাড়ি অঞ্চলের কোথাও কোথাও ভূমিধস হতে পারে।

রেমালের অগ্রবর্তী অংশ ও বায়ুচাপ পার্থক্যের আধিক্যের প্রভাবে উপকূলীয় জেলা খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, বরগুনা, বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী, ফেনী, কুমিল্লা, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার এবং তাদের অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরসমূহের নিম্নাঞ্চল স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে ৮ থেকে ১২ ফুট অধিক উচ্চতার বায়ু তাড়িত জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হতে পারে।

এই ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে রাজশাহী, রংপুর, ময়মনসিংহ, ঢাকা, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগে দমকা বা ঝড়োহাওয়াসহ ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণ হতে পারে। অতি ভারী বর্ষণে কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও চট্টগ্রামের পাহাড়ি অঞ্চলের কোথাও কোথাও ভূমিধস হতে পারে।

ঢেউয়ের তোড়ে প্রাণ গেল যুবকের
বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় রেমালের প্রভাবে পটুয়াখালীতে সাগর উত্তাল হয়ে উঠেছে। সমুদ্রের ঢেউয়ের তোড়ে শরীফ (২৪) নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। রোববার (২৬ মে) দুপুরে কলাপাড়া উপজেলার ধূলাসর ইউনিয়নের কাউয়ারচর এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। শরীফ অনন্তপাড়া এলাকার আবদুর রহিমের ছেলে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শরীফের ফুপু মাতোয়ারা বেগম কাউয়ার চর এলাকায় বসবাস করেন। ওই বাড়িতে তার বোন বেড়াতে গিয়েছিল। রোববার দুপুরে বোন এবং ফুফুকে উদ্ধারে অনন্তপাড়া থেকে কাউয়ারচর যান শরীফ। সে সময় রেমালের প্রভাবে কাউয়ারচর এলাকা প্লাবিত ছিল। সাঁতার কেটে যাওয়ার সময় সমুদ্রের ঢেউয়ের তোড়ে শরীফ হারিয়ে যান। পরে খোঁজাখুঁজির পর তার লাশ উদ্ধার করে স্থানীয়রা।

মহিপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আনোয়ার হোসেন তালুকদার বলেন, খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।

গতি বেড়েছে রেমালের
প্রবল ঘূর্ণিঝড় রেমাল। উপকূলের দিকে যত এগোবে গতিবেগ একটু একটু করে বেড়েছে। প্রবল ঘূর্ণিঝড় রেমাল ‘অতি প্রবল’ ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি গতিবেগ ঘণ্টায় ১১০ থেকে ১২০ কিলোমিটার উঠতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ও ভারতের আবহাওয়া অফিস।

উল্লেখ্য, ঝড়ের গতিবেগ যদি ৮৯ থেকে ১১৭ কিলোমিটার হয়, তখন তাকে ‘তীব্র’ ঘূর্ণিঝড় বা ‘সিভিয়ার সাইক্লোনিক স্টর্ম’ বলা হয়। বাতাসের গতি ঘণ্টায় ১১৮ থেকে ২১৯ কিলোমিটার হলে সেটিকে ‘হ্যারিকেন’ গতিসম্পন্ন ঘূর্ণিঝড় বা ‘ভেরি সিভিয়ার সাইক্লোনিক স্টর্ম’ বলা হয়। গতিবেগ ২২০ কিলোমিটার বা তার বেশি হলে তাকে ‘সুপার সাইক্লোন’ বলা হয়।

বাংলাদেশের আবহাওয়া অধিদফতর জানায়, প্রবল ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের ৬৪ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের একটানা সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ৯০ কিলোমিটার, যা দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়ার আকারে ১২০ কিলোমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রবল ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের নিকটবর্তী এলাকায় সাগর বিক্ষুদ্ধ রয়েছে।

