চালকল মালিকরা সরকারি গুদামে চাল দিতে নারাজ || নতুন দর নির্ধারণের দাবি

আপডেট: মে ২০, ২০১৭, ১২:০৭ পূর্বাহ্ণ

নওগাঁ ও বড়াইগ্রাম প্রতিনিধি


সরকারিভাবে মূল্য নির্ধারিত ৩৪ টাকা কেজি দরে সরকারি গুদামে চাল সরবরাহে অনীহা প্রকাশ করেছেন নওগাঁ ও নাটোরের বড়াইগ্রাম অঞ্চলের চালকল মালিকরা। ধান-চালের বর্তমান বাজার দরের সঙ্গে সরকার নির্ধারিত দরের কোনো সামঞ্জস্য নেই জানিয়ে সরকারি গুদামে চাল সরবরাহের জন্য চুক্তিই করেন নি তারা।
তাদের মতে, হাট থেকে ধান কিনে চাল করতে প্রতি কেজিতে খরচ পড়ছে প্রায় ৩৮ থেকে ৩৯ টাকা। এ অবস্থায় গুদামে চাল দিতে গেলে বড় ধরনের লোকসান গুণতে হবে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, হাওড়ে বন্যা এবং বৈরি আবহাওয়ায় ঝড়-বৃষ্টিতে বোরো আবাদের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। হাওড় থেকে উৎপাদিত ধান দেশের প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ চাহিদা পূরণ করে। এছাড়া উত্তরাঞ্চলে ধানের ব্যাপক ক্ষতি হওয়ায় কৃষকরা ঠিকমতো ধান ঘরে তুলতে পারে নি। ধান পাকার আগেই আধাপাকা ও কাঁচা ধান কেটে ঘরে তুলতে হয়েছে। ফলে ধানের ফলনেরও বিপর্যয় হয়েছে। প্রতিবছর যেখানে ভরা মৌসুমে বোরো ধান হাট-বাজারে বিক্রি হয় এবার তা ব্যতিক্রম। খুবই প্রয়োজন ছাড়া কৃষকরা ধান বিক্রি করছেন না। বাজারে যে পরিমাণ ধান আসছে ব্যবসায়ীদের প্রতিযোগিতা করে ধান কিনতে হচ্ছে। ভরা মৌসুমে যেখানে নতুন ধান ছয়শ থেকে সাতশ টাকায় বিক্রি হতো। এবার কাঁচা নতুন ধান ব্যবসায়ীদের প্রতিযোগিতা করে কিনতে হচ্ছে আটশ পঞ্চাশ থেকে নয়শ টাকা দরে।
গত ২ মে থেকে নওগাঁর সরকারি গুদামে চাল সরবরাহ শুরু হবার কথা ছিলো। কিন্তু সরকারের বেঁধে দেয়া মূল্যে গোডাউনে চাল সরবরাহ করতে গেলে ব্যাপক লোকসানে পড়তে হবে মিলারদের। ফলে এখন পর্যন্ত চাল সরবরাহের জন্য কোনো মিলাররা চুক্তি করেন নি। নতুন করে চালের মূল্য নির্ধারণ করা না হলে কেউ চাল সরবরাহের চুক্তি করবেন না বলে জানিয়েছেন চালকল মালিকরা।
২০১৬ সালে সরকারি মূল্যে গোডাউনে চাল সরবরাহ করতে গিয়ে অনেক মিলার লোকসানের দায়ে পথে বসার উপক্রম হয়েছে। শুধুমাত্র মিলের লাইসেন্স টিকিয়ে রাখার জন্য গত বছর চাল সরবরাহ করেছেন চুক্তিবদ্ধ চালকল মালিকরা। সরকারের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার পর এই বছরও যদি লোকসান দিয়ে চাল দিতে হয় তাহলে চালকল মালিকদের পথে বসতে হবে। মিলের লাইসেন্সতো দূরের কথা মিল বিক্রি করে হলেও চাল সরবরাহ করতে হবে চালকল মালিকদের। এ জন্য পুনরায় চালের দর বেধে দেয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান চালকল মালিকরা।
নওগাঁর মেসার্স ফরিদ অ্যান্ড সুলতান ট্রের্ডাসের স্বত্বাধিকারী শেখ ফরিদ হোসেন বলেন, প্রতি বছর বোরো মৌসুমে চালের দাম কম থাকে। এবার তা ব্যতিক্রম। ধান বাজারে আসার আগেই সরকারিভাবে ২৪ টাকা কেজি দরে মূল্য নির্ধারণ করায় বাজারে ধানের আমদানি কম। কিছু কিছু চালকল মালিক প্রতিযোগিতা করে প্রতিমণ ধান সাড়ে আটশ থেকে নয়শ বিশ টাকা দরে কিনছেন। চালের উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ায় চালের বাজার দরও বেশি। তবে বাইরে চালের দাম বেশি হওয়ায় সরকারের মূল্য কম হওয়ায় চালকল মালিকরা অনিহা প্রকাশ করছেন।
