চাখো তোমার মধুশহর

আপডেট: মার্চ ২০, ২০২০, ১২:২৯ পূর্বাহ্ণ

সুমিত্রা পাল


এক
পার্লে পয়েন্টের ফ্লাইওভারে উঠলেই সাদা সেন্ট্রোর স্পিডোমিটারের কাঁটা অটোমেটিক নেমে আসে অনেকখানি নীচে। দয়িতা স্টিয়ারিং হাতে ড্রাইভারের সিটে বসে থাকা স্বামী প্রবালের দিকে একঝলক তাকিয়ে প্রতিবারই দৃষ্টি পেতে দেয় বাইরে। চোখের সামনে তখন ঝলমলে সুরাট শহর। মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকা ‘সরগম’ শপিং কমপ্লেক্স, বিশাল বিশাল জুয়েলারি, টেক্সটাইল আর ইলেক্ট্রনিক্স গুডসের শো-রুম, অসংখ্য ইটারিস… আর তাতে জমে থাকা সুরাটবাসীদের ভিড়। সব মিলিয়ে এক প্রাণচঞ্চল ও সদাবাহার পরিবেশ।
লোভাতুরের মত হাঁ করে বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকে তখন দয়িতা। প্রাণভরে তার কুয়োর ব্যাঙের মত জীবনে,মনের কোনে তুলে রাখতে থাকে এই সদাবাহার ছবি। ফ্লাইওভার থেকে নামলেই শুরু হয়ে যায় পিপলোদ-ডুমাস রোড। সেই রোড ধরে সুরাটের এনআইটি পার হলে ‘মল্হার’ দোসার দোকান। খোলা আকাশের নিচে প্রায় চল্লিশ রকমের সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিন্ন দোসার স্বাদ নেওয়া যায় এখানে। আরও একটু এগিয়ে গেলে রাস্তার বাঁ-পাশে সারভিস রোডে দেখা যাবে অসংখ্য পরাঠা’র স্টল। ত্রিশ টাকা থেকে আরম্ভ করে তিনশ’ টাকা দামের প্রায় পঞ্চাশ-ষাট রকমের পরাঠা এখানে উপলব্ধ। পুরোটা সারভিস রোডের প্রশস্ত ফুটপাথে বিছিয়ে রাখা রয়েছে চাটাই বা দড়ি। দুপাশের বিশাল সব শপিং কমপ্লেক্স, মলস্, অসংখ্য যানবাহনের স্রোতের মাঝখানে বসে সুরাটবাসীরা পরমানন্দে গলঃধকরণ করে চলেছে এই মহার্ঘ বস্তুগুলি। বিশেষ করে শনি রবিবারে গমগম করে ওঠে এই রোড।
ছুটির দিনগুলিতে সুরতি অর্থাৎ সুরাটবাসীরা ঘরে বসে থাকতে চায়না। ডুমাস-পিপলোদ রোড জুড়ে তাই বিশাল ট্র্যাফিক জ্যাম। সপ্তাহের কাজের দিনগুলিতে শুধু লাভক্ষতির অঙ্ক, দেনাপাওনার হিসেব নিকেশ… যেই ছুটির দিন এল সব শিকেয় তুলে বেরিয়ে পড়া। অর্থচিন্তা তো নেই সুরাটবাসীদের, তাই সীমাহীন আমোদ-আহ্লাদ, খাওয়াদাওয়া। জীবনটাকে চুটিয়ে উপভোগ করা। যাকে বলে একেবারে ইজি গোয়িং লাইফ বা লিভ লাইফ কিং সাইজ। সুরাটের বিখ্যাত কবি মারিজ এর ভাষায়- ‘জিন্দেগি নো রস পিভামা জলদি কর্ মারিজ/ এক তো জাম জলতু ছে এনে মদিরা ওছিছে।’ অর্থাৎ জীবনের রস তাড়াতাড়ি পান করো হে মারিজ, কেননা একে তো গ্লাসে ফুটো তায় মদিরাও কম। সত্যি, সুরাটবাসীদের দেখলে মনে হয়- আজই যেন জীবনের শেষ দিন, তাই আজই তুমুল ভাবে বাঁচো। তাই হয়তো ওরা প্রাত্যহিকতায় মলিন হয়না। ভাবে দয়িতা। প্রতিদিন তাই তাজা ফুলের মত ওরা ফুটে উঠে, প্রাণ ভরে নিঃশ্বাস নেয়। চলতে ফিরতে সবখানে স্বতঃস্ফূর্ত মানুষের ভিড়- হাসিখুশি, প্রাণচঞ্চল, প্রাণঢালা। মনে হয় এখুনি ওরা গেয়ে উঠবে- ‘প্রাণ ভরিয়ে তৃষা হরিয়ে, মোরে আরও আরও আরও দাও প্রাণ…’
অন্যদিনের মত আজও গাড়ির গতি কম হতেই কৃতজ্ঞতার চোখে সে একঝলক তাকায় প্রবালের দিকে। দেখে প্রবাল তাকিয়ে আছে তারই দিকে। মুখে হাসি। জানে সে, প্রবাল তার এই দুর্বলতাটুকুকে প্রশ্রয় দিতেই প্রতিবার গাড়ির গতি কম করে দেয়। ভাবখানা এমন- নাও, যত পারো চাখো তোমার মধু শহর। স্মিত হেসে মুখটা ঘুরিয়ে বাইরে দৃষ্টিপাত করে দয়িতা।
দুটো পাখা মেলে উড়ে বেড়াচ্ছে যেন আজ সুরাট শহর। রঙিন তার মেজাজ। চঞ্চল তার চলাচল। হবে নাই বা কেন! আজ যে প্রেমদিবস। ভালবাসার দিন। প্রেমিক-প্রেমিকার দিন। ন্যাট কিং কোলের এই গানটি গাওয়ার দিন-‘ইউ আর মাই প্যারসোনাল প্যজেসন ইউ আর মাই অ্যালোন/ নো বডি মাস্ট কিস ইউ বাট মী/ নো বডি মাস্ট লাভ ইউ বাট মী…’
আসলে, রোম্যান্টিক এই দিনটির আবেদন এত বেশি যে ব্যাপারজগত থেকে আরম্ভ করে প্রেমিক-প্রেমিকা, স্বামী-স্ত্রী সবাই সারাবছর মুখিয়ে থাকে। মনে পড়েনা দয়িতার, ঠিক কবে থেকে এই দিনটি নিয়ে মাতামাতি শুরু হয়েছে। তবে যত দিন যায় সে টের পায়, দিনটিকে কেন্দ্র করে উদ্দাম-উত্তালতা যেন ক্রমশ বেড়েই চলেছে। কেমন যেন ভাবাবেগে জাড়িত হয়ে ওঠে সবাই। বিশেষ করে ইয়ং জেনারেশন। মনে প্রেম থাকুক বা না থাকুক, দিনটি একে অপরের সঙ্গে কাটানো চাই। উপহার আদান-প্রদান তো একেবারে মাস্ট। যা আজকাল প্রেম প্রদর্শনের সবচেয়ে বড় উপায়। আর সেজন্য ব্যাপারজগতও তৈরি। খুলে রেখেছে উপহারসামগ্রীর এক অভিনব দুনিয়া। ফুল, আর্চি’র কার্ড, আরও যে কতকিছু। তামিলনাডু’র ছোট্ট একটি গ্রাম-আমুধাগুন্দাপল্লি। শুধুমাত্র প্রেমদিবস উপলক্ষে গতবছর সেখানে ফোটানো হয় লক্ষ লক্ষ রক্তগোলাপ। যার অধিকাংশই রপ্তানি হয় বাইরের দেশগুলিতে। সেই রক্তগোলাপ হাতে নিয়ে সেই দেশের নাগরিকেরা তাদের প্রিয়জনকে ভালবাসা জাহির করেছে। অতিসুন্দর এই স্লাইডের বিপরীতে যে জিনিসটিকে মোটেই নজর আন্দাজ করা যায়না তা হল মুনাফা। ফুলের পরিবর্তে ভারতে আসে কোটি কোটি মুদ্রা।

