চারঘাট গণহত্যা দিবস আজ

আপডেট: এপ্রিল ১৩, ২০১৭, ১২:৫৭ পূর্বাহ্ণ

নজরুল ইসলাম বাচ্চু, চারঘাট


আজ ১৩ এপ্রিল চারঘাট গণহত্যা দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে পাক হানাদার বাহিনী অতর্কিত আক্রমণ করে চারঘাটে মুক্তিযোদ্ধাসহ প্রায় তিন শতাধিক নিরীহ মানুষকে নৃসংশভাবে হত্যা করে। রাজশাহী জেলা শহর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্ব দিকে পদ্মা বড়াল নদী বিধৌত চারঘাট উপজেলা।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, চারঘাট পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ে ছিল তৎকালীন চারঘাট থানার মুক্তিযোদ্ধাদের মূল ক্যাম্প। ১৩ এপ্রিল মঙ্গলবার দুপুর ১২টার দিকে চারঘাট বাজারের পূর্ব ও উত্তর দিক দিয়ে পাক বাহিনী ২০-২৫টি গাড়ি নিয়ে প্রবেশের চেষ্টা করলে আনসার, পুলিশ এবং তৎকালীন ইপিআরসহ মুক্তিযোদ্ধারা বেশ কয়েকটি বাংকারে অবস্থান নিয়ে প্রতিরোধের চেষ্টা করেন। যার নেতৃত্বে ছিলেন কমান্ডার ল্যান্স নায়েক লস্কর। এর দুইদিন আগে সারদা পুলিশ একাডেমির (বর্তমান নাম বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমি) অস্ত্র ভান্ডার থেকে অস্ত্রগুলো ক্যাপ্টেন রশিদের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে তুলে দেয়া হয়েছিল। পাক সেনাদের ভারী অস্ত্রের মুখে মুক্তিযোদ্ধারা সেদিন প্রাণপনে যুদ্ধ করেও টিকে থাকতে পারেন নি। এসময় চারঘাট বাজার ও পার্শ¦বর্তী এলাকায় বৃষ্টির মতো গুলি বর্ষণে মুক্তিযোদ্ধাসহ অর্ধশতাধিক ব্যক্তি শহীদ হন। আহত হন প্রায় ২৫ জন। রাজশাহী ক্যাডেট কলেজের তৎকালীন প্রভাষক আবু বকর সিদ্দিকী (বীর বিক্রম) এইদিন শহীদ হন। এরপর পাক সেনারা সারদা পুলিশ একাডেমিতে অবস্থান নেয়। এদিকে চারঘাট বাজার থেকে অর্ধকিলোমিটার উত্তর-পশ্চিম দিকে এবং সারদা পুলিশ একাডেমি সংলগ্ন থানাপাড়ার সহস্রাধিক নারী পুরুষ ও শিশু প্রাণভয়ে ঘরবাড়ি ছেড়ে পদ্মার পাড়ে গিয়ে আশ্রয় নেয়। কোন কোন মা-বোনেরা দুপুরে রান্না করা অবস্থায় চুলায় হাঁড়ি রেখেই দৌড়ে পালায়। ওইদিন বিকালে পাক সেনারা পদ্মার পাড়ে জড়ো হওয়া সহস্রাধিক মানুষকে ঘিরে ফেলে। হানাদার বাহিনী সমবেত জনতার মধ্য থেকে নারী ও শিশুদের বের করে দিয়ে পুরুষদের কয়েকটি লাইনে সারিবদ্ধ হওয়ার নির্দেশ দেয়। কয়েকজনকে হিন্দু না মোসলমান তাও পরীক্ষা করা হয়। নিশ্চিত মৃত্যুর কথা বুঝতে পেরেও সবাই লাইনে দাঁড়িয়ে যায়। এরপরেই মেশিনগান গর্জে উঠে। সংঘঠিত হয় ইতিহাসের এক নারকীয় পৈশাচিক হত্যাযজ্ঞ। নিহত হন থানাপাড়া ও পার্শ্ববর্তী গ্রামের দুই শতাধিক কর্মক্ষম পুরুষ। নিহত হন পুলিশ একাডেমিতে কর্মরত বেশ কয়েকজন কর্মচারীও। সকলের মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার জন্য হায়েনার দল লাশের স্তুপে পেট্রোল ঢেলে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। থানাপাড়া পরিণত হয় এক মৃত্যুপুরী ও পুরুষশূন্য বিধবাদের গ্রামে। লাশের স্তুপ থেকে সেদিন অলৌকিকভাবে বেঁচে যান ১০-১২ জন। স্বজন হারানো নারী ও শিশুসহ শত শত মানুষের গগন বিদারী আত্মচিৎকারে সেদিন থানাপাড়ার আকশে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে শোকের মাতম। লাশগুলো সৎকার করার মতোও সেদিন তেমন কেও ছিল না। তাই লাশগুলো শিয়াল কুকুরে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খেয়েছে। লাশের স্তুপ থেকে পঁচা দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়লে এলাকাবাসী লাশগুলো মাটি চাপা দেয়। পুলিশ একাডেমির চানমারী থেকে প্রায় ৯শ ফুট পশ্চিমে পদ্মা নদীর চরে নিহতদের গণকবর বা বধ্যভূমি রয়েছে। চারঘাটের অনেক নারীও পাকবাহিনীর নির্যাতন ও সম্ভ্রম হানীর শিকার হন। সেই দুঃসহ স্মৃতি ও বীরঙ্গনা খেতাব নিয়ে আজও পাগলের মতো অসহায়ভাবে বেঁচে রয়েছেন উপজেলা সদরের সন্যাসী রানী (৭০)। ১৩ এপ্রিল চারঘাটবাসীকে স্মরণ করিয়ে দেয় ’৭১ সালের ভয়াবহ দিনগুলোর কথা। শহীদদের পরিবারগুলো প্রতিবছর এই দিনে পারিবারিকভাবে স্বজনদের স্মরণে মিলাদ মাহফিল ও দোয়া করেন। পুলিশ একাডেমিতে ২৪ জন শহীদ কর্মচারীর নাম সম্বলিত একটি স্মৃতিসৌধ রয়েছে। কিন্তু অন্যান্য শহীদ পরিবার এবং এলাকাবাসী গণহত্যায় নিহত ও সকল শহীদদের স্মৃতি রক্ষায় একটি স্মৃতিসৌধ নির্মানের দাবি করে আসছে দীর্ঘদিন থেকে।
স্বাধীনতার ৪২ বছর পর স্থানীয় সাংসদ শাহরিয়ার আলমের উদ্যোগে মহাসড়কের সামনে চারঘাট আখক্রয় কেন্দ্র চত্বরে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়। আজ ১৩ এপ্রিল চারঘাট গণহত্যা দিবসে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য উক্ত স্মৃতিসৌধের পাদদেশে স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হবে। থানাপাড়া সোয়ালজ ডিএসের আয়োজনে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম।