চাই জনবান্ধব পুলিশ

আপডেট: মার্চ ৩১, ২০১৭, ১২:৩৯ পূর্বাহ্ণ

ড. মির্জা গোলাম সারোয়ার পিপিএম



ঔপনিবেশিক আমলের ধ্যান-ধারণার পরিবর্তন ঘটিয়ে পুলিশ বাহিনীকে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে একাত্ম ও আরও জনবান্ধব হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গত ২৩ জানুয়ারি রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ লাইনে ‘পুলিশ সপ্তাহ-২০১৭’ উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে তিনি এ আহ্বান জানান। প্রধানমন্ত্রী বলেন, “ঔপনিবেশিক আমলের ধ্যান-ধারণার পরিবর্তে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গে একাত্ম হয়ে পুলিশের সেবাকে আরও জনবান্ধব হতে হবে। পুলিশ সপ্তাহ উপলক্ষে পুলিশ সদস্যদের মনোজ্ঞ কুচকাওয়াজের সালাম গ্রহণ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং একটি খোলা জিপে প্যারেড পরিদর্শন করেন। প্যারেড পরিদর্শনের পর প্রধানমন্ত্রী সালাম গ্রহণ করে। অনুষ্ঠানের প্রধানমন্ত্রী চারটি ক্যাটাগরিতে ১৩২ পুলিশ সদস্যের মাঝে ‘বাংলাদেশ পুলিশ পদক’ ও ‘রাষ্ট্রপতি পুলিশ পদক’ বিতরণ করেন।
অনুষ্ঠানে পুলিশ বাহিনীর আধুনিকায়ন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পরিবর্তনশীল বিশ্বে প্রযুক্তির উৎকর্ষতার সঙ্গে সঙ্গে নিরাপত্তা ও অপরাধের নিত্য নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় পুলিশের আধুনিকায়নের কোন বিকল্প নেই। বাংলাদেশ পুলিশের কৌশলগত পরিকল্পনা, অবকাঠামো ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করে কর্মক্ষেত্রে পুলিশের সার্বিক সক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে। পদক বিজয়ীদের অভিনন্দন জানিয়ে তিনি বলেন, এ পদক আপনাদের কাজের স্বীকৃতির পাশাপাশি ভবিষ্যতে আরও পেশাদারিত্ব ও আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করবে। পাশাপাশি সততা, নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সাথে নিজ নিজ দায়িত্ব পালনে প্রতিটি পুলিশ সদস্যকে ব্রতী হতে বলেন। প্রধানমন্ত্রী তাঁর রাজনৈতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নে দেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা অব্যাহত থাকলে আমরা অচিরেই জাতির জনকের স্বপ্নের ‘সোনার বাংলা’ গড়ে তুলতে সক্ষম হবো।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, “আমাদের মহান নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ভাষণে যে কথা বলেছিলেন, এই দেশ স্বাধীন দেশ, আমরা স্বাধীন দেশের নাগরিক। কাজেই প্রতিটি ক্ষেত্রেই দায়িত্ববোধ থাকতে হবে, থাকতে হবে জনসেবা করার মানসিকতা। তিনি বলেন, বাংলাদেশ পুলিশের নারী সদস্যরা জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনসহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিভিন্ন ইভেন্টে অংশ গ্রহণের মাধ্যমে প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমাদের পুলিশ বাহিনীর অর্জিত অভিজ্ঞতা দেশের আইন শ্ঙ্খৃলাসহ সার্বিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কিন্তু দেশি-বিদেশি চক্র নানাভাবে বাংলাদেশর অগ্রযাত্রা ব্যহত করে চায়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান বিশ্ব গ্লোবাল ভিলেজ। আমাদের