আসলে সবকিছুতেই এখন বাণিজ্যকরণ! প্রেম-ভালবাসাতেও। প্রবালের ঘড়িটা সারাতে ঘোড়দৌড় রোডে টাইটানের শো রুমে গিয়েছিল ওরা। ক্রেতাদের আকর্ষণ করতে চল্লিশ পারসেন্ট অফ্ যে কোন পারচেজে। আর স্বাভাবিকভাবেই ভিড়ে গিজগিজ করছে সেই দোকান। তবে সবচাইতে ভালো লেগেছে যে জিনিস তা হল-ভিড়ের বেশিরভাগটাই জোড়ায় জোড়ায়। আটোয়া লাইন্স, আটোয়া গেট, আডাজান, মাজুরা গেট যেখানেই গেছে, সবখানেই চোখে পড়েছে হাতে হাত ধরা, খুশির জোয়ারে ভেসে চলা যুগলবন্দী ছবি। সেইসঙ্গে গাড়ির সারি আর বাইকের দুর্বার গতি। ছটফট করে ওঠা দুরন্ত যৌবনের হিল্লোল আজ সবখানে। আবেগের আবেশে মেতে ওঠা প্রেমিক-প্রেমিকাদের হাতের মুঠোয় আজ সারা সুরাট শহর।