নওগাঁ ধান-চাল মালিক সমিতির সভাপতি তৌফিকুল ইসলাম বলেন, বোরো ধানের যে পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে তা পূরণ করতে সরকারকে চাল আমদানি করা ছাড়া বিকল্প কোনো উপায় নেই। ভরা মৌসুমে যেখানে চালের দাম কমে যাওয়া কথা সেখানে বাজার ঊর্ধ্বমুখি। নওগাঁ জেলা চালকল মালিক গ্রুপের সভাপতি রফিকুল ইসলাম বলেন, বাজারে ধানের যা মূল্য সে হিসেবে ধান কিনে গোডাউনে চাল সরবরাহ করতে গেলে প্রতি কেজি চালে ৪ থেকে ৫ টাকা লোকসান হবে। গত ৪ মে জেলা চালকল মালিক সমিতির সভা থেকে সরকার কর্তৃক চালের মূল্য নতুন করে নির্ধারণের জন্য খাদ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর জন্য একটি লিখিত দরখাস্ত জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে দেয়া হয়েছিলো। কিন্তু এখন পর্যন্ত সাড়া না গত ১৭ মে দুপুরে জরুরি সভায় সিদ্ধান্ত হয়, নতুন করে চালের মূল্য নির্ধারণ করা না হলে গোডাউনে চাল সরবরাহ করবে না চালকল মালিকরা।
জেলা সহকারী খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা মোহাজের হাসান বলেন, এ বছর জেলায় ৪২ হাজার ২৫০ মেট্রিক টন চাল কেনা হবে। ২ মে থেকে চাল কেনা শুরু হওয়ার কথা থাকলেও এ পর্যন্ত কোনো চালকল মালিক চুুক্তিবদ্ধ হয় নি। তবে ২০ মে পর্যন্ত চুক্তিবদ্ধ হওয়ার সময় আছে। এ সময়ের মধ্যে চুক্তিবদ্ধ হতে পারে ধান সঙ্কটে চাল সরবরাহের চুক্তি করেননি চালকল মালিকরা।
এদিকে বড়াইগ্রামে গত বৃহস্পতিবার সরকার নির্ধারিত চুক্তি করার শেষদিনে উপজেলার ১৩১টি চালকলের মধ্যে মাত্র ২৪টি চুক্তির জন্য সরকার নির্ধারিত ব্যাংক ড্রাফট করেছেন। উপজেলা খাদ্যনিয়ন্ত্রকের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বড়াইগ্রাম উপজেলায় চলতি মৌসুমে তিন হাজার ৮শ মেট্রিকটন চাল সংগ্রহের জন্য উপযুক্ত চালকল মালিকদের সাথে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার জন্য ১৩১ চালকলের মধ্যে ৮৮টিকে মনোনয়ন দেয়া হয়। সেই ৮৮টির মধ্যে শেষদিনে মাত্র ২৪টি চালকল মালিক চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন। চুক্তিবদ্ধ চালকলের মধ্যে দুইটি রয়েছে অটো চালকল। আর ৪৩টি মিল চুক্তির ভয়ে সচল মিলের তালিকা থেকে আগেই নিজেদের নাম কাটিয়ে নিয়েছেন।
বনপাড়ার মিল মালিক শরীফুল ইসলাম বলেন, প্রতি বোরো মৌসুমে আমরা হাওর অঞ্চল এবং উত্তরাঞ্চল থেকে ধান সংগ্রহ করে সারা বছর মিল সচল রাখতাম। এ বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে হাওর অঞ্চল থেকে কোন ধান পাওয়া যাচ্ছে না। আবার উত্তরাঞ্চলে আগাম বৃষ্টি এবং কালবৈশাখী ঝড়ে অধিকাংশ ধান নষ্ট হয়ে যাওয়ায় সেদিক থেকেও ধান পাওয়া যাচ্ছে না।
গাজী অটোরাইস মিলের মালিক গাজী মোমিন বলেন, লোকসান হবে তবু সচেতন ব্যবসায়ী হিসেবে সরকারি নির্দেশনার প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়ে চুক্তি করেছি। সরকারও হয়তো একসময় আমাদের লোকসানের বিষয়টি দেখবেন। তবে আমার অভিযোগ হচ্ছে নাম সর্বস্ব চালকল নিয়ে। এই কলগুলোর নাম ব্যবহার হয় যখন সরকার দেয় ৩৪ টাকা কেজি আর খোলা বাজারে থাকে ২৫ টাকা কেজি। যখনই লাভের পরিমান কম হয় তখন এদের খুঁজে পাওয়া যায় না। এইসকল ধান্দবাজ চালকলের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থানে যাওয়া উচিৎ। সরকারের চাহিদা মোতাবেক চাল এখন অটো চালকল থেকেই সরবরাহ সম্ভব বলেও জানান তিনি।
উপজেলা চালকল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবু বক্কর বলেন, বাজারে মোটা ধান পাওয়াই যাচ্ছে না। আবার সরকারি মূল্যের চেয়ে খোলা বাজারে চালের দাম অনেক বেশি। তাই মোটা অঙ্কের লোকশান থেকে রক্ষা পেতেই মিলাররা চুক্তি করতে রাজি হচ্ছে না। যারা চুক্তি করেছেন তারাও শেষ পর্যন্ত চাল সরবরাহ করবেন কিনা তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
এ বিষয়ে উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মোখলেছ আল-আমিন বলেন, চালকল মালিকদের একাধিকবার তাগাদা দিয়েও শেষ পর্যন্ত তারা চুক্তি করেন নি। এখন সরকারের পরবর্তী নির্দেশনার জন্য অপেক্ষা করছি।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