চলনবিল ট্র্যাজেডিঃ তাদের ভুলেনি কেউ

আপডেট: সেপ্টেম্বর ২, ২০২২, ১২:৩৯ পূর্বাহ্ণ

মোশাররফ হোসেন মুসা:


কথিত আছে- দূর্ঘটনায় মারা যাওয়ার চেয়ে খুন হয়ে মরা ভাল; কারণ দূর্ঘটনার খবর মানুষ দ্রুত ভুলে যায়। কিন্তু খুনের ঘটনাটি দীর্ঘদিন আলোচনায় থাকে। গত বছর ৩১ আগষ্ট চলনবিলে বেড়াতে গিয়ে এক অপ্রত্যাশিত নৌকা ডুবিতে ৫ জনের অকাল মৃত্যু ঘটে। দূর্ঘটনায় তাদের মৃত্যু হয়েছে- সে হিসেবে মানুষ তাদের ভুলে যাওয়ার কথা। কিন্তু ঈশ^রদীবাসী একদিনের জন্যেও ঘটনাটি ভুলে নাই। শুধু তাই নয়, দেশের বিভিন্ন স্থানের পরিচিত-অপরিচিত মানুষের সঙ্গে দেখা হলে নৌকাডুবির প্রসঙ্গটি আসে। এতে প্রমাণিত হয়- সকল ঘটনা মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে যায় না, ট্রাজেডি সৃষ্টি করে না।