এদিকে ভারতের আবহাওয়া অধিদফতর জানায়, রবিবার দিনগত মধ্যরাতের মধ্যে রিমাল তীব্র ঘূর্ণিঝড় হিসেবে পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশের খেপুপাড়ার মধ্যবর্তী উপকূল দিয়ে অতিক্রম করে প্রায় উত্তর দিকে অগ্রসর হতে পারে। এরপর এটি আরও তীব্র হতে পারে এবং বাংলাদেশ ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চল অতিক্রম করতে পারে। এ সময় এর গতিবেগ ঘণ্টায় ১১০ থেকে ১২০ কিলোমিটার হতে পারে, যা প্রতি ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১৩৫ কিলোমিটার পর্যন্ত বাড়তে পারে।

আবহাওয়াবিদ আবুল কালাম মল্লিক বলেন, এখন রেমালের বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ৯০ কিলোমিটার যা দমকা বা ঝড়ো হাওয়ার আকাশে ১২০ কিলোমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ হিসেবে এটিকে এখনও তীব্র ঘূর্ণিঝড় বলা যায়।

রেমালের গতিবেগ বাড়তে পারে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। অনেক সময় বৃষ্টি ঝরে গতি কমে যায়। আবার অনেক সময় স্থলভাগের ধাক্কা লেগে গতি বেড়েও যায়।

উপকূলের বহু এলাকা বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন
ঘূর্ণিঝড় রেমালের প্রভাবে উপকূলের বহু এলাকা বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। মানুষের জীবন রক্ষায় উপকূলের বেশিরভাগ এলাকায় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছে। বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের পিবিএসগুলোর (সমিতি) জেনারেল ম্যানেজারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রবল ঘূর্ণিঝড় রিমাল মোকাবিলায় উপকূলীয় এলাকায় প্রস্তুতি নিচ্ছে সমিতিগুলো।

ইতোমধ্যে সাতক্ষীরা উপকূলে ঘূর্ণিঝড়ের অগ্রভাগের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে ঝোড়ো বাতাসে গাছ পড়ে দুর্ঘটনা যাতে না ঘটে, সেজন্য এরইমধ্যে অনেক এলাকায় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বিদ্যুৎ সরবরাহ। অনেক এলাকায় লাইন চালু করার পর তা বারবার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

জানা যায়, সম্ভাব্য ঝড়ে আক্রান্ত জেলাগুলোর বিদ্যুৎকর্মীদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। ঝড় চলে যাওয়ার পর দ্রুত যাতে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা যায়, সে লক্ষ্যে সমিতির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

বাগেরহাটের পিবিএস-এর জেনারেল ম্যানেজার সুশান্ত রায় জানান, ঘূর্ণিঝড় রেমাল মোকাবিলায় প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে সবার ছুটি বাতিল করা হয়েছে। সবাইকে স্ট্যান্ডবাই থাকতে বলা হয়েছে। এদিকে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে সঙ্গে সঙ্গে যাতে তা ঠিক করা যায়, এজন্য প্রয়োজনীয় মালামাল বিভিন্ন জায়গায় পাঠানো হয়েছে। তিনি জানান, তাদের লাইনম্যান আছে প্রায় ২৩২ জন, ঠিকাদারসহ সংশ্লিষ্ট আরও ১৫০ জন জনবল প্রস্তুত রয়েছে। তিনি আরও জানান, তাদের অধীন এলাকায় মোট বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয় ১০৯ মেগাওয়াট। গ্রাহক আছে প্রায় ৪ লাখ ৮৫ হাজার। কিন্তু এখন মাত্র ২০ হাজার গ্রাহক বিদ্যুৎ পাচ্ছে। ঝোড়ো বাতাসের কারণে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা যাচ্ছে না বলে তিনি জানান।

এদিকে পটুয়াখালী সমিতির জেনারেল ম্যানেজার তুষার কান্তি মণ্ডল জানান, ঝড়ের জন্য যা যা প্রয়োজন, সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। জনবল ও মালামাল সব ঠিক করা হয়েছে। ঠিকাদারদেরও স্ট্যান্ডবাই থাকতে বলা হয়েছে।