মুগ্ধ চোখে উপভোগ করে যাচ্ছিল দয়িতা এই জনজোয়ার, এই চাঞ্চল্য। তার নিজের মনটাও বেশ ফুরফুরে হয়ে ওঠেছিল। কিন্তু বাইরের জগতের সঙ্গে নিজেদের জীবনের একটা তুলনা হঠাৎ করেই তার মনের কোণে উঁকি দিয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে মনটা উদাস হয়ে গেল তার। ফুরফুরে ভাবটা কেটে গিয়ে বুক চিরে বেরিয়ে এল এক দীর্ঘশ্বাস। মনে হল ভ্যালেন্টাইন্স ডে নিয়ে তার আর প্রবালের মনে বিশেষ কোন উচ্ছ্বাস বা ভাবাবেগ তো নেই! অন্য সাধারণ দিনগুলির মতই দৈনন্দিন রুটিনে ব্যস্ত ওরা। তবে কি তাদের জীবন থেকে প্রেম বিদায় নিয়েছে! তবে কি তারা পরস্পর পরস্পরকে ভালবাসেনা? প্রবালের সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছে আজ আঠারো বছর। এ কি তবে দীর্ঘজীবন একত্র বসবাসের একঘেয়েমি? তবে কি আর ওদের একে অপরকে কিছু দেওয়ার বা পাওয়ার নেই?

একটু অস্থির হয়ে উঠল সে! তাকাল প্রবালের দিকে। গাড়ি চালাতে মগ্ন প্রবাল। কোন হেলদোল নেই, বাইরের জগতের সঙ্গে কোন লেনদেন নেই। নিজেতেই ব্যস্ত সে। কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে গেল দয়িতা। কোন লাভ নেই। বরং চটে যাবে প্রবাল। এক-দুই নয়, এ তার দীর্ঘ আঠারো বছরের অভিজ্ঞতা।

দেখল ওদের সাদা সেন্ট্রো ফ্লাইওভার থেকে নেমে রাজহংস্, ইস্কন মল, লেক ভিউ গার্ডেন পার করে কারগিল চকে এসে গেছে। এখান থেকে বাঁ-দিকে মোড় নিলে পিপলোদ হয়ে ভেসু। পোশাকি নাম গ্রিন সিটি লাইট এরিয়া। এখানেরই রাজসিদ্ধি হাউসিং সোসাইটি ওদের বর্তমান ঠিকানা। কিন্তু বাড়িমুখো না হয়ে দাঁড়িয়ে গেল গাড়ি কারগিল চকে। দয়িতার মনে সূক্ষ্ম এক আশা, হয়তো সারপ্রাইজ দেবে প্রবাল। হয়তো বাকি সময়টা অন্যভাবে স্পেন্ড করার কথা বলবে সে। প্রবালের দিকে খানিকটা প্রশ্রয় ও প্রশ্ন মেশানো চাহনি মেলে ধরতেই বুঝল তার ধারনা ভুল।

একটু চিন্তিত যেন প্রবাল, বলে-ভাবছি প্লান্টে একটা সারপ্রাইজ ভিজিট করে আসি। সিকিউরিটি স্টাফ ঠিকমত কাজ করছে কিনা একটু দেখা দরকার।
উফ্, এনাফ ইজ এনাফ! আশাভঙ্গের রাগে কিড়মিড় করে ওঠে দয়িতা। মানুষটা কাজ ছাড়া কি আর কিছুই জানেনা, বোঝেনা! সারাদিন, সারাবছর কাজ করেও কি কাজ শেষ হয়না? এরকম একটি রোম্যান্টিক দিনেও কাজেরই চিন্তা… ধুর, এই একটা জীবন? বাঁধাধরা, একই গৎবাঁধা, রাঁধার পরে খাওয়া, আর খাওয়ার পর রাঁধা… এভাবেই চলতে থাকা… নাহ, আর পারা যায়না!
দেখল তার সম্মতি-অসম্মতির কোন তোয়াক্কা না করে গাড়ি ছুটে চলেছে সামনের সোজা রাস্তা ধরে।

