চাঁপাইনবাবগঞ্জে পারিবারিক বিরোধ, প্রতিপক্ষ কে স্বাধীনতা বিরোধী হিসেবে পোস্টার দিয়ে হেনস্তা, এলাকায় নিন্দার ঝড়

আপডেট: জুন ২৬, ২০২৪, ১০:২৩ অপরাহ্ণ


চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি:


পৈত্রিক জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে বনিবনা নেয় পরিবারে। সেই পরিবারেরই ১ ভাই ছাড়া বাকি ৩ ভাইয়ের ছবি ও বাবার নাম দিয়ে হঠাৎ গ্রামজুড়ে পোস্টার। ২য় বিশ্বযুদ্ধে অংশে নেওয়া প্রয়াত সৈনিক ও অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক বাবা, আমেরিকার একটি স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ও বাকি দুই ভাইকে রাজাকার ও মানবতাবিরোধী অপরাধী চিহ্নিত করে পোস্টার সাটান হয়। পারিবারিক বিরোধের জের ধরে গ্রামজুড়ে বির্তকিত এই পোস্টারকে ঘিরে তীব্র নিন্দার ঝড় বইছে গ্রামজুড়ে।

এনিয়ে ক্ষোভে ফুঁসছে পুরো গ্রামবাসী। রাগে-ক্ষোভে রাতের অন্ধকারে লাগানো বির্তকিত পোস্টার ছিঁড়ে ফেলেছে গ্রামের লোকজন। ঘটনাটি ঘটেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের সদর উপজেলার নারায়নপুর ইউনিয়নের চন্দ্রনারায়নপুর হাট, জনতা হাট, সূর্যনারায়ণপুর, টিকলীচর, ঘুটনীপাড়া, খড়িবোনা, বাইনাপাড়া, আলিমনগর গ্রামে।

স্থানীয় বাসিন্দা, গ্রামবাসী ও জনপ্রতিনিধি সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার (২০ জুন) সকালে হঠাৎ করেই গ্রামের বিভিন্ন সড়কের বৈদ্যুতিক খুঁটি ও দেয়ালে কিছু বিতর্কিত পোস্টার দেখা যায়। তা দেখা মাত্রই রাগ-ক্ষোভে ছিঁড়ে ফেলে গ্রামের বিভিন্ন বয়সী নারী-পুরুষ। তাদের ধারণা, বুধবার দিবাগত রাতের অন্ধকারেই গোপনে এমন পোস্টার লাগিয়েছে দুর্বৃত্তরা। এখন তাদেরকে খোঁজাখুঁজি করছে পুরো গ্রামের বাসিন্দারা৷

পোস্টারে লেখা হয়, “চাঁপাইনবাবগঞ্জের সূর্যনারায়ণপুর গ্রামের নিবাসী ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা বিরোধী, রাজাকার ও আল-বদর বাহিনীর অন্যতম সদস্য মকবুল হোসেন মাস্টারের বড় ছেলে স্বাধীনতা বিরোধী ও ইসলামী ছাত্র সংঘের অন্যতম নেতা যুক্তরাষ্ট্রে পলাতক প্রফেসর ড. আবুল কাশেম, তার আরেক সন্তান শামসুল হক-জহির ও তার আরেক সন্তান স্বাধীনতা বিরোধী, ধর্ষক, অগ্নি-সংযোগকারী এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য রাজাকার মতিউর রহমানসহ সকলের দৃষ্টান্ত-মূলক শাস্তি ও বিচার চায়। পোস্টারে উল্লেখ করা হয়, প্রচারে: অত্র এলাকার সর্বস্তরের জনগণ। অথচ জনতা হাট ও সুর্যনারায়ণপুর গ্রামের শতাধিক মানুষকে জিজ্ঞেস করলে তারা এসবের কিছুই জানেন না এবং এমন কাজকে গর্হিত বলে জানান তারা।

পোস্টারে নাম ও ছবি থাকাদের অভিযোগ, চাঁপাইনবাবগঞ্জের সূর্যনারায়ণপুর গ্রামের প্রয়াত স্কুলশিক্ষক মকবুল হোসেন মাস্টারের মেজো ছেলে আলহাজ্ব আব্দুল মাতিন ওরফে জাল কালুর মদদেই হয়েছে এসব পোস্টার লাগানোর কাজ। এবিষয়ে তার আপন ভাই পোস্টারে নাম ও ছবি থাকা মতিউর রহমানের অভিযোগ করে বলেন, মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় আমার বয়স ১০ বছর। আমাকে সেই বিতর্কিত পোস্টারে একজন স্বাধীনতা বিরোধী ব্যক্তি ও রাজাকার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ মাত্র ১০ বছর বয়সে এসব কার্যক্রম করার কথা নয়। তবুও শুধুমাত্র ব্যক্তিগত স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য আমার আপন ভাই মাতিন ওরফে জাল কালুই তার ছেলে সেলিম ও আজমকে দিয়ে এসব পোস্টারিং করেছে।