সাতক্ষীরা পিবিএস-এর জেনারেল ম্যানেজার জিয়াউর রহমান জানান, আমরা জুম মিটিং করে প্রতিটি অফিসে প্রস্তুতির নির্দেশ দিয়েছি। আমরা সাধারণত তিন ধরনের প্রস্তুতি নিই—ঝড় আসার আগে, ঝড়ের সময় এবং ঝড় পরবর্তী সময়ে করণীয়। ঝড় আসার আগে আমরা মোবাইলে চার্জ দিয়ে রাখতে বলি সবাইকে, মেরামতের জন্য প্রয়োজনীয় মালামাল সংগ্রহ করে রাখা হয়, যারা স্ট্যান্ডবাই থাকবেন, তাদের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়। এদিকে ঝড়ের সময় যাতে কেউ বিদ্যুৎস্পৃষ্ট না হয়, সেজন্য মাইকিং করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি আমরা চেয়ারম্যান ও ইউপি সদস্যদের মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করে রাখছি। যাতে তাদের এলাকায় বিদ্যুতের তারের ওপরে গাছ পড়লে সরাসরি যোগাযোগ করা যায়।

জলোচ্ছ্বাসে তলিয়ে গেলো সুন্দরবন
ঘূর্ণিঝড় রিমালের প্রভাবে সুন্দরবন উপকূলসহ মোংলায় ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেত এখনও বহাল রয়েছে। এরইমধ্যে বৃষ্টিসহ দমকা বাতাস বইতে শুরু করেছে। ঘূর্ণিঝড়ের কারণে জলোচ্ছ্বাসে তলিয়ে গেছে পুরো সুন্দরবন।

রবিবার (২৬ মে) দুপুরে পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের করমজল বন্যপ্রাণী প্রজননকেন্দ্র ও পর্যটন স্পটের ওসি আজাদ কবির জানান, ঘূর্ণিঝড় রিমালের প্রভাবে স্বাভাবিকের চেয়ে চার ফুট পানি বেড়ে সুন্দরবন তলিয়ে গেছে। পানির চাপ আরও বাড়বে। তবে বন্যপ্রাণীর ক্ষয়ক্ষতির কোনও আশঙ্কা নেই বলে উল্লেখ করেন তিনি।

আজাদ কবির বলেন, ‘ঘূর্ণিঝড় রিমালের কারণে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে পুরো সুন্দরবন বিভাগের কর্মকর্তা ও বনরক্ষীদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। বন বিভাগের ঝুঁকিপূর্ণ ক্যাম্পগুলোতে থাকা বনরক্ষীদের এরইমধ্যে নিরাপদে সরিয়ে আনা হয়েছে।’

মে মাসে কেন দুর্যোগের ঘনঘটা?
মে মাস আর বাংলার দুর্যোগ ক্রমেই সমার্থক হয়ে উঠছে। এই মে মাসেই বার বার বাংলার বুকে আছড়ে পড়েছে আয়লা-আমফান-ইয়াস। তাণ্ডব চালিয়েছে ফণীর মতো ঝড়ও। আর তার প্রভাবে সর্বস্ব হারিয়েছে বাংলার উপকূলে থাকা মানুষজন। চরম ক্ষতির মুখে পড়েছিল সুন্দরবন অঞ্চল। সেই স্মৃতি উসকে রবিবার রাতে আছড়ে পড়তে চলছে আরবি বালি ‘রেমাল’।

ভারতের সংবাদ প্রতিদিন খবরে বলা হয়েছে আবহাওয়াবিদদের মতে, বর্ষা আসার আগে ও পরে অতিরিক্ত স্পর্শকাতর হয়ে ওঠে ভারত মহাসাগরের উত্তর অংশ। সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা থেকে ২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি। আর এই জোড়া অনুকূল পরিস্থিতিতেই নিম্নচাপ দ্রুত ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয়ে। যার ক্ষমতা অন্যান্য ঘূর্ণিঝড়ের চেয়ে বেশি হয়।

যদিও বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রভাবে উত্তর-পূর্ব ও উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগরের বর্তমান তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের উপর রয়েছে। উচ্চ তাপমাত্রা ও অনুকূল বায়ুর উপর ভিত্তি করেই শক্তি বাড়িয়ে রেমাল। যা আজ রাতেই আছড়ে পড়তে চলেছে বাংলাদেশের মংলা এলাকায়। ল্যান্ডফলের সময়ের গতিবেগ থাকবে ১৩৫ কিলোমিটার প্রতি ঘন্টায়।