দুই

প্রায় দু-বছর হতে চলেছে দিল্লী থেকে বদলি হয়ে দয়িতারা সুরাটে এসেছে। এবার একটি এলপিজি বটলিং প্লান্ট তৈরির গুরুদায়িত্বের ইনচার্জ প্রবাল। আগের থেকে কাজের চাপ দশগুণ বেশি। সকাল আটটায় বেরিয়ে ফিরতে ফিরতে রাত সাড়ে আটটা, নটা। তারমধ্যে সরকারি ছুটির দিন বা রবিবারের কোন বালাই নেই। প্রতিদিন অন ডিউটি।
একদিন, দয়িতা বলে বসেছিল- তুমি নিজেই তো ইনচার্জ, হোল আন্ড সোল, ছুটি নিতে তোমার তাহলে বাধা কোথায়? সে যেন চরম বেফাঁস একটা কথা বলে ফেলেছে, এরকম ভঙ্গীতে প্রবাল বলেছিল- দায়িত্ব, ম্যাডাম, দায়িত্ব। রেসপন্সিবিলিটি। সবকিছুর জবাবদিহির ভার এখন আমার। তার উপর উপরমহল থেকে এত প্রেসার। প্রতিদিনের টার্গেট ফুলফিল হওয়া… আমার জায়গায় থাকলে পাগল হয়ে যেতে এতদিনে তুমি।
প্রবালের কাজের চাপ পাল্লা দিয়ে যত বেড়েছে সে তত একা থেকে নিঃসঙ্গ হয়েছে। বাড়িতে সর্বসাকুল্যে তিনটি মাত্র প্রাণী। সে প্রবাল আর তাদের একমাত্র ছেলে। ছেলের এবার টুয়েলভ বোর্ড। বোর্ডের প্রিপারেশন প্লাস কম্পিটিটিভ পরীক্ষাগুলির জন্য কোচিং ক্লাসেস নিয়ে সে এত ব্যস্ত যে তার নিজেরই এক একসময় কষ্ট হয় ছেলেটার জন্য। সেই সকাল সাতটায় বেরিয়ে ফিরে আসতে আসতে রাত সাড়ে নটা, দশটা। মাঝখানে বেলা দুটোয় স্কুল থেকে ফিরে হাতে ঘণ্টা খানেকের মত সময় পায় সে। তারপর আবার ছুট।
সারাটাদিন পুরো ফ্ল্যাটে দয়িতা একা। কত আর ঘর সাজাবে, টিভি দেখবে, গল্পের বই পড়বে। এই দুবছরে কারুর সঙ্গে তার বন্ধুত্বও গড়ে উঠল না।
দিল্লীতে কাটিয়ে আসা হৈহুল্লোড়ের দিনগুলির কথা মনে করে সে উদাস হয়ে যায়। দিল্লীর কোম্পানি আবাসনের দশটি ফ্ল্যাটের প্রত্যেকেই ছিল হুজুগে। প্রায় সমবয়সী হওয়ায় ভাবের আদান-প্রদানে কখনো কোন ব্যাঘাত ঘটেনি। প্রতিটিদিন কাজের শেষে নিচের বিশাল সবুজ লনে চেয়ার পেতে গল্প-গুজব, চা-পান, খাওয়াদাওয়া, ব্যাডমিন্টন খেলা… শীতের দিনগুলিতে রোদ পোহাতে পোহাতে শাক-সব্জি বাছা… কিটি পার্টী, অমৃতবাণী-গীতা পাঠ… আজ এর ঘর থেকে খাওয়া আসছে তো কাল ওর ঘর থেকে। নিজেও ভিন্ন ভিন্ন রেসিপি ট্রাই করে ওদের পাঠানো। বিভিন্ন হোটেলে, কখনো নিচের হলে গেটটুগেদারের আয়োজন। উপলক্ষ শুধু একটা বাহানা মাত্র। সমবেত হয়ে ঐকতানে ভেসে যাওয়া এই ছিল ওদের উদ্দেশ্য। বড় সুখের বড় আনন্দের দিন ছিল সেইসব। ভেবেছিল এভাবেই কেটে যাবে বাকী দিনগুলি।