মতিউর রহমান আরও বলেন, পদ্মার চরে থাকা আমার বাবার প্রায় ১০-১২ বিঘা জমি গত প্রায় ২০ বছর ধরে ভোগদখল করছেন আমার মেজো ভাই আব্দুল মাতিন। দীর্ঘ সময় ধরে বাকি ৬ বোন ও ৩ ভাইকে বঞ্চিত করে আসলেও সর্বশেষ গত কয়েক মাস আগে জমির ন্যায্য হিসাব বুঝে নিতে গ্রাম্য সালিশ বসায়। সালিশে সব ভাই-বোনকে জমি বুঝিয়ে দেওয়ার কথা উল্লেখ করে সমাধান করে দেয়া হয়। কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে সালিসের কথা স্বীকার করলেও পরবর্তীতে জমি দিতে অস্বীকৃতি জানায় আব্দুল মাতিন।

তিনি বলেন, পৈত্রিক সম্পত্তির জন্য চাপ দিতে থাকলে উপায় না পেয়ে বাবা ও আপন তিন ভাইকে রাজাকার আলবদর উল্লেখ করে সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছে জাল কালু। আমরা পোস্টার লাগানোর খবর পেয়ে এলাকায় যাওয়ার আগেই গ্রামবাসী তা ছিঁড়ে ফেলেছে। কত নিকৃষ্ট ব্যক্তি হলে প্রয়াত বাবার বিরুদ্ধে এমন কথা উল্লেখ করে এমন পোস্টারিং করতে পারে তা তাকে দেখেই বোঝা যায়। আমরা এর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করছি। আশা করছি ন্যায়বিচার পাব ও তাকে উপযুক্ত শাস্তি প্রদান করা হবে।

জনতা-হাট গ্রামের বাসিন্দা এসলাম আলী (৮২) জানায়, বৃহস্পতিবার সকালে হঠাৎ করেই দেখা গেছে কিছু পোস্টার লাগানো হয়। লেখা হয়েছে প্রচারে, সর্বস্তরের জনগণ। কিন্তু গ্রামের লোকজন এবিষয়ে কিছুই জানেন না। এমনকি প্রয়াত মকবুল হোসেন মাস্টার, তার সন্তান আমেরিকা প্রবাসী-প্রফেসর ড. আবুল কাশেম, শামসুল হক জহির ও মতিউর রহমান’র স্বাধীনতা বিরোধী কোনও কার্যক্রম ছিলো না।

একই গ্রামের মো. আলাউদ্দিন (৬৪) জানান, স্বাধীনতার প্রায় ৫৩ বছর পরে এসে এসব পোস্টার লাগানোর সাথে এই এলাকার জনগনের কোন সম্পর্ক নেই। জনগণের নামে এসব পোস্টার লাগানোর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানায়। ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের জন্য এই কাজ করা হয়েছে।

নারায়ণপুর ইউনিয়ন পরিষদের ০৯ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য মো. রুহুল আমিন জানান, আমি পোস্টার দেখতে পায়নি। তবে গ্রামের লোকজনের মুখে শুনেছি। এটি তাদের পারিবারিক বিরোধ থেকেই হতে পারে। জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে অনেকবার তাদের সালিস হয়েছে। আমি নিজেও কয়েকটিতে উপস্থিত ছিলাম, কিন্তু শেষ পর্যন্ত-সুরাহা হয়নি।
চন্দ্রনারায়ণপুর হাট এলাকার নজরুল ইসলাম (৭০) বলেন, গ্রামবাসীর নাম করে এমন একটা স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে যে বা যারা এই কাজ করেছে তাদেরকে সামনে পেলে থাপড়াতাম। আমরা এসবের কিছুই জানি না। জনগণ তাদেরকে পেলে কঠোর-শাস্তির আওতায় নিয়ে আসবে।

আলহাজ্ব আব্দুস সামাদ কলেজের সহকারী অধ্যাপক শরিফুল ইসলাম জানান, সড়কের কয়েকটি জায়গায় ও সূর্যনারায়নপুর হাটে আসলে চোখের সামনে পোস্টার দেখতে পাই। তারমধ্যেই এলাকাবাসী ছিঁড়ে ফেলেছে। পারিবারিক জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরেই এটা হয়েছে।

তরিকুল ইসলাম নামের এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, জমিজমা জবরদখল নিয়ে বাকি ভাই-বোনদের সাথে আব্দুল মাতিন এর ঝামেলা চলছে অনেকদিন থেকে। এরই সূত্র ধরে বাবা ও আপন তিন ভাইকে রাজাকার আলবদর উল্লেখ করে পোস্টার লাগিয়েছে বলে জানতে পেরেছি। অথছ তার ভাইদের ও বাবার কোন ভূমিকা ছিল না স্বাধীনতা বিরোধী কার্যক্রমে।
এবিষয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওসি মো. মেহেদী হাসান জানায়, এখন পর্যন্ত জনতা ও সূর্যনারায়নপুর এলাকায় বির্তকিত পোস্টার লাগানোর বিষয়ে কোনও অভিযোগ পায়া যায়নি। অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