চাঞ্চল্যকর টুকু হত্যামামলা সিআইডিতে খুন হতে পারে দুই কারণে, পলাতক তরিক কানাডায়

আপডেট: অক্টোবর ১, ২০১৬, ৭:১৬ অপরাহ্ণ

জিয়াউল হক টুকু

 

নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের অর্থ সম্পাদক জিয়াউল হক টুকু (৪৫) হত্যামামলা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি) হস্তান্তর করা হয়েছে। নিহতের পারিবারের আবেদনের প্রেক্ষিতে গত ২০ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আলোচিত এই মামলাটি সিআইডিতে হস্তান্তর করেছে।
মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব পেয়েছেন সিআইডির রাজশাহী অফিসের পরিদর্শক মাহবুব আলম। তিনি বলেন, নতুন করে মামলার তদন্ত শুরু হয়েছে। তিনি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। এ মামলার কারাবন্দি প্রধান আসামির রিমান্ডেরও আবেদন করেছেন তিনি। আদালতে তার রিমান্ড মঞ্জুর হলে তদন্ত কাজ অনেকটাই এগিয়ে যাবে বলে মনে করেন তিনি।
এদিকে নিহত টুকুর পরিবারের সদস্যরা বলছেন, দুটি কারণে টুকুকে হত্যা করা হতে পারে। মামলার প্রথম তদন্তকারী কর্মকর্তা নগরীর বোয়ালিয়া থানার পুলিশ পরিদর্শক সেলিম বাদশাকে এ তথ্য জানানো হয়েছিল। কিন্তু রহস্যজনক কারণে তিনি সেসব বিষয়কে গুরুত্ব দিচ্ছিলেন না। এ কারণে মামলাটি সিআইডিতে হস্তান্তরের জন্য গত মে মাসে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়।
রাজশাহী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক প্রশাসক জিয়াউল হক টুকু গত ২৪ এপ্রিল নগর ভবনের সামনে তার ব্যক্তিগত চেম্বারে গুলিবিদ্ধ হন। ওই সময় তার চেম্বারে চারজন ব্যক্তি অবস্থান করছিলেন। পরে তারাই টুকুকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় পরদিন টুকুর স্ত্রী নুরুন নাহার লতা ওই চারজনকেই আসামি করে বোয়ালিয়া থানায় একটি হত্যামামলা দায়ের করেন।
আসামিরা হলেন, ঢাকার সবুজবাগ থানা এলাকার এমএ নয়ন (৪৫), নগরীর বোসপাড়া এলাকার বাসিন্দা ও জাতীয় পার্টির প্রয়াত সাংসদ ডা. সালাহউদ্দীনের ছেলে তরিকুল ইসলাম ওরফে তরিক (৪৮), নগরীর মহিষবাথান এলাকার রবিউল ইসলাম (৪৬) এবং সুলতানাবাদ এলাকার ব্যবসায়ী জসিম উদ্দিন (৪৮)। টুকু মারা যাওয়ার পর পুলিশ রবিউল ও জসিমকে গ্রেফতার করে। তবে এখন তারা জামিনে। অন্যদিকে গত ৪ মে প্রধান আসামি এমএ নয়ন আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। তিনি এখন কারাগারে। কিন্তু এখনও পলাতক রয়েছেন মামলার দুই নম্বর আসামি তরিকুল ইসলাম তরিক।
তরিক এখন কানাডায় : আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও টুকুর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা নিশ্চিত, তরিক এখন কানাডায় অবস্থান করছেন। হত্যাকা-ের তিনদিন পরই তিনি স্ত্রীকে নিয়ে কানাডা পালিয়ে যান। ঘটনার দিন টুকুকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তার চেম্বার থেকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল তরিকের প্রাইভেট কারে। পরে ওই প্রাইভেট কারেই নয়ন ও তরিক নাটোরে চলে যান। এরপর তরিক নাটোরে নেমে যান। আর নয়ন গাড়ি নিয়ে চলে যান বগুড়া। তিনি বাসে করে ঢাকা চলে যান। অন্যদিকে তরিক তার স্ত্রীকে রাজশাহী থেকে নাটোরে ডেকে নেন। তারপর তিনিও ঢাকায় চলে যান। তিনদিন পর স্ত্রীকে নিয়ে পাড়ি জমান কানাডায়। এর আগে ঘটনার দিন রক্তমাখা শার্ট পরিবর্তন করতে পাঠানোর নামে হাসপাতাল থেকে কৌশলে নয়ন ও তরিককে পালাতে সাহায্য করেন রবিউল। কানাডায় অবস্থানরত অবস্থায় নিহত টুকুর একজন নিকটাত্মীয় এবং রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরএমপি) একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলেছেন তরিক। ফোনে তিনি দেশে ফিরে আইনের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আদালতে আত্মসমর্পণ করতে চেয়েছেন। নিহত টুকুর ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে।
