চাপাইনবাবগঞ্জের মাসকলাই জিআই স্বীকৃতির দাবি রাখে

আপডেট: সেপ্টেম্বর ৮, ২০২১, ১২:২৪ পূর্বাহ্ণ

সামসুল ইসলাম টুকু:


মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসের অধিকাংশ সময় আমি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মেদিনীপুর জেলার ঝাড়গ্রাম মহুকুমা শহরে অবস্থান করেছি। সমতল ভূমির চেয়ে উঁচু, লাল কাঁকরযুক্ত মাটি, শালবনে ঘেরা ও সাঁওতাল অধ্যুষিত এই ঝাড়গ্রাম মহকুমা। বর্তমানে তা ঝাড়খন্ড রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত। অবশ্য তখন থেকেই পৃথক ঝাড়খন্ড রাজ্যের দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়েছিল। তাদের একজন নেতা চিত্তরঞ্জন মান্ডির সহযোগিতায় রাঁচীতে অনুষ্ঠিত এক মিটিং-এ উপস্থিত থাকার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। সে সময় সাঁওতালদের মধ্যে ব্যাপকভাবে শিক্ষার প্রসার ঘটেছিল। তাদের মধ্যে ছিলেন তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সুবোধ হাঁসদা, এম পি অমিয় কুমার কিস্কু, সমিত টুডু, অনিল হেমব্রম, চিত্তরঞ্জন মান্ডি সহ অনেকেই এবং তারাই ঝাড়খন্ড আন্দোলনকে বেগবান করেন। আমি থাকতাম একজন সাঁওতাল পরিবারের আশ্রয়ে। কথাপ্রসঙ্গে আমি তাদের মাসকলাইয়ের ডাল ও রুটি খাওয়ার কথা বলেছিলাম। এতে ওরা খুব হাঁসাহাঁসি করেছিল। বলেছিল ওরা মাঝেমধ্যে অল্পস্বল্প মাসকলাইয়ের আবাদ করে বটে তবে তা গোখাদ্যের জন্য। তারা মনেই করতো না যে মাসকলাইয়ের ডাল হয় এবং সেটা একটি উৎকৃষ্ট মানের মনুষ্য খাদ্য।
২০১৯ সালে একবার কোলকাতা গিয়েছিলাম। সেখানে পিয়ারলেস হাঁসপাতালের সামনে একটি বোর্ডিং-এ কয়েকদিনের জন্য থাকতে হয়েছিল। বোর্ডিং-এর আশেপাশে কয়েকটি ছোট হিন্দু হোটেল ছিল। সকালে সেখানে গেলাম পরাটা সবজি ডালের নাস্তা করার জন্য। কিন্তু সেখানে পরাটা পাওয়া যায়না। অগত্যা রুটি ডালের অর্ডার দিলাম। কিন্তু তারা রুটির সাথে দিল তড়কা। তড়কা নামটা জীবনে শুনিনি। কিন্তু খেতে ভালো লাগলো। অত্যন্ত সুস্বাদু ও রাচিকর। জানলাম মাসকলাই ডালের সাথে ২/৩ প্রকারের অন্য ডাল, ডিম ও গরম মশলার সমন্বয়ে তৈরি এই তড়কা। প্রায় একই জিনিস মাংস দিয়ে রান্না করলে তার নাম বলি আমরা হালিম।