পুলিশের কর্মক্ষেত্র, কর্মব্যাপ্তি বৃদ্ধি পেয়েছে। শুধু চুরি-ডাকাতি, হত্যা-রাহাজানি বন্ধ নয়। পুলিশের কাজের ক্ষেত্র আজ বিস্তৃত হয়েছে সাইবার ক্রাইম, মানি লন্ডারিং, মাদক-পাচার, পণ্য চোরাচালান, নারী শিশু পাচার এমনকি জলজ-বনজ এবং পরিবেশ সংরক্ষণে। পুলিশের উন্নয়নে গৃহীত সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের প্রসঙ্গ তুলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাঁর সরকারই ২০০৯ সালে দায়িত্ব গ্রহণের পর বাংলাদেশ পুলিশের সাংগঠনিক কাঠামোতে ৭৯৯ টি ক্যাডার পদ সহ ৩২ হাজার ৩১টি  পদ সৃজন করে। দেশের জনসংখ্যার অনুপাতে পুলিশের জনবল যথেষ্ট নয় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের সরকার বাংলাদেশ পুলিশে আরো ৫০ হাজার জনবল নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ইতিমধ্যে প্রায় ৪১ হাজার পদ সৃজন করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদ নির্মুলে পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে সারাদেশে কাউন্টার টেররিজম ইউনিট গঠন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
পরে প্রধান মন্ত্রী বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর সিআইডির ফরেনসিক ডিএনএ ল্যাবরেটরি, সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন সেন্টার এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও একাত্তরের বীর শহিদদের স্মরণে নির্মিত রাজারবাগ-’৭১ নামের আবক্ষ মূর্তির নাম ফলক উন্মোচন করেন। পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর উদ্বোধনের সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কিছু দুর্লভ ছবি দেখে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
প্রধানমন্ত্রী উর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়ে পুলিশ সপ্তাহ উপলক্ষে কেক কাটেন। তিনি পুলিশ নারী কল্যাণ সমিতি (পুনাক) স্টল পরিদর্শন করেন। পরে প্রধানমন্ত্রী এই প্রথম পুলিশের সব পর্যায়ের সদস্যদের সঙ্গে কল্যাণ প্যারেডে অংশগ্রহণ করেন রাজারবাগ শহিদ এসআই শিরুমিলা মিলনায়তনে। প্রধানমন্ত্রীকে কাছে পেয়ে তাঁরা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আছাদুজ্জামান খান কামাল ও স্বরাষ্ট্র সচিব ড. কামাল উদ্দীন, পুলিশ মহাপরিদর্শক এ.কে.এম শহীদুল হকের সভাপতিত্বে প্রথমবার অনুষ্ঠিত কল্যাণ প্যারেডে নানা-দাবি-দাওয়া তুলে ধরা হয়। কল্যাণ প্যারেডের শুরুতেই স্বাগত বক্তব্য দেন পুলিশের মহাপরিদর্শক একে এম শহীদুল হক। তিনি বলেন, ‘এখানে পুলিশের সব পদের কর্মকর্তাদের প্রতিনিধি উপস্থিত আছেন। বর্তমান আওয়ামীলীগ সরকার পুলিশের সমস্যাগুলো সমাধানে অত্যন্ত আন্তরিক। পুলিশের বাজেট অনেক বেড়েছে। আমাদের নতুন করে তেমন কোন দাবি-দাওয়া নেই। পুলিশ সদস্যরা আপনাকে পেয়ে অত্যন্ত খুশি। তারা শুধু কিছু বিষয় তুলে ধরবেন।
