চলনবিলকে ঘিরে গড়ে উঠেছে ৩ শতাধিক শুঁটকির চাতাল

আপডেট: অক্টোবর ২৩, ২০১৬, ১১:৩৩ অপরাহ্ণ


সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি
চলনবিলের মাছকে ঘিরে সিরাজগঞ্জের তাড়াশসহ ১৪টি উপজেলার তিন শতাধিক শুঁটকির চাতাল গড়ে উঠেছে। সেই সঙ্গে এই বিলের মিঠাপানির সুস্বাদু শুঁটকির চাহিদা দেশ-বিদেশে দিন দিন বেড়েই চলছে। বৃহত্তর চলনবিলের শুঁটকি এখন রফতানি হচ্ছে আমেরিকাসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে।
সম্প্রতি পানি কমতে থাকায় চলনবিলের বিভিন্ন স্থানে প্রতিদিন জেলেদের জালে ধরা পড়ছে পুঁটি, খলসে, চেলা, টেংরা, কই, মাগুর, শিং, বাতাসি, চিংড়ি, নলা, টাকি, গুচিবাইম, বোয়াল, ফলি, কাতল, লওলা, শোল, গজারসহ নানা জাতের মাছ।
এসব কাঁচা মাছ কিনে চাতালে বা রোদে শুকিয়ে উৎকৃষ্ট মানের সুস্বাদু শুঁটকি তৈরি করেন চাতাল মালিকরা। পরে উৎপাদিত শুঁটকি পাঠানো হচ্ছে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। শুঁটকি উৎপাদনে এ অঞ্চলের তিন শতাধিক চাতালে এখন কর্মব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন প্রায় ৩ হাজার শ্রমিক।
চলতি মৌসুমে চলনবিলে আহরিত মাছ থেকে ১২০-১৩০ মেট্রিক টন শুঁটকি উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। যার বাজার মূল্য প্রায় ৩২ কোটি টাকা বলে তাড়াশ উপজেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা গেছে।
একটা সময় ছিল যখন চলনবিলের মাছ স্থানীয় অর্থনীতি ও জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলতো। মাছ বিক্রি করে আর্থিকভাবে সচ্ছল হতো এ অঞ্চলের মানুষ।
১৯১৪ সালে চলনবিলের মাঝ দিয়ে প্রথম ঈশ্বরদী-সিরাজগঞ্জ রেলপথ নির্মিত হয়। তখন চলনবিলের সঙ্গে কলকাতার যোগাযোগ স্থাপিত হয়। ওই সময় ট্রেনে মাছ যেত কলকাতায়। স্বাধীনতার পর ১৯৭৭ সালে চলনবিলের মাঝ দিয়ে বাঘাবাড়ী থেকে সিংড়া পর্যন্ত বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ করা হয়।
২০০২ সালে চলনবিলের বুক চিরে নির্মাণ করা হয় ৫৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের বনপাড়া-হাটিকুমরুল-যমুনা সেতু সংযোগ সড়ক।
‘ইম্পেরিয়াল গেজেটিয়ার অব ইন্ডিয়া’ বই থেকে জানা যায়, এক সময় চলনবিল নাটোর জেলার বড়াইগ্রাম, গুরুদাসপুর, সিংড়া, নওগাঁ জেলার রানীনগর, আত্রাই, সিরাজগঞ্জ জেলার তাড়াশ, রায়গঞ্জ, উল্লাপাড়া, পাবনা জেলার চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, ফরিদপুর, বেড়া এবং বগুড়া জেলার দক্ষিণাঞ্চল মিলে চলনবিলের অবস্থান ছিল। কিন্তু ১৯১৪ সালে ঈশ্বরদী-সিরাজগঞ্জ রেলপথ স্থাপনের পর থেকে রেলপথের উত্তর ও পশ্চিম অংশকেই চলনবিল বলা হয়।
১৯৬৭ সালে এমএ হামিদ টিকে ‘চলনবিলের ইতিকথা’ বইতে লিখেছেন, তখন থেকে প্রায় ১৪০ বছর পূর্বে অর্থাৎ ১৮২৭ সালে জনবসতি এলাকা বাদ দিয়ে চলনবিলের জলময় অংশের আয়তন ছিল ৫০০ বর্গমাইলের উপরে।
১৯০৯ সালে চলনবিল জরিপ কমিটির রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়, তৎকালে বিলের আয়তন ছিল ১৪২ বর্গমাইল। এর মধ্যে ৩৩ বর্গমাইল এলাকায় সারা বছর পানি জমে থাকতো। ওই রিপোর্টে বলা হয়, চলনবিল তার পানির স্রোতধারা ও নাব্যতা হারিয়ে ক্রমশঃ সংকুচিত হচ্ছে। আর প্রতি বছর কমছে এই বিলের আয়তন। প্রাপ্ত তথ্য সূত্রে জানা যায়, গঠনকালে চলনবিলের আয়তন ছিল প্রায় এক হাজার ৮ বর্গকিলোমিটার। কিন্তু বর্তমানে বর্ষা মৌসুমে আয়তন দাঁড়ায় প্রায় ৩৬৮ বর্গকিলোমিটার। শুষ্ক মৌসুমে (মূল বিলটি) আয়তন দাঁড়ায় ১৫.৯ থেকে ৩১.০ কিলোমিটার। এছাড়া বিলের গভীরতা এক দশমিক ৫৩ মিটার থেকে এক দশমিক ৮৩ মিটার। সর্বোচ্চ প্রশস্ততা ১৩ কিলোমিটার এবং সর্বোচ্চ দৈর্ঘ্য প্রায় ২৪ কিলোমিটার। প্রতি বছর চলনবিলের আয়তন হ্রাস পাচ্ছে। বাড়ছে ফসলি জমি, কমছে মাছের উৎপাদন। হারিয়ে যাচ্ছে জীববৈচিত্র্য। চলনবিলে জমির পরিমাণ ছিল এক লাখ ৬৬ হাজার ৫৩৫ হেক্টর।