একশ বছরের অধিক সময় ধরে চাঁপাইনবাবগঞ্জে মাসকলাই আবাদ হয়। দেশের উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলের জেলাগুলোতে অল্প পরিমাণে আবাদ হয়। তবে চাঁপাইনবাবগঞ্জের মানুষ যত গুরুত্বের সাথে মাসকলাইয়ের আবাদ করে তেমনটা অন্যান্য জেলার মানুষেরা করেনা। দেশে মোট আবাদকৃত মাসকলাইয়ের এক চতুর্থাংশ চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় আবাদ হয়। প্রতি বছর এ জেলায় প্রায় ২৫ হাজার হেক্টর জমিতে আবাদ হয় এবং উৎপাদন হয় প্রায় ২৮ হাজার মে.টন। শুধু তাই নয়, চাঁপাইনবাবগঞ্জের মাটিতে হেক্টর প্রতি ১০০ কেজির বেশি উৎপাদন হয় অন্যান্য জেলার চেয়ে। এখানে হেক্টর প্রতি উৎপাদন হয় কমবেশি ৮১৫ কেজি। মাটিতে ৮০%আর্দ্রতা, ২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা ও দোআঁশ মাটিতে মাসকলাই আবাদ ভালো হয়। যার সবকটি চাঁপাইনবাবগঞ্জের আবহাওয়ায় ও মাটিতে বিদ্যমান। সাধারণত বন্যার পানি নেমে গেলেই অর্থাৎ ভাদ্র মাসে প্লাবিত ও পলিযুক্ত মাটিতে প্রায় চাষ ছাড়াই বীজ ছিটিয়ে দিলেই আবাদ হয়ে যায়। সেচেরও দরকার হয়না। মাসকলাইয়ের গাছ ছোট হয়, প্রায় মাটির সাথে লেগে থাকে। সময় হলেই গাছে মটরশুটির মত চিকন চিকন ফল হয়। প্রতিটি ফলের মধ্যে থাকে ৫/৬ টি করে কালো দানা। সেটাই মাসকলাই। এটি চাঁপাইনবাবগঞ্জের মানূষের জন্য অতিরিক্ত ফসল হিসেবে বিবেচিত । ফল পেকে গেলে তা গাছ সহ উপড়িয়ে আনা হয় এবং মাড়াই করে মাসকলাই আলাদা করা হয় । গাছের ডালপাতা ও ফলের খোসা হয় উতকৃষ্ট গোখাদ্য আর মাসকলাই রোদে ভালো করে শুকিয়ে জাতায় ডললে কালো খোসা উঠে সাদা ডাল বেরিয়ে আসে ।
প্রতি ১০০গ্রাম মাসকলাইয়ে ৩৪১ ক্যালোরি খাদ্যগুন থাকে । এরমধ্যে রয়েছে ৯৮০ মি.গ্রাম পটাসিয়াম, ১০ গ্রাম প্রোটিন, ৩৮ মি.গ্রাম সোডিয়াম, ১৩৮ মি.গ্রাম ক্যালসিয়াম, ৭৫৭ মি.গ্রাম আয়রন। এই ডালে ২০/২৩ ভাগ আমিষ থাকে। প্রোটিন ও ভিটামিন-বি সমৃদ্ধ এই ডাল। এর ভেষজ গুন অনেক। এতে প্রচুর ফাইবার আছে, হজম শক্তি বাড়ায়, রক্ত প্রবাহ বাড়ায়, হৃদযন্ত্র সুস্থ রাখে, পেশী গঠন করে, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করে, স্নায়বিক রোগ সারাতে সাহায্য করে, ব্যথানাশক, রোগ প্রতিরোধক, ত্বকের সুরক্ষা দেয় এবং শুক্রবর্ধক। এই ডাল পেট কেচে বর্জ্য নামিয়ে দেয়।
মাসকলাইয়ের ডাল ফোড়ন দিয়ে রান্না করতে হয়। কাঁচা ডাল ভাজা ডাল দুভাবেই রান্না করা যায়। তবে ভাজা ডালের স্বাদ কিছুটা বেশি হয়। আদার সমন্বয়ে শুধু ডাল, ডাল ও চাল মিশিয়ে খিচুড়ি, ডালের সাথে লাউ বা কুমড়ার ঘাঁটি প্রভৃতি খাবারগুলো অন্যান্য সব জেলায় কমবেশি চালু থাকলেও মাসকলাইয়ে আটা ও চালের আটা মিশিয়ে হাতে তৈরি রুটি এবং মাসকলাইয়ের আটার সাথে চালকুমড়ার সমন্বয়ে বড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জের মানুষ ছাড়া অন্য জেলার মানুষ তৈরি করতে পারেনা। হাতে তৈরি সেই