দুপুর দেড়টার সময় প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে কল্যাণ প্যারেড শুরু করে অন্যান্য পদমর্যাদার সহ¯্রাধিক সদস্য এতে অংশ নেন। প্রধানন্ত্রীকে কাছে পেয়ে পুলিশ সদস্যরা খোলামেলা কথা বলেন। সবার বক্তব্য ধৈর্য্য এবং মনোযোগ সহকারে শোনার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে প্রথমবার রাজারবাগে এসে দেখেছি, এই এলাকা জরাজীর্ণ ছিল। এক সময় রাজারবাগে প্যারেড গ্রাউন্ড ছিল না। বসবাসের জন্য ভাল ব্যবস্থা ছিল না। আমার কাছে কেউ দাবি জানায়নি। নিজ থেকে রাজারবাগ প্যারেড গ্রাউন্ড তৈরিসহ অনেক উন্নয়ন করেছি। আগে পুলিশের কথা শুনলেই এ দেশের মানুষ খারাপ দৃষ্টিতে দেখতো। আমরা এ দৃষ্টি ভঙ্গি পাল্টাতে কাজ করেছি।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, দেশের বিভিন্ন জায়গায় থানা এবং পুলিশের অনেক স্থাপনা ছিলো জরাজীর্ণ। দায়িত্ব পালনের জন্য ছিলো না ভালো যানবাহন। ঘট ঘট শব্দ করে লক্কর ঝক্কর গাড়ি নিয়ে যাওয়ার আগেই অপরাধীরা পালিয়ে যেত। পুলিশ বাহিনীর সার্বিক উন্নয়নে আওয়ামী লীগ নানা উদ্যোগ নিয়ে তা বাস্তবায়ন করছে। এছাড়া পরিচ্ছন্ন পোশাক পরে দায়িত্ব পালনে বছরে চার সেট পোশাক দেয়ার আশ্বাস দেন তিনি। তিনি বলেন, ঢাকায় আরেকটি পুলিশ ব্যারাক প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, পুলিশের আবাসন সমস্যা থাকবে না। ব্যারাক, আবাসন ও অন্যান্য সমস্যা দূর করা হবে। তিনি বলেন, আপনাদের সমস্যাগুলো সম্পর্কে আমি ওয়াকিবহাল আছি। কোন কিছুর জন্য আপনাদের দাবি জানাতে হবে না। আমরা পুলিশে নারীদের অধিক হারে নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। নারী পুলিশের পক্ষ থেকে তাদের পোশাক ও শাড়ির সংখ্যা বাড়ানোর জন্য যে যৌক্তিক দাবি এসেছে তা বাস্তবায়নের জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী।
বর্তমানে বাংলাদেশ পুলিশের মোট সদস্য সংখ্যা ১,৯৪,৭১৩ জন। আমাদের দেশে বর্তমানে জনসংখ্যা ও পুলিশের অনুপাত ৮২২:১। জনগণকে কাক্সিক্ষত সেবা প্রদানের জন্য বতর্মান সরকার ধারাবাহিকভাবে পুলিশের সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধির পরিকল্পন বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছে। বাংলাদেশ পুলিশের ১৬,৭৯৭ জন সদস্য ১৯৮৯ সাল হতে এখন পর্যন্ত ২১টি শান্তিরক্ষা মিশনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে সুনামের সাথে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে তাদের দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠার অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। এ পর্যন্ত ১১০৯ জন নারী পুলিশ সদস্য জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশনে সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করেছে। বর্তমান বাংলাদেশের শান্তিরক্ষী বাহিনী বিশ্বশান্তি রক্ষায় লাইবেরিয়া, সুদান, আইভরিকোস্ট, কঙ্গো, হাইতি, মালি, সোমালিয়া এবং দক্ষিণ সুদানসহ বিশ্বের ৮টি দেশে তাদের অবদান রাখছে। তন্মধ্যে ঋচট-তে ১০৩৫ জন,  টচঙখ-এ ১১৬ জন সদস্য এবং জাতিসংঘে প্রফেশনাল চাকরিতে ৫ জন কর্মকর্তা কর্মরত রয়েছে।
