চাঁপাইনবাবগঞ্জের ফজলী আমকে জিআই স্বীকৃতির দাবি

আপডেট: মে ১৫, ২০২২, ১০:৫৩ অপরাহ্ণ

চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি:


ফজলী আম জিআই (ভৌগলিক নির্দেশক) পণ্য হিসেবে রাজশাহী জেলার পক্ষে নিবন্ধনের বিরোধীতা করে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার পক্ষে নিবন্ধনের দাবিতে শিল্প মন্ত্রণালয়ের ডিজাইন, পেটেন্ট ও ট্রেডমার্কস বিভাগে একটি আপত্তি দাখিল করা হয়। প্রেক্ষিতে পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্কস বিভাগ এই আপত্তির যৌক্তিকতা বিবেচনা করেই আগামী ২৪ মে উভয় পক্ষের শুনাণির দিন ধার্য্য করেছে।

ইতোপুর্বে ফজলী আমের জিআই স্বীকৃতির দাবিতে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও শিবগঞ্জে বাগানমালিক, আম ব্যবসায়ী, চেম্বার অফ কমার্স, সাংবাদিকসহ জেলার বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ মানববন্ধন, জেলা প্রশাসক বরাবর স্মারকলিপি প্রদানসহ আন্দোলন অব্যাহত রেখেছে।

বিশেষ করে যে পণ্য একটি অঞ্চলের ঐতিহ্যের অংশ সেটির ক্ষেত্রে এই সনদ দেয়া হয়। আবহাওয়া, মাটি, পানি ও ভৌগলিক গঠনের উপরে যেকোনো কৃষি পণ্যের বৈশিষ্ট্য, ঘ্রাণ ও স্বাদ নির্ভর করে এবং নির্দিষ্ট অঞ্চলেই সেটা হবে। জাতীয় এমনকি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আমের সুতিকাগার বলতে চাঁপাইনবাবগঞ্জকেই বুঝায় এবং সেটা প্রায় ১০০ বছরেরও অধিক সময় ধরে।

জানা গেছে, দেশ বিভাগের প্রায় দেড়শত বছর আগে থেকেই মালদহ তথা গৌড়ের ফজলী আমের সুখ্যাতি রয়েছে। গৌড়ের অংশ হিসেবে সেই সুখ্যাতির পরিপূর্ণ অধিকারী চাঁপাইনবাবগঞ্জ।

১৮০০ সালের দিকে চাপাইনবাবঞ্জ সীমান্ত সংলগ্ন গৌড়ে ফজলবিবি নামে এক বৃদ্ধা বাস করতেন। সে সময় ভারতের মালদহ জেলা কালেক্টর রাজভেনশ সরকারী কাজে গৌড়ে আসেন ও বৃদ্ধার বাড়ীর কাছে শিবির স্থাপন করেন। কালেক্টরের আগমন বার্তা শুনে বৃদ্ধা কালেক্টরের জন্য উপঢৌকন হিসেবে তার বাড়ীর আঙ্গিনায় আম উপহার দেন। কালেক্টর আম খেয়ে তৃপ্ত হন এবং বৃদ্ধাকে সেই আমের নাম জানতে চান। বৃদ্ধা কথা বুঝতে না পেরে তার নিজের নাম বলেন। সেই থেকে আমটির নামকরণ হয় ‘ফজলী’।

ছত্রাজিতপুরের আমবাগান মালিক হারুনুর রশিদ জানান, রাজশাহীতে ফজলী বা অন্য কোন আমের ঐতিহাসিক স্বীকৃতি নেই। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ রাজশাহী জেলার অন্তর্ভুক্ত হয় সেই সুবাদেই চাঁপাইনবাবগঞ্জের ইতিহাস ঐতিহ্যকে তাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য বলে দাবী করে।

যেমনটা চাঁপাইনবাবগঙ্গের ভোলাহাট হচ্ছে রেশমের সুতিকাগার এবং সমগ্র দেশের ৬০ শতাংশ রেশম সূতা সেখানে উৎপাদিত হয়। শুধু তাই নয় শিবগঞ্জ, হরিনগর, লাহারপুর তাঁতে বোনা রেশম বস্ত্র দেশখ্যাত। কিন্তু রাজশাহী শহরে পাওয়ারলুম বসিয়ে রেশম নগরী করে রেশমের জি আই স্বীকৃতি লাভ করেছে।

সমাজকর্মী নাহিদ হোসেন জানান, ১৯৮২ সালে এ জেলা থেকে পোরশা উপজেলাকে ছিনিয়ে নিয়ে নওগাঁয় অন্তর্ভূক্ত করে দেয়া হয়েছে। এভাবে এ জেলার ঐতিহ্যকে ছিনিয়ে নেয়ার প্রবণতা কমছে না। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী সারা দেশে উৎপাদিত মোট আমের এক চতুর্থাংশ চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলাতেই উৎপাদিত হয়।

এ জেলায় ৩৮ হাজার হেক্টর জমিতে প্রায় ৪ লাখ টন আম উৎপাদিত হয় যার ২৩ ভাগ বা প্রায় ৮৫ হাজার টন ফজলী আম উৎপাদিত হয়। যেখানে রাজশাহী জেলায় ফজলী আম উৎপাদন হয় মাত্র ২৮ হাজার টন। দেশভাগের পর থেকে সিংহভাগ আমের বিপণন হয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকেই।

এ জেলার মত বিশাল পরিমানের আম বাগান আজও অন্য কোন জেলায় নেই। আমের জন্য লাগসই ভুপ্রকৃতি, আবহাওয়া ও তাপমাত্রা প্রয়োজন তা চাঁপাইনবাবগঞ্জে শতভাগ নিশ্চিত করে বলেই কৃষি দপ্তরের গবেষণা বিভাগ বলে। পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্কস বিভাগ যে সকল শর্তের প্রেক্ষিতে জিআই পণ্যের স্বীকৃতি প্রদান করে অর্থাৎ ঐতিহাসিক, ভৌগলিক, উৎপাদন, বিপণন সবই ফজলী আমের ক্ষেত্রে পুরণ করেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ।

শুধু তাই নয় বাস্তবে একটি প্রমাণ দিলে আরও স্পষ্ট হবে। যে কোন ভোক্তার সামনে যদি চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহীর ফজলী আম রাখা যায় তাহলে প্রথমেই চাপাইনবাবগঞ্জের ফজলী আমই বেছে নেবে।

এদিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য সংসদেই ফজলী আমের স্বীকৃতির দাবী জানিয়ে উত্থাপন করেন। এছাড়া অন্য দু’জন সংসদ সদস্য চাঁপাইনবাবগঞ্জের পক্ষেই ফজলী আমের স্বীকৃতির দাবি জানান।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