চলনবিলে ধানকাটা আর রসুন আবাদকে ঘিরে জমে উঠেছে শ্রমিকের হাট

আপডেট: ডিসেম্বর ২, ২০১৬, ১২:১৯ পূর্বাহ্ণ

গুরুদাসপুর প্রতিনিধি
ভোরের আলো ফুটতে তখনো বেশ বাকি। মহাসড়কে বাস-ট্রাকগুলো চলছে বাতি জ্বালিয়ে। তবুও জীবিকার তাগিদে হাতে কাস্তে, কোদাল আর ধান বহনের বাক নিয়ে জড়ো হয়েছে কয়েক হাজার শ্রমিক। এদের মধ্যে চলনবিলে বসবাসরত আদিবাসী নারী-শিশু ও পুরুষ রয়েছে। বনপাড়া-হাটিকুমরুল মহাসড়কের নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার ধারাবারিষা ইউনিয়নের নয়াবাজার হাটের প্রতিদিনের দৃশ্য এটি।
দক্ষিণ চলনবিলের নাটোরের গুরুদাসপুর, বড়াইগ্রাম ও পাবনার চাটমোহর উপজেলায় বিনাহালে রসুন রোপণ আর আমনধান কাটার উৎসবকে ঘিরে ২০০০ সাল থেকে গড়ে উঠেছে এই শ্রমিকের হাট।
কৃষি অধিদফতর ও স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চলনবিলের পানিতে এখন ভাটির টান। জেগে উঠছে আবাদী জমি। দক্ষিণ চলনবিলের ৭০ হাজার হেক্টর জমিতে চলছে ধান কাটার উৎসব। ধান কাটার পর নরম কর্দম পলিমাটিতে ৩০ হাজার ৯শ ৬ হেক্টর জমিতে বিনাহালে রসুন রোপণের কাজ শুরু হয়েছে। এসব কাজে অনেক শ্রমিকের দরকার হয়। চলনবিলের নিচু এলাকার শ্রমিক এবং ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীর শ্রমিকরাই এই শ্রেিমকর হাটে আসে।
গত সোমবার নয়াবাজেরর শ্রমিকের হাটে গিয়ে জানা গেছে, গুরুদাসপুর-বড়াইগ্রাম ছাড়াও তাড়াশ, সলঙ্গা ও উল্লাহপাড়া, বগুড়া শেরপুর উপজেলা এলাকার শ্রমিকরাও দল বেধে এখানে জমায়েত হয় কাজের আশায়। এসব শ্রমিকদের সবাই এসেছে ট্রাক-বাসের ছাদে, নছিমন কিংবা অটোভ্যানে। সকলের গায়েই রয়েছে শীতের পোষাক, হাতে কাস্তে, কোদাল ও ধান বহনের জন্য বাক। গেরস্থ (কৃষক) দেখলেই- শ্রমিকদের প্রশ্ন ‘কয়ড্যা লাগবি’ (কয়জন শ্রমিক লাগবে)। কৃষক তাদের চাহিদামত শ্রমিক দরদাম মিটিয়্ েসরাসরি নিয়ে যাচ্ছেন মাঠে।
মজিবুর রহমানসহ পাঁচজন কৃষকের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ধান কাটা, বিনাহালে রসুন রোপণ, সেখানে লারা (ধানের খড়) বিছানো ও ধানকাটাসহ জমি তৈরির কাজ করানো হয় এসব শ্রমিক দিয়ে। নভেম্বরের শুরু থেকে ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত চলে শ্রমিকদের এই হাট।