স্বাধীনতা প্রাপ্তির পর ১৯৭৪ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর আন্তরিক উদ্যোগে সর্বপ্রথম ১৪ জন নারী পুলিশ সদস্য সাদা পোশাকে প্রতিরক্ষার দায়িত্ব পালনে স্পেশাল ব্রাঞ্চে নিয়োজিত হয়। বর্তমান সরকারের কর্ম কৌশলের অংশ হিসেবে ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ উদ্যোগে, বাংলাদেশ পুলিশে নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে অভুতপূর্ব সাফল্য অর্জিত হয়েছে। তিনটি জেলায় পুলিশ সুপারসহ চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশে নারী ওসির পদায়ন ও সম্প্রতি ট্রাফিক সার্জেন্ট হিসেবে নারী পুলিশের নিয়োগ এ অগ্রযাত্রায় এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। পার্বত্য রাঙ্গামাটি জেলাসহ সাতটি বিভাগীয় শহরে মোট আটটি ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার স্থাপনসহ নির্যাতন ও সহিংসতায় শিকার নারী ও শিশুকে নিরাপদ আশ্রয়সহ শারীরিক, মানসিক ও আইনগত সেবা প্রদান অব্যাহত রয়েছে। থানায় স্থাপিত উইমেন্স হেল্প ডেক্স এর মাধ্যমে নারী ও শিশু নির্যাতন বিষয়ক ঘটনাগুলোর সুষ্ঠু তদন্তসহ আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা হচ্ছে।
জনগণ বিপদে পড়ে অসহায় অবস্থার পুলিশের শরণাপন্ন হন। তখন যদি তাকে কোন অনিয়মের শিকার হতে হয় তবে সেটা নির্যাতনের পর্যায়ে পড়ে। এজন্য পুলিশের নিয়োগ পরীক্ষার পরিবর্তন করতে হবে যাতে কেউ কোন প্রকার অসৎ উপায়ে নিয়োগের সুযোগ না পায়। পাশাপাশি পুলিশের বর্তমান ট্রেনিং সিলেবাসে আবশ্যকীয়ভাবে মানবাধিকার, নৈতিকতা, আচরণ বিধি ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত করে পুলিশ সদস্যদের মূল্যবোধের একটি ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে হবে। পুলিশ বিভাগের কর্মকর্তা ও অন্যান্য পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালনের জন্য পর্যাপ্ত যানবাহন সরবরাহ করতে হবে। পাশাপাশি প্রাপ্ত বেতন-ভাতা এবং সুযোগ সুবিধা নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে যাতে জীবন যাত্রার নূন্যতম মান বজায় রাখা যায় যে ব্যবস্থা করতে হবে। পুলিশি ব্যবস্থায় ক্ষমতার ব্যবহার, শক্তি প্রয়োগ যেমন অনস্বীকার্য, তেমনি তা সঙ্গতিপূর্ণ হওয়াও বাঞ্ছনীয়। কাজেই এরূপ কাজের ক্ষেত্রে নিবিড় তদারকির প্রয়োজন। পুলিশি কার্যক্রমের যে অংশটি বিচার-প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত। বিশেষ করে তদন্ত, আসামী গ্রেফতার ও আদালতে প্রেরণ, রিমান্ড, তদন্ত প্রতিবেদনের গ্রহণ যোগ্যতা ইত্যাদি কাজসমূহের জবাবদিহিতা আদালতের মাধ্যমে বর্তমানে যেভাবে কার্যকর আছে তা যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে পুলিশ বাহিনীকে আরও দায়িত্বশীল হতে অনুপ্রাণিত করা যায়। কিন্তু আমাদের দেশে একশ্রেণির রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সুবিধাভোগী লোকজন পুলিশকে তাদের অধীনস্ত রেখে প্রতিনিয়তই নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করে চলেছে। পুলিশ বিভাগের জন্য-কমিশন করে সংস্কার সাধনের মাধ্যমে এই রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সুবিধাভোগী লোকদের দমন করা যায়। পুলিশ বিভাগের সংস্কার হলে সন্দেহাহীতভাবে এর ফলে দেশের জনসাধারণ উপকৃত হবে এবং পুলিশের ওপর জনগণের আস্থা বাড়বে।