নিহত টুকুর ছোট ভাই এমদাদুল হক বাবু জানান, তারা তরিকের কানাডার মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করেছেন। ওই নম্বরে তরিকের স্ত্রীর সঙ্গে তাদের কথা হয়। তরিকের স্ত্রী বাবুকে বলেছেন, তার স্বামী পরিস্থিতির শিকার। তবে তিনি আইনের প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়ে দেশে ফিরে আত্মসমর্পণ করবেন।
ভাড়াটে খুনি নয়ন : মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, নয়নের সঙ্গে নিহত টুকুর কোনো পূর্ব পরিচয় ছিল না। নয়ন একজন ভাড়াটে খুনি। তার জন্মস্থান চট্টগ্রামের হাতিয়ায়। প্রায় ২৫ থেকে ৩০ বছর আগে নয়নের বাবা সেখানকার ঘরবাড়িসহ সব সম্পত্তি বিক্রি করে ঢাকায় চলে আসেন। নয়নের এখন স্থায়ী কোনো ঠিকানা নেই। রাজধানীর সবুজবাগ থানার সামনের একটি বাসায় পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ভাড়া থাকতেন তিনি। নয়নের একটি মেয়ে ও দুটি ছেলে আছে। একটি ছেলে অটিস্টিক। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রচ- চাপের কারণে তিনি আদালতে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হন। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, যে কোনো একটি পক্ষ নয়নকে ভাড়া করে টুকুকে খুন করিয়েছেন। যদিও পাঁচদিন রিমান্ডে থেকেও এ ব্যাপারে মুখ খোলেননি নয়ন। তিনি নিজেও টুকুকে গুলি করার স্বীকারোক্তি দেননি।
দুই কারণে হতে পারে খুন : ব্যবসায়ী টুকু হত্যার পেছনে দুটি কারণ থাকতে পারে বলে মনে করছে তার পরিবার ও ঘনিষ্ঠজনরা। এর মধ্যে একটি হলো, বরেন্দ্র বহুমুখি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) একটি টেন্ডার। আরেকটি কারণ হতে পারে রাজনৈতিক। টুকুর ভাই বাবু বলেন, তার ভাই রাজনীতি করতেন। এ কারণে তার অনেক প্রতিপক্ষ তৈরি হয়েছিল। এদের মধ্যে থেকে কেউ তাকে হত্যা করিয়ে থাকতে পারেন। ক্ষমতাসীন দলের অনেক নেতার সঙ্গেই তার ভাইয়ের খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। কিন্তু টুকু হত্যাকা-ের পর কেউই তাদের খোঁজ রাখেন নি। এ কারণেই এটি রাজনৈতিক হত্যাকা- বলে সন্দেহ হয়।
আবার বেশকিছু দিন আগে টুকু বিএমডিএ’র অকেজো লোহার (স্ক্র্যাফ) একটি টেন্ডার পেয়েছিলেন। এসব লোহা বিক্রি চলমান অবস্থায় ছিল। কিছু লোহা টুকু ঢাকার নবাবপুরে মইনুদ্দিন নামে এক ব্যক্তির কাছে বিক্রিও করেছিলেন। তার কাছে টুকু প্রায় ৬ থেকে ৭ কোটি টাকা পেতেন। টুকু হত্যার পেছনে এটিও একটি কারণ হতে পারে বলে তার ধারণা।
গুলি করা হয় দাঁড়িয়ে, পেছন থেকে : ঘটনার দিন নিজের রিভলবারের গুলি বিদ্ধ হয়েছিল টুকুর শরীরে। তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলে উপস্থিত আসামিরা প্রচার চালিয়েছিলেন, নিজের রিভলবার পরিস্কার করতে গিয়ে টুকু নিজে নিজেই গুলিবিদ্ধ হন। কিন্তু টুকুর লাশের ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক রাজশাহী মেডিকেল কলেজের (রামেক) ফরেনসিক বিভাগের অধ্যাপক ডা. এনামুল হক বলেছেন, টুকুর পিঠের দিকে যে ফুটো হয়েছিল তা তুলনামূলক ছোট। এছাড়াও গুলিতে বুকের হাড়ের ভেতরের অংশ এবং ফুসফুসের নিচের অংশ জখম হয়। এ থেকে বলা যায়, পেছন থেকে গুলি করা হয়েছিল টুকুকে। আর গুলিটি করা হয়েছিল দাঁড়িয়ে।
মামলার প্রথম তদন্ত কর্মকর্তা বোয়ালিয়া থানার পরিদর্শক সেলিম বাদশা বলেন, রবিউল, জসিম ও তরিক নিহত টুকুর বন্ধু ছিলেন। নয়ন ঢাকা থেকে আসার পর নগরীর কোর্ট স্টেশন এলাকায় এই তিনজনের সঙ্গে আড্ডা দেন। এরপর দুপুরে তারা তিনজন নয়নকে টুকুর চেম্বারে নিয়ে যান। এরপরই এ হত্যাকা-ের ঘটনা ঘটে। পরবর্তীতে তরিক ও নয়নকে পালাতে সাহায্য করেন রবিউল। কিন্তু তারা কেউ হত্যাকা-ে জড়িত থাকার ব্যাপারে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন নি। রবিউল ও জসিমকে তিনদিন করে রিমান্ডে নিয়ে তাদের মুখ খোলানো যায় নি।
মামলার বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা মাহবুব আলম জানিয়েছেন, হত্যাকা-ের ক্লু উদঘাটন করতে যা যা করা প্রয়োজন তিনি করবেন। তিনি এ মামলাটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গেই গ্রহণ করেছেন। এ কাজে তিনি সফল হতে চান।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