বর্তমানে চলনবিলের ভৌগোলিক অবস্থান ক্রমশ সংকুচিত হয়ে ২৪:২৩ ডিগ্রি হতে ২৪:৩৫ ডিগ্রি উত্তর এবং ৮৯:০৫ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশের মধ্যে এসে দাঁড়িয়েছে।
দেশের সর্ববৃহৎ মৎস্য ভা-ার চলনবিল বর্তমানে সংকুচিত হয়ে পাবনা জেলার ভাঙ্গুড়া, চাটমোহর, ফরিদপুর, নাটোর জেলার গুরুদাসপুর, সিংড়া, লালপুর, নওগাঁ জেলার আত্রাই, রাণীনগর, বগুড়া জেলার শেরপুর ও নন্দীগ্রাম এবং সিরাজগঞ্জ জেলার তাড়াশ, রায়গঞ্জ, উল্লাপাড়া, শাহজাদপুরসহ ১৪টি উপজেলা, ৬২টি ইউনিয়ন ও ৮টি পৌরসভার এক হাজার ৬০০টি গ্রাম নিয়ে চলনবিলের অবস্থান।
লোকসংখ্যা ২৫ লক্ষাধিক। চলনবিলে প্রায় এক হাজার ৭৫৭ হেক্টর আয়তনের ৩৯টি বিল, চার হাজার ২৮৬ হেক্টর আয়তনবিশিষ্ট ১৬টি নদী এবং ১২০ বর্গকিলোমিটার আয়তন বিশিষ্ট ২২টি খালসহ অসংখ্য পুকুর রয়েছে। বর্তমানে চলনবিল অঞ্চলে জেলে, ব্যবসায়ী ও শ্রমিকরা মাছ ধরা ও শুকানোয় ব্যস্ত। দেশি মাছকে কেন্দ্র করে চলনবিলে গড়ে উঠেছে ৩০টি অস্থায়ী শুঁটকির চাতাল।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও চাতাল মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চলতি মৌসুমে বৃহত্তর চলনবিলের চাতালগুলিতে ১২০ থেকে ১৩০ মেট্রিক টন শুঁটকি উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। দেশের বড় বড় ব্যবসায়ীরা সরাসরি চাতাল থেকে পছন্দের শুঁটকি মাছ কিনে নিয়ে যায়। শুঁটকি মাছের মান ভেদে ‘এ’, ‘বি’ ও ‘সি’ গ্রেডে বাছাই করা হয়। ‘এ’ গ্রেডের (ভালো মানের) শুঁটকি মাছ আমেরিকা, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, কাতার, ওমান, বাহরাইন, দুবাই, ইরাক, কুয়েত, লিবিয়া, ইন্দোনেশিয়াসহ ২৫টি দেশে রফতানি করা হচ্ছে।
সাধারণত এসব দেশে বসবাসরত প্রবাসী বাঙালিদের মাঝে রয়েছে চলনবিলের সুস্বাদু শুঁটকি মাছের কদর। এছাড়া ‘সি’ ও ‘বি’ গ্রেডের শুঁটকি মাছ দেশের ভেতরে দিনাজপুর, সৈয়দপুর, রংপুর, রাজশাহী, খুলনা, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও এমনকি বন্দরনগরী চট্টগ্রামে উচ্চমূল্যে বিক্রি হয়ে থাকে।
তাড়াশ এলাকার চাতাল মালিক আমির হোসেন জানান, শুঁটকি ব্যবসায় লাভ রয়েছে। তাছাড়া চলনবিলের দেশীয় প্রজাতির মাছের শুঁটকির চাহিদা ব্যাপক। তবে আগের মতো পর্যাপ্ত মাছ পাওয়া যায় না। যা পাওয়া যায় তার দাম অনেক বেশি।
চলনবিলের শুঁটকি ব্যবসায়ী মজিবুর রহমান জানান, চলনবিলের শুঁটকি মাছের মান ভালো। তাই দেশের বিভিন্ন এলাকায় চলনবিলের শুঁটকি মাছের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। শুঁটকি ব্যবসায় জড়িত হয়ে তারা আর্থিকভাবে স্বচ্ছলতার দেখা পেয়েছেন ঠিকই; তবে এ ব্যবসায়ে ঝুঁকিও অনেক বেশি।
শুঁটকি তৈরির কাজে নিয়োজিত নারী শ্রমিক আলেয়া খাতুন, আরজিনা বেগম ও ননুয়াকান্দি গ্রামের সবিতা, তাহমিনাসহ বেশ কয়েকজন নারী-পুরুষ শ্রমিক জানান, তিন কেজি তাজা মাছ শুকিয়ে এক কেজি শুঁটকি তৈরি হয়। প্রকার ভেদে শুঁটকির বাজার মূল্য ৪৫০ টাকা থেকে এক ৮৫০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়ে থাকে। শহরাঞ্চলে এর দাম আর একটু বেশি। তাদের তৈরি শুঁটকির সিংহ ভাগ বিক্রি হয় শহরেই।
তাড়াশ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. হাফিজুর রহমান বলেন, চলনবিলের মিঠা পানির দেশীয় প্রজাতির শুঁটকির যত চাতাল রয়েছে তা দেশের আর কোথাও নেই। চলনবিল অঞ্চলের দরিদ্র মানুষদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এখানের উৎপাদিত শুঁটকির চাহিদা শুধু পার্শ্ববর্তী ভারত নয় আমেরিকার মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে রয়েছে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