চলনিবলে শামুকখোল পাখির অবাধ বিচরণে মনোমুগ্ধকর পরিবেশ

আপডেট: জুন ২২, ২০২৪, ৮:১৮ অপরাহ্ণ

পাবনার চাটমোহর উপজেলার বোয়াইলমারী বিলে বিচরণরত শামুকখোল পাখি। অতি সম্প্রতি তোলা ছবি।

শাহীন রহমান, পাবনা:


পাবনার চাটমোহর উপজেলার চলনবিলে বেশ কিছুদিন যাবৎ অবাধে বিচরণ করছে সারস জাতীয় পাখি শামুকখোল। পাখিগুলো খাল বিল জলাশয়ের পাশে নির্বিঘ্নে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কয়েক বছর আগেও এ এলাকায় শামুকখোল পাখি চোখে পড়তো না। পর্যাপ্ত খাবার, বসবাস ও প্রজননের সুবিধা পাওয়ায় ক্রমশই এ অঞ্চলে বাড়ছে শামুকখোলের সংখ্যা।

চাটমোহরের বিল জলাশয়ের নিকটবর্তী স্থান সমূহে প্রায়শই দেখা মিলছে শত শত শামুকখোল পাখির। ঝাঁক বেধে এসব পাখি যখন উড়ে এক স্থান থেকে অন্যত্র চলে যেতে থাকে তখন মনোমুগ্ধকর দৃশ্যে অবতারণা হয়। বিলের পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোর গাছের উঁচু ডালে আবাস গড়ে তুলে রাত যাপন করছে এ পাখি।

শ্বেতকায় বৃহদাকার জলচর পাখি শামুকখোলের বৈজ্ঞানিক নাম অহধংঃড়সঁং ড়ংপরঃধহং, এটি ঈরপড়হররফধব গোত্র বা পরিবারভূক্ত। কেউ কেউ অদ্ভুত ঠোঁট বিশিষ্ট এ পাখিকে শামুক ভাঙা পাখি আবার কেউ কেউ শামখৈলও বলে থাকেন। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, শ্রীলঙ্কাসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার স্থায়ী পাখি। এছাড়া পৃথিবীর অনেক দেশেই শামুকখোল পাখি দেখা যায়। সাদা রঙের এই পাখির পিঠ ও ডানার অংশে কালো রঙ দেখা যায়।

প্রয়োজনীয় খাবার এবং নিরাপত্তা পেলে একই এলাকাতে থাকতেই স্বাচ্ছন্দ বোধ করে। খাবারের সন্ধানে সকালে বাসা থেকে বেড় হয়ে জলাশয়ের নিকটবর্তী স্থানে চলে যায়। শামুক, ঝিনুক, ব্যাঙ, কাঁকড়াসহ ক্ষুদ্র জলজ প্রাণী এ পাখির প্রধান খাদ্য।

চাটমোহর শহরের বালুচর মহল্লার ইউটিউবার সিদ্দিক মিলন জানান, পাখি প্রাকৃতিক পরিবেশের অংশ। চলনবিল এলাকায় শামুকখোল পাখির অবাধ বিচরণ বিলের সৈন্দর্য্য বাড়িয়ে তুলছে। আগে এ এলাকায় শামুকখোল পাখি দেখা যেত না, এখন চাটমোহরের বেয়াইলমারী, করকোলা, গৌড়নগর, বোঁথরসহ বিভিন্ন বিলে, মাঠে শত শত শামুকখোল পাখির দেখা মিলছে। এটি অবশ্যই আশা জাগানিয়া একটি বিষয়।

তবে, চায়না দুয়ারী, নিষিদ্ধ কারেন্ট জালসহ বিভিন্ন জালের মাধ্যমে অবাধে পোনা মাছ নিধন হওয়ায় ক্রমাগত চলনবিলের মাছ কমছে। অসাধু ব্যবসায়ীদের ছত্রছায়ায় এলাকার কিছু গরিব মানুষ বছরের পর বছর বিলের শামুক ঝিনুক তুলে বিক্রি করায় কমে যাচ্ছে শামুক ঝিনুকও। মাছসহ অন্যান্য জলজ প্রাণী রক্ষা করা গেলে ক্রমশই এ পাখির বিস্তৃতি বাড়বে। এজন্য প্রশাসনকে সতর্ক থাকতে থাকতে হবে। জনসচেতনতাও বাড়াতে হবে।

পাখিপ্রেমী আশরাফুল আলম হেলাল জানান, এ এলাকার মানুষের মধ্যে সচেতনতা বেড়েছে। মানুষের পাখি হত্যার প্রবণতা কমেছে। এখন মানুষ আর অবাধে শামুকখোল পাখি হত্যা করে না। পাখি হত্যা বন্ধে প্রশাসনও তৎপর রয়েছে।

চাটমোহরের উত্তরাংশের বিলগুলোর অল্প জলে ও জল সংলগ্ন নিকটস্থ স্থল ভাগে শামুকখোল পাখির আধিক্য দেখা যাচ্ছে। এই অঞ্চল বিলের পাশে হওয়ায় শামুকখোল পাখি সহজেই শামুক ঝিনুকসহ অন্যান্য খাবার পাচ্ছে। সম্ভবত এ কারণেই ক্রমশই এ এলাকায় শামুকখোল পাখির সংখ্যা বাড়ছে।

নিমাইচড়া ইউনিয়নের গৌড়নগর গ্রামের সিদ্দিকুর রহমান জানান, বছর তিনেক আগেও এ এলাকায় শামুকখোল পাখি ছিল না। গত দুই তিন বছর যাবত এ এলাকায় শামুকখোল পাখির আনাগোনা বেড়েছে। এখন জলাশয়গুলোর পাশে শত শত শামুকখোল চোখে পড়ে। জলাশয় সংলগ্ন গ্রামের উঁচু গাছে বাসা তৈরি করে বসবাস করছে। সকাল বেলা ঝাঁক ধরে খাবারের সন্ধানে বেড়িয়ে পরে। সন্ধ্যার দিকে বাসায় ফেরে।

করকোলা গ্রামের সুজন আহম্মেদ জানান, এ বছর করকোলা মাঠে প্রচুর শামুকখোল পাখি দেখা গেছে। মানুষ সাধারণত এ পাখিকে বিরক্ত করে না। তবে কৌতুহল বশত কেউ কেউ ছবি তুলতে গেলে এরা বিরক্ত হয়ে দূরে সরে যায়।

পাবনার ‘ন্যাচার এন্ড ওয়াইল্ড লাইফ কনজারভেশন কমিউনিটি’র সাংগঠনিক সম্পাদক হাসান মাহমুদ জানান, শামুকখোল আমাদের দেশীয় পাখি। এ পাখির প্রধান খাবার শামুক। জলাশয়ের নিকটবর্তী স্থানে বিচরণ করে। এরা বিরক্ত হলে বা খাবার না পেলে দেশের এক এলাকা থেকে আরেক এলাকায় চলে যায়। যে এলাকাকে বসবাসের উপযোগী মনে করে সে এলাকায় বাসা তৈরি করে। বাচ্চা ফোটায়। চলনবিল অধ্যুষিত চাটমোহরে বেশ কিছু বিল রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা এবং বিলে পর্যাপ্ত খাবার পেয়ে এ এলাকায় অবাধে বিচরণ করছে শামুকখোল পাখি।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