কলাইয়ের রুটি কত পুষ্টিকর এবং বেগুন ভর্তা ও ধনে পাতের চাটনি দিয়ে খেতে কত সুস্বাদু তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। অন্যদিকে মাসকলাইয়ের ডাল পুরো একদিন পানিতে ভিজিয়ে রেখে আরেকদিন কড়া রোদে শুকিয়ে সেটা ঢেকিতে ছাটাই করলে কালো খোসামুক্ত একেবারে সাদা ডাল বেরিয়ে আসে। সেই ডাল জাতায় পিষে যে আটা তৈরি হয় সেই আটার সাথে কুন্নি দিয়ে কোরা পাকা চালকুমড়ার আঁশ পানিতে ধুয়ে মাখতে হয়। এই মথিত পেস্ট যতক্ষণ পানিতে না ভাসবে ততক্ষণ মন্থন অব্যাহত রাখতে হয়। তারপরে হাতের চাপে বড়ি দিতে হয়। সেই বড়ি বেশ কড়া রোদে ২/৩ দিন শুকালে খাওয়ার উপযুক্ত হয়। এই বড়ি মাছ সহ যে কোনো তরকারিতে দিলে তার স্বাদ শতগুনে বেড়ে যায়। কলাইএর রুটি এবং বড়ি তৈরিতে চাঁপাইনবাবগঞ্জের নারীরা বিশেষজ্ঞ তাতে কোনো সন্দেহ নাই।
২৫/৩০ বছর আগেও মসকলাইয়ের ডাল পাওয়া যেত ৩৫/৪০ টাকা কেজি যখন মুসুর ও অন্যান্য ডালের মূল্য ছিল ৬০/৭০ টাকা কেজি। আর গত ১৫ বছর যাবত দেখা যাচ্ছে, মাসকলাইয়ের ডালের দাম হয়েছে ১২০/১৩০ টাকা কেজি এবং মসুর সহ অন্যান্য ডালের দাম ৭০ থেকে ৯০ টাকা কেজি। মাসকলাইয়ের ডালের জনপ্রিয়তা প্রতিদিন বাড়ছে । ঢাকাস্থ চাঁপাইনবাবগঞ্জ সমিতি প্রতি বছর সেখানে একবার সম্মিলন করে। যেখানে অতিথিসহ সহস্রাধিক সদস্যের আগমন হয়। তাদের সকালের নাস্তা হিসেবে মাসকলাইয়ের রুটি বেগুনভর্তা ও ধনেপাতার চাটনি পরিবেশন করা হয় এবং দুপুরে বেগুন বড়ির তরকারি ভাত ও মাংস খাওয়ানো হয়। ষাটের দশকে আমরা যখন উচ্চ শিক্ষার জন্য রাজশাহী গিয়েছি তখন রাজশাহীর স্থানীয় এবং পাবনা বগুড়া রংপুর এর সহপাঠিরা আমাদের কালাই বলে ঠাট্টা করতো। কারন তখনও তারা কলাই রূটি ও বড়ির স্বাদ পায়নি। আসতে আসতে তারাও খেতে শিখেছে, ঠাট্টাও ভুলে গেছে। তাই মাসকলাইয়ের সাথে চাঁপাইনবাবগঞ্জের তৃণমূল পর্যায়ের সংস্কৃতি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। সুতরাং চাঁপাইনবাবগঞ্জই মাসকলাইএর জিআই স্বীকৃতি পাওয়ার একমাত্র হকদার তাতে কোনো সন্দেহ নাই। চাঁপাইনবাবগঞ্জের খিরসাপাত আম যেমন ি আই স্বীকৃতি পেয়েছে তেমনি ফজলি আম, রেশম, মাসকলাই, গম্ভিরা গান জিআই স্বীকৃতি পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। কারণ এই জিনিষগুলোর উৎপত্তি, ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি,গুরুত্ব ও ব্যবহার সম্পর্কে ইতোপূর্বে বিভিন্ন পত্রিকায় লেখা হয়েছে। শুধু তাই নয়, এসব জিনিষের সাথে চাঁপাইনবাবগঞ্জের নিবিড় ভূ-তাত্ত্বিক যোগাযোগ রয়েছে
লেখক- সাংবাদিক