২০০৯ সালে ২৫ মে বাংলায় আছড়ে পড়েছিল আয়লা। ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১২০ কিলোমিটার বেগে ধূলিসাৎ করে দিয়েছিল সুন্দরবনকে। ২০১৯ সালে দাপট দেখিয়েছিল ফণি। বাংলাকে ছুঁয়ে চলে গিয়েছিল ওড়িশা। করোনাকাল এই মে মাসেই ধেয়ে এসেছিল সুপার সাইক্লোন আমফান। গতি ছিল ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ২০০ কিলোমিটারের বেশি। একুশের ২৬ মে ঘণ্টায় ১৪০ কিমি বেগে তাণ্ডব চালিয়েছিল ইয়াস। এবার এই তালিকায় জুড়ে যাবে আরবি বালি অর্থাৎ রেমালের নাম।

নদীগুলোতে পানি বেড়েছে ৫-৭ ফুট
ঘূর্ণিঝড় রেমালের প্রভাবে দেশের উপকূলীয় জেলাগুলোর বিভিন্ন নদ-নদীতে পানি বাড়তে শুরু করেছে। কিছু নদীতে স্বাভাবিকের চেয়ে পাঁচ থেকে সাত ফুট বেশি পানি বাড়ার খবর পাওয়া গেছে। আবহাওয়া অধিদফতরের দেওয়া তথ্য মতে, সন্ধ্যার পর থেকেই উপকূলীয় এলাকা অতিক্রম করতে শুরু করেছে রেমাল।

রাতের জোয়ারের সময় তা আরও বাড়ার শঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। এ ছাড়া দমকা হাওয়ার সঙ্গে বৃষ্টিতে উপকূলীয় অঞ্চলের নদ-নদীগুলো উত্তাল হয়ে উঠেছে বলে জানিয়েছেন নদী পাড়ের বাসিন্দারা।
বাগেরহাটের প্রধান প্রধান নদ-নদী বিপৎসীমার উপর দিয়ে জোয়ারের পানি প্রবাহিত হচ্ছে। অতি জোয়ারে সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে; এতে বনের প্রাণির প্রাণহানির আশঙ্কা করছে বনবিভাগ। রোববার দুপুরে জেলা সদর, মোড়েলগঞ্জ, শরণখোলা, মোংলা ও রামপাল উপজেলার নদীর তীরবর্তী এলাকার দুই শতাধিক বাড়িঘর প্লাবিত হয়েছে জেলা প্রশাসন জানিয়েছে।

বাগেরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু রায়হান মোহাম্মদ আল-বিরুনী বলেন, ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে বাগেরহাটের প্রধান প্রধান নদ-নদীর পানি দুপুরে বিপৎসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। সবচেয়ে বেশি পানি বেড়েছে জেলার মোংলা উপজেলার পশুর নদে। মোংলা বন্দরের এই নদে দুপুরে বিপৎসীমার ৫ ফুট উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়েছে। আর বলেশ্বর ও ভৈরব নদে বিপৎসীমার দুই থেকে তিন ফুট উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে।

সুন্দরবনের বন সংরক্ষক (সিএফ) মিহির কুমার দো বিকালে বলেন, ঝড়ের প্রভাবে বঙ্গোপসাগরে পানির অস্বাভাবিক চাপ রয়েছে। দুপুরের জোয়ারের পানি সুন্দরবনের সব নদ-নদীতে প্রবাহিত হয়। সেই পানির উচ্চতা ছিল পাঁচ থেকে আট ফুট পর্যন্ত।

সাগরের পানি অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় জেলার নদ-নদীর পানি ৭-৮ ফুট বৃদ্ধি পেয়েছে। জেলার রাঙ্গাবালী, কলাপাড়া ও মির্জাগঞ্জে বেশ কিছু স্থানে বেড়ীবাধ উপচে গ্রামের মধ্যে পানি ঢুকে প্লাবিত হয়েছে।

পটুয়াখালী পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মিরাজ গাজী জানান, গলাচিপার পানপট্টি, মুসুরীকাঠি স্লুইজ, সদর উপজেলার কালিচন্না, দুমকির হাজিরহাট, দশমিনার আউলিয়াপুর এলাকায় বেড়িবাধ ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। তবে সকালে ৪-৫ফুট পানি বৃদ্ধি পেলেও বর্তমানে পানি কমে গেছে।

ঘূর্ণিঝড় রেমালের প্রভাবে ফুঁসে উঠেছে খোলপেটুয়া ও কপোতাক্ষ নদসহ সাতক্ষীরার নদীগুলো। জোয়ারের আগেই নদীগুলোয় পানি স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়েছে ছয় ফুটের বেশি। জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলী সালাউদ্দিন জানান, জেলার উপকূলীয় গাবুরা, পদ্মপুকুর, প্রতাপনগর এলাকায় খোলপেটুয়া ও কপোতাক্ষ নদের পানি এর মধ্যেই স্বাভাবিকের চেয়ে ছয় ফুটের বেশি বেড়েছে।

ঘূর্ণিঝড় রিমালের প্রভাবে উত্তাল হয়ে উঠেছে ভোলার মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদী। সকাল থেকে থেমে থেমে বইছে ঝড়ো বাতাস, সেই সঙ্গে রয়েছে হালকা ও মাঝারি বৃষ্টি। ভোলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী হাসান-উজ-জামান জানান, ঝড়ের প্রভাবে সকালে জেলার মেঘনা নদীর পানি বিপদসীমার ২০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। পরে তা বাড়তে বাড়তে বিকাল ৫টার দিকে ৫৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।

বাতাসের সঙ্গে সঙ্গে জোয়ারে প্লাবিত হয়েছে ভোলার সদরের ধনিয়া, নাছির মাঝি, রাজাপুর, শিবপুর, চটকিমারার চর, চরফ্যাশন উপজেলার ঢালচর, কুকরী-মুকরি ও চর পাতিলা, দৌলুতখানের সৈয়দপরসহ মনপুরার বেশ কিছু নিচু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এরই মধ্যে ভোলায় পানিবন্দি হয়ে পড়েছে প্রায় ৫ হাজার পরিবার।

ঘূর্ণিঝড় রেমাল উপকূলের দিকে এগিয়ে আসার সঙ্গে খুলনা উপকূলের নদ-নদীতে পানির উচ্চতা বাড়ছে। স্বাভাবিক সময়ে ভাটায় পানি নেমে গেলেও রোববার বিকালে তা হয়নি। বরং নদীতে স্বাভাবিকের চাইতে পানির উচ্চতা ৩-৪ ফুট বেশি রয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী-২ আশরাফুল আলম বলেন, জোয়ারে নদীতে পানি এবং পানির চাপ বেড়েছে। খুলনার নদ-নদীতে বিপৎসীমার ৩ ফুট ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। তিনি জানান, খুলনার সবচেয়ে বড় নদী শিবসার স্বাভাবিক পানি প্রবাহ থাকে ১ দশমিক ৭৬ মিটার। এর বিপদসীমা ১ দশমিক ৩৭ মিটার। সেখানে প্রবাহিত হচ্ছে ২ দশমিক ৯৪ মিটার ওপর দিয়ে।

ঘূর্ণিঝড় রেমালের প্রভাবে বরিশালের নদীগুলোর পানি বাড়লেও তা বিপৎসীমা ছাড়িয়ে যায়নি। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী খালিদ ওয়েব অলীদ বলেন, জেলার কোনো নদীর পানি বিপৎসীমা পার হয়নি। সব নদীর পানি বিপৎসীমার থেকে ২ থেকে ৩ ফুট নিচে রয়েছে। তবে নদীগুলোয় পানি বেড়েছে। এতে নিম্নাঞ্চলে কিছু এলাকায় পানি উঠেছে। তা আবার নেমে যাবে বলে আশা করছেন এই প্রকৌশলী।