পুলিশ এবং জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে একটি টেকসই নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব। পুলিশ-জনতার সম্মিলিত উদ্যোগে অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকারের মাধ্যমে সমাজ থেকে পুলিশভীতি ও অপরাধভীতি দূর করাসহ প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তাবোধ বৃদ্ধি করাই পুলিশের লক্ষ্য। জনসম্পৃক্ততা এবং জনগণের অংশগ্রহণ ব্যতিত আইন-শৃঙ্খলা উন্নয়ন কাক্সিক্ষত পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। পুলিশের কাজের প্রকৃতি হল আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করার জন্য সমাজকে চেনা এবং সমাজের সাথে একটি নিবিড় যোগসূত্র তৈরি করা। স্বাধীনতার চল্লিশ বছর পরে হলেও সরকার ২০১১ সালে বাংলাদেশ পুলিশকে “স্বাধীনতা পদক” প্রদান করে। এটা ছিল বাংলাদেশ পুলিশের জন্য অত্যন্ত গৌরবের অর্জন। বাংলাদেশ পুলিশের জনবল বর্তমানে প্রায় ১ লক্ষ ৭০ হাজার। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের জনবল ৩৪ হাজারের উপরে। জনবলের দিক থেকে বাংলাদেশ পুলিশ সরকারের সবচেয়ে বড় সংস্থা। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ বাংলাদেশ পুলিশের সবচেয়ে বড় ইউনিট।
আবহমান কাল থেকে পুলিশ বাহিনী ঐতিহাসিকভাবে সেবামূলক বাহিনী হিসেবে ব্রিটিশ সরকারের শাসনামল থেকে শুরু করে পাকিস্তান শাসনামলে ও বর্তমানে বাংলাদেশে নিজেদের দায়িত্ব পালন করে আসছে। অতীতকাল থেকে কিছু পুলিশ সদস্যের বিরূপ কর্মকা-ের কারণে সাধারণ মানুষ পুলিশকে সেবক নয়, শাসক কিংবা নির্যাতনকারী বাহিনী হিসেবে মনে করে থাকে। জনগণের আস্থা অর্জন করতে হলে প্রথমেই পুলিশের প্রতিটি সদস্যকে বিশেষ করে থানা প্রশাসনে কর্মরত থানার ওসি থেকে শুরু করে পুলিশ কনস্টেবল পর্যন্ত সবাইকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। কারণ জনগণ বিপদে পড়ে অসহায় অবস্থায় প্রথমেই থানার শরণাপন্ন হন। পুলিশ শত পদক্ষেপ গ্রহণ করার পরও অপরাধ কমছে না। প্রতিনিয়ত পুলিশ প্রশাসন জনগণের কাছে প্রশ্নের সম্মুখিন হচ্ছে। এটি অনস্বীকার্য, এসব অপরাধ কঠোর হাতে দমন করতে হলে থানাকে প্রশাসনের কেন্দ্র বিন্দু হিসেবে চিহিৃত করে লজিস্টিক সাপোর্ট দিয়ে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবমুক্ত করতে হবে।
পৃথিবীর অনেক দেশেই পুলিশ বিভাগের ভিন্ন বেতন কাঠামো আছে। বেতনের টাকায় যদি নূন্যতম চাহিদা পূরণ না হয়, তাহলে দুর্নীতির প্রবণতা তৈরি হয়। থানাগুলোর যুক্তিসংগত অপারেশনাল বাজেট থাকা দরকার। তাছাড়া সোর্স মানির পরিমাণ বাড়াতে হবে। থানার অফিসার ইনচার্জ যেন ঠিকমতো সোর্স মানির টাকা পায় তা নিশ্চিত করতে হবে। এ ব্যাপারে অনেক ভুক্তভোগী ওসিকে সোর্সমানির টাকা ঠিকমতো না পাওয়ার জন্য ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা যায়। একজন তদন্ত কর্মকর্তা যখন নিজের টাকায় মোটর সাইকেলের তেল কিনে তদন্ত করতে যান, তখন স্বভাবতই তার অবৈধ আয়ের প্রবণতা বাড়ে। পৃথিবীর অনেক উন্নত দেশের ট্রাফিক পুলিশ তার অর্জিত ট্রাফিক আয়ের একটি অংশ বৈধভাবে পায়। এ বিষয়গুলো আমাদের ভেবে দেখতে হবে।
পুলিশের সম্পর্কে সাধারণ মানুষের নেতিবাচক মনোভাব আজকের নয়, অনেক পুরোনো। নি¤œ পদের অফিসাররা সৎ থাকতে চাইলেও পারিপার্শ্বিক অবস্থা তাকে সৎ থাকতে দেয় না। কাজেই এই নেতিবাচক ধারণা সহসা বদলাবে না। তবে পুলিশ প্রশাসন ও পুলিশ সদস্যরা যদি সদিচ্ছার পরিচয় দেয়, তাহলে পরিস্থিতির অবশ্যই উন্নতি হবে। তবে দলীয়করণ, নিয়োগ বাণিজ্য, ব্যক্তি ও দলীয় স্বার্থে পুলিশকে ব্যবহার ইত্যাদি অসৎ কার্যক্রম পুলিশ বিভাগকে সবসময় কলুষিত করছে। পুলিশ বিভাগকে অবশ্যই এসব অযৌক্তিক, অনৈতিক নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করতে হবে। আইন এমন একটি বিষয় যা জাতিকে শৃঙ্খলাবদ্ধ নিরাপদ রাখতে অপরিহার্য। এ আইন যুগ যুগ ধরে ব্যবহার হয়েছে, কিন্তু প্রকৃত অর্থে প্রয়োগ হয়নি। পুলিশে যথেষ্ট সংখ্যক নিষ্ঠাবান, কর্তব্যপরায়ন, সৎ, দক্ষ কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন। থানাকে জনকল্যাণে আনতে হলে থানা সংশ্লিষ্টদের আয় জীবন উপযোগী কিনা সে বিষয়েও পদক্ষেপ নিতে হবে। বেঁচে থাকার জন্য তাদের যেন অবৈধ পথ বেছে নিতে না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। সারা বিশ্বেই যেসব পেশার মানুষ সমাজে আইন শৃঙ্খলা রক্ষার কাজে সম্পৃক্ত তারা সন্তোষজনক বেতন পেয়ে থাকেন। এতে তাদের কাজের প্রতি দায়বদ্ধতা, জবাবদিহিতাও তৈরি হয়। পাশাপাশি তারা উৎসাহ ও উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে পেশাদারিত্বের সাথে সফল ও সূচারুভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করে থাকেন।
আধুনিক বিশ্বে গণতান্ত্রিক সমাজ কাঠামোতে পুলিশের কাছে নাগরিকদের প্রত্যাশা ব্যাপক। তাই সততা, নিষ্ঠা, আন্তরিকতা এবং পেশাদারিত্বের মাধ্যমে পুলিশি সেবা দ্রুত জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। পুলিশও তাদের কাজ কর্মের মাধ্যমে জনগণের বিশ্বাস ও আস্থা অর্জন করে জনগণের বন্ধুতে পরিণত হয়ে সমাজে আইনের শাসন সমুন্নত রাখবেন। সাথে সাথে পুলিশ সম্পর্কে জনগণের দৃষ্টিভঙ্গি বদলিয়ে বন্ধু হিসেবে ভাবতে হবে। হ্যাক্সলির মতে, পারস্পরিক সেবার মনোভাব জীবনকে মহিমান্বিত করে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্ভাসিত হয়ে পুলিশের সকল সদস্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় নিরপেক্ষতা ও পেশাদারিত্বের পরিচয় দিবেন। যে কোন সমাজ ব্যবস্থাতেই পুলিশিং করা একটি দুরুহ কাজ। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের মত একটি উন্নয়নশীল দেশে। তবে এক্ষেত্রে পুলিশ বাহিনীকে দক্ষ ও যোগ্য করে তোলার পাশাপাশি দরকার সামাজিক ও রাজনৈতিক পদক্ষেপ।
বর্তমানে সরকার এ বাহিনীকে একটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের সেবামূলক বাহিনী হিসেবে জনগণের কাছে পুলিশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বলতার করার জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। এরপরও অতীতকাল থেকে কিছু পুলিশ সদস্যের বিরূপ কর্মকা-ের কারণে সাধারণ মানুষ পুলিশকে সেবক নয়, শাসক কিংবা নির্যাতনকারী বাহিনী হিসেবে মনে করে আসছে। দেশের শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষা ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করাই একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সামাজিক স্থিতিশীলতার পূর্বশর্ত। মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক নিরাপত্তা প্রদানের দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ। পুলিশকে জনবান্ধব হয়ে নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করতে হবে। দেশের আপামর জনসাধারণ বাংলাদেশ পুলিশকে সেভাবেই দেখতে চায়।
লেখক: পুলিশ কর্মকর্তা (অব.) (আই.জি ব্যাজ, জাতিসংঘ ও রাষ্ট্রপতি পদক প্রাপ্ত)