গত বছর ৩১ আগস্ট’১৮ তারিখে আমরা কয়েকজন কবি, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবি, গায়ক সহ পরিবার-পরিজন নিয়ে চলনবিলে নৌভ্রমণে যাই। আমরা বিল অতিক্রম করে তাড়াশ উপজেলায় গিয়ে যাত্রা শেষ করি। কিন্তু কয়েকজনের খামখেয়ালিপনায় আবারও ভাঙ্গুড়ার দিকে যাত্রা শুরু করি। হান্ডিয়াল কাটাখাল অতিক্রমকালে স্্েরাতের পাকে পড়ে নৌকাটি নিমিষেই তলিয়ে যায় এবং নৌকাডুবিতে পাঁচ জনের মৃত্যু ঘটে। তারা হলেন- বিল্লাল গনি ও তার স্ত্রী শিউলি বেগম, স্বপন বিশ^াস ও তার কন্যা সওদা মনি এবং আমার স্ত্রী শাহানাজ পারভীন পারু। আমরা যারা স্বজন হারিয়েছি তাদের দুঃখ কারোর চেয়ে কারোর কম নয়। এই দূর্ঘটনায় আমি আমার একান্ত প্রিয়জন স্ত্রীকে হারিয়েছি। প্রথম প্রথম ভাবতাম আমার দুঃখই হয়ত সবচেয়ে বেশি। পরে ভেবে দেখেছি- আমার সন্তানেরা তার মাকে হারালেও তাদের পিতা তো বেঁচে আছে। স্বপন বিশ্বাসের একমাত্র মেয়ে ছিল সৌদামনি। স্বপন ও সৌদামনিকে হারিয়ে স্বপনের স্ত্রী মুসলিমার বেঁচে থাকার অবলম্বন কী? বিল্লাল গনি ও তার স্ত্রী শিউলি বেগম নৌকা ডুবিতে প্রাণ হারিয়েছেন। তাদের একমাত্র কন্যা শর্মী কি ভাবে বেঁচে আছে! আমার ভিতরেও হাহাকার যেরকম , তাদের মনে দুঃখবোধ নিশ্চয় তার চেয়েও বেশি। আমরা যারা সেদিন নৌকা ভ্রমণে গিয়েছিলাম তারা সকলেই স্ব-স্ব অবস্থানে দায়িত্বশীল ব্যক্তি। পরিবারের প্রতি যতœবান। চেতনাগত দিকে থেকে প্রগতিমনা। বলা যায়, সমাজের অগ্রসরমান অংশের লোক। সেজন্য আমাদের নিয়ে সমালোচনা হয়েছে বেশি। যারা সমালোচনা করেছেন তারা আমাদের ভালোবেসেই করেছেন। তবে সেদিন জীবনের চরম মুহুর্তে আমাদের সাহস, সততা, মানবিকতা, উদারতা সহ চরিত্রের সবকিছু ফুটে উঠেছে। হয়ত সে কারণেই বলা হয়- বুদ্ধিজীবীরা কর্মী হওয়ার চেয়ে বুদ্ধি চর্চাকে বেশি পছন্দ করে।তাছাড়া অসংগঠিত ব্যক্তিরা যে কোনো কাজের নয়, সেটাও প্রমাণীত হয়েছে। আমি নৌকায় ছৈয়ের উপর বসে ফেসবুকিং করছিলাম। হঠাৎ দেখি নৌকাটি তলিয়ে যাচ্ছে। সামনের দিকে তাকাতেই দেখি আমার মেয়ে হাবু-ডুবু খাচ্ছে। কেউ তাকে ধরছে না। যে যার মত ভেসে থাকার চেষ্টা করছে। সাঁতার জানা সহযাত্রীদের কেউ কেউ সাতরে কিনারায় চলে যাচ্ছে। কেউ কেউ আত্ম চিৎকার করে কিনারায় দাড়িয়ে থাকা মানুষদের বলছে- আমাদের বাঁচান! আমাদের বাঁচান!! ক্ষণিককালের জন্য ঘটনাটি বর্ণিত কিয়ামতের মতো মনে হলো। এখানে উল্লেখ করতে হয়, নৌকা ডুবির আশংকা থেকে আমি খালি বোতলগুলো একটি সাইড ব্যাগে ভরে হাতের মুঠোর মধ্যে রেখেছিলাম। ঘটনার আকষ্মিকতায় তার সব ফেলে পানিতে ঝাপ দিয়ে মেয়েকে ধরি। তার কাছে যেতেইে সে আমাকে জড়িয়ে ধরে। ডুবে যেতে থাকি দুজন। নাক-মুখ দিয়ে পানি প্রবেশ করতে তাকে। নাসারন্ধে ঝাঝাঁলো অনুভুতি। দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম। মনে হলো এটাই মৃত্যুর পূর্ব মুহুর্ত। আজরাইল যেন জান কবজ করতে প্রস্তুত। হঠাৎ নিজেকে মেয়ের হাত থেকে মুক্ত করে ভেসে উঠে দম নেই। দেখি মেয়েও ভেসে উঠেছে। আবারও মেয়ের প্রতি মমতা সৃষ্টি হয়। তাকে ভাসিয়ে রাখার চেষ্টা করি। এখন চিন্তা করি- ওই সময় তো আমার স্ত্রীর কথা মনে পড়েনি, মেয়েকে নিয়ে ব্যস্ত থাকলাম কেন! আবার মেয়েকে দুরেও সরিয়ে দিয়েছি। তাহলে কি চুড়ান্ত মুহুর্তে মানুষ নিজেকেই বেশি ভালোবাসে! এটা হয়ত আমার বেলায় ঘটেছে। বিল্লাল গনি সাঁতার জানতেন। তার সাঁতার না জানা মেয়েকে নৌকায় তুলে দিয়ে নিজে তলিয়ে যান। পরে শুনেছি, যারা আগে নৌকায় উঠে বসেছিল, তাদের কেউ যদি গনি ভাইয়ের হাতটি ধরতেন, তাহলে গনি ভাই বেঁচে যেতেন। একই ঘটনা স্বপনের বেলাতেও ঘটেছে। রফিকুলের মুখ থেকে শোনা- তিনি নাকি সৌদামনির এক হাত আগে ধরেন এবং আরেক হাত স্বপনকে ধরতে অনুরোধ করেন। স্বপন নাকি মেয়ের হাত ধরে নিজেই তলিয়ে যেতে থাকে, তখন রফিকুল নিজেকে বাঁচাতে সৌদা মনির হাত ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। তিনি ভেবেছিলেন- উদ্ধারকারী নৌকাটি আগে ধরি, তারপরে তাদের উদ্ধার করা যাবে। আরেক জনের মুখে শুনেছি, স্বপন তার মেয়েকে নিয়ে সাতরে আসতে আসতে তলিয়ে যান। উদ্ধারকারী নৌকায় উঠে যাওয়া লোকগুলো মরনপণ দশা দেখেও তাদের উঠানোর চেষ্টা করেনি, কেউ কেউ নাকি মোবাইল ফোন নষ্ট হয়ে গেছে, ব্যাগ ভিজে গেছে এসব নিয়ে দুঃখ করতে থাকে। আমার স্ত্রী শাহানাজ পারভীন পারু ও বিল্লাল গনির স্ত্রী শিউলি বেগম নৌকার ছৈয়ের নিচে আটকে যান। তারাও প্রানপণ চেষ্টা করেছেন ছৈ থেকে বের হওয়ার। তারা নিশ্চয় দম বন্ধ হওয়ার পূর্বে সন্তানদের মঙ্গল কামনাই করেছেন। সহযাত্রী যারা বেঁচে আছেন- তাদের মধ্যে গায়ক, কবি, গবেষক ও এনজিও কর্মী রয়েছেন। তারা সকলেই মানবতাবাদী । তারা প্রকাশ্যে নিজেদের ক্রটি স্বীকার করেছেন (যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী শফি বাশার খান ও রফিকুল ইসলাম বাদে)- এমন কথা শোনা যায় নি। তারা এখন সকলেই স্বাভাবিক জীবন-যাপন করছেন। একজন তো বাড়ির কাছে নিজ খরচে মসজিদ নির্মাণ করে নিয়মিত নামাজ পড়া শুরু করেছেন। নিশ্চয় তিনি তার কৃত ভুলের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছেন (হয়তো সৃষ্টিকর্তার কাছে ক্ষমা চাওয়া সহজ; কিন্তু মানুষের কাছে ক্ষমা চাওয়া কঠিন)। আমার প্রতি মুহুর্তের মর্ম পীড়ার প্রধান কারণ নৌকা ডুবির ঘটনাটি। এ যেন আরেকটি টাইটানিক ডুবে যাওয়ার ঘটনা। স্বপন বিশ্বাসের মতো বন্ধুবৎসল ও প্রগতিমনা যুবক হাজারে কয়জন থাকে? তার কন্যা সৌদা মনি ছিল একজন সম্ভাবনাময় মেধাবী ছাত্রী। বিল্লাল গনি ছিলেন ইসলামিক আধ্যাত্মিক ব্যক্তি( তার বাবা পীর ছিলেন)। তাঁর মুখে হাদিসের ব্যাখ্যা শুনে যে কেউ বিমোহিত হতেন। আমার স্ত্রী শাহানাজ পারভীন পারু আমার মতো ছন্নছাড়ার সঙ্গে কীভাবে ২৬ বছর কাটালেন, সেটাই এখন ভাবছি। আগামী ৩১ আগষ্ট তাদের ১ম মৃত্যু বার্ষিকী। তাদের পরলোকিক জীবন যেন সুখের হয় এবং তাদের রেখে যাওয়া আর্দশ যেন আমাদের সন্তানেরা ধারন করতে পারে – সেই কামনাই করছি।
লেখকঃ নৌকা ডুবিতে বেঁেচ যাওয়া যাত্রী ও কলাম লেখক।
ঈবষষ : ০১৭১২-৬৩৮৬৮২

E-mail: musha.pcdc@gmail.com