দিল্লী থেকে সুরাটে ট্র্যান্সফারের খবর শুনে দয়িতার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়েছিল। এই পরিবেশ ছেড়ে আসতে হবে ভেবে মনটা তার খুব খারাপ হয়ে গিয়েছিল। সবাই বুঝিয়েছিল, সুরাট খুব ভালো শহর। কোন অসুবিধা হবেনা তার।
আরব সাগরের উদ্দাম, অস্থির জলরাশি ছুঁয়ে থাকা ভারতের পশ্চিমপ্রান্তের উপকূলবর্তী গুজরাট রাজ্যের একেবারে দক্ষিণে অবস্থিত সুরাট শহরে এপ্রিলের এক কাকডাকা ভোরে যখন ওরা পা রেখেছিল তখন তার মনে ছিল একটু শঙ্কা। সে একটু বেশী অনুভুতিপ্রবণ। অল্পেতেই ভয় পায় বা খুশি হয়ে ওঠে। তবে কয়েকটাদিন যেতে না যেতেই ভালো লেগে গিয়েছিল তার শহরটি। জেনেছিল সে, ডায়মন্ড সিটি বা হীরক নগরী নামে রামধনুর বর্ণচ্ছটায় উজ্জ্বল এই শহর শুধু ভারতেরই নয় সমস্ত বিশ্বের ডায়মন্ড ক্যাপিটাল হিসেবে অতি পরিচিত। বিশ্বের এগারোটি হীরার মধ্যে ন’টি অর্থাৎ নব্বই পারসেন্ট হীরা এখানেই কাটিং এবং পলিশিং হয়। এখানের পয়তাল্লিশ হাজার কোটি টাকার ট্যাক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রিজ বা বয়নশিল্প ভারতের বিশ শতাংশ কাপড় তৈরি করছে।
ঈর্ষনীয় গ্রোথ, অভাবনীয় ডেভলাপমেন্ট, আকর্ষণীয় ইনভেস্টমেন্ট, আরও ফ্লায়িং হাই… এই-ই এই শহরের মূলমন্ত্র। যা এই শহরকে শুধু ম্যাক্সিমাম সিটির মর্যাদাই দেয়নি, বিশ্বের প্রথম একশোটি ফাস্টেস্ট গ্রোয়িং সিটির তালিকায়ও স্থান করে দিয়েছে। এ যেন এই শহর ও তার বাসিন্দাদের অদম্য উৎসাহের এক যাত্রা।

কিন্তু শহরের এই চাকচিক্য, আরও ফ্লায়িং হাই মনোবৃত্তি তার উপর কোন প্রভাব ফেলতে পারল কই? বরং এই বিশেষত্বের ঠিক বিপরীতে তার অবস্থান। সে সাদামাটা, ঘরোয়া, অনেকটা ঘরকুনো। ভীষণভাবে প্রবালের উপর ডিপেন্ডেন্ট। একটা কাজও সে প্রবালকে ছাড়া করতে অভ্যস্ত নয়। তা সে কোথাও যাওয়াই হোক বা কোন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ব্যাপারই হোক। এমনকি নিজস্ব কেনাকাটাতেও প্রবালের সাহায্য চাই। কিন্তু এত ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফেরে প্রবাল যে সে বাইরে নিয়ে যাওয়ার কথা উচ্চারণই করতে পারেনা। উপায়বিহীন হয়ে বলতে গেলে রেগে ওঠে প্রবাল। বলে -‘যখন সময় পাই নিয়ে তো যাই-ই। মাঝে মাঝে কারুর সঙ্গে একটু বেরিয়ে নিজের কাজগুলি তো অন্তত করে নিতে পারো। তা না, তুমি তো আবার এস্পিসিয়াল! এখানের একশো বিরানব্বইটি ফ্ল্যাটের কাউকে তোমার বন্ধু হওয়ার যোগ্য খুঁজে পেলেনা’!
প্রবালের খোঁচা নীরবে হজম করলেও মনে মনে সে ফুঁসতে থাকে। কি করে সে বোঝাবে তার সমস্যার কথা। তার একেবারে জিরো কম্যুনিকেটিং পাওয়ারের কথা। বিশাল এরিয়া নিয়ে তাদের রাজসিদ্ধি হাউসিং সোসাইটি। তাতে বারোতালা করে চারটি টাওয়ার। একএকটি টাওয়ারে আটচল্লিশটি করে মোট একশো বিরানব্বইটি ফ্ল্যাট। প্রতিটি ফ্ল্যাট একুশশো স্ক্যয়ার ফুটের। সোসাইটির পরিবেশ-পরিস্থিতিও অনেক উন্নত-আধুনিক, সংস্কৃতিমনস্ক।
বাকি অংশ আগামী সপ্তাহে…