ধারাবারিষা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান আবদুল মতিন জানান, শুধু নয়াবাজার নয়  বনপাড়া-হাটিকুমরুল মহাসড়ক ঘেঁষে মশিন্দা ইউনিয়নের হাঁসমারী ও বড়াইগ্রামের মানিকপুর পয়েন্টে এরকম শ্রমিকের হাট রয়েছে। দক্ষিণ চলনবিলের পানি সবার আগে নামে। ধান কাটা আর বিনা হালে রসুন আবাদকে ঘিরে এই শ্রমিকের হাট বসছে। প্রতিদিন এখানে ৩ থেকে ৫ হাজার শ্রমিক কাজের সন্ধানে আসে। অন্য দুই পয়েন্টে এর চেয়ে কম সংখ্যক শ্রমিকের উপস্থিতি থাকে।
শ্রমিকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, তারা ছয় থেকে ২০ জনের দলবুক্ত হয়ে আসে শ্রম বাজারে। কৃষকের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে তারা বিভক্ত হয়ে মাঠে কাজ করে। কাজ শেষে দলবদ্ধ হয়ে বাড়ি  ফেরে। আবার দূরের শ্রমিকদের থাকার ব্যবস্থা করা হয় কৃষকের বাড়িতেই।
তাড়াশের বস্তুুল গ্রাম থেকে এসেছে শত শত ওরাঁও সম্প্রদায়ের নারী-পুরুষ। এদের দল নেতার নাম জোসনা ওরাঁও। রয়েছে কলেজ পড়–য়া রাখীটক্ক (১৭)। জোসনা ওরাঁও জানান, তাদের এলাকা অপেক্ষাকৃত নিচু। এখানে ইরি-বোরো আবাদ ছাড়া কাজ নেই। অলস বসে না থেকে এখানে এসেছেন। রসুন রোপণ, ধানকাটাসহ সকল কাজই তারা করে থাকেন। নিজের খেয়ে জনপ্রতি মজুরি পান ২০০ টাকা। কলেজ ছাত্রী রাখীটক্কির জানান, তারা নিজের খেয়ে মজুরি পান ২০০ টাকা। অথচ অন্য সম্প্রদায়ের পুরুষ নারীরা কৃষকের খেয়ে একই মজুরি পেয়ে থাকেন। আবার পুরুষ শ্রমিকরা ৩০০ টাকা করে মুজুরী পান। এ বৈষম্য থাকা ঠিক নয়।
উল্লাহপাড়ার সাইলজানি গ্রাম থেকে আসা মমতা বেগম ও গোলেজা বেওয়ার নেতৃত্বে এসেছে ২০ জনের একটি দল। প্রত্যককে ভাড়া গুনতে হয়েছে ১০ টাকা করে। রসুন রোপনের কাজ করেন তারা। এজন্য মজুরি পান ২০০ টাকা। তবে সকালে ও দুপুরে খাবার দেন জমির মালিক। এলাকায় কাজ না থাকায় তারা এখানে এসেছেন।
একই কথা জানালেন, তাড়াশের নওগাঁ থেকে আসা আয়শা বেগম (৪৫)। তিনি জানান, স্বামী মিন্টু প্রামানিক সড়ক দুর্ঘটনায় পঙ্গু। এক ছেলে এবং মেয়ে নিয়ে সংসার। জীবনের প্রয়োজনে তিনি এখানে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে এসেছেন। এখানে কাজ করে পাওয়া মজুরিতেই চলে তার সংসার।
এলাকার কয়েকজন কৃষক জানান, এই সময়টাতে এক সাথে কাজ শুরু হয়। এলাকায় শ্রমিক পাওয়া যায় না। বাইরের শ্রমিকরাই ভরসা। তাছাড়া আগত শ্রমিকদের মজুরিও অনেক কম।
গুরুদাসপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আবদুল করিম বলেন, উপজেলায় আট হাজার হেক্টরসহ পাশের বড়াইগ্রাম ও চাটমোহর উপজেলাতে অনুরুপ পরিমান বিনাহালে রসুন আবাদ হয়। এসব আবাদকে ঘিরে বিভিন্ন উপজেলা এলাকা থেকে শ্রমিকরা এখানে কাজ করতে আসেন।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